বাংলা বইয়ের খবর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বাংলা বইয়ের খবর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১০ মে, ২০২৫

বাংলার লুপ্তপ্রায় কেবিন সংস্কৃতি

 


৯ঋকাল বুকস পরপর মচৎকার সব বিষয় নিয়ে কাজ করছে। দু একটা কেনা হয়, আবার কিছু কিছু আনালেও পড়া হয় না, বা পড়তে পড়তে বছর ফুরিয়ে আসে। যাই হোক, এই বছরের দু একটা টার্গেটেড বইয়ের মধ্যে এটা অন্যতম ছিল, অনেকেই প্রচ্ছদ দেখে আগ্রহী হয়েছিলেন যতদূর মনে পড়ছে। তারপর খুব বেশি পোস্ট ফোস্ট দেখিনি, তাই একটা ছোটকু পোস্ট। বড় পোস্ট দিয়েও লাভ নেই। আজকাল বাজারে এসব চলছে না। ফেসবুক হয়তো ভ্যানিশই করে দিল, যেমন করে অর্ধেক কেবিন রেস্তোরাঁ ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে...

যাই হোক, গ্রন্থভাবনা থেকে স্ট্রাকচারিং, সব বিষয়েই যথারীতি লিরিকালিয় যত্নের ছাপ বিদ্যমান। সে অবশ্য প্রকাশনার সব বইতেই থাকে, আলাদা করে বলার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

এখানে ঘটনা হল, লেখক তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে, সংকলনটা বানাতে কতটা খাটাখাটুনি করতে হয়েছে। খুঁজে খুঁজে এক একটা লেখা সংগ্রহ করা অত সহজ লয়!

কে নেই? অরণি বসু থেকে দামু মুখোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় থেকে সুনেত্রা সাধু, কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় থেকে যশোধরা রায়চৌধুরী...আছেন রঞ্জন রায়, সুনীল কুমার পাল, প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত প্রভৃতি। তাবড় সাহিত্যিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এমন লেখকও আছেন, যিনি এই প্রথম একটা লেখা ছাপালেন।

বইটি ভাগ করা হয়েছে এই পাঁচটি বিভাগে।


এক কেবিনের মধ্যে আরেকটা কেবিন

কিসসা কেবিন কা

কলকাতার কেবিন কড়চা

জেলায় জেলায় দুজনে কূজনে

হারিয়ে যাওয়া কেবিনের দিন

চেনা অচেনা কেবিননামা


প্রতিটা বিভাগেই চার পাঁচটা করে লেখা আছে। এছাড়া অতিরিক্ত সংয়োজন, টীকা ইত্যাদি অতিরিক্ত বিভাগও আছেই, যেমন থাকে। লেখায় যে সমস্ত কেবিনের উল্লেখ আছে, সেই কেবিনের ঠিকানা আর বর্তমানে বন্ধ আছে না খোলা আছে সেসবও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে রসনাপ্রেমিকদের কথা ভেবে।

সংকলনের কিছু কিছু লেখা স্বাভাবিকভাবেই পরে খুঁজে যোগ করা হয়েছে, তাতে অতীতের রোমান্স আর নস্টালজিয়া থাকলেও 'কেবিন' সেই অর্থে নেই, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। কেবিন নিয়ে এক্সক্লুসিভ লেখা হলেও অনেকেই হয়তো বসন্ত কেবিন/দিলকুশা/সাঙ্গুভ্যালি ইত্যাদি জায়গার কথা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এই পুনরাবৃত্তি শুধু নামেই, কারণ সকলের চোখ আর মন নিজের, সেই জায়গাটা সম্পর্কে স্মৃতি আর আবেগ প্রত্যেকের আলাদা।

এমনিতেও এই সংলকনে, কেবিন নিয়ে লেখা মানে শুধু কেবিন চরিত নয়, পাশাপাশি কলকাতা ও বাংলার ইতিহাসের নানান খুঁটিনাটি উঠে এসেছে। সমাজ, পরিবার, মূল্যবোধ, সাহিত্য, রাজনীতি, রন্ধনশিল্প, সংস্কৃতি, সিনেমার কথা সাবলীলভাবে জড়িয়ে গেছে আলেখের সঙ্গে। কোন কেবিন রেস্তোরাঁয় কোন সাহিত্যিক আসতেন, কোন অভিনেতা কেবিন রেস্তোরাঁ থেকে মোগলাই প্যাক করে নিয়ে যেতেন... এসব যেমন আছে, ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশও ঘটেছে ইতিউতি।

গৌতম বসু মল্লিকের কলমে 'আড্ডা, প্রেম ও কেবিনকথা' ওপেনিং কলম হিসেবে যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য, তথ্যবহুল লেখা। কিন্তু আমার মন ছুঁয়ে গেছে দেবদত্ত গুপ্তের 'চপলেট কাটলেট রমাকান্তর কেবিন'। স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অনেকে হাহুতাশ করেছেন সে যুগে কেবিন রেস্তোরাঁয় গিয়ে প্রেম করা হল না বলে, অনেকে আবার কেবিনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া স্টুডেন্ট লাইফের নোলার কাহিনিই লিখেছেন ঘি গরমমশলা দিয়ে। কেউ কেউ বদলে যাওয়া সমাজ নিয়ে কমেন্ট্রি করেছেন, কেউ আবার অনুসন্ধান করেছেন স্পেসিফিক কেবিন রেস্তোরাঁর রসুই রহস্য।

এত এত কেবিন সর্বস্ব লেখাতেও দামুবাবু যথারীতি নিজস্বতা বজায় রেখে আউট অফ দ্য স্টেডিয়াম ছয় আঁকড়েছেন। যাঁরা রহস্য গল্প লিখবেন বলে হাত পাকাচ্ছেন, অ্যাটমস্ফিয়ার ক্রিয়েট করার বিদ্যাটা তাঁর লেখা পড়ে আয়ত্ত করে ফেলুন। 'পাহাড়ের কেবিনগাথা' অমনভাবে আর কেউই লিখতে পারত না। কুমারপ্রসাদের লেখায় আলিসাহেবের একাধিক ঘটনা পড়ে যারাপরনাই প্রীত হলাম। দারুণ লেগেছে সুনেত্রা সাধুর 'আড়াল আর আগুন স্মৃতি'।

সব নিয়ে ফাটাফাটি সংকলন। যাঁরা জীবনে ডেটিং সাইট বা কেবিন লাইট কিছুই পাননি আমার মতো, বই পড়েই পাপখণ্ডন করুন।

রবিবার, ৪ মে, ২০২৫

অপ্রাগৈতিহাসিক

 


কল্পবিশ্বের হাত ধরে যে প্রতিভাবান স্পেকফিক লেখকদের একটা ব্যাচ উঠে এসেছে, তাতে সোহম গুহ-এর নাম আলাদা করে বলতেই হয়। ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সোহমের কয়েকটা গল্প পড়েই আমি তাঁর ছকভাঙা লেখার ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। বিষয়বস্তু ও চিন্তাভাবনার দিক থেকে অভিনব তো বটেই, তার চেয়েও বড় কথা, সোহমের কলম যে কল্পবিজ্ঞান লেখে, তাতে 'বাঙালি পাঠক ও জিনিস বুঝবে কি না! একটু সহজ করে লিখব নাকি?' জাতীয় মেন্টাল ব্লকেজ থাকে না।

যা থাকে, তা হল এই ভাবনাটা। ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে কল্পবিজ্ঞান লিখতে বসেছি যখন, এই যুগের সেরা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের সঙ্গেই পাল্লা দিতে হবে, তার সমকক্ষ হয়ে উঠতে হবে, স্ট্রেট অ্যান্ড সিম্পল। এখন, এই অ্যাস্পিরেশন হয়তো অনেকেরই থাকে, কিন্তু সত্যি কথা হল, অ্যাস্পিরেশন থাকলেই তো হয় না, একটা বিশেষ ঘরানায় নিজের লেখাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হলে, আন্তর্জাতিক করে তুলতে হলে, বহুস্তরীয় করে তুলতে হলে অনেকটা পথ অতিক্রম করতে হয়। আমি সেরা কল্পবিজ্ঞান লিখতে চাই, আবার সেরা ঐতিহাসিক গল্পও লিখব, অসামান্য সামাজিক কাহিনি লিখব, মর্মস্পর্শী স্মৃতিকথাও লিখে দেব ঝটপট... ওসব শুনতেই ভালো লাগে। বাস্তবে, জিনিয়াস বাদে অমন কেউ করতে পারে না। আমার যতদূর ধারণা, সোহম জানেন, তিনি স্রেফ কল্পবিজ্ঞান লিখবেন এবং মন দিয়ে লিখবেন। সেই দায়বদ্ধতা থেকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছেন, হোমওয়ার্ক করেছেন, করছেন, বইপত্রের পাশাপাশি আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের চলন ও দর্শন তিনি একদম গুলে খেয়েছেন। না খেয়ে থাকলে 'অপ্রাগৈতিহাসিক' এর মতো লেখা বেরোতে পারে না।

বইটা পড়েছি বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু আপাতত বইটা সঙ্গে নেই বলে বিস্তারিত আলোচনা লেখা একটু মুশকিল। কিন্তু এমন একটা উচ্চাকাঙ্খী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে যে পরিশ্রম লেগেছে, সে নিয়ে স্পেকফিক আগ্রহী পাঠক হিসেবে দু চার লাইন লিখে রাখলে অন্যায় হবে না।

প্রথমেই, অতি সংক্ষিপ্ত সামারি।

'অপ্রাগৈতিহাসিক' আসলে কী নিয়ে? প্রথমেই জেনে রাখা ভালো, টেকনিক্যালি বইটির নাম 'অপ্রাগৈতিহাসিক: প্রথম পর্ব (ঈশ্বরের বাগান)' এবং এ-ই বইটি একটা ট্রিলজির প্রথম খণ্ড। তেলেঙ্গানার বেআইনি খনিতে কয়েক কোটি বছর পুরোনো একটা ফসিলে মানুষের জুতোর ছাপ পাওয়া গেছে, সেই কথা চাউর হতে একাধিক দেশের বিজ্ঞানী ও সরকার নড়েচড়ে বসেছেন। এবং সেই সূত্রে একটা অভিযানের সূচনা হয়, যা এই বইটির মূল বিষয়বস্তু। এটুকুতে আশা করি প্লটের কোনও স্পয়লার দেওয়া হল না।

বাট ওয়েট, ডিড আই সে প্লট? বাট ওয়েট, প্লট ইজ নট দ্য অনলি কি থিং হিয়ার! প্লট আছে, কিন্তু শুধুই প্লট থাকলে এই বইয়ের কথা লিখতে হত না। হুম, এখানে দু এক কথা আরো বলে রাখি! বইটা পড়ে আমার অন্তত ব্যক্তিগত ভাবে যা মনে হয়েছিল সেইটুকুই, কারণ লেখক বা অন্যান্য পাঠকের পাঠ অভিজ্ঞতা বা ইন্টারপ্রিটেশন আমার চেয়ে ভিন্ন হতেই পারে।

'অপ্রাগৈতিহাসিক' ভীষণ একটা চনমনে সাস্পেন্স থ্রিলারের ভঙ্গিতে শুরু হয়েছে। একের পর এক রহস্য, অজানা তথ্য, প্রাগৈতিহাসিক থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক যুগের স্টেট অফ দ্য আর্ট টেকনোলজির তাকলাগানো তথ্য, এবং মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া জটিল সব প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে মিশে একটা স্পাইডারনেট তৈরি করেছে। অনেক পাঠক হয়তো ভাবছেন বইটা একদম টেকনো থ্রিলারের ভঙ্গিতে শেষ লাইন অব্দি আপনাকে এজ অফ দ্য সিটে বসিয়ে রাখবে। মারকাটারি অ্যাডভেঞ্চার হবে ক্রিকটনের বইয়ের মতো। আমারও তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু না, বইটার মাঝামাঝি গিয়ে আমার মনে হয়েছে, 'ওই বইটা' লেখক লিখতে চাননি। এখানে রোমাঞ্চকর সব ঘটনা ঘটছে পরপর, সার্ভাইভালের জন্য দাঁত চাপা লড়াই আছে, গায়ের রোম দাঁড় করানো ঘটনা আছে, অ্যাড্রেনালিন রাশ আছে, গতিও আছে, কিন্তু সেই সব ছাপিয়ে কেন এই বইটা স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে তার কারণ হল, বইটা আসলে একটা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের একটা বিশেষ দর্শনকে অবলম্বন করে এগিয়েছে, যার নাম পোস্ট সার্টেনিটি প্যারাডাইম।

এখন ওপর ওপর দেখলে মনে হয় পোস্ট সার্টেনিটি প্যারাডাইম এমন আর কী নতুন জিনিস? ট্রাডিশনালি একরকম কল্পবিজ্ঞান কাহিনি লেখা হত, তাতে অনুমান করা হত বিজ্ঞানের অগ্রগতি হতে হতে এমন একটা সময় আসবে যখন এই সমস্ত চমৎকার জিনিস থাকবে কিংবা তার ফলে কিছু কিছু ক্রাইসিস তৈরি হবে। কিন্তু পোস্ট সার্টেনিটি প্যারাডাইম এই বিশ্বাসটাকেই চ্যালেঞ্জ করে। এখন technological determinism কে চ্যালেঞ্জ করে বলা যে এআই এলে এই সমস্যা হবে বা রোবটরা বেশি শক্তিশালী হলে মানুষকে দাস হয়ে থাকতে হবে খুবই প্রাথমিক লেভেলের কল্পনা, সে নিয়ে অসংখ্য লেখা আছে। কিন্তু সমকালীন post-paradigm shift আরো অনেক বেশি জটিল প্রশ্ন তুলছে, সেখানে আসলে প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের অস্তিত্ব চেতনা আর মরালিটিকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। একটা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা দুর্ঘটনা কীভাবে সমগ্র মানবজাতিকে একটা নৈতিক দ্বন্দের মধ্যে ফেলে দিতে পারে, সে নিয়ে চিন্তাভাবনা করাই পিসিপি ঘরানার প্রধান অস্ত্র।

সেখানে কিছুই নিশ্চিত নেই, সবই ধোঁয়াশা! যদি বিজ্ঞানের অগ্রগতির পূর্বপরিকল্পিত ভাবনাটাই মিথ্যা বলে জানা যায়? মানুষ বা মহাকাশ বা সময়ের যে প্রমাণিত কন্সেপ্ট আছে, তাই যদি বদলে যায়? সত্যি বলতে, বাস্তবেও scientific dogmatism এর দিন চলে গেছে। দিন দিন নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে, নতুন নতুন তথ্য জানা যাচ্ছে, তার ফলে বহুদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ধারণা বাতিল হয়ে যাচ্ছে, বিজ্ঞানের সমস্ত কিছুই রিভিজন করতে হচ্ছে। এর বিকল্প নেই, কারণ 'নতুন' বিজ্ঞান বলছে 'পুরোনো' বিজ্ঞান ভুল, আবার 'ভবিষ্যতের বিজ্ঞান' ও 'বর্তমানের বিজ্ঞান' কে ভুল বলবে বলে অনেকের বিশ্বাস। কে জানে? এই বাস্তবতাবোধ, এই এপিস্টেমিক হিউমিলিটির ফলে মানবজাতির সত্তা ও অস্তিত্বের ধারণাই এখন এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে কোনও কিছুর নিশ্চয়তা নেই।

