লেখাপড়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
লেখাপড়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৭ মে, ২০২৫

দ্য ডাইং ডে

 


মালাবার হাউজ সিরিজের দ্বিতীয় বই।

১৯৫০ সালের বোম্বে। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে দান্তের ডিভাইন কমেডির একটা মূল্যবান কপি চুরি হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি উধাও হয়ে গিয়েছেন জন হিলি বলে একজন ভদ্রলোকও, যিনি পাণ্ডুলিপিটা নিয়ে গবেষণা আর নতুন অনুবাদের কাজ করছিলেন। হিলি আবার যাওয়ার আগে কিছু সংকেত রেখে গিয়েছেন, সে সব এক একটা জটিল ধাঁধা।

প্রথম কেসের পর ইন্সপেক্টর ওয়াডিয়া সবে একটু শান্তির নিশ্বাস ফেলেছেন, ততোক্ষণে নতুন কেস হাজির। ভারতের প্রথম মহিলা অফিসার হওয়ার দরুণ তাকে রোজ নতুন নতুন ঝামেলা পোয়াতে হচ্ছে। একদিকে লোকজন তাকে বরখাস্ত করতে বলছে, খিল্লি করছে, ট্যারা চোখে তাকাচ্ছে, অন্যদিকে একদল লোক তাকে সেলিব্রেট করছে, ভাষণ দিতে ডাকছে, সম্মান দিচ্ছে। আমাদের নায়িকার মাথা খারাপ। সে শুধু মন দিয়ে ইনভেস্টিগেশন করতে চায়, কিন্তু ইনভেস্টিগেশন করা কি অতই সহজ? এমন সময় আবার রেললাইনে একজন বিদেশি মেয়ের দেহ পাওয়া যায়, পোস্টমর্টেম করে জানা যায় তাকে সম্ভবত খুন করা হয়েছে। দুটো কেস নিয়ে তদন্ত চলতে থাকে।

ধীরে ধীরে বোঝা যায়, আসলে দুটো কেসই একসূত্রে জোড়া। জন হিলি বিশ্বযুদ্ধের সময় এক ইতালিয়ান ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন, তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। কিন্তু কিছু আছে, যা তাকে তিষ্ঠোতে দিচ্ছিল না। কেসের পিছনে ধাওয়া করে ইন্সপেক্টর ওয়াডিয়া আর ব্রিটিশ ক্রিমিনলোজিস্ট আর্চি ব্ল্যাকফিঞ্চ এমন এক রহস্যের সামনে এসে পড়েন, যেখানে হিটলারের এসএস থেকে মুসোলিনির সিক্রেট পুলিশ আছে, দান্তের সাহিত্য আছে, ফ্রিম্যাসনস আছে, ক্রিশ্চিয়ান ফিলোসফি আছে, আর আছে পদে পদে বিপদের আশংকা।

ওয়াসিম খান পিরিওডিকাল প্রসিডেরাল জিনিসটা বোঝেন। প্রায় সাড়ে তিনশো পৌনে চারশো পাতার বই, একের পর এক নতুন ইনফরমেশন, কিন্তু কখনওই ইনফোডাম্প মনে হয় না, একঘেয়েমিও আসে না। প্রত্যেকটা চরিত্রে ব্যাকস্টোরি বুনে তার দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনের কারণগুলো জাস্টিফাই করতে পারেন বলেই হয়তো চরিত্রগুলোর সঙ্গে একাত্ম হওয়া যায়। এছাড়া ১৯৫০ সালের বোম্বের স্থাপত্য, ইতিহাস, সিটি কালচার আর রাজনীতির পাসিং রেফারেন্স তো আছেই।

সব মিলিয়ে এই সিরিজটা আমার বেশ প্রিয় হয়ে উঠেছে। তৃতীয় বইটাও শুরু করে ফেলেছি দোনামনা করে, ফেলে রাখতে ইচ্ছে করছিল না। উইকেন্ড কাটানোর জন্য পারফেক্ট বই।

দ্য ডাইং ডে
Hodder & Stoughton
Kindle edition 589/- 

শনিবার, ১০ মে, ২০২৫

অদ্ভুত ছবি না অদ্ভুত বই

 


উকেতসু জাপানি ইউটিউবার। হরার মিস্ট্রি ঘরানার বই লিখে অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। কিন্তু তিনি কে কেউ জানে না। ইউটিউব ভিডিওতেও তাঁর মুখে মুখোশ থাকে, গলার স্বর থাকে কার্টুন ক্যারেক্টরদের মতো।

সেই লোক এমন জবরদস্ত বই লিখবেন আইডিয়া ছিল না। পিওর রহস্য। নো ফালতু কথা। চারটে গল্প। প্রতিটাতেই রহস্যের সূত্র লুকিয়ে আছে হাতে আঁকা ড্রয়িংয়ে। একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা পাঁচটা ছবি এঁকে মারা গেছেন, একটা বাচ্চা ছেলে বাড়ির ছবি এঁকে হারিয়ে গেছে, খুন হওয়ার আগে পাহাড়ের ছবি এঁকে গেছেন এক শিক্ষক। সেই ছবি নিয়ে তদন্ত। ভয়ানক গতিতে বই এগোয়। ছবির খুঁটিনাটি বিচার করে শিল্পীর সাইকো অ্যানালাইসিস করা হয়। একসময় বোঝা যায়, সবগুলো গল্পই ইন্টারকানেক্টেড। আস্তে আস্তে এমন এক ভয়ংকর রহস্য উন্মোচিত হয়, যা কেউ কল্পনাও করেনি।

পারফেক্ট উইকেন্ড রিড। ২৪০ পাতার বই। আমি এক সিটিংয়ে পড়েছি। মিস না করাই ভালো।

Harpervia
Kindle edition 499/

বাংলার লুপ্তপ্রায় কেবিন সংস্কৃতি

 


৯ঋকাল বুকস পরপর মচৎকার সব বিষয় নিয়ে কাজ করছে। দু একটা কেনা হয়, আবার কিছু কিছু আনালেও পড়া হয় না, বা পড়তে পড়তে বছর ফুরিয়ে আসে। যাই হোক, এই বছরের দু একটা টার্গেটেড বইয়ের মধ্যে এটা অন্যতম ছিল, অনেকেই প্রচ্ছদ দেখে আগ্রহী হয়েছিলেন যতদূর মনে পড়ছে। তারপর খুব বেশি পোস্ট ফোস্ট দেখিনি, তাই একটা ছোটকু পোস্ট। বড় পোস্ট দিয়েও লাভ নেই। আজকাল বাজারে এসব চলছে না। ফেসবুক হয়তো ভ্যানিশই করে দিল, যেমন করে অর্ধেক কেবিন রেস্তোরাঁ ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে...

যাই হোক, গ্রন্থভাবনা থেকে স্ট্রাকচারিং, সব বিষয়েই যথারীতি লিরিকালিয় যত্নের ছাপ বিদ্যমান। সে অবশ্য প্রকাশনার সব বইতেই থাকে, আলাদা করে বলার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

এখানে ঘটনা হল, লেখক তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে, সংকলনটা বানাতে কতটা খাটাখাটুনি করতে হয়েছে। খুঁজে খুঁজে এক একটা লেখা সংগ্রহ করা অত সহজ লয়!

কে নেই? অরণি বসু থেকে দামু মুখোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় থেকে সুনেত্রা সাধু, কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে যশোধরা রায়চৌধুরী...আছেন রঞ্জন রায়, সুনীল কুমার পাল, প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত প্রভৃতি। তাবড় সাহিত্যিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এমন লেখকও আছেন, যিনি এই প্রথম একটা লেখা ছাপালেন।

বইটি ভাগ করা হয়েছে এই পাঁচটি বিভাগে।


এক কেবিনের মধ্যে আরেকটা কেবিন

কিসসা কেবিন কা

কলকাতার কেবিন কড়চা

জেলায় জেলায় দুজনে কূজনে

হারিয়ে যাওয়া কেবিনের দিন

চেনা অচেনা কেবিননামা


প্রতিটা বিভাগেই চার পাঁচটা করে লেখা আছে। এছাড়া অতিরিক্ত সংয়োজন, টীকা ইত্যাদি অতিরিক্ত বিভাগও আছেই, যেমন থাকে। লেখায় যে সমস্ত কেবিনের উল্লেখ আছে, সেই কেবিনের ঠিকানা আর বর্তমানে বন্ধ আছে না খোলা আছে সেসবও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে রসনাপ্রেমিকদের কথা ভেবে।

সংকলনের কিছু কিছু লেখা স্বাভাবিকভাবেই পরে খুঁজে যোগ করা হয়েছে, তাতে অতীতের রোমান্স আর নস্টালজিয়া থাকলেও 'কেবিন' সেই অর্থে নেই, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। কেবিন নিয়ে এক্সক্লুসিভ লেখা হলেও অনেকেই হয়তো বসন্ত কেবিন/দিলকুশা/সাঙ্গুভ্যালি ইত্যাদি জায়গার কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এই পুনরাবৃত্তি শুধু নামেই, কারণ সকলের চোখ আর মন নিজের, সেই জায়গাটা সম্পর্কে স্মৃতি আর আবেগ প্রত্যেকের আলাদা।

এমনিতেও এই সংলকনে, কেবিন নিয়ে লেখা মানে শুধু কেবিন চরিত নয়, পাশাপাশি কলকাতা ও বাংলার ইতিহাসের নানান খুঁটিনাটি উঠে এসেছে। সমাজ, পরিবার, মূল্যবোধ, সাহিত্য, রাজনীতি, রন্ধনশিল্প, সংস্কৃতি, সিনেমার কথা সাবলীলভাবে জড়িয়ে গেছে আলেখের সঙ্গে। কোন কেবিন রেস্তোরাঁয় কোন সাহিত্যিক আসতেন, কোন অভিনেতা কেবিন রেস্তোরাঁ থেকে মোগলাই প্যাক করে নিয়ে যেতেন... এসব যেমন আছে, ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশও ঘটেছে ইতিউতি।

গৌতম বসু মল্লিকের কলমে 'আড্ডা, প্রেম ও কেবিনকথা' ওপেনিং কলম হিসেবে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য, তথ্যবহুল লেখা। কিন্তু আমার মন ছুঁয়ে গেছে দেবদত্ত গুপ্তের 'চপলেট কাটলেট রমাকান্তর কেবিন'। স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অনেকে হাহুতাশ করেছেন সে যুগে কেবিন রেস্তোরাঁয় গিয়ে প্রেম করা হল না বলে, অনেকে আবার কেবিনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া স্টুডেন্ট লাইফের নোলার কাহিনিই লিখেছেন ঘি গরমমশলা দিয়ে। কেউ কেউ বদলে যাওয়া সমাজ নিয়ে কমেন্ট্রি করেছেন, কেউ আবার অনুসন্ধান করেছেন স্পেসিফিক কেবিন রেস্তোরাঁর রসুই রহস্য।

এত এত কেবিন সর্বস্ব লেখাতেও দামুবাবু যথারীতি নিজস্বতা বজায় রেখে আউট অফ দ্য স্টেডিয়াম ছয় আঁকড়েছেন। যাঁরা রহস্য গল্প লিখবেন বলে হাত পাকাচ্ছেন, অ্যাটমস্ফিয়ার ক্রিয়েট করার বিদ্যাটা তাঁর লেখা পড়ে আয়ত্ত করে ফেলুন। 'পাহাড়ের কেবিনগাথা' অমনভাবে আর কেউই লিখতে পারত না। কুমারপ্রসাদের লেখায় আলিসাহেবের একাধিক ঘটনা পড়ে যারাপরনাই প্রীত হলাম। দারুণ লেগেছে সুনেত্রা সাধুর 'আড়াল আর আগুন স্মৃতি'।

সব নিয়ে ফাটাফাটি সংকলন। যাঁরা জীবনে ডেটিং সাইট বা কেবিন লাইট কিছুই পাননি আমার মতো, বই পড়েই পাপখণ্ডন করুন।

বৃহস্পতিবার, ৮ মে, ২০২৫

ফ্যামিলি স্টাইল: স্টাইল সে জিনে কা

 