পোস্ট সার্টেনিটি প্যারাডাইম শিফটে এ-র সঙ্গে ঢুকে গেছে পোস্টমর্ডানিজম আর সিউডোসায়েন্সের নানান ধারণা। নতুন প্রযুক্তির ভুল এবং ইনএফিসিয়েন্সির ফলে নানারকমের পারশেপশন তৈরি হচ্ছে। এই যেমন, যে অ্যাপে টাইপ করছিলাম, সেখানে ইংরেজি শব্দ Dogmatism টাইপ করতেই বাংলায় 'কুকুরজাতীয়' লিখে দিল, Paradigm কে প্যারাডাইম না লিখে প্যারাডিগম লিখে ফেলল, epistemic কে 'জ্ঞানমূলক' করে দিল। অটোকারেক্টের তো যা তা অবস্থা! এখন আমি ভাবছি প্রযুক্তিটা ইনএফিসিয়েন্ট, কিন্তু তবু আমরা গুগল টাইপিং আর ট্রান্সলেট ব্যবহার করছি। এখানেই একটা গোটা জাতির দ্বন্দের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বেলাইনে চলে এসেছি। এ নিয়ে বিশদে বলা এখানে অসম্ভব। কিন্তু বটমলাইন হল, আধুনিক কালে এই দর্শনকে অবলম্বন করে লেখা কল্পবিজ্ঞানে মূলত সময়, ইতিহাস, প্রযুক্তি এবং মানুষের অস্তিত্বচেতনার জটিল প্রশ্নগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই বইগুলো শুধুই বিজ্ঞাননির্ভর অনুসন্ধানের গল্প বলে না, বরং মানবচেতনার দার্শনিক দিকগুলো নিয়ে একটা কাহিনি বুনে তোলে। 'অপ্রাগৈতিহাসিক' ও তার ব্যাতিক্রম নয়।

আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের যে আরেকটি বিশেষত্ব এই উপন্যাসে পুরোদমে আছে, তা হল কল্পকাহিনির মাধ্যমে বাস্তব দুনিয়ার কথা তুলে ধরে। সহজ হিসেব হল, কল্পবিজ্ঞান আসলে আগামীর গল্প নয়, সার্থক কল্পবিজ্ঞান চিরকাল বর্তমানের কাহিনি বলতে চেয়েছে। মোড়ক যা ইচ্ছে হতে পারে, রূপক যা ইচ্ছে ব্যবহার করা যেতে পারে, মহাকাশ থেকে জলের নিচে, হাজার বছর পরের দুনিয়া বা হাজার বছর আগের দুনিয়ায় কাহিনি থাকলেও, আসলে তা আজকের গল্প। লেখায় বর্তমানের প্রতিফলন না থাকলে, সোশিওলজিকাল কন্টেক্সট না থাকলে, এই সময়ে অনুভব করা অসহায়তাগুলো লেখায় ফুটিয়ে না ওঠাতে পারলে সেই কল্পবিজ্ঞান কোনও কাজের নয়। এখন যদি কোনও পাঠক সায়েন্স ফিকশনে শুধু উদ্ভট গ্যাজেট খুঁজছে, এলিয়েন খুঁজছে আর রাজনীতি আর সোশ্যাল রিয়ালিটির আলোচনা/সংলাপ পেলেই হাই তুলছে, তাহলে তা পাঠকদের সমস্যা, সায়েন্স ফিকশন বা তার লেখকদের নয়। না না, আমি বলছি না, বিদ্বজনেরা বলছেন।

সেই জায়গা থেকে সোহমের উপন্যাস টপনোচ। প্রথম বইতেই তিনি যথাসম্ভব সোশ্যাল রিয়ালিটি দেখিয়েছেন, ক্রাইসিসটাকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে বুনেছেন, পাঠকদের অনাদি-অনন্ত বিস্তৃত জটিল সায়েন্টিফিক-এথনিক ডিলেমার মাঝে ফেলেছেন, এবং যতটা সম্ভব রোমাঞ্চ আর গতি বজায় রেখেছেন। তার ভাষাটাও ঠিক চিরাচরিত বাংলা নয়, একদম ঝরঝরে স্বতঃস্ফূর্ত বাংলা বলতে যা বোঝায় তা নয়, ইংরেজি স্পেকফিকে যে ধরনের ভাষা বা বাক্যগঠন থাকে, অনেকটা সেই ধাঁচের। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত ভাবে তাতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি, পাঠসুখে ব্যাঘাত ঘটেনি, বরং ব্যাপারটা লেখকের ক্রিয়েটিভ চয়েজ বলেই মনে হল। মেলভিল বা ম্যারি ডোরিয়া রাসেলের মতো অনেকেই গতানুগতিক ইংরেজি বর্জনকে একটা নিজস্ব ভাষায় উপন্যাস লিখেছেন, খানিকটা সেরকমই। আরো খোলতাই ভাষা হলে পড়তে বেশি ভালো লাগত না লাগত না, সেটা আপাতত বোঝার উপায় নেই।

যাই হোক, বাংলা সায়েন্স ফিকশনের জগতে এই বইটি এবং সিরিজটি অতি প্রয়োজনীয় সংয়োজন হতে চলেছে, সেটুকু স্বীকার না করে উপায় নেই। যাঁরা সিরিয়াস সাই ফাই নিয়ে ইন্টারেস্টেড, এই বইটা মিস না করাই ভালো। আপাতত দ্বিতীয় খণ্ডের অপেক্ষায়।

অপ্রাগৈতিহাসিক
সোহম গুহ

সোমবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৫

বাংলার স্টেশন কথা

 


একটা বই কী করে হয়?

একটা বই করে কী হয়?

দুটো প্রশ্নের উত্তরই কেস স্পেসিফিক। একটা বই করে আসলে কিছুই হয় না হয়তো; শুধু শুধু মানসিক চাপ নেওয়া, ঘাড়ে পিঠে ব্যাথা হওয়া, কিংবা চোখের বারোটা বাজানো। আবার হয়তো, একটা বই করে একজন ভীষণ আনন্দ পায়। গোটা প্রসেসটার সময় তো বটেই, তার পরেও সেই বইটা তাঁর জীবনে ভ্যালু অ্যাড করে। ওদিকে, একটা বই তৈরি হওয়াও নানারকম। আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই রবিবার পান্ডুলিপি শুরু হয়ে পরের শনিবার জমা হলে আসছে সোমবার বই ছাপাইতে চলে যায়। আজকাল অ্যাসেম্বলি লাইনে ফেলে বই করা কোনও ব্যাপারই নয়। ওদিকে এমনও ঘটে, যে ভীষণ নাকমুখ কুঁচকে একটা বই নিয়ে বছর কাবার করে দেন লেখক/প্রকাশক, নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ান, অথচ বই হাতে নেওয়ার পর সেই যত্ন চোখে বা মনে ধরা পড়ে না।

কথাগুলো মনে পড়ল, এই বইটার কথা উঠতে। ট্রেন নিয়ে আমার বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রহ আছে বটে, কিন্তু বাংলার স্টেশন নিয়ে আমি ওই দু একটা বই পড়ে ভাসাভাসা যা জানা যায়, তার চেয়ে বেশি কিছু জানি না। তবু কেন জানি সম্পাদক জুটি আমাকে প্ল্যানিং টিমে রেখেছিলেন কে জানে? হয়তো ট্রেনের প্রতি আগ্রহের কথা জেনে গিয়েছিলেন বলেই! ফালতু বকা ছাড়া আমার কন্ট্রিবিউশান শুন্য। মাইনাসও বলা যায়। কিন্তু এই গোটা সময় ধরে আমি দেখলাম, একটা 'নট সো কমন' বিষয়বস্তুর বইটাকে একটা 'নট সো কমন' বই বানানোর জন্য দুজন মানুষ কী খাটুনিই না খাটলেন!

ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে যখন আমাকে গ্রুপে ঢোকানো হয়, তার সম্ভবত বছর খানেক আগে থেকেই বইয়ের খসড়া করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানে, বিষয়বস্তু সম্পর্কে হোমওয়ার্ক করা, অন্যান্য বই গুলে খাওয়া, কে বা কারা লিখতে পারেন, কী নিয়ে লিখতে পারেন, তার একটা প্রাথমিক পরিকল্পনা আগেই হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ম্যানুস্ক্রিপ্টের যেমন ড্রাফট ১ থেকে ২০ হতে পারে, প্রাথমিক পরিকল্পনাও ফাইনাল হতে গিয়ে পঞ্চাশবার অদলবদল হয়।

একপর্ণিকা ছোট প্রকাশনী। ত্রিপুরা থেকে বই করে, প্রকাশক কলকাতায় আসেন না। মানে, আসেনই না। মুখ দেখাতেও না। জয়ঢাক প্রকাশন তাদের পরিবেশক, বই তাই সহজলভ্য। কিন্তু মূল প্রকাশকের বই করে কতটা প্রফিট হয়, কতজন পড়েন আমার জানা নেই। আন্দাজ করছি, সঙ্খ্যাটা মারাত্মক কিছু নয়! তবু, একটা বই নিয়ে এই লং টার্ম এফর্ট দেওয়া, এই আন্তরিক যত্ন আর নিজের দিক থেকে পরিশ্রমের ত্রুটি না রাখার প্রসেসটা আমি বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি।

তা সত্ত্বেও কি সব সময় বই একদম পারফেক্ট হয়? সব বইই কি বিষয়বস্তু, প্রোডাকশন বা প্রচ্ছদের দিক থেকে আমার চোখে দারুণ কিছু বলে মনে হয়?

না। হয় না।

এটাই সত্যি কথা। বানানের ভুল থাকতে পারে, প্রচ্ছদ আমার পছন্দ না হতে পারে, মেকিং বা প্রুফের ত্রুটিও কিছু থাকতে পারে মাঝেমধ্যে। থাকেও।

কিন্তু যে জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করে, তা হল একজন মানুষের প্রতিবার নাছোড়বান্দা পারফেকশন পাওয়ার জন্য করা এই চেষ্টাটা। প্রকাশনী বলতে তো একজন মাত্র মানুষ। বাজেটও নেই। লোকবলও নেই। শুধু ভালো বই করার জেদ আছে, ইচ্ছে আছে। আমি জানি, এমন প্রকাশনী আরো আছেন। অনেকেই আছেন, শূন্য লাভ নিয়েই লড়ে যাচ্ছেন। একবার একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমার বাংলা প্রকাশনা জগতে কী ভালো লাগে? আমি বলেছিলাম, হাজার অপেশাদারিত্ব আর বিতিকিচ্ছিরি রকম পলিটিক্স আর স্ট্রাকচারহীন জগতে থেকেও কয়েকজন মানুষ সব প্রফিট লসের হিসেব ভুলে ভালো বই করার জন্য খাটছে, বুদ্ধিসুদ্ধি শিকেয় তুলে প্যাশন নিয়ে বাঁচছে। ওইটুকুই ভালো লাগা। ওইটুকুই।

এইবার আমি একটা বই বানাতে দেখলাম, যেটার সঙ্গে আমি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবেও হয়তো জড়িয়েও নেই। না আমার লেখা আছে, না আমি সম্পাদক, না বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা আছে। সেইজন্যই বুঝি আরো মন দিয়ে দেখতে পেলাম, অনুভব করতে পারলাম, এই বইটা ঠিক কতটা যত্ন নিয়ে তৈরি করা হল?

বাংলায় স্থানীয় স্টেশন নিয়ে একাধিক কাজকর্ম হয়েছে। কিন্তু সাবজেক্টটা এতটাই বড় যে প্রতিটা অঞ্চলের স্টেশন নিয়ে এক একটা সিরিজই হয়ে যেতে পারে। আচ্ছা, তুলনামূলক ভাবে অজানা বিষয় নিয়ে লেখা সংগ্রহ করার জন্য সম্পাদকরা কী কী করেছেন? বইটাকে ভালো করার জন্যই বা তাঁরা কী করেছেন? আমি বরং কয়েকটা পয়েন্ট লিখে দিই।

১) আই আর এফ সি এ অর্থাৎ ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ফ্যান ক্লাব ফোরামের যাবতীয় লেখালিখি পড়ে দেখেছেন, দরকারে সেই লেখা নিয়ে অন্যান্য বইপত্র/লেখালিখি ঘেঁটে দেখেছেন। এই আমি বললাম হয়তো পার্থপ্রতিম বাবু ট্রৈনিকে রেল নিয়ে চমৎকার কাজ করছেন না ভারতীয় রেল হেরিটেজ নিয়ে দীপক রায়চৌধুরী বহুদিন ব্লগ লিখেছেন, রাজীববাবু ছুটলেন খবর নিতে। হয়তো বললাম আমার বন্ধু কাম দাদা Saugata Sengupta পুরো রেলপাগলা লোক, রাজীবদা ঝাঁপ মারলেন। আমি বলেই খালাস। যেখানে দেখো ছাই উড়াইয়া দেখো তাই, সম্পাদক-জোড় কিছুই করতে বাকি রাখেননি।

২) বইয়ের স্ট্রাকচার নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলেছে। কী নিয়ে লেখা থাকবে আর কী নিয়ে থাকবে না, কোন বিষয়টা নিয়ে বইটা গড়ে উঠলে পাঠকটা নতুন কিছু পাবেন না পূর্ববর্তী বইগুলোর কোন লেখাগুলো নিয়ে কচলানোর দরকার নেই, সেই নিয়ে এমন গভীর, উত্তপ্ত, যুক্তিগ্রাহ্য আর দীর্ঘ আলোচনা চলেছে যে আমি মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে ফেলেছি।

৩) বইতে কন্ট্রিবিউটার হিসেবে অংশগ্রহণ করার জন্য কাকে কাকে অনুরোধ করা হবে, সেই নিয়েও প্রচুর মেল/মেসেজ চালাচালি হতে দেখেছি, ফোনও হয়েছে। বিষয়বস্তু নিয়ে অগাধ জ্ঞান কিন্তু লেখা তুলনায় শুষ্ক, আবার লেখার শৈলী অনবদ্য কিন্তু বিষয়বস্তুর নিরিখে সেই লেখা বিশেষ কোনও ভ্যালু অ্যাডিশন করছে না... এক্ষেত্রে কী করা যায়? এই ব্যাপারটা শুনতে যত সহজ মনে হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া ততোটাই কঠিন। বাংলা লেখালিখির জগতে কোনও কাজের মূল্য নির্ধারণ করা নেই, সবসময় ভালো লেখা পাওয়াও যায় না। আমি খুশি, অবশেষে একটা চমৎকার ব্যালেন্স করে নেওয়া যায় ভালো সম্পাদক পাওয়া গেলে। এখানেও দিব্যি কাজ হয়েছে।

৪) সম্পাদনার ক্ষেত্রে এমন সমস্ত ছোটখাটো সমস্যা দেখা যায়, সাধারণত যে সব নিয়ে কেউ মাথাই ঘামায়নি। এই ধরুন, একটা স্টেশনের নাম। বাংলায় একরকম, স্থানীয় ভাষায় একরকম, হিন্দিতে একরকম। কোনটা রাখা হবে? আপনি হয়তো ভাবছেন বাংলা বইয়ে বাংলা নাম, সিম্পল! কিন্তু ব্যাপারটা অমন নয়। একটা নামের ইতিহাস বা কালচারাল সিগ্নিফিকেন্স এক একটা লেখার এমন ভাবে ঢুকে থাকে, তখন সেটাকে বদলে দেওয়া মোটেও সহজ হয় না। সেই নামের ব্যাঞ্জনার সঙ্গে লেখা ও বিষয়ের যে সামঞ্জস্য আছে, সেটা ব্রেক করলে সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে। এমন হাজারও জিনিস, স্ট্রাকচারিং থেকে প্লেসমেন্ট, সূচিপত্রের অদলবদল, ভূমিকা ও ব্লার্ব, এক একটা শব্দের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমি দীর্ঘ আলোচনা হতে দেখেছি। এক একটা সময় এমন হয়েছে, কাজ পনেরো আনা শেষ হয়ে আবার শুরু করতে হয়েছে, কারণ সামান্য একটা ভুল 'হয়তো' হলেও হতে পারে। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের জন্য না সম্পাদক না প্রকাশক একবারের জন্যও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

৫) বইয়ের সঙ্গে যে জরুরি ছবি, নথি, অলংকরণ ইত্যাদি যাবে, সেই নিয়েও তুমুল আলোচনা আর মাঝেমধ্যে মতান্তর হয়েছে। কিন্তু অবশেষে দেখা গেছে, বইয়ের জন্য যা জরুরি, সেটাকেই প্রায়োরিটি দেওয়া হয়েছে। কেউই ইগোবশত নিজের মতামত জোর করে চাপিয়ে দেয়নি। পাশাপাশি আবার 'বই কে ওয়াস্তে সব মঞ্জুর' বলে কপিরাইটেড ছবি বা অন্য বইয়ের/শিল্পীর অলংকরণ/ফোটোগ্রাফ কিছুই ব্যবহার করেননি। এই বিশেষ কাজটা করার জন্য আমি ব্যক্তিগত ভাবে টুপি খুললাম।

৬) প্রচ্ছদ যে ঠিক কতবার বানানো হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। একইভাবে কাজ হয়েছে ভিতরের ছবি নিয়েও। ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ক্যালিগ্রাফি, স্টাইল থেকে রঙের ব্যবহার, দিনের পর দিন ধরে কাজ চলছে তো চলছেই। বইমেলা চলে এল, বই হল না। নববর্ষ দোরগোড়ায়, তবু দুজনে ঘাড় গুঁজে কাজ করছে। ইভেন্ট চলে গেলে বই আদৌ বিকোবে কিনা, সে নিয়ে কারো হেলদোল নেই। দুজনের সিদ্ধান্ত, বই পারফেক্ট না হলে তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই। মিথ্যে বলব না, মাঝেমধ্যে দু এক মুহুর্তের জন্য তো আমিই ভেবেছি, ওরে বাবা! এত বাড়াবাড়ি করে কী লাভ? কতজন আর পড়বে? তারপর দুই সম্পাদকের হাড়ভাঙা খাটুনি দেখে নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে হয়েছে। অবশেষে সব বাধা বিপত্তি কাটিয়ে কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সেই বইয়ের প্রচ্ছদ প্রকাশ হল কাল। আন্তরিক যত্ন আর পরিশ্রমে করা একখান বই। হয়তো পারফেক্ট, হয়তো পারফেক্ট (পার্ফেক্ট বলে কিছু হয়ও না) নয়, কিন্তু পারফেক্ট করার ইনটেনশনটা, ইচ্ছেটা, পরিশ্রমটা ...সেটা অবশ্যই পারফেক্ট।

আমি বইটার সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নই। তবু মেকিং সম্পর্কে দু একটা কথা বললাম, সাধারণত 'বিহাইন্ড দ্য বুক' নিয়ে কথা হয়, অথচ সিনেমায় 'বিহাইন্ড দ্য সিনস' নিয়ে এক একটা ডকুমেন্টারি হয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, ট্রেন নিয়ে আগ্রহী পাঠকদের কাছে অনুরোধ, বইটা উল্টেপাল্টে দেখবেন। দেখে জানাবেন, যত্নটুকু চোখে আর মনে ধরা পড়ছে কিনা! যদি পড়ে, সম্পাদক জুটির সব কষ্ট সার্থক।

বাংলার স্টেশন কথা
একপর্ণিকা প্রকাশনী
 

সোমবার, ৩ মার্চ, ২০২৫

বিষনিদ্রা: চারুদত্ত ফ্যান্টাসি সিরিজের ফ্যান্টাস্টিক ওপেনিং

 


বইমেলায় গেলে আমি পারতপক্ষে কল্পবিশ্বের স্টলে ঢুকি না। স্পেকফিক বইগুলো দেখে হাত পা নিশপিশ করবে কিন্তু বাড়িতে বই রাখার জায়গা নেই, আজকাল পাইরেসির জ্বালায় ইবুকও হয় না, তাই অনেক বইই ইচ্ছে থাকলেও পড়া হয় না বা পড়তে বছর গড়িয়ে যায়। কিন্তু ইচ্ছে থাকেই। সত্যি বলতে, এই সময় বাংলায় কল্পবিজ্ঞান বা সার্বিক ভাবে স্পেকুলেটিভ ফিকশনের ভক্ত হলে সোহম গুহ, সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়, রনিন বা শ্রীজিত সরকারের মতো প্রতিভাবান কলমদের এড়িয়ে না যাওয়াই বেটার। সিনিয়ারদের কথা না হয় নাই বললাম। এত সব কথা বলার কারণ, বেশ কয়েকদিন পর একটা বই পড়ে মনমেজাজ বেশ ফুরফুরে মনে হচ্ছে। 

গত মাসেই মেলায় সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের চারুদত্ত ফ্যান্টাসি সিরিজের প্রথম বই 'বিষনিদ্রা' প্রকাশিত হয়েছে, ইতিমধ্যেই পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছে। আরবান ফ্যান্টাসি কাম গোয়েন্দা গল্প ঘরানার কাহিনি, বিশ্বসাহিত্যে এমন গল্পের অভাব না থাকলেও বাংলায় অতি প্রয়োজনীয় সংয়োজন। রিভার্স অফ লন্ডন, অ্যালেক্স ভেরাস সিরিজ বা জেমস লাভগ্রভের শার্লকিয়ান মিস্ট্রির ভক্ত হলে এই বই আপনারই জন্য, আবার ফ্যান্টাসি বাদ দিয়ে সাধারণ গোয়েন্দা গল্প/রহস্য কাহিনির অনুরাগী হলেও বইটা আপনাকে হতাশ করবেন না।

অতি সংক্ষিপ্ত সামারি। চারুহাসিনী দত্ত পেশায় দিব্যেন্দ্রিয়, অদ্ভুতাঙ্গ প্রাণী আর অতিলৌকিক (পড়ুন রাক্ষস, খোক্ষস, মৃতদেহ জাগানো ইত্যাদি ইত্যাদি) নিয়েই তাঁর কারবার। এমন সময় এক দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর স্ত্রী রহস্যজনক ভাবে অদ্ভুতাঙ্গ এক প্রাণীর আক্রমণে প্রাণ হারান আর সেই কেসের তদন্ত করতে গিয়ে চারু এক বড় রহস্যের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। একের পর এক ঝামেলা, রহস্যের ওপর রহস্য, তদন্ত এবং সমাধান। ক্লিন অ্যান্ড সিম্পল। কোনও নাটক নয়।

সৌম্যবাবুর লেখা সাবলীল, ভাষা স্মার্ট, তাঁর রেঞ্জও কাবিলে তারিফ। নানান জায়গায় তাঁর লেখা গল্প পড়ে আমি জানি তিনি গল্পের চরিত্র বুঝে ভাষা ব্যবহার করেন, অযথা জ্ঞান ফলাতে যান না। এখানেও তাঁর কলম ধারালো ছুরির মতো এগিয়েছে। ঝকঝকে ন্যারেটিভ, তকতকে সংলাপ, ইন্টারেস্টিং প্লট এবং টানটান ট্রিটমেন্ট। খুব শাটল ভাবে এই দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিতি ঘটিয়েছেন, পাশাপাশি কোরাপ্ট রাজনীতি আর  সিস্টেমের পাওয়ার ডায়নামিক্সও বুঝিয়ে দিয়েছেন। এরই মাঝে অসম্ভব দক্ষতায় জাস্টিস আর মোরাল কম্পাস নিয়ে কমেন্ট্রিও করেছেন, সেসব কতজন খেয়াল করবেন জানি না। কিন্তু এসব কিছুই মূল কাহিনির গতিকে থমকে দেয়নি। লেখককে সাধুবাদ দিতেই হয় তাঁর পরিমিতিবোধের জন্য। তিনি আসলে একই রহস্য কাহিনি লিখছেন, আর রহস্য কাহিনিতে রহস্যটাই আসল, এটা কোথাও তিনি ভুলে যাননি। ফলে গোটা বইটাই মুচমুচে, ক্রিস্প। কুড়মুড়ে ফিশফ্রাইয়ের মতোই।

ফ্যান্টাসি হওয়া সত্ত্বেও শক্তিনগর বলে যে পশ্চিম বঙ্গের যে শহরটাকে সৌম্যবাবু তুলে ধরেছেন, সেটা সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত। এখানে সম্পর্কের জটিলতা আছে, কেরিয়ারের ঝামেলা আছে, ড্রাগ ব্যবসা আছে, দিব্যেন্দ্রিয় ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের ছুঁড়ে মারা টীকাটিপ্পনী আছে। সত্যি বলতে এসব চেনা জিনিস এতটাই বেশি আছে যে মাঝেমধ্যে আমার মনে হচ্ছিল ফ্যান্টাসির চেয়ে রিয়ালিজমের দিকে কাঁটা বেশি ঝুঁকে যাচ্ছে। আরেকটু ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং করলে, অদ্ভুতাঙ্গ বা এই অতিবাস্তব দুনিয়ার গোড়ার কথা একটু খোলসা করে বললে হয়তো আরো জমে যেত। কিন্তু যেহেতু এটা সিরিজ হতেই চলেছে, আশা করি পরের বইগুলোয় আরো ডিটেলে সব জানা যাবে। কিন্ত সব মিলিয়ে 'বিষনিদ্রা' বাংলা স্পেকুলেটিভ ঘরানায় একটা অসম্ভব ভালো অ্যাডিশন। রিডিং ব্লক হলে তা কাটাতে এই বইটা তুলে নিতেই পারেন। বোর হওয়ার কোনও জায়গা নেই। 