চমৎকার একখানা গ্রাফিক নভেল। 'আমেরিকান বর্ন চাইনিজ' বা এশিয়ান ইমিগ্রেন্টদের গল্প ভালোবাসলে বলাই যায়, 'ফ্যামিলি স্টাইল'-ও সম্ভবত আপনার মন কাড়বে।
একটা ইমিগ্রেন্ট ফ্যামিলিকে ওয়ার জোন থেকে পালিয়ে নতুন দেশে (বিশেষ করে যদি দেশটা আমেরিকা হয়) এসে থিতু হতে গেলে যে সমস্ত বাধাবিপত্তির সামনে পড়তে হয়, দাঁতে দাঁত চিপে ছেলেমেয়ের মুখ চেয়ে যে সব স্বার্থত্যাগ করতে হয়, তার সব কিছুই এখানে আছে, কিন্তু তাই বলে বইটা কখনওই ন্যাকা প্যানপ্যানে বা ক্লিশে হয়ে ওঠেনি। লেখায় যত্ন আর আবেগ, দুইই সমান পরিমাণে আছে। আঁকাও দিব্যি। যাকে বলে কমপ্লিট প্যাকেজ! ঝকঝকে পাতা। দগদগে অতীত। ফুরফুরে হিউমার। কুড়মুড়ে সংলাপ। কামিং অফ এজ ড্রামা, গ্রেট আমেরিকান ড্রিম... কিছুরই অভাব নেই।
সাধেই কি আর আইসনার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে?
কিন্তু, এসব ছাড়াও যে কারণে বইটা আমার কাছে আলাদা করে কিছুটা স্পেশাল হয়ে উঠল, তা হল এই স্মৃতিকথায় খাদ্য সংস্কৃতির এক বিশেষ ভূমিকা আছে। এক ভিয়েতনামিজ ইমিগ্রেন্ট ফ্যামিলি, যে দুই পুঁচকেকে নিয়ে নৌকায় করে থাইল্যান্ডে এসে ইউএস রিফিউজি ক্যাম্পে উঠেছে আর মাসের পর মাস কোনোক্রমে দিন কাটিয়ে আমেরিকায় থিতু হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তাদের জীবনে খাবারের ভূমিকা এমন কি জোরদার? সারভাইভ করে গেলেই তো হল!
কিন্তু জীবন অত সহজ পথে চলে না। হাফপ্যান্ট পরা পুঁচকে ছেলেটা যখন জলে ভিজে হাফ সাঁতরে, হাফ ঠেলা খেয়ে, সমুদ্রের জল গিলে রিফিউজি ক্যাম্পে এসে পৌঁছচ্ছে আর প্রথম তরমুজ আর ফারমেন্টেড ফিশ মুখে তুলছে, তার কাছে তরমুজের মিষ্টি আর মাছের টকটাই জীবনের একমাত্র স্বাদ হয়ে ধরা পড়ছে। সেটাই তখন তার একমাত্র স্মৃতি, ছোটবেলার প্রথম স্মৃতি। তখন সে জানেও না তিরিশ বছর পর এই কাহিনি সে আঁকতে শুরু করবে, কিন্তু তার অজান্তেই এই খাবারগুলো চিরদিন তার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থেকে গিয়েছে। অনেক কিছু হয়তো আস্তে আস্তে আবছা হয়ে গেছে, কিন্তু এক একটা রেসিপি, এক একটা পদ, এক একটা খাদ্যভাস তার মাথায় রয়ে গেছে। নৌকায় মায়ের হাত থেকে নিয়ে রাইসবল খাওয়া, পেট চালানোর জন্য রিফিউজি ক্যাম্পে সবাই মিলে ভিয়েতনামিজ খাবারের দোকান দেওয়া, আমেরিকার সান জোসে গিয়ে প্রথম স্টেক খাওয়া, স্কুলে ফ্রি লাঞ্চে পাওয়া আপেল আর সালিসবারি স্টেক, বড় হয়ে আমেরিকান ফাস্ট ফুডের অ্যাডিকশন আর বার্গারের নেশায় মায়ের সযত্নে রাঁধা খাবার ময়লার বাক্সে ফেলে দেওয়া... প্রতিটা চ্যাপ্টারই একটা খাবারকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে।
আরেকটা জিনিস যা খুব পছন্দ হল, তা হল বইয়ের শেষে এক একটা পাতায় বইসংক্রান্ত ছোট ছোট কমিক আঁকা। যেমন, এই বইটা আমি কী করে আঁকলাম? বাবা মা বইটা পড়ে কী বলল? ওই দুষ্টু ছেলেটার সঙ্গে এখনও দেখা হয় কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। মজার ছলেই লেখা, কিন্তু জেনুইন।
সব নিয়ে চমৎকার কাজ। সোজাসাপটা। ইমোশনাল। হিউমারাস। ব্যালেন্সড। ফিলগুড তো বটেই। পড়লে আশা করি মন্দ লাগবে না।
First Second
Kindle edition 797/-

বুধবার, ৭ মে, ২০২৫

মাই টেন্ডর ম্যাটাডোর

 


চিলিতে 'মাই টেন্ডর ম্যাটাডোর' বইটির একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। আধুনিক যুগের কুইয়ার ক্লাসিক তো বটেই, পেদ্রো লেমেবেলের এই উপন্যাস ১৯৮৭ সালের যে সময়টা তুলে ধরেছে, যখন চিলিতে বুগিউগি চলছে। ইউনিভার্সিটি চত্বরে ছাত্ররা একাধিক রেবেল গ্রুপ বানিয়ে প্রটস্ট করছে, কমিউনিস্ট গেরিলাবাহিনী পিনোচেকে খুন করে 'ডেমোক্রেসি' আনবে বলে হুঙ্কার দিচ্ছে, ওদিকে সরকার একের পর এক নতুন আইন বানাচ্ছে আর স্টেট স্পন্সর্ড মিডিয়া দেশের সাধারণ মানুষের ব্রেনওয়াশ করে ফেলেছে প্রায়। এমন সময় এই উপন্যাসের কাহিনি শুরু হয়। মূল স্প্যানিশে উপন্যাসের নাম হল Tengo miedo, torero যা আসলে সারা মন্টিয়েলের একটা বিখ্যাত গানের লাইন। এখন এই লাইনের সঙ্গে নানান ইমোশনাল অ্যাস্পেক্ট, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আর নস্টালজিয়ার গল্প জড়িয়ে আছে, সে বলাই বাহুল্য। হিস্প্যানিক সাহিত্যে জনপ্রিয় প্রবাদ বা গানের কথা ব্যবহার করে উপন্যাসের নাম রাখা খুব কমন ব্যাপার, কিন্তু সে নিয়ে আপাতত আর কথা খরচ করলাম না।

আসল কথা হল, পেদ্রো লেমেবেলের এই উপন্যাস ২০০১ সালে প্রকাশিত, এই নিয়ে আগেও অনেক সিনেমা নাটক হয়েছে, এখনও হচ্ছে। নতুন যুগে পাঠকদের আগ্রহ দেখে পুশকিন প্রেস বইটা নতুন করে প্রকাশিত করেছে ২০২৫ সালে। বইটা পড়তে শুরু করেছিলাম বেশ কিছুদিন আগে, শেষ করতে বেশ সময়ই লাগল। কেন?

কারণ, উপন্যাসটা ঠিক গতানুগতিক উপন্যাসের মতো লেখা হয়নি। চ্যাপ্টার ফ্যাপ্টারের বালাই নেই। মূল চরিত্র কুইন অফ দ্য কর্নার বলে একজন 'ট্রাভেস্টি' বা মাঝবয়সী সমকামী, তাঁকে মাঝেমধ্যে হি, আবার মাঝেমধ্যে সি লেখা হয়েছে। লাতিন আমেরিকায় ট্রাভেস্টি মানে সম্ভবত পুরুষ যিনি মহিলাদের মতো ক্রস ড্রেস করেন, কিন্তু চরিত্রটির মনের ভাব বা সিদ্ধান্তগুলো বুঝতে আমার বেশ সময় লেগেছে।

এখন এই কুইন একজন তরুণ ছাত্রের প্রেমে পড়েছেন, সেই ছাত্রটির নাম কার্লোস। সে কুইনের বাড়িতে নানান সন্দেহজনক জিনিসপত্র রেখে যাচ্ছে, অন্যান্য ছাত্রদের নিয়ে এসে গোপনীয় আলোচনা করছে, কিন্তু কুইনকে কিছু জানাচ্ছে না। আর প্রেমে অন্ধ হয়ে কুইনও জিজ্ঞেস করছেন না। আমি দিব্যি বুঝতে পারছি, কার্লোস প্যাট্রিওটিক ফ্রন্টের গেরিলাবাহিনীর সৈনিক, সে আসলে অস্ত্রশস্ত্র গোপনে রাখার জন্য কুইনের বাড়িটা ব্যবহার করছে। কিন্তু কুইন বুঝছেন না কেন? না তিনি বুঝেও বুঝতে চাইছেন না? এটা কি ও-ই 'একতরফা পেয়ার' এর পাগলামি? কার্লোসের মনে কি তাঁর জন্য কোনও ইমোশন আছে, নাকি সবটাই তাঁর ভালো ব্যবহার শুধুই তার কাজ বের করার ফন্দি? এইসব ঝামেলা না হয় হল, কিন্তু এরমধ্যে খোদ পিনোচে আর তাঁর স্ত্রী লুসিয়াও এসে পড়েছেন। পিনোচের স্বৈরাচারী শাসনের সিদ্ধান্ত, ডিপ্লোম্যাসি, এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার চলছে, আবার তাঁদের পারিবারিক জীবনের ঝামেলাও এসে পড়ছে।

এখন বইটায় না অধ্যায় আছে, না ঘটনার ভাগাভাগি আছে, না ডাবল কোট ইত্যাদির ব্যবহার আছে। সংলাপগুলো সব ন্যারেটিভে চলে এসেছে আর চারটে বাক্যের মতো। কুইনের সঙ্গে কার্লোসের কথা চলতে চলতেই লুসিয়া আর পিনোচের কথা শুরু হয়ে যাচ্ছে, কুইনের বেদনাদায়ক অতীতের সঙ্গে ঢুকে পড়ছে লুসিয়ার অতীত। আর তার সঙ্গে চলছে চিলিতে চলতে থাকা অভ্যুত্থানের লড়াই। ছাত্ররা প্রটেস্ট করছে, সেনাবাহিনী কার্ফিউ জারি করে লোকজনের ঘরেঢুকে পড়ছে, গেরিলাবাহিনী আক্রমণ করছে, ওদিকে কুইন অফ দ্য কর্নার তাঁর ওয়ানসাইডে লাভ লাইফ নিয়ে উৎকণ্ঠায় মরে যাচ্ছেন, নিজের বিপদ ডেকে এনে কার্লোসদের সাহায্য করছেন। এই কাহিনির চলন ধরতেই আমার অনেকটা সময় লেগে গেল।

আসল কথা হল, পেদ্রো নিজে সমকামী আর চল্লিশ বছর আগে সান্তিয়াগোর একজন সমকামী মানুষ, যে রেডিও আর সেলাইবোনাই নিয়েই বেঁচে আছে, সে প্রেমকে কীভাবে এক্সপ্রেস করবে, আমরা প্রথমে তা বুঝতে পারি না। তাঁর এক্সপ্রেশন, তাঁর শৈলী, তাঁর কবিতা, তাঁর বিষাদ, সবই আমাদের অচেনা। তাই অনেকেই একসময় এই বইটা পড়ে বিরক্ত হয়েছিলেন, বোলান্যো নাকি বলেছিলেন, এমন corny প্রেমের উপন্যাস আমার চাই না। কিন্তু আসলে এই প্রেম কর্নি নয়, প্রাচীনপন্থী নয়, ন্যাকা নয়, সময় ও চরিত্রের নিরিখে, এইটাই বাস্তব।

“So, like a buzzing bumblebee, he came and went through the house, feathered in his stole of: Yes, Carlos. No, Carlos. Maybe, Carlos. Perhaps, Carlos. As if the repetition of the name embroidered its letters in the air, lulled by the echo of his nearness. As if the pedal of that snarling tongue insisted on naming him, calling him, licking him, savoring those syllables, chewing that name, filling itself entirely with that Carlos so deep, that name so broad, that it remained all sigh, wrapped between the C and the A of that C-arlos that illuminated the entire house with its presence.”