বিষনিদ্রা

কল্পবিশ্ব প্রকাশনী


শনিবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৪

বর্ষায় বর্ষণ/ রেসের বাইরের লেট রিড

রাজর্ষি দাশ ভৌমিক গোয়েন্দা কানাইচরণ লিখে বাঙালি পাঠকের চোখের মণি হয়ে উঠেছেন সন্দেহ নেই, কিন্তু মুশকিল হল, লেখক গোয়েন্দা গল্প আর ক্রাইম লিটের একনিষ্ঠ ভক্ত হলেও আদপে দীর্ঘকাল ধরে চমক লাগানো 'গোয়েন্দাকাহিনি' লেখার ইচ্ছে তাঁর সম্ভবত ছিল না, গোয়েন্দা কানাইচরণের চেয়ে তিনি ব্যক্তি কানাইচরণকে নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী, অনেক বেশি ইমোশনাল। একজন মাঝবয়সী মানুষ, যার বর্তমান চরিত্রের সঙ্গে কলকাতা আর তার শহরতলির স্পেস আর টাইম জড়িয়ে আছে। মেঠো মফস্বল, ঘেমো রোজনামচা, ধমকধামক আর কেতা দেখানোর ব্যালেন্স শীট মেশানো পুলিশ জীবন। শহরের ঋতুবদল--গ্রীষ্মের একঘেয়েমি, বর্ষার ভাপ, শীতের মার্ক করা উৎসব-- যেখানে জীবনের বদলের সঙ্গে এক হয়ে যায়। সময় যেভাবে বদলায়, শহরও বদলায়, বদলে যায় শহরে থাকা সেই মানুষও। রাজর্ষি সেই মানুষের গল্প বলতে কলম ধরেছেন, গোয়েন্দা কাহিনির চমক, প্লটের অভিনবত্ব বা পুলিশ প্রসিডেরালের সুক্ষ্ণতা দেখানোর পালা তাঁর শেষ। এইবার লেখক কানাইকে নিয়ে যে পথ ধরেছেন, তা দিন দিন আরো ধোঁয়াশা হয়ে উঠবে বলে আমার ধারণা। মনে রাখবেন, এই কাহিনি গোয়েন্দার নয়, এই কাহিনি কানাইয়ের। এবং, কানাই ইজ কলকাতা। কলকাতা ইজ কানাই।
কানাই শুধুই কলকাতা অবশ্য নয়, কানাই আসলে ১৯৮৩ সাল। কানাই আশির দশকের মধ্যনিম্নবিত্ত সমাজের সেই সমস্ত দীর্ঘশ্বাস, যার চিন্তাধারা ও ভাবনাকে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধরা কঠিন। কানাই কমিউনিস্ট সরকারের থিতিয়ে আসা বিপ্লবের সেই সব ভেঙে যাওয়া প্রেম, যারা জাঁতাকলে পিষে প্রেমিকাকে হারাবে বলে মানসিকভাবে তৈরি থাকে। কানাই সেই সব সম্পর্কের দলিল, যেখানে দমবন্ধ করা জীবনের মাঝে কাঁচি সিগারেট ধরিয়ে নিজেকে সব ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে শত শত যুবক। কানাই পুলিশও বটে, যে পুলিশ নিজেও এক এক্সিস্টেন্সিয়াল ক্রাইসিস নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। কেস আসে, কেস যায়! কখনও অপরাধী ঠিক করে ক্রাইম সিন তৈরি হয়, কখনও ক্রাইম সিন সাজিয়ে অপরাধীর মাথায় মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়! জাস্টিস সিস্টেমের নিকুচি, কেস ফাইল ক্লোজ হোক! জোড়াতালি দিয়ে কোর্টে ম্যানেজ করে নিলেই হল! কানাই তিরাশির বর্ষায় মতিদার শিক্ষানবিশি করা এমন এক যুবক, যার আপাতত হাতেখড়ি চলছে।
ক্রাইম গল্পে ন্যাকাপনা আমার পছন্দ নয়, আমি ক্রিস্প লেখা ভালোবাসি। প্লট জোরালো না হলে বা আদ্যিকালের প্লট হলে আমি প্রথম থেকেই হাই তুলি, সে আমার পছন্দের লেখক হলেও এর হেরফের বিশেষ হয় না। খোদ কানাইয়ের প্রথম বই পড়তে গিয়েই আমি এই কথা বলেছি। অথচ, এই গল্পে না জোরালো প্লট আছে, না এমন কিছু নতুনত্ব আছে, না চমক আছে, তবুও আমি যাকে বলে বোল্ড আউট বাই ইট। এর পিছনে একটাই কারণ, লেখক আমাকে কলমের ম্যাজিকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন যে আমি নিছক একটা গোয়েন্দা গল্প পড়ছি না, আমি একটা ভালো লেখা পড়ছি। রহস্য গল্প নয়, আসল রহস্য হল লেখকের ভাষা, ন্যারেটিভের বর্ণালীগত সৌন্দর্য! ব্লিক, অথচ ডিটেল্ড! চিরাচরিত, অথচ নতুন। সহজ, অথচ গভীর। মুচমুচে, কিন্তু বিষাদময়। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
একটু সহজ কথায়, বা আরেকটু স্পষ্ট করে লিখি। লেখক 'কলকাতা নুয়া' থেকে 'বর্ষণ অধিক'-এ আসতে যে পথ ধরেছেন, তাতে বোঝাই যায়, তাঁর গোয়েন্দা গল্প আর গোয়েন্দা গল্প শুধু নেই। 'অজ্ঞাত পরিচয়..' এর যে প্লটে প্লটের অভিনবত্ব মুছে এক মেলানকলিক, বহুস্তরীয়, রাত্রিকালীন কমপ্লেক্সিটি ঢুকে পড়েছিল, 'বর্ষণ অধিক'-এ সেটা আংশিক ভাবে বিমূর্ত রূপ নিয়েছে। মেঘ বৃষ্টি রোদ্দুরের মোড়কে বন্দি জোড়াখুনের কেস আসলে স্পেসটাইমকে অতিক্রম করে একটা প্রজন্মের জীবনদর্শন তুলে ধরেছে। লেখক ইচ্ছাকৃত ভাবে টাইমলাইন তছনছ করে এমন একটা সময়কে তুলে ধরেছেন, যেখানে এই অপরাধ সম্ভব, এই অপরাধের উদ্দেশ্য জাস্টিফায়েড, এই অপরাধের ডিটেকশন আর ফয়সালাও ভ্যালিড। হয়তো আজকের সময়ে নয়, হয়তো আশির দশকে নয়, হয়তো কানাইয়ের অন্য কোনও কাহিনিতে নয়, কিন্তু 'বর্ষণ অধিক' এর তিরাশিতে, এই স্পেসিফিক টাইমলাইনে এই গল্প জাস্টিফায়েড। (এবং, বাস্তব টাইমলাইন মেন্টেন করার কোনও দায় লেখকের নেই।)
এই বইয়ে গল্পের চাল আরো ছন্দময়ী, আরো পোয়েটিক, আরো বেশি অভাজার্ভেন্ট, কিন্তু ক্লাইম্যাক্সের চমক বা রহস্য সমাধানের ব্যাগেজ কলমকে থমকাতে দেয়নি। যদি কারো মনে হয়, কী হল? কিছুই তো তেমন হল না? তাহলে উত্তর, যা হল, তাই হয়ে থাকে! সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না, পুলিশের গোয়েন্দারাও নস্যি টিপে মাঝেমধ্যে লেখকের মতো কল্পনা করে ফুটোফাটা বুজিয়ে নেন। এই সেই অতিবাস্তব পুলিশ কাহিনি, যা কোনোদিন কেউ বাংলায় লেখেনি। এই কাহিনি পুলিশ প্রসিডেরালের মোড়কে সাহিত্যের এমন একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রইল (অন্তত আমার কাছে, অন্য কারো কাছে বইটা অন্যভাবে ধরা দিতেই পারে) যা ঘুরেফিরে পড়ে মনে করব, বাংলায় এমন একটা বই লেখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এবং আরেকবার, পিনাকিদার প্রচ্ছদের কোনও তুলনা নেই।
বর্ষণ অধিক
বৈভাষিক

 

বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০২৪

অন্য বসন্তের উপাখ্যান

 


জয়ঢাক প্রকাশন পরিবেশিত 'অন্য বসন্তের উপাখ্যান' বাংলায় নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী কাজ৷ এই সংকলন  সাউথ এশিয়ান কুইয়ার (queer) স্পেকুলেটিভ ফিকশনকে সামনে আনতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কিন্তু 'বাংলায় এই প্রথম' মার্কা শব্দাবলী দিয়ে এই ইনিশিয়েটিভকে খাটো করার কোনও মানে হয় না। কারণ, কুইয়ার স্পেক-ফিক এর আনকোরা বিষয়বস্তু বাদেও, 'বাংলায় এই প্রথম' বাদেও এই সংকলনের অন্যতম প্রধান স্ট্রেন্থ হল সাউথ এশিয়ান সাহিত্যের রেঞ্জ আর বিষয়বস্তু নির্বিশেষে এমন কিছু সুসাহিত্য ও সুসাহিত্যিকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া, যাদের কথা তুলনামূলক ভাবে খুব বেশি পাঠক জানে না। কাজটা ঝুঁকির, কারণ সাহিত্য বলতে সাধারণত বাংলায় যা 'চলে', সেখানে প্লট আর ভাষা খুব স্পষ্ট, প্রমিনেন্ট, লিটারারি ডিভাইসের ধার পরখ করার চোখ বা ধৈর্য সকলের থাকে না, সবসময় তো নয়ই। (আমি নিজেকে ইনক্লুড করেই বলছি) কিন্তু আন্তর্জাতিক ঘরানার সাহিত্য, বিশেষ করে ছোটগল্প যেভাবে লেখা হয়, তার গভীরটা যেভাবে মাপা হয়, তার সঙ্গে একবার পরিচয় হলে ব্যাপারটা নিজে থেকেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। উদাহরণ, অ্যালিস মুনরো বা জর্জ সন্ডার্সের গল্প যদি কেউ প্রথম পড়ে, প্রায় প্লটহীন ব্যানাল লাইফের সাদামাঠা বিবরণ পড়ে হাই তোলা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই সাদামাঠা গল্প যে আসলে এক একটা চাবুক, সে উপলব্ধি হলে আর পিছন ফিরে তাকানো যায় না। 'অন্য বসন্তের উপাখ্যান' সেই জরুরি কাজটা করতে আরো এক পা এগিয়েছে। ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে ইংরেজি-বাংলা ভাষায় দক্ষ সাহিত্যিকদের কিছু গল্প নিয়ে এসে বুঝিয়ে দিয়েছে, কলমের ধারে বসন্তের ফুল ফোটানো কাকে বলে?


আপাতত, কুইয়ার স্পেকফিকে ফিরে যাচ্ছি। এই জিনিসটা চাপের। বিশেষ করে সম্পাদকদের কাছে। কিউয়ার মানে গে লেসবিয়ান ট্রান্স সম্পর্ক বাদেও অনেক কিছু হতে পারে, কিন্তু গল্প নির্বাচন করার পন্থাটা অবশ্যই বিচার্য৷ মানে, হতে পারে একজন কিউয়ার লেখক স্পেকুলেটিভ ফিকশন লিখেছেন, হতে পারে একজন হেট্রোসেক্সুয়াল লেখকের সাই ফাই গল্পের মূল চরিত্র কুইয়ার... বলতে চাইছি, গল্পে 'কুইয়ার' কতটা গুরুত্বপূর্ণ আর 'স্পেকফিক' কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটার ওয়েটেজ ঠিক করাই একটা বিশাল কাজ। কিন্তু এই বইয়ের চার সম্পাদক (সৌমিলি দাস, এম ডি মহাশ্বেতা, অঙ্কিত প্রসাদ আর অমৃতা চক্রবর্তী) যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে তুলনামূলক  এমন সমস্ত গল্প নির্বাচন করেছেন, যেখানে 'স্পেকফিক'--এর স্পেকুলেটিভ কল্পনাটাই আসলে কুইয়ার। সব গল্পে না হলেও বেশ কিছু গল্পে ব্যাপারটা পার্ফেক্ট ভাবে ধরা পড়েছে, আর পাঠককে মুগ্ধ করার পাশাপাশি ভাবিয়েওছে।


খুব সহজ ভাবে বলি, এই প্যাশন প্রজেক্টের পিছনে এই চার তরুণ- তরুণী যে নিষ্ঠা দেখিয়েছেন, তা সব প্রজেক্টে দেখা যায় না। জয়ঢাকের প্রকাশনার প্রোফাইল মন দিয়ে দেখলেও এই বইটা আর দশটা বইয়ের চেয়ে আলাদা হয়ে থাকবে তার ট্রিটমেন্ট, বিষয় ও লেখক/অনুবাদক নির্বাচন আর সম্পাদনার জন্য। প্রকাশনের সাপোর্ট ও গাইডেন্স অবশ্যই ছিল (যদিও ই-বুকে অন্তত কিছু কিছু বানান ভুল আর স্পেসিং মিসটেক চোখে লেগেছে) কিন্তু মূল ক্রেডিটটা অবশ্যই এই চারজনের। 


যদি ভুল না করে থাকি, ঈপ্সিতা হালদারের একটা সুচিন্তিত বক্তব্য ও ইংরেজি ও বাংলায় লেখা ভূমিকার পর বইয়ে মোট সতেরোটা গল্প আছে, তার কিছু কিছু বাংলায় লেখা, বাকিগুলো অনুবাদ। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল, এখানে দক্ষিণ এশিয়ার সেই সমস্ত লেখক লেখিকাদের গল্প তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে যারা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক জগতে সক্রিয় ও পরিচিত। সে মিমি মণ্ডল হোক, ইন্দ্রপ্রমিত দাস হোক, অর্চিতা মিত্র হোক বা কুরালি মানিকভেল, এম এল কৃষ্ণন আর বন্দনা সিং। অনুবাদকদের প্রত্যেকের কাজ চমৎকার, কিন্তু দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুষ্টুপ শেঠ বা মৌসুমী রায়ের মতো নিয়মিত অনুবাদক ও সাহিত্যিকদের   চেয়েও বেশি এগিয়ে রাখব সৌমিলি দাস আর অহনা মৈত্রের মতো তুলনামূলক ভাবে কম পরিচিত নামদের। বিশেষ করে এক একটা গল্প এতটাই 'উইয়ার্ড' ঘরানার, সেখানে এমন ঝকঝকে একবারও হোঁচট না খাওয়া বাংলা অনুবাদ করা সহজ কথা নয়। মন দিয়ে সম্পাদনা না করলে এমন কন্সিস্টেন্ট রেজাল্টও পাওয়া যায় না। এমনকি দু তিনটে গল্প যা আমার ওপর সেভাবে ইম্প্যাক্ট ফেলতে পারেনি, সেখানেও অনুবাদ নিয়ে কোনও কথা হবে না। 


লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, গল্প। পড়ে কেমন লাগল? সত্যি বলতে, বাংলা মাল্টিপল লেখক স্পেকফিক অ্যান্থোলজিতে এত ভালো গল্প আগে পড়েছি বলে মনে হয় না। বেশিরভাগ গল্পই চমৎকার, কিন্তু কিছু কিছু গল্প কেন বেশি ভালো লেগেছে, কারণ সহ বলে রাখি! এগুলো আমার ভালো লেগেছে, তাই বলে অন্যগুলো লাগেনি তা নয়। অন্য গল্পগুলোও ইকোয়ালি স্ট্রং।


১) শ্যামাপোকার ঘরবাড়ি: সোহম গুহ যে এই মুহুর্তে বাংলা স্পেকফিক জগতের রত্ন তাতে আমার মোটেও সন্দেহ নেই। ইন্টারন্যাশনালি অ্যাক্লেম পেতে হলে লেখায় বা বিষয়বস্তুতে যে ভাষা বা ভাবনা লাগে, তার সব আছে। কয়েক বছর পর নেবুলা বা হিউগোতে তার বই দেখলে আমি মোটেও অবাক হব না।

সংকলনের এউ গল্পটা প্রথম কুইয়ার ব্যাপারটা গল্পের মূল বিষয়বস্তুতে ঢুকিয়ে দিয়েছে আর সেই বুনন ঘটেছেও চমৎকার ভাবে।


২) মৃত্যুঞ্জয়: শাম্ভবী ঘোষকে আবিষ্কার করার জন্য এই সংকলন এর কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম। জাস্ট আউটস্ট্যান্ডিং গল্প। একটা ছোট্ট, সহজ গল্পকে ভাষা ও ট্রিটমেন্ট দিয়ে কোন লেভেলে নিয়ে যাওয়া যায় সেটা বোঝার জন্য এই গল্পটা পড়ে নেওয়া দরকার। লেখিকার আরেকটা গল্পও আছে এই বইয়ে ভুল না হলে, তবে এইটাকে আমি এগিয়ে রাখব। (পরে ভেবে দেখেছি, বইয়ে যুক্ত প্রায় অনেকেই সরাসরি সাহিত্য গবেষণা বা অ্যাকাডেমিক জগত থেকে এসেছেন, তাই হয়তো গল্পগুলো সামগ্রিক ভাবে একটা অন্য অ্যাম্বিয়েন্স ক্রিয়েট করেছে।)


৩) অক্টানিয়নের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কপ্রসূত ভগ্নহৃদয়কে কীভাবে সারিয়ে তোলা যায়: কুরালি মানিকাভেল এর লেখা পড়ার সৌভাগ্য আমার আগেই হয়েছে। প্রথম যদি কেউ তাকে পড়ে, থ হয়ে বসে থাকবে। ভদ্রমহিলা যা লেখেন, অন্য কেউ লিখতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এই গল্পটা বিশেষ করে স্মরণীয় হয়ে রইল সৌমিলি দাসের চমৎকার অনুবাদের জন্য। এমন ভীষণ গল্পের এমন সাবলীল অনুবাদ- ব্রাভো!


৪) সবুজকুমারী: অর্চিতা মিত্রের এই বহুস্তরীয় গল্প যতটা মায়ময়ী, অহনা মৈত্রের  অনুবাদ তার চেয়ে কম মায়াবী নয়। 


এবং, লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, এক একটা গল্প থাকে, সিনেমায় এক একটা সিন থাকে, লাফিয়ে একদম পার্ফেকশনের ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়। এই সংকলমে এমন একটা গল্প পেয়ে আমি বিশাল খুশি। জাস্ট আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড গল্প। লেখিকার কলম এর ভক্ত আমি আগেও ছিলাম, কিন্তু তিনি এখানে যা করে দিয়ে গেলেন, সেইজন্য আমি তাকে দেখা হলে এক প্লেট বিরিয়ানি/ আইসক্রিম খাওয়ানোর নেমন্তন্ন জানিয়ে রাখলাম। যে জগত তিনি গড়েছেন, তা পার্ফেক্টকি কুইয়ার এবং ম্যাজিকালি স্পেকুলেটিভ। খোদ মার্কেজ বা বোর্খেস পড়লে তার মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের জল ফেলতেন। শুধু এই গল্পটার জন্যই বইটা কিনে পড়ে ফেলুন। গল্পের নাম, 'লেডিজ হোস্টেলের চাঁদ'! 