একবার ব্যাপারটা ধরে নেওয়ার পর আমার আর অসুবিধা হয়নি। পেদ্রো লেমেবেল আসলে নিজেই কুইন, তিনি কুইয়ার লেখক হিসেবেই বিখ্যাত, সারাজীবন ক্রসড্রেস করেছেন, মন দিয়ে পড়লে বোঝা যায় গল্পটা অনেকটাই আত্মজৈবনিক, অটোফিকশন। কিন্তু তাই বলে দেশের তৎকালীন অবস্থা পূঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তুলে ধরতে তাঁর কোনও অসুবিধা হয়নি। সান্তিয়াগোর যানবাহন থেকে স্টুডেন্ট লাইফ, সাধারণ মানুষের ভাবনাচিন্তা, রাজনৈতিক পপরিস্থিতি সবই চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন, কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে গিয়েও বারবার মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, এটা আসলে আদতে একটা প্রেমের গল্প। এখন সেই প্রেম কতজন বুঝছে বা কতজন বুঝছে না, সেটা ভাবার দায় তাঁর নয়।

ছোট বই। কিন্তু এটা ইবুক রেকামেন্ড করব না। ভাষা আর শৈলীর কারুকাজ আছে, হার্ডকপি পড়লেই সুবিধা হবে মনে হয়।

পুশকিন প্রেস

রবিবার, ৪ মে, ২০২৫

অপ্রাগৈতিহাসিক

 


কল্পবিশ্বের হাত ধরে যে প্রতিভাবান স্পেকফিক লেখকদের একটা ব্যাচ উঠে এসেছে, তাতে সোহম গুহ-এর নাম আলাদা করে বলতেই হয়। ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সোহমের কয়েকটা গল্প পড়েই আমি তাঁর ছকভাঙা লেখার ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। বিষয়বস্তু ও চিন্তাভাবনার দিক থেকে অভিনব তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা, সোহমের কলম যে কল্পবিজ্ঞান লেখে, তাতে 'বাঙালি পাঠক ও জিনিস বুঝবে কি না! একটু সহজ করে লিখব নাকি?' জাতীয় মেন্টাল ব্লকেজ থাকে না।

যা থাকে, তা হল এই ভাবনাটা। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে কল্পবিজ্ঞান লিখতে বসেছি যখন, এই যুগের সেরা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের সঙ্গেই পাল্লা দিতে হবে, তার সমকক্ষ হয়ে উঠতে হবে, স্ট্রেট অ্যান্ড সিম্পল। এখন, এই অ্যাস্পিরেশন হয়তো অনেকেরই থাকে, কিন্তু সত্যি কথা হল, অ্যাস্পিরেশন থাকলেই তো হয় না, একটা বিশেষ ঘরানায় নিজের লেখাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হলে, আন্তর্জাতিক করে তুলতে হলে, বহুস্তরীয় করে তুলতে হলে অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হয়। আমি সেরা কল্পবিজ্ঞান লিখতে চাই, আবার সেরা ঐতিহাসিক গল্পও লিখব, অসামান্য সামাজিক কাহিনি লিখব, মর্মস্পর্শী স্মৃতিকথাও লিখে দেব ঝটপট... ওসব শুনতেই ভালো লাগে। বাস্তবে, জিনিয়াস বাদে অমন কেউ করতে পারে না। আমার যতদূর ধারণা, সোহম জানেন, তিনি স্রেফ কল্পবিজ্ঞান লিখবেন এবং মন দিয়ে লিখবেন। সেই দায়বদ্ধতা থেকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছেন, হোমওয়ার্ক করেছেন, করছেন, বইপত্রের পাশাপাশি আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের চলন ও দর্শন তিনি একদম গুলে খেয়েছেন। না খেয়ে থাকলে 'অপ্রাগৈতিহাসিক' এর মতো লেখা বেরোতে পারে না।

বইটা পড়েছি বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু আপাতত বইটা সঙ্গে নেই বলে বিস্তারিত আলোচনা লেখা একটু মুশকিল। কিন্তু এমন একটা উচ্চাকাঙ্খী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে যে পরিশ্রম লেগেছে, সে নিয়ে স্পেকফিক আগ্রহী পাঠক হিসেবে দু চার লাইন লিখে রাখলে অন্যায় হবে না।

প্রথমেই, অতি সংক্ষিপ্ত সামারি।

'অপ্রাগৈতিহাসিক' আসলে কী নিয়ে? প্রথমেই জেনে রাখা ভালো, টেকনিক্যালি বইটির নাম 'অপ্রাগৈতিহাসিক: প্রথম পর্ব (ঈশ্বরের বাগান)' এবং এ-ই বইটি একটা ট্রিলজির প্রথম খণ্ড। তেলেঙ্গানার বেআইনি খনিতে কয়েক কোটি বছর পুরোনো একটা ফসিলে মানুষের জুতোর ছাপ পাওয়া গেছে, সেই কথা চাউর হতে একাধিক দেশের বিজ্ঞানী ও সরকার নড়েচড়ে বসেছেন। এবং সেই সূত্রে একটা অভিযানের সূচনা হয়, যা এই বইটির মূল বিষয়বস্তু। এটুকুতে আশা করি প্লটের কোনও স্পয়লার দেওয়া হল না।

বাট ওয়েট, ডিড আই সে প্লট? বাট ওয়েট, প্লট ইজ নট দ্য অনলি কি থিং হিয়ার! প্লট আছে, কিন্তু শুধুই প্লট থাকলে এই বইয়ের কথা লিখতে হত না। হুম, এখানে দু এক কথা আরো বলে রাখি! বইটা পড়ে আমার অন্তত ব্যক্তিগত ভাবে যা মনে হয়েছিল সেইটুকুই, কারণ লেখক বা অন্যান্য পাঠকের পাঠ অভিজ্ঞতা বা ইন্টারপ্রিটেশন আমার চেয়ে ভিন্ন হতেই পারে।

'অপ্রাগৈতিহাসিক' ভীষণ একটা চনমনে সাস্পেন্স থ্রিলারের ভঙ্গিতে শুরু হয়েছে। একের পর এক রহস্য, অজানা তথ্য, প্রাগৈতিহাসিক থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক যুগের স্টেট অফ দ্য আর্ট টেকনোলজির তাকলাগানো তথ্য, এবং মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া জটিল সব প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে মিশে একটা স্পাইডারনেট তৈরি করেছে। অনেক পাঠক হয়তো ভাবছেন বইটা একদম টেকনো থ্রিলারের ভঙ্গিতে শেষ লাইন অব্দি আপনাকে এজ অফ দ্য সিটে বসিয়ে রাখবে। মারকাটারি অ্যাডভেঞ্চার হবে ক্রিকটনের বইয়ের মতো। আমারও তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু না, বইটার মাঝামাঝি গিয়ে আমার মনে হয়েছে, 'ওই বইটা' লেখক লিখতে চাননি। এখানে রোমাঞ্চকর সব ঘটনা ঘটছে পরপর, সার্ভাইভালের জন্য দাঁত চাপা লড়াই আছে, গায়ের রোম দাঁড় করানো ঘটনা আছে, অ্যাড্রেনালিন রাশ আছে, গতিও আছে, কিন্তু সেই সব ছাপিয়ে কেন এই বইটা স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে তার কারণ হল, বইটা আসলে একটা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের একটা বিশেষ দর্শনকে অবলম্বন করে এগিয়েছে, যার নাম পোস্ট সার্টেনিটি প্যারাডাইম।

এখন ওপর ওপর দেখলে মনে হয় পোস্ট সার্টেনিটি প্যারাডাইম এমন আর কী নতুন জিনিস? ট্রাডিশনালি একরকম কল্পবিজ্ঞান কাহিনি লেখা হত, তাতে অনুমান করা হত বিজ্ঞানের অগ্রগতি হতে হতে এমন একটা সময় আসবে যখন এই সমস্ত চমৎকার জিনিস থাকবে কিংবা তার ফলে কিছু কিছু ক্রাইসিস তৈরি হবে। কিন্তু পোস্ট সার্টেনিটি প্যারাডাইম এই বিশ্বাসটাকেই চ্যালেঞ্জ করে। এখন technological determinism কে চ্যালেঞ্জ করে বলা যে এআই এলে এই সমস্যা হবে বা রোবটরা বেশি শক্তিশালী হলে মানুষকে দাস হয়ে থাকতে হবে খুবই প্রাথমিক লেভেলের কল্পনা, সে নিয়ে অসংখ্য লেখা আছে। কিন্তু সমকালীন post-paradigm shift আরো অনেক বেশি জটিল প্রশ্ন তুলছে, সেখানে আসলে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের অস্তিত্ব চেতনা আর মরালিটিকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। একটা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা দুর্ঘটনা কীভাবে সমগ্র মানবজাতিকে একটা নৈতিক দ্বন্দের মধ্যে ফেলে দিতে পারে, সে নিয়ে চিন্তাভাবনা করাই পিসিপি ঘরানার প্রধান অস্ত্র।

সেখানে কিছুই নিশ্চিত নেই, সবই ধোঁয়াশা! যদি বিজ্ঞানের অগ্রগতির পূর্বপরিকল্পিত ভাবনাটাই মিথ্যা বলে জানা যায়? মানুষ বা মহাকাশ বা সময়ের যে প্রমাণিত কন্সেপ্ট আছে, তাই যদি বদলে যায়? সত্যি বলতে, বাস্তবেও scientific dogmatism এর দিন চলে গেছে। দিন দিন নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে, নতুন নতুন তথ্য জানা যাচ্ছে, তার ফলে বহুদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ধারণা বাতিল হয়ে যাচ্ছে, বিজ্ঞানের সমস্ত কিছুই রিভিজন করতে হচ্ছে। এর বিকল্প নেই, কারণ 'নতুন' বিজ্ঞান বলছে 'পুরোনো' বিজ্ঞান ভুল, আবার 'ভবিষ্যতের বিজ্ঞান' ও 'বর্তমানের বিজ্ঞান' কে ভুল বলবে বলে অনেকের বিশ্বাস। কে জানে? এই বাস্তবতাবোধ, এই এপিস্টেমিক হিউমিলিটির ফলে মানবজাতির সত্তা ও অস্তিত্বের ধারণাই এখন এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে কোনও কিছুর নিশ্চয়তা নেই।

পোস্ট সার্টেনিটি প্যারাডাইম শিফটে এ-র সঙ্গে ঢুকে গেছে পোস্টমর্ডানিজম আর সিউডোসায়েন্সের নানান ধারণা। নতুন প্রযুক্তির ভুল এবং ইনএফিসিয়েন্সির ফলে নানারকমের পারশেপশন তৈরি হচ্ছে। এই যেমন, যে অ্যাপে টাইপ করছিলাম, সেখানে ইংরেজি শব্দ Dogmatism টাইপ করতেই বাংলায় 'কুকুরজাতীয়' লিখে দিল, Paradigm কে প্যারাডাইম না লিখে প্যারাডিগম লিখে ফেলল, epistemic কে 'জ্ঞানমূলক' করে দিল। অটোকারেক্টের তো যা তা অবস্থা! এখন আমি ভাবছি প্রযুক্তিটা ইনএফিসিয়েন্ট, কিন্তু তবু আমরা গুগল টাইপিং আর ট্রান্সলেট ব্যবহার করছি। এখানেই একটা গোটা জাতির দ্বন্দের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বেলাইনে চলে এসেছি। এ নিয়ে বিশদে বলা এখানে অসম্ভব। কিন্তু বটমলাইন হল, আধুনিক কালে এই দর্শনকে অবলম্বন করে লেখা কল্পবিজ্ঞানে মূলত সময়, ইতিহাস, প্রযুক্তি এবং মানুষের অস্তিত্বচেতনার জটিল প্রশ্নগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই বইগুলো শুধুই বিজ্ঞাননির্ভর অনুসন্ধানের গল্প বলে না, বরং মানবচেতনার দার্শনিক দিকগুলো নিয়ে একটা কাহিনি বুনে তোলে। 'অপ্রাগৈতিহাসিক' ও তার ব্যাতিক্রম নয়।

আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের যে আরেকটি বিশেষত্ব এই উপন্যাসে পুরোদমে আছে, তা হল কল্পকাহিনির মাধ্যমে বাস্তব দুনিয়ার কথা তুলে ধরে। সহজ হিসেব হল, কল্পবিজ্ঞান আসলে আগামীর গল্প নয়, সার্থক কল্পবিজ্ঞান চিরকাল বর্তমানের কাহিনি বলতে চেয়েছে। মোড়ক যা ইচ্ছে হতে পারে, রূপক যা ইচ্ছে ব্যবহার করা যেতে পারে, মহাকাশ থেকে জলের নিচে, হাজার বছর পরের দুনিয়া বা হাজার বছর আগের দুনিয়ায় কাহিনি থাকলেও, আসলে তা আজকের গল্প। লেখায় বর্তমানের প্রতিফলন না থাকলে, সোশিওলজিকাল কন্টেক্সট না থাকলে, এই সময়ে অনুভব করা অসহায়তাগুলো লেখায় ফুটিয়ে না ওঠাতে পারলে সেই কল্পবিজ্ঞান কোনও কাজের নয়। এখন যদি কোনও পাঠক সায়েন্স ফিকশনে শুধু উদ্ভট গ্যাজেট খুঁজছে, এলিয়েন খুঁজছে আর রাজনীতি আর সোশ্যাল রিয়ালিটির আলোচনা/সংলাপ পেলেই হাই তুলছে, তাহলে তা পাঠকদের সমস্যা, সায়েন্স ফিকশন বা তার লেখকদের নয়। না না, আমি বলছি না, বিদ্বজনেরা বলছেন।

সেই জায়গা থেকে সোহমের উপন্যাস টপনোচ। প্রথম বইতেই তিনি যথাসম্ভব সোশ্যাল রিয়ালিটি দেখিয়েছেন, ক্রাইসিসটাকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে বুনেছেন, পাঠকদের অনাদি-অনন্ত বিস্তৃত জটিল সায়েন্টিফিক-এথনিক ডিলেমার মাঝে ফেলেছেন, এবং যতটা সম্ভব রোমাঞ্চ আর গতি বজায় রেখেছেন। তার ভাষাটাও ঠিক চিরাচরিত বাংলা নয়, একদম ঝরঝরে স্বতঃস্ফূর্ত বাংলা বলতে যা বোঝায় তা নয়, ইংরেজি স্পেকফিকে যে ধরনের ভাষা বা বাক্যগঠন থাকে, অনেকটা সেই ধাঁচের। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ভাবে তাতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি, পাঠসুখে ব্যাঘাত ঘটেনি, বরং ব্যাপারটা লেখকের ক্রিয়েটিভ চয়েজ বলেই মনে হল। মেলভিল বা ম্যারি ডোরিয়া রাসেলের মতো অনেকেই গতানুগতিক ইংরেজি বর্জনকে একটা নিজস্ব ভাষায় উপন্যাস লিখেছেন, খানিকটা সেরকমই। আরো খোলতাই ভাষা হলে পড়তে বেশি ভালো লাগত না লাগত না, সেটা আপাতত বোঝার উপায় নেই।

যাই হোক, বাংলা সায়েন্স ফিকশনের জগতে এই বইটি এবং সিরিজটি অতি প্রয়োজনীয় সংয়োজন হতে চলেছে, সেটুকু স্বীকার না করে উপায় নেই। যাঁরা সিরিয়াস সাই ফাই নিয়ে ইন্টারেস্টেড, এই বইটা মিস না করাই ভালো। আপাতত দ্বিতীয় খণ্ডের অপেক্ষায়।

অপ্রাগৈতিহাসিক
সোহম গুহ

সোমবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৫

টোকিও আজকাল

 


তাইয়ো মাতুস্মোতো যে জিনিসে হাত দেন, তাই সোনা হয়ে যায়। শুধু শুধুই ভদ্রলোক একাধিকবার আইসনার অ্যাওয়ার্ড পাননি। ভিজ থেকে তিন খণ্ডে প্রকাশিত 'টোকিও দিজ ডেজ' কথাটা ফের মনে করিয়ে দিল।
কাজুও সিওজাওয়া তিরিশ বছর ধরে মাংগা আঁকছেন। গ্রাফিক নভেলের শুরুতেই দেখা যায়, তিনি তার কর্মজীবন থেকে ইস্তফা নিচ্ছেন। স্বেচ্ছায়। তাঁর সহকর্মীরা, তাঁর জুনিয়াররা, সম্পাদক হিসেবে যাঁদের তিনি হাত ধরে সামনে নিয়ে এসেছেন, সবাই খানিকটা বিভ্রান্ত। সত্যি বলতে, সিওজাওয়া নিজেও খানিকটা কনফিউজড। তাঁর মাংগা জীবনের দীর্ঘ কেরিয়ার যেন গিয়েও আর যাচ্ছে না। তিনি জমিয়ে রাখা ঘরভর্তি মাংগা কমিকস বিক্রি করব করব করেও করতে পারছেন না, আঁকা ছেড়ে দেব বলেও ছাড়তে পারছেন না, অজান্তেই সেই কাফে বা টি হাউসের দিকে পা ঘুরে যাচ্ছে যেখানে তাঁর জুনিয়ার বা মেন্টাররা বসতেন, এখনও বসেন। বইয়ের দোকানে দোকানে ঘুরছেন। শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলছেন, আর্ট ফর্ম নিয়ে আলোচনা করছেন। মাঝে মাঝে হয়তো একজনকে বোঝাচ্ছেন, যে আগের মতো আর কাজে সেই স্পার্ক দেখা যাচ্ছে না। আবার কাউকে বলছেন, লেগে থাকো, তোমার মধ্যে আছে, শুধু হাল ছেড়ো না। এক সময় গল্প সিওজাওয়াকে ছাড়িয়ে বৃহত্তর মাংগা জগতে ঢুকে পড়ে। কত কত শিল্পী। কেউ প্যাশনেট, কেউ হাল ছেড়ে দিয়েছে, কেউ লড়ে যাচ্ছে, কেউ অবসাদগ্রস্ত। তাদের রোজনামচা, তাদের আশা হতাশা আর... আর টোকিও শহর। ভালোয় মন্দে, রোদে বৃষ্টিতে, কাকাতুয়া আর বেড়ালের কথায়, ছাতা উড়ে যাওয়ায়, শেষ ট্রেন ধরায়, রাস্তা ক্রস করায়... শহর চলছে গল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। সাদামাঠা। অলংকারহীন। আড়ম্বরহীন। কিন্তু জীবনের মতো বহমান। তিন খণ্ড ধরে শুধু এ-ই। শহর আজকাল। টোকিও দিজ ডেজ।
এসব গল্প লেখা থুড়ি আঁকা সকলের কম্মো নয়, সাহসের কথা তো ছেড়েই দিলাম।

সোমবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৫

বাংলার স্টেশন কথা

 


একটা বই কী করে হয়?

একটা বই করে কী হয়?

দুটো প্রশ্নের উত্তরই কেস স্পেসিফিক। একটা বই করে আসলে কিছুই হয় না হয়তো; শুধু শুধু মানসিক চাপ নেওয়া, ঘাড়ে পিঠে ব্যাথা হওয়া, কিংবা চোখের বারোটা বাজানো। আবার হয়তো, একটা বই করে একজন ভীষণ আনন্দ পায়। গোটা প্রসেসটার সময় তো বটেই, তার পরেও সেই বইটা তাঁর জীবনে ভ্যালু অ্যাড করে। ওদিকে, একটা বই তৈরি হওয়াও নানারকম। আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই রবিবার পান্ডুলিপি শুরু হয়ে পরের শনিবার জমা হলে আসছে সোমবার বই ছাপাইতে চলে যায়। আজকাল অ্যাসেম্বলি লাইনে ফেলে বই করা কোনও ব্যাপারই নয়। ওদিকে এমনও ঘটে, যে ভীষণ নাকমুখ কুঁচকে একটা বই নিয়ে বছর কাবার করে দেন লেখক/প্রকাশক, নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ান, অথচ বই হাতে নেওয়ার পর সেই যত্ন চোখে বা মনে ধরা পড়ে না।

কথাগুলো মনে পড়ল, এই বইটার কথা উঠতে। ট্রেন নিয়ে আমার বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রহ আছে বটে, কিন্তু বাংলার স্টেশন নিয়ে আমি ওই দু একটা বই পড়ে ভাসাভাসা যা জানা যায়, তার চেয়ে বেশি কিছু জানি না। তবু কেন জানি সম্পাদক জুটি আমাকে প্ল্যানিং টিমে রেখেছিলেন কে জানে? হয়তো ট্রেনের প্রতি আগ্রহের কথা জেনে গিয়েছিলেন বলেই! ফালতু বকা ছাড়া আমার কন্ট্রিবিউশান শুন্য। মাইনাসও বলা যায়। কিন্তু এই গোটা সময় ধরে আমি দেখলাম, একটা 'নট সো কমন' বিষয়বস্তুর বইটাকে একটা 'নট সো কমন' বই বানানোর জন্য দুজন মানুষ কী খাটুনিই না খাটলেন!

ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে যখন আমাকে গ্রুপে ঢোকানো হয়, তার সম্ভবত বছর খানেক আগে থেকেই বইয়ের খসড়া করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানে, বিষয়বস্তু সম্পর্কে হোমওয়ার্ক করা, অন্যান্য বই গুলে খাওয়া, কে বা কারা লিখতে পারেন, কী নিয়ে লিখতে পারেন, তার একটা প্রাথমিক পরিকল্পনা আগেই হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ম্যানুস্ক্রিপ্টের যেমন ড্রাফট ১ থেকে ২০ হতে পারে, প্রাথমিক পরিকল্পনাও ফাইনাল হতে গিয়ে পঞ্চাশবার অদলবদল হয়।

একপর্ণিকা ছোট প্রকাশনী। ত্রিপুরা থেকে বই করে, প্রকাশক কলকাতায় আসেন না। মানে, আসেনই না। মুখ দেখাতেও না। জয়ঢাক প্রকাশন তাদের পরিবেশক, বই তাই সহজলভ্য। কিন্তু মূল প্রকাশকের বই করে কতটা প্রফিট হয়, কতজন পড়েন আমার জানা নেই। আন্দাজ করছি, সঙ্খ্যাটা মারাত্মক কিছু নয়! তবু, একটা বই নিয়ে এই লং টার্ম এফর্ট দেওয়া, এই আন্তরিক যত্ন আর নিজের দিক থেকে পরিশ্রমের ত্রুটি না রাখার প্রসেসটা আমি বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি।

তা সত্ত্বেও কি সব সময় বই একদম পারফেক্ট হয়? সব বইই কি বিষয়বস্তু, প্রোডাকশন বা প্রচ্ছদের দিক থেকে আমার চোখে দারুণ কিছু বলে মনে হয়?

না। হয় না।

এটাই সত্যি কথা। বানানের ভুল থাকতে পারে, প্রচ্ছদ আমার পছন্দ না হতে পারে, মেকিং বা প্রুফের ত্রুটিও কিছু থাকতে পারে মাঝেমধ্যে। থাকেও।

কিন্তু যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করে, তা হল একজন মানুষের প্রতিবার নাছোড়বান্দা পারফেকশন পাওয়ার জন্য করা এই চেষ্টাটা। প্রকাশনী বলতে তো একজন মাত্র মানুষ। বাজেটও নেই। লোকবলও নেই। শুধু ভালো বই করার জেদ আছে, ইচ্ছে আছে। আমি জানি, এমন প্রকাশনী আরো আছেন। অনেকেই আছেন, শূন্য লাভ নিয়েই লড়ে যাচ্ছেন। একবার একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমার বাংলা প্রকাশনা জগতে কী ভালো লাগে? আমি বলেছিলাম, হাজার অপেশাদারিত্ব আর বিতিকিচ্ছিরি রকম পলিটিক্স আর স্ট্রাকচারহীন জগতে থেকেও কয়েকজন মানুষ সব প্রফিট লসের হিসেব ভুলে ভালো বই করার জন্য খাটছে, বুদ্ধিসুদ্ধি শিকেয় তুলে প্যাশন নিয়ে বাঁচছে। ওইটুকুই ভালো লাগা। ওইটুকুই।

এইবার আমি একটা বই বানাতে দেখলাম, যেটার সঙ্গে আমি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবেও হয়তো জড়িয়েও নেই। না আমার লেখা আছে, না আমি সম্পাদক, না বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা আছে। সেইজন্যই বুঝি আরো মন দিয়ে দেখতে পেলাম, অনুভব করতে পারলাম, এই বইটা ঠিক কতটা যত্ন নিয়ে তৈরি করা হল?