অলোকপর্ণা, ইউ রক! 


অন্য বসন্তের উপাখ্যান 

জয়ঢাক প্রকাশন

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০২৪

মলয়ালম বই বুদ্ধন চিরিক্কুন্নিল্লা।(অস্মিত বুদ্ধ)

 


এই মলয়ালম বইটা বাংলায় আনার জন্য আমি কাঠবেড়ালির মতো খানিকটা মাটি বয়ে দিয়েছি। সরাসরি মলয়ালম থেকে বাংলা নয়, বইটা আগে হিন্দিতে অনুবাদ হয়েছিল, যদিও সে অনুবাদটা খুব একটা কাজের নয়। মলয়ালম বা অন্য ভারতীয় ভাষা জানা অনুবাদক বাংলায় খুবই কম, থাকলেও আমার সঙ্গে চেনা নেই। বাংলায় এমন কিছু কিছু বই সরাসরি অনুবাদ হলেও সিংহভাগ প্রকাশক কপিরাইট নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ, সাহিত্যসেবার নিরিখে বেআইনি অনুবাদ করে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ালেই চলে। এমনিতেও বাংলা বাজারের পেশাদারিত্ব নিয়ে...

যাকগে, এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা থাক, মোদ্দা কথা হল জোষে পাষুক্কারণের এই 'আউট অফ দ্য বক্স' লেখাটা রাজীবদা অসম্ভব যত্ন আর মমতায় অনুবাদ করেছেন। প্রকাশকও আশা করি যত্নসহকারে প্রোডাকশন করছেন। কিন্তু কাজটায় যাঁর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, তাঁর নাম এস এ কুদসি। মলয়ালম ভাষার অনুবাদক। ম্যান্ডারিন সাইফি ইংরেজিতে নিয়ে আসতে কেন লিউয়ের যা ভূমিকা, আরব আর গাল্ফ এর সাহিত্য মলয়ালমে আনতে তাঁর ভূমিকা প্রায় একই। এছাড়াও ফার্সি আর ইন্দোনেশিয়ান ইত্যাদি বই নিয়ে কাজ করেছেন, অন্যান্য অনুবাদক ও প্রকাশকদেরও নানাভাবে সাহায্য করেছেন। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রকের তরফ থেকে পুরস্কার পেয়েছেন কুদসি স্যার, এমনকি তাঁর খোঁজও আমি পেয়েছি ভিনদেশি এক প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে। এমন সদাহাস্য, মৃদুভাষী, নিঃস্বার্থ মানুষ বড় একটা দেখা যায় না আজকাল। মলয়ালম সাহিত্য নিয়ে যে আমি জেনুইনলি ইন্টারেস্টেড, এটুকু জানতে পেরে নিজেই এই বইটা সাজেস্ট করেছিলেন।

না আমি মলয়ালম ভাষা জানি, না আমি প্রকাশক, জোর দিয়ে বলতেও পারি না যে কেউ বই করতে আগ্রহী হবেন। না হলে কেরালায় আধুনিক সাহিত্য (শুধু সাহিত্য কেন, আর্টের সব ফর্মেই তাঁরা শতযোজন এগিয়ে) যে সমস্ত অসামান্য কাজকর্ম হচ্ছে, সেসব আরো বেশি করে বাংলায় নিয়ে আসার জন্য কুদসি স্যার বা জোষ পাষুক্কারণের মতো আরো অনেকের সঙ্গেই কথা বলা যেত। কে আর মীরা, বেনয়ামিন, অখিক কে, ও ভি বিজয়ন, কে এল মোহনবর্মা, এস হরিশ বা জে আর ইন্দুগোপানের মতো মেনস্ট্রিম লেখকদের লেখাতেও প্রচুর বৈচিত্র্য আছে। 'হ্যাংওম্যান' কলকাতা বেসড ঐতিহাসিক উপন্যাস। বেনিয়ামিনের 'গোট ডেজ' সত্যি ঘটনা নিয়ে লেখা যেখানে একজন আরব দেশে গিয়ে ছাগলদের সঙ্গে থাকত, সেই নিয়ে একটা বড় বাজেটের সিনেমা আসন্ন। কে আর মীরার 'কাবার' বাবরি মসজিদ আর রাম মন্দির নির্মাণের সমসাময়িক রাজনীতি চমৎকার ভাবে সাহিত্যে ধরেছে। 'ভাল্লি' অসামান্য ইকো ফিকশন। এদিকে আব্রাহাম ভার্গিসের ইংরেজিতে লেখা 'দ্য কোভেনান্ট অফ ওয়াটার' তো দুনিয়া কাঁপাচ্ছে। ম্যাজিক রিয়ালিজম আর পোস্ট মডার্ন সাহিত্যের অলিগলির সঙ্গে মলয়ালম সাহিত্যের পরিচয় নতুন নয়।

অনেকেই অনেক বইয়ের ভিড়ে এই বইটা মিস করে যাবেন হয়তো, কিন্তু যাঁরা পড়বেন, তাঁরা এই একটা বইয়েই না থেমে আরো কিছু মলয়ালাম বই পড়ে দেখার চেষ্টা করবেন বলে অনুরোধ রইল। পাঠক, প্রকাশক ও অনুবাদক একসঙ্গে আগ্রহী না হলে অন্য ভাষার ভালো বই আইনি ভাবে বাংলায় আনা একটু চাপের কাজই বটে। প্রকাশক বই নিয়ে যা লিখেছেন তুলে দিলাম...

বুদ্ধন চিরিক্কুন্নিল্লা।(অস্মিত বুদ্ধ) জোসে পাষুক্করণ। ভাষান্তর রাজীব কুমার সাহা ।

বুদ্ধ ফিরে এসেছেন। পুনর্জন্ম নিয়েছেন বিহার প্রদেশের এক গণ্ডগ্রামে, এক দলিতশিশু হয়ে। বিশ শতকের পৃথিবী তাঁকে হাসতে ভুলিয়ে দেয় এক নিমেষে। তিনি হয়ে হাসেন না। হয়ে ওঠেন অস্মিত বুদ্ধ।

আর তারপর, হত্যা, রক্ত, মৃত্যু আর অত্যাচারের কুম্ভীপাকে বাঁধা পড়ে মৃত্যু থেকে মৃত্যুতে হেঁটে চলেন তিনি। নিঃশব্দে আর্তনাদ করে দলিত তরুণ, মানবজন্ম নয় আর, আমায় গোজন্ম দাও...জোসে পাষুক্করণের মালয়ালাম ডার্ক ক্লাসিক 'বুদ্ধন চিরিক্কুন্নিল্লা'র বাংলা ভাষান্তর আসছে নববর্ষে।

অনুবাদ রাজীব কুমার সাহা। প্রচ্ছদ, প্রকাশকের দীর্ঘকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, খ্যাতনামা মারাঠী শিল্পী গীতালী তারে। জয়ঢাক প্রকাশন।

সোমবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৪

এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা


"আমার এখন কোনও প্রত্যাশা নেই। ফিরে পাবার, ফিরে যাবার। ইচ্ছে হত বলে কত দীর্ঘকাল কেবল উপকরণের প্রাসাদজীবনে কেটে গেল। জীবনের কী দীর্ঘ অপচয়।"

প্রজ্ঞাদীপা হালদারের নতুন বই ৯ঋকাল বুকস প্রকাশিত 'এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা'। সংসার গহনে, নির্ভয় নির্ভর আর নির্জন সজনে নামাংকিত তিনটে ভাগে তাঁর লেখা স্মৃতিকথন, চিন্তাভাবনা, স্বপ্ন-জীবন ও সমাজদর্শনের বয়ান, যাপনকথা! পড়তে ভালো লাগে। কিছু আগে ফেসবুকে পড়েছি, অনেকগুলোই পড়িনি। মাঝেমাঝে একটু গলা চিনচিন করে, মাঝে মাঝে দখিনা হাওয়া গায়ে লাগে, রাগও হয় কম নয়। লেখার তাপ কোথাও কোথাও বড় বেশি, তখন বই বন্ধ করে লেখিকার কথা আওড়াই, "আজকাল আমি কিচ্ছু ভাবি না।' ঘর ছেড়ে বারান্দায় আসি, মনে মনে বলি, 'একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে'। 

৯ঋকালের সম্পাদনা ও প্রোডাকশন বরাবরের মতো যত্নশীল, উপমা চক্রবর্তীর পেন্সিলের আঁচড়ে আঁকা ছবিগুলো সহজ, সাবলীল, সুন্দর ও লেখার সঙ্গে মানানসই। 

এইটুকু বললেই চলে যায়, কারণ এরপর কিছু বলতে গেলেই যে সমস্ত কথা মাথায় ভিড় করে আসে, তার সঙ্গে বইয়ের যোগাযোগ বিশেষ নেই। সেই অকিঞ্চিকর, অপ্রাসঙ্গিক কথা তুলে আনা বেমানান! তারপর ভেবে দেখি, কে আর পড়ছে? না কেউ এই লেখা পড়বে, বিশেষ কেউ প্রজ্ঞাদীপার বইও পড়বে বলে মনে হয় না। তাহলে আর কীসের নিষেধ, কীসের বাধা?

প্রজ্ঞাদীপার আগের বই 'আত্মহত্যার সম্পূর্ণ বিবরণী' পড়ে যখন বিহ্বল হয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম, তখন সে বইটা জনাদশেক মানুষ পড়েছিলেন কিনা সন্দেহ! প্রজ্ঞা নিজে একদিন মস্করা করে বলেছিলেন, আমার বইটা আমি ছাড়া স্রেফ একজন পড়েছে। তুমি। আমার সঙ্গে বয়সের তফাত বিশেষ নেই, কিন্তু আমি পনেরো বছরের কিশোরীদেরও অনায়াসে দিদি বলতে পারি, এই ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। লেখক লেখিকাদের সঙ্গে আমার দূরত্ব বজায় থাকে সাধারণত, মেসেঞ্জারে কাউকে কিছু বলতে যাই না, আড্ডা হয় না, বই নিলে সই নেওয়ার চেষ্টা করি না, সেল্ফি তোলানোর ইচ্ছেও আমার নেই, বই লেখার জন্য বলি না, ফ্রেন্ডলিস্টে তাঁদের ঢোকানোর ইচ্ছেও থাকে না। কিন্তু লেখা পড়ার ইচ্ছে থেকেই যায়। প্রজ্ঞাদীপাদির ফেসবুক বাদেও খুঁজে খুঁজে ব্লগে তাঁর আগের লেখা পড়েছি, পরের বইয়ের অপেক্ষা ছিল। কিন্তু সে বই আর আসে না। ইতিমধ্যে একদিন দেখি তিনি পিং করে লিখেছেন, "তোমার পোস্টে রেকামেন্ড করা হোয়্যার দ্য ক্রড্যাড সিংস' বইটা পড়ে আমি মুগ্ধ! সিনেমাটাও দেখেছি!" দু এক কথা হতে আমি সাহস করে বললাম, "কিছু লিখছেন না?" তাতে তাঁর জবাব, "শুয়াপঙখী উড়ে গেছে।" নিজের বানানো নিয়ম ভেঙে আর্জি দিলাম, "লিখুন মাঝে মাঝে! সময় নিয়ে!" এরপর মাঝেমাঝে কথা হয়েছে। পরিমলদার লেখা নিয়ে। সত্যি রূপকথা নিয়ে। প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে। কোভিড নিয়ে। ঘনিষ্ঠতা হয়নি, কিন্তু তবু জোরাজুরি করে আমাদের একবার বাড়িতে ডেকে খাতির করেছেন, বই উপহার দিয়েছেন। কেন জানি না। একটু আস্কারা পেয়ে বলেছিলাম, "পরের বই আসতে কত দশক লাগবে?" উত্তরে হাসি পেয়েছিলাম। বই মেলায় এল বছরখানেক পর...প্রজ্ঞা এলেন না। 

"গ্বালিবের মতো ভাঙচুরের আওয়াজে কান পেতে থাকি। ম্যাঁয় হুঁ অপনে শিকস্ত কী আওয়াজ। আমি তো নিজেই নিজে ভেঙে যাওয়ার শব্দ, শহর আর কত ভাঙবে। কতই বা আর।"

আমার ইমোশনের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। প্রজ্ঞার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা বা স্পেকুলেশনের অধিকার, এক্তিয়ার বা ইচ্ছা আমার নেই। যা আমি বলতে পারি, বলতে চাই, সেটা হল, প্রজ্ঞার মতো কলম খুঁজে পাওয়া যায় না, তৈরি করা যায় না, ইভলভ হয় না সময়ের সঙ্গে, তাঁরা স্পেসটাইমের একটা বিন্দুতে কিছুক্ষণ জ্বলজ্বল করেন। কতক্ষণ সে আলো থাকে, আগে থেকে জানা যায় না! তাঁর সমাজদর্শন, তাঁর এমপ্যাথি, তাঁর স্মৃতিকথার আটপৌরে মোহময়তা আর সরস্বতীসুলভ ভাষার ব্যঞ্জনার প্রতিধ্বনির আড়ালে একটা আগুন থাকে, একটা বিষণ্ণ অসহায়তা, একটা রাগ থাকে, যা সকলের কাছে ধরা দেয় না। বিশ্বসাহিত্যে সেরিব্রাল লিটারেচার বলে একটা কথা আছে, 'ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট' হোক বা হালেই পড়া হারনান ডিয়াজের ' ট্রাস্ট'... এই গল্পগুলো গল্পের গল্পময়তাকে অতিক্রম করে একটা অন্য জগতে চলে যায়, সবসময় সে লেখা অনুধাবন করাও যায় না। কিন্তু সেরিব্রাল সাহিত্যের মধ্যেও সেরা হল সেই লেখা, যা ভাষার গুণে দিব্যি পড়ে নেওয়া যায়, লেখনীর মাধুর্য আর নস্টালজিয়ার ছোঁয়ায় মন ভিজে যায়, ঠোঁটের কোনে হাসি ফোটে, তারপর বই শেষ করার দিন তিনেক পর আচমকা এমন একটা উপলব্ধি হয়, যা বইটাকে অন্য স্তরে নিয়ে যায়। প্রত্যেকের জন্য এই উপলব্ধি আলাদা। প্রজ্ঞাদীপা যেমন লিখেছেন, "বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে 'কিচ্ছু বদলাবে না' মানুষকে বদলে দেয়।" বয়স বাড়লে এই উপলব্ধিও মনে হয় বদলে বদলে যায়। প্রজ্ঞাদীপার লেখা পুরোপুরি সেই জাতের। সেরিব্রাল। কিন্তু অ্যাক্সেসিবাল। নির্লিপ্ত, কিন্তু আবেগী। বিপ্লবী, কিন্তু আদুরে বেড়ালের গায়ের মতো কোমল। 

"জলখাবারের মর্ম আমার চাইতে বেশি কেউ জানে না। জলখাবার শব্দটার মায়া-মোহময়তা পঞ্চেন্দ্রিয় জড়িয়ে রাখে। আহা, জলখাবার কী অপূর্ব জিনিস, না জানি সে খেতে কেমন। আমার তখন উপেনবাবুর গল্পের বামুনের কাঁচা ফলার, পাকা ফলার দশা!"