বাংলায় স্থানীয় স্টেশন নিয়ে একাধিক কাজকর্ম হয়েছে। কিন্তু সাবজেক্টটা এতটাই বড় যে প্রতিটা অঞ্চলের স্টেশন নিয়ে এক একটা সিরিজই হয়ে যেতে পারে। আচ্ছা, তুলনামূলক ভাবে অজানা বিষয় নিয়ে লেখা সংগ্রহ করার জন্য সম্পাদকরা কী কী করেছেন? বইটাকে ভালো করার জন্যই বা তাঁরা কী করেছেন? আমি বরং কয়েকটা পয়েন্ট লিখে দিই।

১) আই আর এফ সি এ অর্থাৎ ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ফ্যান ক্লাব ফোরামের যাবতীয় লেখালিখি পড়ে দেখেছেন, দরকারে সেই লেখা নিয়ে অন্যান্য বইপত্র/লেখালিখি ঘেঁটে দেখেছেন। এই আমি বললাম হয়তো পার্থপ্রতিম বাবু ট্রৈনিকে রেল নিয়ে চমৎকার কাজ করছেন না ভারতীয় রেল হেরিটেজ নিয়ে দীপক রায়চৌধুরী বহুদিন ব্লগ লিখেছেন, রাজীববাবু ছুটলেন খবর নিতে। হয়তো বললাম আমার বন্ধু কাম দাদা Saugata Sengupta পুরো রেলপাগলা লোক, রাজীবদা ঝাঁপ মারলেন। আমি বলেই খালাস। যেখানে দেখো ছাই উড়াইয়া দেখো তাই, সম্পাদক-জোড় কিছুই করতে বাকি রাখেননি।

২) বইয়ের স্ট্রাকচার নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলেছে। কী নিয়ে লেখা থাকবে আর কী নিয়ে থাকবে না, কোন বিষয়টা নিয়ে বইটা গড়ে উঠলে পাঠকটা নতুন কিছু পাবেন না পূর্ববর্তী বইগুলোর কোন লেখাগুলো নিয়ে কচলানোর দরকার নেই, সেই নিয়ে এমন গভীর, উত্তপ্ত, যুক্তিগ্রাহ্য আর দীর্ঘ আলোচনা চলেছে যে আমি মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে ফেলেছি।

৩) বইতে কন্ট্রিবিউটার হিসেবে অংশগ্রহণ করার জন্য কাকে কাকে অনুরোধ করা হবে, সেই নিয়েও প্রচুর মেল/মেসেজ চালাচালি হতে দেখেছি, ফোনও হয়েছে। বিষয়বস্তু নিয়ে অগাধ জ্ঞান কিন্তু লেখা তুলনায় শুষ্ক, আবার লেখার শৈলী অনবদ্য কিন্তু বিষয়বস্তুর নিরিখে সেই লেখা বিশেষ কোনও ভ্যালু অ্যাডিশন করছে না... এক্ষেত্রে কী করা যায়? এই ব্যাপারটা শুনতে যত সহজ মনে হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া ততোটাই কঠিন। বাংলা লেখালিখির জগতে কোনও কাজের মূল্য নির্ধারণ করা নেই, সবসময় ভালো লেখা পাওয়াও যায় না। আমি খুশি, অবশেষে একটা চমৎকার ব্যালেন্স করে নেওয়া যায় ভালো সম্পাদক পাওয়া গেলে। এখানেও দিব্যি কাজ হয়েছে।

৪) সম্পাদনার ক্ষেত্রে এমন সমস্ত ছোটখাটো সমস্যা দেখা যায়, সাধারণত যে সব নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায়নি। এই ধরুন, একটা স্টেশনের নাম। বাংলায় একরকম, স্থানীয় ভাষায় একরকম, হিন্দিতে একরকম। কোনটা রাখা হবে? আপনি হয়তো ভাবছেন বাংলা বইয়ে বাংলা নাম, সিম্পল! কিন্তু ব্যাপারটা অমন নয়। একটা নামের ইতিহাস বা কালচারাল সিগ্নিফিকেন্স এক একটা লেখার এমন ভাবে ঢুকে থাকে, তখন সেটাকে বদলে দেওয়া মোটেও সহজ হয় না। সেই নামের ব্যাঞ্জনার সঙ্গে লেখা ও বিষয়ের যে সামঞ্জস্য আছে, সেটা ব্রেক করলে সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে। এমন হাজারও জিনিস, স্ট্রাকচারিং থেকে প্লেসমেন্ট, সূচিপত্রের অদলবদল, ভূমিকা ও ব্লার্ব, এক একটা শব্দের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমি দীর্ঘ আলোচনা হতে দেখেছি। এক একটা সময় এমন হয়েছে, কাজ পনেরো আনা শেষ হয়ে আবার শুরু করতে হয়েছে, কারণ সামান্য একটা ভুল 'হয়তো' হলেও হতে পারে। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য না সম্পাদক না প্রকাশক একবারের জন্যও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

৫) বইয়ের সঙ্গে যে জরুরি ছবি, নথি, অলংকরণ ইত্যাদি যাবে, সেই নিয়েও তুমুল আলোচনা আর মাঝেমধ্যে মতান্তর হয়েছে। কিন্তু অবশেষে দেখা গেছে, বইয়ের জন্য যা জরুরি, সেটাকেই প্রায়োরিটি দেওয়া হয়েছে। কেউই ইগোবশত নিজের মতামত জোর করে চাপিয়ে দেয়নি। পাশাপাশি আবার 'বই কে ওয়াস্তে সব মঞ্জুর' বলে কপিরাইটেড ছবি বা অন্য বইয়ের/শিল্পীর অলংকরণ/ফোটোগ্রাফ কিছুই ব্যবহার করেননি। এই বিশেষ কাজটা করার জন্য আমি ব্যক্তিগত ভাবে টুপি খুললাম।

৬) প্রচ্ছদ যে ঠিক কতবার বানানো হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। একইভাবে কাজ হয়েছে ভিতরের ছবি নিয়েও। ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ক্যালিগ্রাফি, স্টাইল থেকে রঙের ব্যবহার, দিনের পর দিন ধরে কাজ চলছে তো চলছেই। বইমেলা চলে এল, বই হল না। নববর্ষ দোরগোড়ায়, তবু দুজনে ঘাড় গুঁজে কাজ করছে। ইভেন্ট চলে গেলে বই আদৌ বিকোবে কিনা, সে নিয়ে কারো হেলদোল নেই। দুজনের সিদ্ধান্ত, বই পারফেক্ট না হলে তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই। মিথ্যে বলব না, মাঝেমধ্যে দু এক মুহুর্তের জন্য তো আমিই ভেবেছি, ওরে বাবা! এত বাড়াবাড়ি করে কী লাভ? কতজন আর পড়বে? তারপর দুই সম্পাদকের হাড়ভাঙা খাটুনি দেখে নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে হয়েছে। অবশেষে সব বাধা বিপত্তি কাটিয়ে কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সেই বইয়ের প্রচ্ছদ প্রকাশ হল কাল। আন্তরিক যত্ন আর পরিশ্রমে করা একখান বই। হয়তো পারফেক্ট, হয়তো পারফেক্ট (পার্ফেক্ট বলে কিছু হয়ও না) নয়, কিন্তু পারফেক্ট করার ইনটেনশনটা, ইচ্ছেটা, পরিশ্রমটা ...সেটা অবশ্যই পারফেক্ট।

আমি বইটার সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নই। তবু মেকিং সম্পর্কে দু একটা কথা বললাম, সাধারণত 'বিহাইন্ড দ্য বুক' নিয়ে কথা হয়, অথচ সিনেমায় 'বিহাইন্ড দ্য সিনস' নিয়ে এক একটা ডকুমেন্টারি হয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, ট্রেন নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের কাছে অনুরোধ, বইটা উল্টেপাল্টে দেখবেন। দেখে জানাবেন, যত্নটুকু চোখে আর মনে ধরা পড়ছে কিনা! যদি পড়ে, সম্পাদক জুটির সব কষ্ট সার্থক।

বাংলার স্টেশন কথা
একপর্ণিকা প্রকাশনী
 

শনিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৫

সেলুরিয়ান সি-এর দ্বীপের সেই বাড়িটা

 


জি কে চেস্টারটন বলেছিলেন, সাহিত্য পড়া আসলে লাক্সারি, গল্প পড়া হল প্রয়োজন। মাঝেমধ্যে এক একটা বই কথাটা মনে করিয়ে দেয়। এই অসম্ভব, অসম্ভব মিষ্টি বইটার কথা লিখে রাখলাম, কেউ পড়লে তাদের দু চারটে দিন অনেক বেশি মিষ্টি হয়ে উঠবে। ডায়াবিটিস থাকলেও সমস্যা নেই। একদম সুগারক্যান্ডি বই, যদিও মাঝেমধ্যে টকমিষ্টি লজেন্সের স্বাদও পাবেন। আর যদি স্টোরিটেল বা অন্য কোথাও অডিও স্টোরি শোনেন, তাহলে তো পোয়াবারো। এমন মালপো হালুয়া জিলিপি মার্কা রস গড়ানো বইকে সাহিত্য বলে গণ্য করে না অনেকেই, তারা ওইসব মোটামোটা জটিল বই নিয়ে বসে থাকুক গে! আমরা বরং ছোট করে সেলুরিয়ান ক্রনিকালসের প্রথম বইয়ের গল্পটা জেনে নিই।

লিনাস বেকার ডিপার্টমেন্ট অফ চার্জ ফর ম্যাজিকাল ইউথের জন্য কাজ করেন। কেরানি গোছের কাজ, তাঁর প্রধান দায়িত্ব হল ম্যাজিকাল চাইল্ডদের জন্য বরাদ্দ অনাথআশ্রমে গিয়ে দেখে আসা বাচ্চাগুলো যত্নে আছে কিনা! ঝামেলা থাকলে রিপোর্ট দেওয়া, সেই অরফেনেজ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। এই কাজ করতে করতে তিনি চল্লিশের গোড়ায় পৌঁছেছেন, অন্য সবাই পদোন্নতি পেয়ে তাঁকে টপকে গেছে। লিনাস বেকার থেকে গেছেন। তিনি ভুঁড়ি থলথলে গোবেচারা মানুষ, একা থাকেন, সঙ্গী বলতে একজন বেড়াল মাত্র। গান শোনা ছাড়া তেমন কোনও শখ নেই। দজ্জাল বসের কাছে বকা খান, বাড়িওয়ালা রোজ টিটকিরি দেয়, তিনি বাস থেকে নেমে বৃষ্টিপ্রবণ শহরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে সমুদ্রের কথা ভাবেন, কিন্তু সমুদ্র দেখতে আর যাওয়া হয় না। তিনি নিজেও জানেন, আমার কিছু হওয়ার নয়।

এমন সময় একটা হাই ভোল্টেজ অ্যাসাইনমেন্ট এসে পড়ে তাঁর কাছে৷ হাইয়ার ম্যানেজমেন্ট তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ার আর রিপোর্ট দেখে তাঁর সততা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে একটা গোপন মিশনে পাঠাবেন তাঁকে। কী সেই গোপন মিশন? একটা দ্বীপে অবস্থিত অনাথ আশ্রমে ছয়জন বিপজ্জনক বাচ্চা থাকে। নামে বাচ্চা হলেও তারা এক একটা জিনিস। বেকারকে গিয়ে একমাস থেকে রিপোর্ট করতে হবে, এই জায়গাটা থাকবে না বন্ধ করে দেওয়াই বেটার?