প্রজ্ঞার লেখা যাঁরা পড়েননি, তাঁদেরকে অনুরোধ, তাঁর লেখার উৎকর্ষ বুঝতে হলে "আত্মহত্যার সম্পূর্ণ বিবরণী' পড়ে দেখতে। আর যাঁরা তাঁর অসম্ভব শক্তিশালী কলমের পরিচয় পেয়েছেন, "এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা" তাঁদের জন্য। আমি জানি, প্রজ্ঞা লেখা নিয়ে কী করতে পারেন, এই বইটা তাঁর লেখাকে জানার জন্য নয়, তাঁকে জানার জন্য! কিছুটা বারাসাত, কিছুটা চিকিৎসক জীবন, অনেকটা ফেলে আসা সময়কে আঁকড়ে ধরা কাহিনি! সেই সব হতভাগ্যদের দেখে লেখা কিছু ঘটনা, যাদের কেউ দেখেও দেখে না। প্রজ্ঞা দেখেন, লেখেন, তারপর এই দেখাকে নাকচ করে এগিয়ে যান।

"গরিব মানুষের গায়ের একটা গন্ধ আছে, গরিব মানুষের, দলিত মানুষের, প্রান্তিক মানুষের, অসুস্থ মানুষের। মাস্ক না থাকলে সেই গন্ধটাই আমাকে এতদিন পাগল করে দিত সন্দেহ নেই। কিন্তু গন্ধটা আমি আর পাই না। কোভিডের পার্মানেন্ট ড্যামেজ, কেউই আর গন্ধ পায় না। দেখেও না সম্ভবত। আমিও দেখি না।"

আরেকটা কথা মনে পড়ছে, লিখেই রাখি! বইটা উৎসর্গ করা হয়েছে তাঁদের, যাঁরা মেকানাইজেশন মেনে নেয়নি। যে যুগের সাক্ষী হয়ে আছি, তাতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার! কাজকর্ম দূরের কথা, ব্যক্তিগত জীবনেও মেকানাইজেশনের বিস্তার আমাদের অচল করে রেখেছে! প্রেম অপ্রেম, সমর্পণ বিরোধিতা মিলন বিচ্ছেদ রাগ দুঃখ, আনন্দ শোক এবং সেই শোকের বহির্প্রকাশ, এখন তো সবই মেকানাইজড! মাপা! নিয়ম মেনে! (প্রজ্ঞাদীপা সে কথা জানতেন না, আমি বিশ্বাস করি না!) তাই আমার ধারণা, এই বইয়েরও বিশেষ পাঠক পাওয়া যাবে না। মেকানাইজেশন যাঁদের অচল করে দিয়েছে, সেরকম কয়েকজন পাঠক বইটা কিনবেন, পড়বেন, পোস্ট দেবেন হয়তো, বিশেষ করে তাঁরাই, যাঁরা লেখিকার নাম বা কলমের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু এরও মধ্যে যদি কেউ প্রকাশনার স্টলে গিয়ে প্রজ্ঞাদীপা সম্পর্কে কিছুই না জেনে এই বইটা নেড়েচেড়ে দেখেন, কেনেন ও পড়েন, বুঝব বইটা তাঁকে উদ্দেশ্য করেই লেখা হয়েছে।

প্রজ্ঞাদীপাদি! মনের সুখে বাজারঘাট করো, বেড়াল পোষো, ভালো থেকো! একদিন দেখা হবে!

শনিবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৩

আফ্রিকান স্পেকুলেটিভ ফিকশন

 


আফ্রিকান স্পেকুলেটিভ সাহিত্য নিয়ে জয়ঢাক প্রকাশন একটা উচ্চাকাঙ্খী কাজ করেছে ২০২৩ সালে। 'বাংলায় এই প্রথম' বা 'আসতে চলেছে বিশাল চমক' টাইপ স্লোগান দেওয়ার কোনও মানে হয় না, কিন্তু আমার ধারণা স্কেলের দিক থেকে এই কাজটা সত্যিই একটা মাইলস্টোন। চার বছরেরও আগে শুরু হওয়া এই প্রজেক্টে (যখন প্রজেক্ট বলে কিছু ছিলই না) প্রায় ছশোটা মেলই করেছি আমি। কমপক্ষে তেরোটা দেশের  চল্লিশজন লেখক অনুবাদক ও সম্পাদক যুক্ত ছিলেন এই কাজে। তার চেয়েও বড় কথা, এটা শুধুই একটা বিচ্ছিন্ন অনুবাদ সংকলন নয়, বরং একটা কন্টিনিউড কালচার এক্সচেঞ্জ প্রজেক্টের প্রথম পদক্ষেপ। 

খাতায় কলমে এই সংকলনের প্রথম খণ্ডের সম্পাদনার দায়িত্ব ছিল আমার। দ্বিতীয় খণ্ডের সম্পাদক জনপ্রিয় স্পেকুলেটিভ ফিকশন লেখক শ্রী দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য। তবে আমরা একা ছিলাম না, কারণ এই প্রোজেক্টটাও ছিল আর চারটে অনুবাদ সংকলনের চেয়ে আলাদা।সঙ্গে ছিলেন পুরস্কারপ্রাপ্ত আফ্রিকান লেখক ওলে তালাবি, এই প্রজেক্টের প্রধান সম্পাদক। বিদেশি গল্প নিয়ে অনুবাদ আগেও হয়েছে, পরেও হবে। তবে এই সংকলনে ঠিক কী কী আলাদা হল সেটা ডকুমেন্টেশনের জন্য খুব সংক্ষেপে জানিয়ে রাখলাম। 

১) বিশ্বসাহিত্যে আফ্রিকান স্পেকুলেটিভ আজকাল যে উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে, তাতে এই জনরার লেখকদের মোটেও অগ্রাহ্য করা চলে না। তাঁদের অনেকেই বিপুল জনপ্রিয়, আফ্রিকা বাদেও ইউরোপ, আমেরিকা, চিন ও জাপানে তাঁদের লেখা নিয়মিত অনুবাদ হয়, পাঠকও কম নেই। কয়েক বছর ধরে আমি এই ধারার লেখা পড়েছি, এখনও পড়ছি, আর আফ্রিকার লেখকদের কলমের গুণে মুগ্ধ হচ্ছি বারবার। তাই ভেবেছিলাম, যদি বাংলায় এই গল্পগুলো অনুবাদ করা যায়! তবে অনুবাদ করা মানে অবশ্য আমি অনুমতি নিয়ে অনুবাদ করাই বুঝি, হুট করে নেট থেকে বা বই থেকে গল্প তুলে অনুবাদ করাটা আমার মূল্যবোধে আটকায়। তাই লেখকদের ব্যাপারটা বোঝানো এবং রাইটস হস্তান্তরণ করাটা প্রধান সমস্যা ছিল। আমি উটকো একজন পাঠক, প্রকাশক তো নইই। সে সময় জানতামও না ভবিষ্যতে জয়ঢাক এই বই করতে আগ্রহী হবে, বা আমাকে সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হবে। শুধু চেয়েছিলাম, লেখাগুলো বাংলা পাঠকদের কাছে পৌঁছাক। গত চার আড়াই বছরে প্রায় আট দশজন লেখকের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে, কিন্তু সত্যি সত্যি যখন কাজটা বাস্তবায়িত হওয়ার জায়গায় আসে, তখন গিয়ে অবশেষে দেবজ্যোতিদাকে ব্যাপারটা জানিয়েছিলাম। 

'জয়ঢাক প্রকাশন কি কন্টেম্পোরারি আফ্রিকান স্পেকুলেটিভ রাইটারদের কাজ অনুবাদ করতে ইচ্ছুক?'

গ্রিন সিগন্যাল এসেছিল মুহুর্তের মধ্যে, কিন্তু তারপরেও প্রচুর বাধাবিপত্তি এসেছে। বেশ কয়েক মাস কেটে যাওয়ার পর অবশেষে ব্যাপারটার ফাইনাল ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হয়। ভেবেছিলাম, এইবার মানেমানে কেটে পড়ব, কিন্তু সে আর হল না। দেবজ্যোতিদা আমাকেই সম্পাদনার দায়িত্ব দিলেন। কাজটা ইন্টারন্যাশনাল কোলাবরেশন হিসেবে নেওয়াটাই প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, তাই ওলে অবশ্যই সঙ্গে ছিলেন। একটা এ ধরনের কাজে কালচার এক্সচেঞ্জ না হলে, বিদেশি সাহিত্য আর বাংলা অনুবাদ নিয়ে সত্যিকারের আগ্রহ না থাকলে শুধু রাইটস বিনিময় করে কী লাভ? 

২) এই বইটা কেবলমাত্র একটা ট্রান্সলেশন অ্যান্থলজি নয়, প্রোজেক্টটার মাধ্যমে আমি বাংলা সাহিত্য ও বইবাজার সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি বিদেশি সাহিত্যিক ও সম্পাদকদের। অনেক লেখককে নেওয়া সম্ভব হয়নি প্রথম কাজে, কিন্তু গত দু' বছরে গোটা আফ্রিকার প্রায় কুড়ি তিরিশজন লেখক সম্পাদককে আমি সমসাময়িক বাংলা ও ভারতীয় স্পেকুলেটিভ সাহিত্য সম্পর্কে ক্র‍্যাশ কোর্স দিয়েছি বলা যায় (তাই বলে এ নিয়ে আমি খুব বেশি কিছু জানি বলে দাবী করছি না, উল্টে কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য নিয়ে আমার পড়াশোনা খুবই কম) অনীশ দেব থেকে মিমি মন্ডল বা দীপেনবাবু, রণেন ঘোষ থেকে সোহম গুহ, অদ্রীশ বর্ধন থেকে সুমিত বর্ধন, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য থেকে সৌম্যসুন্দর মুখোপাধ্যায়, সত্যজিৎ থেকে অনিন্দ্য সেনগুপ্ত, সৌভিক চক্রবর্তী থেকে সৌরভ ঘোষ, ইন্দ্রপ্রমিত দাস থেকে গৌতম ভাটিয়া, ফ্যান্টাস্টিক থেকে কল্পবিশ্ব। স্বাভাবিকভাবেই সম্পাদক বা পত্রিকাগুলোর নাম বলব না, কিন্তু এইটুকু বলতে পারি, আমি নিজে উদ্যোগ নিয়ে  এদের অনেকের লেখার লিংক শেয়ার করেছি এদের সঙ্গে, প্রয়োজনে মাল্টিলিংগুয়াল অ্যান্থোলজির জন্য বিদেশি লেখকদের গল্প বাংলায় অনুবাদও করে দিয়েছি। (অনেক সম্পাদক জিজ্ঞেস করতেন, তুমি নিজে বেশি বেশি করে কল্পবিজ্ঞান লেখো না কেন? তখন নিজেই বুঝতাম না কী বলব😁) 

কাজটা জরুরি গ্রাউন্ডওয়ার্ক হিসেবেই ধরেছিলাম, কারণ একটা বই করে বসে থাকলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। আর বদলাতে হলে এই কাজগুলো করা প্রয়োজন। কান্নাকাটি করে কিছুই হবে না। বলতে পারি, প্রথম পদক্ষেপে খুব একটা হতাশ হইনি। যারা অনুমতি দিয়েছেন, প্রায় প্রত্যেকেই প্রজেক্ট চলাকালীন কন্ট্যাক্টে ছিলেন, আপডেট নিচ্ছিলেন অনেকেই। এই অ্যাক্টিভ এঙ্গেজমেন্ট অন্য প্রজেক্টে হয় কিনা আমার জানা নেই। নো ওয়ান ইন উইন্টার স্লিপ! আর কী চাই? আশা করি, আমি সক্রিয়ভাবে যুক্ত না থাকলেও জয়ঢাক পরবর্তীতে এ ধরনের কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে।

৩) সম্পাদনার দায়িত্ব পাওয়ার পরেই ঠিক করেছিলাম, আমি নিজে কোনও গল্পের অনুবাদ করব না। (দ্বিতীয়  খণ্ডে অবশ্য অনুবাদে হাত দিতে হয়েছিল, সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব ছিল না) কল্পবিজ্ঞানে মৌলিক লেখা বা অনুবাদ করার অভিজ্ঞতা যে খুব একটা নেই, সেটা স্বীকার করাই ভালো। এমন একটা কাজে যোগ্যতাটাই প্রথম এবং শেষ শর্ত হওয়া উচিত। টিম নির্বাচনে যেটুকু আমার ইনপুট ছিল, তাতে কোনও পার্সোনাল ইমোশন বা দাদাইবাসা/দিদিয়াবাসা মার্কা বায়াস দেখাতে যাইনি। বিশেষ চেনাজানা ছিল না অনুবাদকদের সঙ্গে, অনেকের সঙ্গে তো আমি এই প্রথম কথা বলেছি। কিন্তু কথা না হলেও তাঁদের কাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম ঠিকই। কে কোন গল্প অনুবাদ করবেন, সেটাও ঠিক করেছি তাঁদের ব্যক্তিগত পছন্দ, দক্ষতা ও আগের কাজ দেখে। এখন বলতেই পারি, অনুবাদকরা অসামান্য কাজ করেছেন। হ্যাঁ, পাঠকদের ভালো মন্দ লাগা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে, সে অন্য বিষয়। 

৪) লেখকরা সবাই যাতে অনুবাদক ও তাঁদের প্রোফাইল সম্পর্কে অবগত থাকেন, সে কাজটা আমি প্রথমেই করে দিয়েছিলাম। সময়ে সময়ে আপডেটও দিয়েছি সবাইকে। অনুবাদকরাও ইচ্ছে করলে লেখককে যোগাযোগ করতে পারবেন, সেও নির্দিষ্ট করা হয়েছিল হয়েছিল। পাশাপাশি আফ্রিকার অন্যতম সম্পাদককে প্রকাশনার সমস্ত ওয়ার্ক সিডিউল জানানো হয়েছে, এবং সম্মতিও নেওয়া হয়েছে প্রতিটা পদক্ষেপে। হ্যাঁ, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, কাজ শুরু হওয়ার আগেই প্রত্যেক লেখকের সঙ্গে আইনি চুক্তি করা হয়েছে, প্রয়োজনে দীর্ঘ নেগোসিয়েশনও হয়েছে বইকি। কিন্তু যে জিনিসটা নিজের তরফ থেকে গোড়া থেকেই এড়িয়ে যেতে চেয়েছি সেটা হল অপেশাদার অ্যাটিটিউড। বড় ইন্ডাস্ট্রি না হতে পারে, বড় প্রকাশক না হতে পারে, কিন্তু বাংলা ভাষার কাজগুলো নিয়ে আমাদের ভিশনটুকু অন্তত যেন বড় হয়! এইটুকু যেন ভুলে না যাই আমরা কেউই। 