বেড়াল নিয়ে বেকার শেষমেশ ট্রেনে উঠে বসেন। তখনও তিনি জানেন না যে এই যাত্রায় তিনি প্রথম সমুদ্র দেখবেন, লোনা হাওয়া আর রোদের সঙ্গে তার মোলাকাত হবে জীবনে এই প্রথম। তিনি এও জানেন না যে ছয়জন বাচ্চার কথা তাকে বলা হয়নি, শুধু ফাইল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে পৌঁছে গিয়ে দেখতে হবে জানিয়ে, তাদের মধ্যে একজন খোদ শয়তানের ছেলে মানে অ্যান্টিক্রাইস্ট। অবশেষে, তিনি এও জানতেন না যে এই এক মাস তাঁর জীবন বদলে দেবে।

বেকার দ্বীপে গিয়ে পৌঁছান বটে, কিন্তু নিজে পৌঁছানোর সাধ্য ছিল না তাঁর। তাঁকে সেই অঞ্চলের বনদেবী (ইংরেজি নামটা থাক!) সেখানে নিয়ে আসেন৷ দেখা হয় অনাথ আশ্রমের প্রধান সঞ্চালক আর্থারের সঙ্গে। ছয়জন ছেলেমেয়ের সঙ্গেও, যাদের ভয়ে ডিপার্টমেন্টর লোক থরথর করে কাঁপছে।

এই এক মাস ধরে একের পর এক রহস্যোদঘাটন হয়। বেকার ভয় পান, তর্কাতর্কি করেন, অনেক কিছু বোঝেন, অনেক কিছু বুঝতে পারেন না। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমরা মুগ্ধ হয়ে পড়ে চলি। একের পর এক চমৎকার ঘটনা, দমফাটা হাসির সিকোয়েন্স, আশ্চর্য রহস্য, চোখ ভিজিয়ে দেওয়া দৃশ্য। গল্পের সঙ্গে আমরাও তখন সেলুরিয়ান সি এর দ্বীপে থাকা সেই বাড়িটায় গিয়ে পৌঁছেছি।

টি জে ক্লুন সাহিত্য করতে পেরেছেন কিনা, ভাষা আর ট্রিটমেন্ট দিয়ে বাজিমাত করেছেন কিনা, সে সব বলা এখানে বেকার! কারণ, এখানে গল্পটাই সব। এমন একটা মন্ত্রমুগ্ধ করা গল্প, যা পড়ে মনে হয় গরম রসগোল্লা খেলাম। নতুন বন্ধু পাতানো যায়, পিকনিকে যাওয়া যায় তাদের সঙ্গে, স্বপ্ন দেখা যায়, গান গাওয়া যায়। এর চেয়ে বেশি সাহিত্য আর কী হতে পারে?

কিছু কিছু বই নিজের জন্য পড়ে নিতে হয়। পড়ুন, ছেলেমেয়ে ভাইপো ভাইঝিদের উপহার দিন, রাত্রে স্টোরিটেলে একসঙ্গে বসে শুনুন। যদি ভালো না লাগে, মুখমিষ্টি না হয়, মন না ভরে, তাহলে মনের ডাক্টারের কাছে যাওয়ার ফিজটা আমিই দেব না হয়!

ছোট নৌকা আর একটা টেলিফোন

 


২০২১ সালে ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার সময় কার্দিশ রিফিউজিদের একটা নৌকা মানে ওই স্মল বোট ডুবতে শুরু করে। উপায় না দেখে তারা ব্রিটিশ হেল্পলাইনে ফোন করে। তারা বলে, মনে হয় তোমরা ফ্রেঞ্চ ওয়াটারে আছো, অমুক নম্বরে ফোন করো। ততক্ষণে জল ঢুকতে শুরু করেছে, উনত্রিশজন যাত্রীর মধ্যে নারীপুরুষ তো আছেই, একটা বাচ্চা মেয়েও আছে। মাঝ সমুদ্রে নেটওয়ার্ক পাওয়া চাপ। তবু একজন ফোন করে। ফ্রেঞ্চ হেল্পলাইন থেকে একজন বউ তুলে বলে, তোমরা মনে হয় ব্রিটিশ ওয়াটারে আছো। ওদের জানিয়ে দিচ্ছি! লোকেশন ভেজো! লোকেশন পাঠানোও মুশকিল। ওদিকে জল কোমর অব্দি এসে গেল প্রায়। ঠান্ডা হাওয়া, জলে ভিজে সবাই কাঁপছে। যাই হোক, হেল্পলাইন থেকে বলে, শান্ত থাকুন। দেখছি কী ব্যাপার। দেখতে দেখতে বোট প্রায় ডুবে যায় আর কি! অনেকে জলে পড়ে গেছে। বেগতিক দেখে বারবার তারা ফোন করতে চেষ্টা করছে, দু দশ মিনিট পর আর কিছু করার থাকবে না। বার বার ফোন আসায় মহিলা বলেন, ধৈর্য ধরুন, দেখছি তো! কিন্তু দেখছে আর কে? ব্রিটিশ রেস্কিউ বোট অনেক দূরে, ফরাসি বোট অন্য মিশনে ব্যস্ত। একদম জলে পড়ে যাওয়ার আগে নিরুপায় হয়ে আবার ফোন করে লোকটা। মহিলা বলেন, জ্বালিয়ে মারলি মাইরি! ইউ উইল নট বি সেভড, বোঝলা?

সাতাশজন মারা যায়। সকলের লাশ ভাসতে পাওয়া যায় সমুদ্রে। প্রতি বছর ওইটুকু সামুদ্রিক পথ, যা নব্বই মিনিটে ক্রস করে দেয় ফাস্ট বোট, সেখানে লোক মরছে। এদেশে হলে অবশ্য পাত্তা দিত না। জায়গাটা ইউরোপ বলেই সাড়া পড়ে, তদন্ত হয়। রেস্কিউ হেল্পলাইনের মহিলাকে ডেকে আনা হয় জেরা করার জন্য। তিনি বলেন, "আমি কী করব? আমি তো প্রোটোকল ফলো করেছি।"

প্রশ্ন ওঠে, আপনি সিচুয়েশন এর গুরুত্ব বুঝতে পারেননি? ওরা রিফিউজি, মরে যাচ্ছিল, একটু সেন্সিটিভ হতে পারছিলেন না? উত্তর আসে, রিফিউজি না হলে মিলেনিয়ার হলে বুঝি বাঁচানোর চেষ্টা করতাম না? আমি কেন দুজন মানুষের মধ্যে তফাত করব? আমার চোখে সবাই ভিক্টিম।

“I didn’t ask you to leave, I said. It was your idea, and if you didn’t want to get your feet wet, love, you shouldn’t have embarked. I didn’t push you into the water, I didn’t fetch you from your village or field or ruin of a suburb and put you in your wretched leaky boat, and now the water’s up to your ankles, I get it that you’re frightened, and you want me to save you and you’re impatient. You’re counting on me. But I didn’t ask you for any of that. So you’ll just have to grin and bear it and let me get on with my job. And apparently these thoughts were so strong that I actually spoke them out loud.”

আপনার ওপিনিয়ন কী রিফিউজি সমস্যা নিয়ে? পুলিশ জিগোয়। উত্তর আসে, আমার কোনোও ওপিনিয়ন নেই। ওপিনিয়ন দিয়ে রেস্কিউ চলে না। সাতাশজন মারা গেছে, সারা কেরিয়ারে আমি কত রিফিউজিকে বাঁচিয়েছি সেটা কে বলবে?

দুজন মানুষ ডুবে যাচ্ছে। তাদের পরিচয় জানা কি তাদের রক্ষা করার জন্য জরুরি? হতে পারে একজন কোটিপতি, শখ করে নিজস্ব ইয়াটে করে মাছ ধরতে এসে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়েছেন, অন্যজন সিরিয়া বা ইরাক থেকে পালিয়ে এসেছে, তাদের ঘরবাড়ি বোমায় উড়ে গেছে, তারা যা হোক কিছু করে আইনি বা বেআইনি ভাবে নৌকা করে ইংল্যান্ডে যেতে গিয়ে নৌকাডুবির শিকার হয়েছেন। দুজনে একসঙ্গে ডুবছে? আমি একজনকে বাঁচাতে পারব। কাকে বাঁচাব? তাদের অতীত বা সিদ্ধান্ত বা গুডলাক/ব্যাডলাক জানার প্রয়োজন আমার আছে কি? একজন পেশাদার রেসকিউ অফিসারের কাছে কি দুজনেই সমান ভিকটিম নন? না সেখানেও আপনার সো কল্ড হিউম্যানিটির ভূমিকা থাকতে হবে? থাকা কি আদৌ উচিত? কে জানে? আমি তো বলতে পারছি না।

এই লেখক যে দার্শনিক বলে পরিচিত, সেটা বোঝাই যায়। তাই, স্মল বোটও ঠিক ফিকশন নয়, এটা একটা ফিলোসফিকাল প্রশ্নকে তুলে ধরেছে। সে প্রশ্ন কালেক্টিভ ডিসেন্সিটিজেশনের। উচিত অনুচিতের। মনুষ্যত্ব আর দায়িত্ববোধের মাঝে থাকা সূক্ষ্ম লাইনের। এই বই সাহিত্য হিসেবে পড়তে কেমন লাগবে জানি না, কিন্তু এই সময় আর এখনকার মানুষকে বুঝতে হলে বইটা আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

একটা জায়গা পড়ে সত্যি একটু নড়ে গেছিলাম।

There is no shipwreck without spectators. Even when there’s no one, when it’s far out at sea, at night, without witnesses, when there’s no living soul in sights for thousands of nautical miles, only waves and the viscous night, covering everything, swallowing everything; when there are no more eyes to see than there are arms to reach out, there are still spectators and the shore from which they are watching is never far away, even if, at the same time, it is infinitely distant.

কিন্তু সতর্ক করে দিচ্ছি, ইটস নট অ্যান ইজি রিড। ভালো লাগবে, তা জরুরি নয়।

বৃহস্পতিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৫

পিটার অ্যান্ড লিজা

 


কমিকসের দুনিয়ায় মার্ভেল আর ডিসি এখনও বেস্টসেলার তালিকায় সবচেয়ে ওপরে থাকে। তাদের সঙ্গে এসে জুড়েছে জাপানিজ মাংগা, নিউ ওয়ার্ল্ড হরার, ফিলগুড কলেজ রোমান্স বা বুদ্ধিদীপ্ত সাইফি ফ্যান্টাসি। কিন্তু এসবের পাশাপাশি ফ্যান্টাগ্রাফিক্স, ড্রন অ্যান্ড কোয়ার্টারলি, জোনাথন কেপ বা ফেবারের মতো বহু প্রকাশনা নিয়মিত লিটারারি গ্রাফিক নভেল নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছে। সেখানে সারা দুনিয়ার শিল্পীরা কাজ করেন, ভিন্ন ভিন্ন আর্ট স্টাইল আর মানসিকতার মেলবন্ধন হয়। এই কাজগুলো সাধারণত বিশাল জনপ্রিয়তা না পেলে অনেকের চোখ এড়িয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে এই বইটা আবিষ্কার করেছিলাম।

সত্যি বলতে, 'পিটার অ্যান্ড লিজা' তেমন এক্সক্লুসিভ কোনও কাহিনি বলতে চায়নি। শিল্পী ভূমিকাতে জানিয়েছেন, এখানে গল্প টল্প বিশেষ নেই। জীবনে যা হয়, তাই আছে। বিষণ্ণ অবস্থাতেও একটা শহরের বিষন্নতা কত সুন্দর হয়ে চোখে ধরা দিতে পারে, সেই কথা আছে। সাধারণ স্বার্থপর মানুষরাও সময় বিশেষে কত ভালো মুহূর্ত উপহার দেয়, আছে সে কথাও। বয়ে যাওয়া সময় আছে। বন্ধু বিচ্ছেদ, সম্পর্কের ভাঙাগড়া আছে, বোহেমিয়ান লাইফ আর অবসাদগ্ৰস্ততার মাঝে বেঁচে থাকা আছে। শীত আছে। পর্ণমোচী গাছের অপূর্ব সুন্দর সব নকশা আছে। বসন্ত আছে। বসন্তের ফুল আছে। ঋতুবদল আছে। প্রেম আছে। আর আছে জীবন।

পিটার কম্পালসারি আর্মি সার্ভিস শেষে শহরে ফিরেছে। কিন্তু এরপর সে কী করবে জানে না। তার সেনাবাহিনীর বন্ধুরা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছে, কিন্তু পিটার কনফিউজড। এই কনফিউশনের একটা বড় কারণ, সে কবিতা লেখে। হৃদয়বিদারক সে কবিতা। যুদ্ধে ক্ষয়ে পড়া তার শহর নিয়ে, শহরের মানুষ নিয়ে। অন্যদের চেয়ে সে বেশি সংবেদনশীল, বেশি ভাবে, আবার ভাবেও না। উদ্দেশ্যহীন ভাবে যে যুদ্ধ বিপর্যস্ত শহরে ভেসে যায় পিটার।

লড়াই থেমে গেছে অনেকদিন, কিন্তু শহরের স্বাভাবিক চরিত্র ফিরে আসেনি। ভাড়াবাড়ির অবস্থা খারাপ, লোকজনের হাতে পয়সা কম। তবু বোহেমিয়ান পাড়ায় রোজ পার্টি হয়, হইহল্লা চলে, নাচানাচি হুল্লোড় চলে। উদ্দাম জীবনের এই ব্যাকরণ মেনে পিটারও বন্ধুদের সঙ্গে এক পার্টি থেকে অন্য পার্টিতে ঘুরছে, কিন্তু শত মানুষের ভিড়েও তাঁর চোখ অন্যমনস্ক, সেখানে বিষাদের ছোঁয়া। এমন সময় লিজার সঙ্গে তার আলাপ। সে একজন ব্যালে ডান্সার। দুজনের সাক্ষাৎ হয়, সম্পর্ক গড়ায় লিভ ইনে। লিজার সঙ্গ পেয়ে পিটারের জীবন রঙিন হতে শুরু করে। তার ফ্যাকাসে জীবনের মরুভূমিতে সে একটা মরুদ্যান খুঁজে পেয়েছে। সময় কাটে, বছর গড়ায়। পিটার লিখতে চায়। কিন্তু কিছুই তার পছন্দ হচ্ছে না। খুচরো কাজ করতে করতে, ফ্ল্যাটে হাউসপার্টি করতে করতে, ভাড়াবাড়ি পাল্টাতে পাল্টাতে আর লিজার সঙ্গে একইভাবে প্রেম করতে করতে দেখা যায়, পিটারের সেই অবসাদ আবার ফিরে আসছে। ক্রমে সেই বিষাদ বাড়তে থাকে, বাড়তে বাড়তে একসময় তাদের সম্পর্ককে শেষ করে দেয়। কিন্তু ...জীবন থেমে থাকে না কারোরই। সময় কাটতে থাকে। দুজনেরই বয়স বাড়ছে। বহু বছর পর তাদের আবার দেখা হয়। ততদিনে তারা আলাদা মানুষ, কিন্তু কোথাও না কোথাও পিটার এখনও সেই পিটার, লিজা এখনও সেই লিজা।

ন্যারেটিভ এগিয়েছে একবার পিটার, একবার লিজার বয়ানে। তাড়াহুড়ো নেই। গল্প বলার চেষ্টা নেই। খালি ফ্ল্যাট আছে, সেখানে উড়ন্ত পর্দা আছে, বাইরে পত্রহীন গাছের সারি আছে। বেড়াল আছে, কুকুর আছে। মদের বোতলের গড়াগড়ি, সিংকে জমানো এঁটো বাসনের ডাঁই আছে। বিকল গাড়ির গোদাম আছে। মানুষও আছে তাদের হরেকরকম জীবন নিয়ে, জীবনের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা তাদের নীরব অলিখিত কবিতা নিয়ে। লিখিত কবিতাও আছে, সর্বত্র।

মিরোস্লাভ সেকুলিক-স্ট্রুজা প্রাণবন্ত ভাবে চরিত্রদের আর তাদের সময়টা ধরেছেন। gouache আর watercolor, দুই ঘরানার আঁকাকেই একসঙ্গে ব্যবহার করেছেন বলে মনে হল, যদিও আর্ট নিয়ে আমার জ্ঞান খুবই ভাসাভাসা। রঙের ছয়লাপ, কিন্তু মেজাজটা বিষন্ন, এমন বহু জায়গা আছে। আবার ফিকে প্যানেলে পর পর আঁকা, কিন্তু বেশ একটা হ্যাপি মোমেন্ট ধরা পড়ছে, এমন জায়গাও আছে। বোহেমিয়ান পাড়া, ডাইভ বার, ঘরের পিছনের ঘর এবং জনাকীর্ণ নগরীর দৃশ্যের বোহেমিয়ান পরিবেশকে জীবন্ত করে তুলেছে তাঁর আঁকা। গোটা ন্যারেটিভটাই 'ব্লিক', সেখানে মাঝেমধ্যে আশার আলো দেখা যায়।

সব নিয়ে মন্ত্রমুদ্ধ করে দেওয়া বই। গল্পের বদলে জীবন পড়ার/দেখার ইচ্ছে হলে এই কাজটা পড়তে পারেন।

পিটার অ্যান্ড লিজা
ফ্যান্টাগ্রাফিক্স

মঙ্গলবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৫

হোমসের যখন মাথা খারাপ হয়

 


জি. এস. ডেনিং-এর লেখা Warlock Holmes: A Study in Brimstone পড়তে গিয়ে হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আগেই জানতাম, ও শার্লক টাইপ্স বই নয়, তবে নকল শার্লক হলেও এমন অদ্ভুত বা বলা উচিত উদ্ভট কাণ্ডকারখানা করবে কে আন্দাজ করতে পারে! আসল কথা হল, এই ওয়ারলক লোকটা নাকি একটা উইজার্ড ডিটেকটিভ। ভীষণ ফেমাস জাদুর দুনিয়ায়, প্রায়ই তাঁকে ডেকে কেস সল্ভ করতে নিয়ে যায় সঙ্গী লেস্ট্রেড যে কিনা একটা ভ্যাম্পায়ার, আর ব্যালে-প্রেমী ওগর গ্রেগসন থুড়ি গ্রগসন; ওদিকে মরিয়ার্টিও আছেন, তিনি ওয়ারলকের দেহে ঢুকে আলবাল বকেন মাঝেমধ্যে।

এসব পড়ে যদি মনে হয় ম্যাজিকাল দুনিয়ায় সেট করা জেমস লাভগ্রোভের লেখা শার্লকিয়ান লাভক্রাফটিয়ান রোমাঞ্চঘন কাহিনির মতো কিছু একটা পড়বেন, সে গুড়ে বালি! আসলে এই ওয়ারলক লোকটা একটা যা তা ধরনের অকালকুষ্মাণ্ড। মাঝেমধ্যে ব্যাটার সংলাপ শুনে পাঠক চেয়ার থেকে মাটিতে পড়ে যায়।

“And who is this new face?” “Tell him nothing, Watson!” Warlock urged, struggling to reclaim his balance. “And for God’s sake, John, don’t let him learn your name!” Moran smiled. I sighed and shook my head. Then, since it seemed I had nothing to lose by it, I extended my hand and said, “Dr. John Watson, at your service.”

তবে কিনা আসল নায়ক এখানে ওয়াটসন, তাঁর তীক্ষ্ণবুদ্ধির দৌলতে ওয়ারলকের প্রাণও বাঁচে, কেসও সল্ভ হয়ে। বইতে ছ'টা গল্প। শেষ অব্দি শার্লক থুড়ি ওয়ারলক একটু হিরোগিরি করার মওকা পায় বটে, তবে তবুও এই ধরনের ভুলভাল কথা বলতে ছাড়ে না।

"That's what I think Julia Stoner was trying to say as she died, 'the speckled band'!"

"All right, I see your point, Watson," Holmes said, "but then again, might she not just say, 'Help, a snake!'? It's got fewer syllables and the benefit of clarity too, don't you think?"

এই সিরিজে ডেনিংবাবু বেশ কয়েকখানা বই লিখে ফেলেছেন। মাথা খারাপ করতে হলে (হেসে না হতাশ হয়ে সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার) পড়ে দেখতেই পারেন।

Titan Books

সোমবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৫

দ্য বুক অফ 'নিরুদ্দেশ'

 


Perhaps I am writing out of fear. Against forgetfulness. I write to remember, and to remind, so memories are not erased. Memory is my last lifeline.

এই বইটা নিয়ে পোস্ট দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না। পলিটিকাল রিয়ালিটি আর বাস্তব ঘটনা নিয়ে বই লেখা হলে পাঠকদের সন্দেহপ্রবণতা বাড়ে, আর এখন যা চলছে, তাতে এই বইয়ের লেখিকাকে অনেকেই প্রপোগান্ডিস্ট বলে উড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু আসল কথা হল, প্যালিস্তিনিয়ান লেখিকার এই বইটা এই বছর ইন্টারন্যাশনাল বুকার লংলিস্টে এসেছে ঠিকই, কিন্তু আসলে মূল আরবিতে বইটা লেখা হয়েছিল বারো বছর আগে।

কী নিয়ে এই বই? সংক্ষেপে বলতে, সে কথা নামেই বলা আছে। একদিন ভোরবেলা উঠে ইজরায়েলের মানুষজন দেখে প্যালেস্তাইনের সমস্ত মানুষ হাওয়া হয়ে গেছে। দুধের ডেলিভারি বয় থেকে বাসের ড্রাইভার, প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার থেকে জেলের আসামি, কারো কোনও পাত্তা নেই। সবাই যেন হাওয়ায় মিশে গেছে। এইবার ইজরায়েলের অথোরিটি নড়েচড়ে বসে। কী হল ব্যাপারটা? এটা কি হামাসের চক্রান্ত? না আরবরা স্ট্রাইক করেছে? ইজরায়েলের ডিফেন্স আর্মি তৎপর হয়ে অনুসন্ধান শুরু করল, ইন্টেলিজেন্স মাঠে নেমে পড়ল, কিন্তু কেউ কিছু বুঝতে পারছে না।

ওদিকে সাধারণ মানুষের মতামতও এক এক রকম। অনেকে আরব বন্ধুদের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে চিন্তিত, বাকিরা বলল, এ আসলে মোসাদের কাজ। একদম ঝেড়েঝুড়ে নিকেশ করেছে। আর না করে থাকলেই বা কি! ব্যাটারা বেমালুম উবে গেছে, বাঁচা গেছে। বেশ হয়েছে। এইবার শান্তিতে থাকা হবে। কিন্তু শান্তি হল না। পরবর্তী আটচল্লিশ ঘন্টা ধরে তোলপাড় চলল দেশ জুড়ে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রভাবিত হল, বিমান সেবা বন্ধ হয়ে গেল। দেখা গেল, এই প্যালেস্তিনিয়ানদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করলে যারা ভাবত সব সমস্যার সমাধান হবে, তা হচ্ছে না। এইটুকুই প্লটলাইন।

কিন্তু, কিন্তু, কিন্ত... এই স্পেকুলেটিভ প্লটলাইন দিলে বইটা সম্পর্কে কিছু বলা হয় না। আসলে ইবতিসাম মানুষজন হারিয়ে যাওয়া নিয়ে থ্রিলিং স্পেকুলেটিভ ফিকশন লিখতে আসেননি, তিনি এসেছেন একটা disappearance এর গল্প বলতে। এই disappearance, এই হারিয়ে যাওয়া আসলে সেই সমস্ত স্মৃতি ও মানুষের, যারা সত্তর বছর ধরে নিজেকের জমিতে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হয়ে বসবাস করেছে, কিন্তু অনেকের মতো জাফফা থেকে নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যায়নি। এই হারিয়ে যাওয়া একটা শহরের, সেই শহরের মানুষদের, তাদের অতীত জীবনের। একটা শহর বহাল তবিয়তে আছে, অথচ নেই। সেখানকার মানুষও কিছু কিছু আছেন সেখানে, কিন্তু নেই। লস অফ মেমোরি আর মেমোরি অফ লস, এটাই আসলে বইটার প্রধান উপাদান।

আলা বলে একজন হারিয়ে গিয়েছে, তার ফেলে যাওয়া ডায়েরি পড়ে ইজরায়েলের এক জিওনিস্ট লিবারেল ছেলে এরিয়েল বুঝতে চেষ্টা করছে সে তার দিদার জন্য কী অনুভব করত? কেমন ছিল তাদের পরিবার? তাদের কী নিয়ে আলোচনা হত? কীভাবে তার দিদার পুরোনো বাড়ি দখল হয়ে যায়, নতুন মানুষ চলে আসে, বিচ্ছিন্ন হয় অর্ধেক পরিবার। এরিয়েল খুব দরদ দিয়ে সেই ডায়েরি পড়তে শুরু করে, ডায়েরি পড়তে থাকে আলার ফেলে যাওয়া ঘরে বসেই। ক্রমে আমরা দেখতে পাই, এরিয়েল নিজেও এক প্যালেস্তিনিয়ান বন্ধুর বাড়িকে তার অনুপস্থিতিতে নিজের মতো করে বদলে দিচ্ছে, সেখানে কম্ফোর্টেবল হয়ে যাচ্ছে, কফি খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, নোটস নিচ্ছে, আলা আর প্যালেস্তাইনের গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরার অছিলায় অজান্তে সে নিজেও এই দখলদারির ইতিহাসে অংশ নিয়ে ফেলছে। এটাই আয়রনি।