এই সংকলন দুটির এক একটা গল্প এক একটা বোমা বটেক। শুধু নেবুলা, হিউগো, নোম্মো, কেইন মনোনীত/বিজয়ী গল্প বলে নয়, বরং গল্পের চরিত্রের কথা ভেবেই এটা বলা। এখানে যত না বিজ্ঞান আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি করে আছে মানুষ। মানুষের ভয়, মানুষের দ্বিধা, মানুষের  রাগ, মানুষের নিরাসক্তি, মানুষের অসহায়তা, মানুষের মনস্তত্ত্ব, মানুষের জেদ... এই বইয়ের প্রতিটা গল্প আফ্রিকার মানুষের কান্না রক্ত ঘাম দিয়ে লেখা। কোথাও সেটা খুব প্রমিনেন্ট, কোথাও অদৃশ্য। কিন্তু এই সততাটা অনুভব করতে পারবেন সকলেই। গল্পগুলো মন দিয়ে পড়লে মাথা ঘোরা তো দূর, গোটা পৃথিবীটাই উল্টোদিকে ঘুরে যেতে পারে।

বিষয়বস্তুর বৈচিত্র‍্যের দিক থেকে দ্বিতীয় খণ্ডটা খানিকটা বেশি নম্বর অবশ্যই পাবে। উগাণ্ডা, নাইজিরিয়া, কেনিয়া, সেনেগল, গাম্বিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বোটসওয়ানা আর মিশরের এই এগারোজন লেখক কতভাবে স্পেকুলেটিভ ফিকশনকে ব্যবহার করেছেন, কল্পনা ও বাস্তবকে কী অসামান্য দক্ষতায় মেনস্ট্রিম সাহিত্যে নিয়ে এসেছেন, বিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসিকে হাতিয়ার করে কী সাবলীলভাবে তৎকালীন সমাজ ও মনুষ্যত্বের গল্প বলে গিয়েছেন, তা পড়লে বার বার চমকে উঠতে হয়, মুগ্ধ হতে হয়। গল্প নির্বাচনের সময় থেকে আজ পর্যন্ত সেই মুগ্ধতা বেড়েছে বই কমেনি।

আর লেখক সূচি! তাঁদের নিয়ে কথা বলতে গেলে তো আলাদা প্রবন্ধ লিখতে হবে! বলতে বাধা নেই, এত বড় বড় সাহিত্যিকদের কাছ থেকে অফিসিয়াল অনুমতি নিয়ে গল্পগুলো অনুবাদ করা বড় সহজ ছিল না। তবে পেশাদারভাবে কাজটার নিষ্পত্তি হল বলে আমি খুশি। বাংলায় অনুবাদ করতে গেলে কপিরাইটের পরোয়া অনেকেই করে না, সেটা দুর্ভাগ্যজনকই বটে। ওলে তালাবি আর জয়ঢাক টিম তো যথাসম্ভব সাহায্য করেছেন ঠিকই, মূল লেখক ও তাঁদের লিটারারি এজেন্টদের কাছেও কৃতজ্ঞ রইলাম। মার্ভেলের জেসিকা জোন্সের সিরিজের প্রধান লেখিকা ও ফিনান্সিয়াল ফিউচারের বিশেষজ্ঞ স্যাম বেকবেসিঞ্জার আছেন,    একেপকি আছেন, নিক উড আছেন, আফ্রিকান স্পেকুলেটিভে ঝড় তোলা লেখক মামে ডিয়েনে আছেন। জে এম কোয়েটজির স্নেহধন্য ছাত্রী ও বিশ্বসাহিত্যে তুমুল আলোচিত হেনরিয়েটা রোজ-ইন্স আছেন তাঁর একটি অসামান্য পুরস্কার প্রাপ্ত গল্প নিয়ে, সমসাময়িক সময়ে 'শাইনিং গার্লস' লিখে প্রায় সেলেব হয়ে যাওয়া লরেন বিউকসও আছেন। অ্যাপল টিভি 'শাইনিং গার্লস' নিয়ে সিরিজ করার পর তাঁর খ্যাতি এখন সারা দুনিয়ায়। স্টিফেন কিং থেকে নীল গাইমান, সবাই তাঁর লেখার তারিফ করেছেন একসুরে। 

অনুবাদক সূচিও চমকে দেওয়ার মতো। যশোধরা(রায়চৌধুরী) দি ও সৈকত (মুখোপাধ্যায়) দার পাশাপাশি এই সময়ের সেরা কিছু অনুবাদক এই গল্পগুলো বাংলায় অনুবাদ করেছেন। আই অ্যাম অন ক্লাউড নাইন। ভাগ্যিস বছর চারেক আগে আমার মাথায় পোকা কামড়েছিল কাজটা করার।

যে কথাটা না বললেই নয়, সেটা হল, দয়া করে কেউ শুধু প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে বলেই বা আফ্রিকার গল্প শুনেই বই কেনার সিদ্ধান্ত নেবেন না। শিল্পী সুবিনয় দাস দুই খণ্ডেই দারুণ প্রচ্ছদ করেছেন, পুস্তানির কাজও অসামান্য, কিন্তু সেই ছবিগুলোই কেবল মূল আকর্ষণ না হলেই ভালো। এই দুটো সংকলনে থাকা গল্পগুলো শুধুই আমাদের চেনা প্লটভিত্তিক 'গল্প' নয়, সাহিত্যসৃষ্টির বিভিন্ন হাতিয়ারকে কাজে লাগিয়ে, ভাষা-ফর্ম-ক্রাফট দিয়ে বুনে তোলা এক একটা বক্তব্য। অসম্ভব প্রাসঙ্গিক, ভীষণ ব্যক্তিগত। প্রায় প্রতিটা গল্প আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে, এক একটা গল্প নিয়ে অনলাইন ফোরামে বছরের পর বছর আলোচনা চলেছে, তা এমনি এমনি নয়। কিন্তু এ-ও জানি, বাংলার পাঠকদের কাছে এই ঘরানার গল্প এখনও খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি, সেটা অস্বীকার না করাই ভালো। একটা গল্পকে ভালো বা মন্দ বলার জন্য যে সমস্ত প্যারামিটার আছে, তার অনেকগুলোর সঙ্গে আমাদের এখনও সেভাবে পরিচয় হয়নি। আচমকা নতুন জিনিস পাতে পড়লেই যে সবাই সেটা একইভাবে অ্যাপ্রিসিয়েট করতে পারবে, সেটা জরুরি নয়। ইতালো কালভিনোর উপন্যাস পড়ে প্রথমে অনেকেই দুরছাই করেছে, গিবেরিশ আর ইন্টারেক্টিভ সাহিত্যকে পাঠকের নিন্দেমন্দ শুনতে হয়েছে, এমনকি প্রাপ্তমনস্ক গ্রাফিক নভেল যে সত্যিকারের সাহিত্য হতে পারে, সে কথা এস্ট্যাবলিশ হতে এক শতাব্দী পেরিয়ে গিয়েছে। এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। আমার এক পরিচিত সাহিত্যিক বন্ধু দুনিয়ারাজ্যের বই পড়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন, কিন্তু 'পার্সেপলিস' বা 'প্যালেস্তাইন' এর মতো সাড়াজাগানো গ্রাফিক নভেল পড়েও তাঁর ওই ফর্মটা ঠিক পছন্দ হয় না। মাঝে মাঝে আমার হাতেও এমন এক একটা বই হাতে আসে, প্রচুর নামডাক থাকলেও সেগুলো পড়তে হিমশিম খেয়ে যেতে হয়। মাথার চুল ছিঁড়তে হয় এই ভেবে যে, এই লেখাটা নিয়ে এত হইহই কেন?

এই সূত্রে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। শুনেছিলাম গুলজার প্রথম যখন অপেরা শুনতে গিয়েছিলেন, সেদিন তাঁর বিরক্তই লেগেছিল, কিছুই বুঝতে পারেননি। কিন্তু আর সকলের মতো তিনি অপেরারা ব্যাপারটা নাকচ করে দেননি আগেভাগে। এত এত শ্রোতা কেন সঙ্গীতের এই ফর্মটাকে পছন্দ করেন, সেটা জানার সদিচ্ছা তাঁর ছিল। তাই বিদেশে থাকাকালীন নিয়মিত অপেরা শুনেছেন, সে নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, যতদিন না এই অজানা শিল্পমাধ্যম তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে। একসময় গুলজার অপেরাকে ভালোবেসেছেন। কেউ তাঁকে জোর করেনি এত সব করতে, নতুন জিনিসকে বোঝার আর নিজের চিন্তাভাবনার প্রসারতাকে বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তাঁকে নিজেই নিতে হয়েছিল। এইজন্যই তিনি গুলজার।

আমরা কেউই সবজান্তা নই। সবাই এখনও শিখছি। তবে নতুন জিনিস শেখার ও অ্যাপ্রিসিয়েট করার ইচ্ছেটুকু, ওই আগ্রহটুকু অন্তত বজায় থাকুক, সেটাই প্রার্থনা। স্পুনফীড করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। দেশবিদেশের স্পেকুলেটিভ ফিকশনের অনুরাগীদের এই বই ভালো লাগবে, সে বিশ্বাস আমাদের আছে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত নতুন পাঠকদের  কয়েকজনের মনেও যদি কয়েকজনের মধ্যেও এই লেখাগুলো, এই জনরা সম্পর্কে ইনকুইজিটিভনেসটুকু জাগিয়ে তোলা যায়, কেউ যদি এই এই বইটা পড়ে নেটে গিয়ে অন্যান্য কিছু গল্প পড়েন, আমাজন থেকে হেনরিয়েটা রোজ-ইন্স বা ওলে তালাবির একটা বই আনিয়ে পড়েন, তাহলেই আমাদের সমস্ত পরিশ্রম সার্থক হবে।

লেখক ও অনুবাদক সূচী 

১. আগামী রাত্রির উপাখ্যান 

২. আলো আঁধারের উপাখ্যান 

Chikodili Emelumadu, Ivor W. Hartmann, Oghenechovwe Ekpeki Donald, Nick Wood, Wole Talabi, Nerine Dorman, Kofi Nyameye, Dare Segun Falowo, T.L. Huchu, Blaize Kaye, Eugen Bacon, Suyi Davies Okungbowa, Sam Beckbessinger, Ada Nnadi, Emad El-Din Aysha, Mame Bougouma Diene, Biram Mboob, Tlotlo Tsamaase, Richard Oduor Oduku, Derek Lubangakene, Henrietta Rose-Innes, Lauren Beukes and Chinelo Onwualu.

Soham Guha, Dip Ghosh, Debjyoti Bhattacharya, Rajarshee Gupta, Santanu Bandopadhyay, Saranya Mukhopadhyay, Anushtup Sett, Sumit Bardhan, Partha De, Arindam Debnath, Aditi Sarkar, Mahasweta, Amit Debnath, Partha Chattopadhyay, Tapas Moulik, Arindam Ganguly, Saptarshi Chatterjee, Saikat Mukhopadhyay, Kaushik Bhattacharya, Mousumi Ray, Yashodhara Ray Chaudhuri and Nandini Das Chattopadhyay.

যদি কেউ পড়তে চান, জয়ঢাক প্রকাশন বা আমাজন থেকে সংগ্রহ করতে পারেন।

শুক্রবার, ১৩ আগস্ট, ২০২১

নাহুমের গ্রাম

 একটা বই কী করে লেখা হয়?


একটা পেইন্টিং, একটা কম্পোজিশন, একটা চলচ্চিত্র, একটা ভাস্কর্যের আড়ালে গোটা একটা জীবন থাকতে পারে। একটা জাতির ইতিহাস কোনও জায়গায় গিয়ে মিশে যায় ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে, স্মৃতির সাবকনশিয়াসে সংরক্ষিত শব্দ, গন্ধ, রঙ ও সুর লিখিয়ে নেয় এক একটা বই, রচিত করে সুরমালা, বাধ্য করে শিল্পীকে শিল্পের সামনে আত্মসমর্পণ করতে। শিল্পের আঙ্গিক, উৎপত্তি, বিবর্তনের সমান্তরালে শিল্পীর চেতনা ও অবচেতন নিয়ে আলোচনা ও লেখালিখি কম হয়নি, কিন্তু নন ফিকশনে গূঢ় মনস্ত্বাত্তিক তদন্ত করতে গিয়ে পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিতে খুব বেশি বই পারে না। নাহুমের গ্রামে লেখকের ভাষার মায়া ও চিন্তার গভীরতা চুপ করিয়ে রাখে পাঠককে, ভাবতে বাধ্য করে। এই বইয়ের সম্পর্কে আর বিশেষ কিছু বলা যায় না, কারণ পাঠের এই অনুভব প্রত্যেকের ক্ষেত্রে নিজস্ব। শিল্পের সার্থকতা ও আবহমান প্রাসঙ্গিকতার এই দীর্ঘ অণুবীক্ষণে বার্গমান, তারকোভস্কি যেমন আছেন সেরকম সমরেশ বসু ও মার্কেসও আছেন। সমসাময়িক শিল্পের কথা যেমন আছে, হারিয়ে যাওয়া শহর ও ইতিহাসের মহামারীর অন্তরালে বদলে যাওয়া মনোজগতের কথাও আছ। আর কিছু না বলে বরং বইয়ের খানিকটা অংশ পাঠকদের জন্য তুলে দিলাম। যদি পড়ে ভালো লাগে, অনুরোধ করব বইটা পড়তে। একাধিক বার পড়তে। আমার ধারণা, আমাদের মধ্যে অনেককেই এই বইটা ফিরে ফিরে পড়তে হবে সারাজীবন।

#পুস্তকাংশ

ক্‌ফারনাউম : গ্রিক শব্দ, হিব্রু ভাষায় উৎপত্তি। আদতে দুটি শব্দ, কেফার ও নাহুম, অর্থাৎ নাহুমের গ্রাম।গ্যালিলি সাগরের উত্তর উপকূলে এক সুপ্রাচীন মাছ-ধরাদের গ্রাম। কোনো এককালে জনসংখ্যা ছিল দেড় হাজারের মতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু হয়ে এগার শতক পর্যন্ত একটানা মানুষের বসবাস ছিল এখানে। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা খনন করে উদ্ধার করেছেন দুটি সুপ্রাচীন সিনাগগের ধ্বংসাবশেষ, একটির ঠিক ওপরে আরেকটি। ক্রুসেডের আগে গ্রামটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়। ৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে একটি বিরাট ভুমিকম্প হয়েছিল। ক্‌ফারনাউম, নাহুমের গ্রাম। শব্দবন্ধটি কীভাবে যে হয়ে উঠল এলোমেলো জড়ো হওয়া অবিন্যস্ত অবান্তর জিনিসের স্তূপ, সেসব ভাষাতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয়।