গল্পে নানান চরিত্র এসেছে। বিচ্ছিনভাবেই এসেছে। মূল প্লট বলেই যখন কিছু নেই, তাহলে প্লটে তাদের ভূমিকার কথা জিজ্ঞেস করাও যুক্তিহীন। এই মানুষগুলো এসেছেন, কারণ তাদের নিয়েই এই বই। সকলের নিজের নিজের কাহিনি, নিজের নিজের সমস্যা, প্রেম বা অপ্রেম জীবন। কোনও একটা প্রধান ঘটনা নেই। কোনও টানটান প্লট নেই। কোনও সমাধান নেই। মানুষ আছে। তাদের বিষাদ আছে। অজানা প্রশ্ন আছে অনেক, সেগুলোর উত্তর নেই। শুরু আছে, শেষ নেই।

সত্যি বলতে, প্যালেস্তাইন সমস্যা নিয়ে খুব সংবেদনশীল না হলে বইটা হয়তো সকলের ভালো লাগবে না। প্লিজ্যান্ট রিড তো নয়ই। কিন্তু যদি মনের দিক থেকে এই সমস্যা আর এখানকার মানুষগুলোর মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে একাত্ম বোধ করেন, বইটা আপনার পড়ে ফেলাই ভালো।

The Book of Disappearance: A Novel
Syracuse University Press; Translation edition 

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০২৫

দ্য টেইন্টেড কাপ

 

গত বছর রবার্ট জ্যাকসন বেনেটের ফ্যান্টাসি উপন্যাস 'দ্য টেইন্টেড কাপ' পড়ে আমার দারুণ লেগেছিল। তখন পরপর কয়েকটা ফ্যান্টাসি পড়েছি, তাতে এপিক ফ্যান্টাসি থেকে শুরু করে আরবান ফ্যান্টাসি সবই ছিল। কিন্তু এই বইটা বিশেষ ভাবে আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রইল।
'দ্য টেইন্টেড কাপ' শ্যাডো অফ দ্য লেভিয়াথন সিরিজের প্রথম উপন্যাস। পরের বই এই বছর এপ্রিলেই হয়তো আসবে, তাই এই বইটার খবর জানিয়ে রাখছি।
ফ্যান্টাসি উপন্যাসে যা থাকে, সে সব এখানে পুরোদস্তুর আছে। চমৎকার ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং, অসামান্য কল্পনা। কিন্তু এর পাশপাশি এই বইটা আসলে একটা গোয়েন্দা গল্পও বটে। আর গোয়েন্দা জুটির চরিত্রগুলোও ভারী ইন্টারেস্টিং। আনা দোলাবরা সরকারি বিভাগে কার্যরত এক গোয়েন্দা, তার নামডাক আছে, কিন্তু মাথায় ছিট আছে বলেও কেউ কেউ বলে থাকেন। এই বয়স্ক মহিলাকে দেখে মাঝেমধ্যে মিস মার্পলের কথা মনে পড়তে পারে। আনা বইয়ের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে বসে থাকেন আর সর্বক্ষণ গান্ধারীর মতো চোখে একটা কাপড় বেঁধে রাখেন। তাই বলে তিনি অন্ধ নন, কিন্তু একটা ইন্দ্রিয় কম ব্যবহার করলে নাকি তাঁর অন্য ইন্দ্রিয়গুলো বেশি কাজ করে, মগজাস্ত্রের তেজও বাড়ে। তার সর্বক্ষণের সহকারী ডিনিওস কোল। কোল আবার প্রশিক্ষিত এনগ্রেভার, তাকে জাদুবিদ্যায় দীক্ষিত করা হয়েছে সব কিছু টু দ্য পয়েন্ট মনে রাখার জন্য, তদন্ত করতে গিয়ে সে যা দেখে, সব কিছুই তার মাথায় ছেপে যায়। এই জুটির সামনে একটা কঠিন কেস এসে পড়ে। একের পর এক ইম্পেরিয়াল অফিসার মারা যাচ্ছে, তাদের গা থেকে গজিয়ে যাচ্ছে গাছ। এদিকে তারা যে দুনিয়ায় থাকে, সেখানে বর্ষাকালে লেভিয়াথান আর প্রকাণ্ড সামুদ্রিক প্রাণীরা হামলা করে, সমুদ্র ঘিরে থাকা নিরাপত্তা ঘেরা টপকাতে পারলে তারা গোটা দুনিয়াকেই ধ্বংস করে দেবে। ইম্পেরিয়াল অফিসারের পাশপাশি সমুদ্র ঘেরার ইঞ্জিনিয়াররাও মারা পড়তে থাকে। হাই স্টেক। রহস্যভেদ না করলে কাম খতম। এমন সময় এই তদন্তের ভার পড়ে আনা আর কোলের ওপর।
প্রথম থেকেই গল্প এগিয়েছে তরতর করে। ছোটছোট সংলাপের মাধ্যমে এই অদ্ভুত দুনিয়ার ছোটখাটো জিনিসের সঙ্গে পরিচিতি ঘটেছে পাঠকের। ক্রমে রহস্যের জাল আরো জট পাকিয়েছে, টেনশন বিল্ডাপ হয়েছে পাল্লা দিয়ে। সঙ্গে এসেছে অ্যাকশন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আনার চরিত্রটা অসম্ভব হিউমারাস। মাঝেমধ্যেই পড়তে পড়তে হাসি পেয়ে যায়৷ একদম শার্লকিয়ান ভঙ্গিতে তদন্ত চালিয়ে এই গোয়েন্দা রহস্য সমাধান করেন, কিন্তু আগামীতে এই জুটির আরো কেস দেখার জন্য আগ্রহ কমে না।
বই জুড়ে রহস্য, অ্যাকশন, অ্যাডভেঞ্চার আর ম্যাজিকের ছড়াছড়ি। দম ফেলার জায়গা নেই, পাঠক কখন যেন এই দুনিয়ায় টেলিপোর্ট হয়ে যায়৷ অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে, লেভিয়াথনরা হামলা করছে, চক্রান্তকারীরা ঝামেলা পাকাচ্ছে, এরই মধ্যে ডিটেকশন আর ডিডাকশন চলছে, জীবন মরণ লড়াই চলছে, তলোয়ার চালাচ্ছে দুই পক্ষই। বই জমে ক্ষীর।
ফ্যান্টাসি আর শার্লকিয়ান মিস্ট্রির ভক্তদের জন্য মাস্ট রিড। দ্বিতীয় বইটা আসার আগে প্রথমটা পড়ে ফেলুন।

সোমবার, ৩ মার্চ, ২০২৫

বিষনিদ্রা: চারুদত্ত ফ্যান্টাসি সিরিজের ফ্যান্টাস্টিক ওপেনিং

 


বইমেলায় গেলে আমি পারতপক্ষে কল্পবিশ্বের স্টলে ঢুকি না। স্পেকফিক বইগুলো দেখে হাত পা নিশপিশ করবে কিন্তু বাড়িতে বই রাখার জায়গা নেই, আজকাল পাইরেসির জ্বালায় ইবুকও হয় না, তাই অনেক বইই ইচ্ছে থাকলেও পড়া হয় না বা পড়তে বছর গড়িয়ে যায়। কিন্তু ইচ্ছে থাকেই। সত্যি বলতে, এই সময় বাংলায় কল্পবিজ্ঞান বা সার্বিক ভাবে স্পেকুলেটিভ ফিকশনের ভক্ত হলে সোহম গুহ, সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়, রনিন বা শ্রীজিত সরকারের মতো প্রতিভাবান কলমদের এড়িয়ে না যাওয়াই বেটার। সিনিয়ারদের কথা না হয় নাই বললাম। এত সব কথা বলার কারণ, বেশ কয়েকদিন পর একটা বই পড়ে মনমেজাজ বেশ ফুরফুরে মনে হচ্ছে। 

গত মাসেই মেলায় সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের চারুদত্ত ফ্যান্টাসি সিরিজের প্রথম বই 'বিষনিদ্রা' প্রকাশিত হয়েছে, ইতিমধ্যেই পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছে। আরবান ফ্যান্টাসি কাম গোয়েন্দা গল্প ঘরানার কাহিনি, বিশ্বসাহিত্যে এমন গল্পের অভাব না থাকলেও বাংলায় অতি প্রয়োজনীয় সংয়োজন। রিভার্স অফ লন্ডন, অ্যালেক্স ভেরাস সিরিজ বা জেমস লাভগ্রভের শার্লকিয়ান মিস্ট্রির ভক্ত হলে এই বই আপনারই জন্য, আবার ফ্যান্টাসি বাদ দিয়ে সাধারণ গোয়েন্দা গল্প/রহস্য কাহিনির অনুরাগী হলেও বইটা আপনাকে হতাশ করবেন না।

অতি সংক্ষিপ্ত সামারি। চারুহাসিনী দত্ত পেশায় দিব্যেন্দ্রিয়, অদ্ভুতাঙ্গ প্রাণী আর অতিলৌকিক (পড়ুন রাক্ষস, খোক্ষস, মৃতদেহ জাগানো ইত্যাদি ইত্যাদি) নিয়েই তাঁর কারবার। এমন সময় এক দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর স্ত্রী রহস্যজনক ভাবে অদ্ভুতাঙ্গ এক প্রাণীর আক্রমণে প্রাণ হারান আর সেই কেসের তদন্ত করতে গিয়ে চারু এক বড় রহস্যের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। একের পর এক ঝামেলা, রহস্যের ওপর রহস্য, তদন্ত এবং সমাধান। ক্লিন অ্যান্ড সিম্পল। কোনও নাটক নয়।

সৌম্যবাবুর লেখা সাবলীল, ভাষা স্মার্ট, তাঁর রেঞ্জও কাবিলে তারিফ। নানান জায়গায় তাঁর লেখা গল্প পড়ে আমি জানি তিনি গল্পের চরিত্র বুঝে ভাষা ব্যবহার করেন, অযথা জ্ঞান ফলাতে যান না। এখানেও তাঁর কলম ধারালো ছুরির মতো এগিয়েছে। ঝকঝকে ন্যারেটিভ, তকতকে সংলাপ, ইন্টারেস্টিং প্লট এবং টানটান ট্রিটমেন্ট। খুব শাটল ভাবে এই দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিতি ঘটিয়েছেন, পাশাপাশি কোরাপ্ট রাজনীতি আর  সিস্টেমের পাওয়ার ডায়নামিক্সও বুঝিয়ে দিয়েছেন। এরই মাঝে অসম্ভব দক্ষতায় জাস্টিস আর মোরাল কম্পাস নিয়ে কমেন্ট্রিও করেছেন, সেসব কতজন খেয়াল করবেন জানি না। কিন্তু এসব কিছুই মূল কাহিনির গতিকে থমকে দেয়নি। লেখককে সাধুবাদ দিতেই হয় তাঁর পরিমিতিবোধের জন্য। তিনি আসলে একই রহস্য কাহিনি লিখছেন, আর রহস্য কাহিনিতে রহস্যটাই আসল, এটা কোথাও তিনি ভুলে যাননি। ফলে গোটা বইটাই মুচমুচে, ক্রিস্প। কুড়মুড়ে ফিশফ্রাইয়ের মতোই।

ফ্যান্টাসি হওয়া সত্ত্বেও শক্তিনগর বলে যে পশ্চিম বঙ্গের যে শহরটাকে সৌম্যবাবু তুলে ধরেছেন, সেটা সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত। এখানে সম্পর্কের জটিলতা আছে, কেরিয়ারের ঝামেলা আছে, ড্রাগ ব্যবসা আছে, দিব্যেন্দ্রিয় ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের ছুঁড়ে মারা টীকাটিপ্পনী আছে। সত্যি বলতে এসব চেনা জিনিস এতটাই বেশি আছে যে মাঝেমধ্যে আমার মনে হচ্ছিল ফ্যান্টাসির চেয়ে রিয়ালিজমের দিকে কাঁটা বেশি ঝুঁকে যাচ্ছে। আরেকটু ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং করলে, অদ্ভুতাঙ্গ বা এই অতিবাস্তব দুনিয়ার গোড়ার কথা একটু খোলসা করে বললে হয়তো আরো জমে যেত। কিন্তু যেহেতু এটা সিরিজ হতেই চলেছে, আশা করি পরের বইগুলোয় আরো ডিটেলে সব জানা যাবে। কিন্ত সব মিলিয়ে 'বিষনিদ্রা' বাংলা স্পেকুলেটিভ ঘরানায় একটা অসম্ভব ভালো অ্যাডিশন। রিডিং ব্লক হলে তা কাটাতে এই বইটা তুলে নিতেই পারেন। বোর হওয়ার কোনও জায়গা নেই। 

বিষনিদ্রা

কল্পবিশ্ব প্রকাশনী