সিলিকন আর ইন্ডিয়া রাবার দিয়ে ওকে বানানো হয়েছিল চীনের গুয়াংঝাউ শহরে। এরপর হংকং ঘুরে চলে যায় লিসবনের বাজারে। চীনে তৈরি হলেও চেহারাটা কিন্তু মঙ্গোলয়েড ধাঁচের নয়, বরং অনেকটা যেন ভূমধ্যসাগরীয়দের মতো। ঘন কালো চুল, সবুজ আঙুরের মতো চোখ, পুষ্ট স্তন, চওড়া জঘন ও শ্রোণি; পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি পুতুল। খুব জীবনানুগভাবেই বানানো, এমনকি মুখের গড়নেও নিখুঁত ফুটে আছে লাস্য আর বিষাদ। পোল্যান্ডের দুই নাবিক ভাগাভাগি করে কিনেছিল ওকে। ওরা ছিল অভিন্নহৃদয় বন্ধু, বিভিন্ন বন্দরে একই বেশ্যালয়ে যেত। কখনো কখনো এমনকি একই নারীর কাছে। মাসের পর মাস দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় পুতুলটি হাতবদল হয়ে চলত ক্যাবিন থেকে ক্যাবিনে। ওর একটি নামও দেওয়া হয়, হেলেন। ডান পায়ের গোড়ালির নীচে মার্কার পেন দিয়ে লেখা থেকে জানা যায়। এই নামটি কেন দিয়েছিল, সেটা অবশ্য জানা যায়নি। হয়তো ওদের চেনা কোনো নারীর নাম, যে ওদের একজনকে, এমনকি হয়তো দুজনকেই, প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রেমিকার নাম কখনোই নয়। ‘হেলেন’ নামের নীচে পোলিশ ভাষায় লেখা ছিল দুটি শব্দ -- বেদনার কুয়ো।

বছর দুয়েক পরে ওদের মালবাহী জাহাজটি কিনে নেয় ক্যারিবিয়ানের এক শিপিং কোম্পানি। কর্মী বদল হয়, কিন্তু পুতুলটি কোনোভাবে থেকে যায়। হয়তো ফেলে রেখে গিয়েছিল দুই যুবক। ওরা নাবিকবৃত্তি ছেড়ে অন্য পেশায় ফেরে। একজন ওয়ারশ-য় রুটির দোকান দেয়, অপরজন গ্রামে খামারবাড়িতে ফিরে গিয়ে চাষবাস শুরু করে, বিয়ে করে সংসার পাতে। হেলেনের শুরু হয় আরেকরকম জীবন।


জাহাজে নতুন কোম্পানির নাবিকদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল ল্যাটিনো ও মেস্টিজো। এছাড়া রসুইখানার কাজে চট্টগ্রামের তিন বাঙালিও ছিল। ওদেরই মধ্যে একজনের প্রথম চোখে পড়ে হেলেনকে। অবশ্য ওর নাম বদলে দেওয়া হয়েছিল কী না সেটা আর জানা যায়নি। ওর দেহে আর কিছু লেখা হয়নি কখনো। তবে এই সময়ে সে বিভিন্ন হাতে ঘুরতে থাকে। জাহাজটি একবার উত্তর মেরু অঞ্চলে হিমজমাট সমুদ্রে আটকা পড়েছিল আড়াই মাস (নরওয়ে থেকে হাঙরের তেল আর পাম্পের যন্ত্রাংশ বহন করছিল)। অত্যধিক ব্যবহারে হেলেনের দেহে রাবারের অংশগুলি ক্লান্ত আর শিথিল হয়ে পড়তে থাকে এইসময়, মাথায় ও দেহের অন্যত্র কেশও ঝরতে থাকে। যদিও সিলিকন অটুটই ছিল। এবং এক কুয়াশাঢাকা ভোরে অস্বচ্ছ তেলের মতো প্রশান্ত মহাসাগর পার হবার সময় -- জাহাজটি পানামা থেকে লাওস যাচ্ছিল -- তাকে পোর্টহোল দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় এক বাঙালি রন্ধনকর্মী। মাসাধিককাল এলোমেলো ভেসে বেড়ানোর পর হেলেন আন্তর্মহাদেশীয় বাণিজ্যস্রোত পেয়ে যায়, এবং গোলার্ধ পরিক্রমা করে বিষুবরেখা পেরিয়ে চলে আসে বঙ্গোপসাগরে। এক পূর্ণিমার জোয়ারে আন্দামানের একটি অগম্য দ্বীপে এসে ওঠে।

দ্বীপে বাস করত অস্ট্রিক জনজাতির একদল মানুষ। ওরা সভ্যতার কোন ভোরে মূল ভূখন্ড থেকে এসেছিল ভেলায় চেপে। মাছ ধরে, ফলমূল কুড়িয়ে, ছোটোখাটো প্রাণী শিকার করে জীবন নির্বাহ করত। চাষবাস তেমন জানত না। নারকোলপাতা দিয়ে তাদের ঘর বানিয়ে নিত আর পশুর চামড়া ও গাছের বাকল পরত কটিদেশে। এছাড়া উল্কি আঁকার এবং নাক ও কান ছেদন করার প্রথা ছিল। বিশ-পঁচিশ জনের ছোটো ছোটো দলে ওরা থাকত প্রায় আশি বর্গমাইল সিমের বিচির আকারের দ্বীপটায়। একশো কুড়ি থেকে দেড়শোর মধ্যে ওঠানামা করত ওদের জনসংখ্যা। জন্মহার কম এবং শিশুমৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় এই ভারসাম্যটা বজায় থাকত। সমুদ্রে খাঁড়িতে অঢেল মাছ, অঢেল নারকোল গাছ, বনে ভোজ্য পাতা ও কন্দ অঢেল থাকায়, এবং চাষের প্রয়োজনে জমির ব্যবহার না থাকার কারণে, বিবাদ বিসম্বাদ প্রায় ঘটতই না। সেভাবে কোনো সংগঠিত ধর্মও ছিল না ওদের। কিছু কিছু আদিম ভীতি এবং লোকবিশ্বাস ছিল। যেমন, ওরা মনে করত পিতৃপুরুষেরা মৃত্যুর পর উইপোকা হয়ে যায়। সেজন্য পিঁপড়ের ডিম ও কিছু কিছু পোকার লার্ভা ওদের খাদ্যতালিকায় থাকলেও উইপোকাদের রক্ষণাবেক্ষণ করত। এমনকি মাটি আর নারকোল পাতা দিয়ে বানানো ওদের শঙ্কুর আকারের ঘরগুলোয় ছেয়ে থাকত উইয়ের বাসা। এভাবেই পূর্বপুরুষদের নিবিড় সান্নিধ্যে সহাবস্থান করত ওরা।

এবং এভাবেই রয়ে গিয়েছিল শত শত বছর। ইতিমধ্যে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে, স্বাধীন রাষ্ট্র আন্দামানের আদিবাসী নাগরিকদের জন্য কিছু কিছু জনহিতকর পদক্ষেপ নিয়েছে। তাতে কমবেশি সাড়াও দিয়েছে কয়েকটি জনজাতি। কোনো কোনো গোষ্ঠী এমনকি পোর্ট ব্লেয়ার ও অন্যান্য শহরে মূলস্রোতে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বিলুপ্তও হয়ে গিয়েছে কেউ কেউ। এই দ্বীপের জনগোষ্ঠীকে অবশ্য বশে আনা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা হয়, কিন্তু সাড়া মেলেনি। চিনি, সুতির কাপড়, পলিথিনের শিট ইত্যাদি উপঢৌকন হিসেবে রেখে আসা হয়, কিন্তু সেসব পুড়িয়ে নষ্ট করে দেয় ওরা। এরই মধ্যে একবার এক বেপরোয়া মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ গোপনে একটি নৌকা নিয়ে দ্বীপে চলে আসেন গবেষণার উদ্দেশ্যে। তিনি আর ফিরতে পারেননি। খবরটা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে এবং এব্যাপারে কূটনৈতিক স্তরে চাপ তৈরি হলে ভারতের উপকূল রক্ষীবাহিনির বিশাল একটি দল প্রায় দশদিন পরে দ্বীপে গিয়ে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে। দেহটি বেলাভূমিতে নারকোল গাছের গায়ে বাঁধা ছিল। কড়া রোদে এবং নোনা হাওয়ায় শুকিয়ে গিয়েছিল, এবং সম্ভবত এক বিশেষ ধরণের গুল্মের রস মাখানো থাকার জন্য পশুপাখিতে কোনো ক্ষতি করেনি। প্রায় অবিকৃতই ছিল।

রবার ও সিলিকনে তৈরি চীনা পুতুল, একদা যার নাম ছিল হেলেন, যখন অর্ধেক পৃথিবী ভেসে দ্বীপের খাঁড়িতে গিয়ে ঢুকল, ওরা তাকে তুলে নিয়ে এসেছিল। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে জাহাজডুবির সামগ্রী ও অন্যান্য আবর্জনা ভেসে এসেছে দ্বীপে। ওরা কখনো সেগুলো অনুসন্ধিৎসার বশে কুড়িয়ে নিয়েছে, কখনো নেয়নি। ছেঁড়া জাল, প্লাস্টিকের বোতল ও জেরিক্যান ছাড়া আর প্রায় কোনো কিছুই ওরা কাজে লাগায়নি। কিন্তু এবার এক দুর্জ্ঞেয় কারণে হেলেনকে নিয়ে এসে ওরা তুলল বসতিতে। শুধু তাই নয়, নারকোলপাতা মাটি আর কাঠ দিয়ে ওর জন্য একটি ছোট্ট ঘর বানিয়ে দিলে কৌম উঠোনের এক কোণে। দিনের পর দিন সাগরের নোনা জলে ভেসে ভেসে হেলেনের সব চুল খসে গিয়েছিল, দেহের বিভিন্ন অংশে, বিশেষত স্তন এবং যোনিদেশে, ইন্ডিয়া রাবারের অংশগুলো কোনও বিশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিকট স্ফীত ও বিকৃত হয়ে এসেছিল, এছাড়া জলপাই তেলের মতো চামড়ার রঙ সম্পূর্ণ উঠে বেরিয়ে পড়েছিল সিলিকনের দগদগে সবুজ। ওরা লতাপাতার রস দিয়ে ওদের বিশিষ্ট উল্কি আঁকল, নাক ও কান বিঁধিয়ে দিল, সাজিয়ে দিল মাছের কাঁটার গয়নায়।

এভাবেই শুরু হল। যেভাবে শুরু হয়।

পর পর ঠিক কী কী ঘটেছিল সেসব অবশ্য জানা যায়নি। হয়তো যাবেও না কোনোদিন, কারণ এই জনজাতির কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তবে হেলেনকে কেন্দ্র করে কোনো বিবাদ, হিংসা কিংবা হানাহানির সূত্রপাত ঘটেছিল বলে কোনো প্রমাণ নেই। কিংবা, সাধারণত যেমন ঘটে থাকে, নতুন কোনো ক্ষমতার বিন্যাস গড়ে ওঠেনি। পরিবেশের ওপরেও কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে পুতুলটি উদ্ধার হবার পর ওদের মধ্যে, বিশেষ করে পুরুষ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, এক অদ্ভুত ধরণের বিষণ্ণতার অসুখ দেখা দেয়। সবচেয়ে উদ্যমী আর কর্মঠরাও যেন জীবনীশক্তি হারায়। খাঁড়িতে মাছ ধরা, জঙ্গলে ঢুকে ফল কন্দ সংগ্রহের কাজে উৎসাহ হারায়। বনে এক ধরণের মাদক ছত্রাক খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে সারাদিন। এমনকি নারকোলপাতা জড়ো করে কুঁড়ের চাল ছাইবার উদ্যমও হারায়। একটি গোটা ঋতুতে দ্বীপে কোনো নতুন শিশুর জন্ম হয় না। এবং আরও কিছু কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। মরা মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে এসে উপকূল ছেয়ে যায়, সমুদ্রে ভাসে কালো তেল, নারকোল গাছে অদৃশ্য কীটাণুর প্রকোপে অপুষ্ট ফলগুলো শুকিয়ে ঝরে যেতে থাকে। এই দ্বীপের ত্রিসীমানায় কোনো পণ্যবাহী জাহাজের পথ নেই, কিন্তু রাত্রিবেলা দিকচক্রবালে বিচিত্র আলোর আনাগোনা দেখা যায়। এইসব লক্ষণ গণনা করার পর গোষ্ঠী প্রবীণেরা বলেন, জ্বরে কাঁপছে মেদিনী। এবং কিছুদিনের মধ্যেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রথমে টের পায় উইপোকারা। উপকূলের লাগোয়া ভিটে ছেড়ে তারা সারি দিয়ে উঠে যেতে থাকে উঁচু জমিতে। তারপর একদিন, কার্ত্তিক পূর্ণিমার তিনদিন পর, দুপুরের পর থেকে সমুদ্র সরতে শুরু হয়। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য : মনে হয় যেন মেদিনীর সরা থেকে সব জল এক চুমুকে পান করছে এক দৈত্য। বিস্তীর্ণ তটভূমি উন্মোচিত হয়ে বেরিয়ে পড়ে আগ্নেয় শিলার ভাস্কর্য, চাটান, গুহা, ধাপকাটা সিঁড়ি, পাথর কুঁদে তোলা দৈত্যাকার পাখি ও বিচিত্র সব প্রাণীর রিলিফ।

দ্বীপবাসীরা অবশ্য সেসব খুঁটিয়ে দেখার জন্য বেলাভূমিতে অপেক্ষা করেনি। তারা উইপোকাদের পথ ধরেছিল। এবং যথারীতি সূর্যটা ডুবে যাবার আগেই ধেয়ে এল বিপুল জলরাশি, নারকোল বীথির মাথায় মাথায়, ওদের বসতিগুলি ভাসিয়ে নিল।

শেষবার এমন ঘটনা ঘটেছিল তিন প্রজন্ম আগে। সেবারও তটভূমি উন্মোচিত হয়ে দেখা দিয়েছিল এই আশ্চর্য পাথরের দেশ, বহুবর্ণ প্রবালে ছাওয়া। আগুনের ধারে বসে সেই স্মৃতিকথা শুনে বড়ো হয়েছে এরা। তারও অনেক কাল আগে ওই আগ্নেয় শিলার দেশে, ওইসব গুহা আর চাটানে বাস করত ওদের পূর্বপুরুষ। সেই কাহিনি এতবার বলা ও শোনার ভেতর দিয়ে কল্পনায় এমন সুস্পষ্ট খোদাই হয়েছিল যে মেদিনীর জ্বর সেরে যাবার পর সমুদ্র যখন ফিরে গেল নীচু এলাকা থেকে, জলের নীচে ঠিক কোথায় ওই শিলাপ্রবালের দেশ রয়েছে সেটা নিখুঁত নিরূপণ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ওই ডুবে-যাওয়া অঞ্চলটা উপকূল থেকে বাইশ দমের পথ, আট দম গভীর।

এমনিতে নারীপুরুষ নির্বিশেষে দ্বীপের সকলেই হাঁটতে শুরু করার পরেপরেই সমুদ্রে সাঁতার দিতে শিখে যেত। তিন, চার এমনকি পাঁচ দম গভীরে সাঁতার দিতে পারার ক্ষমতা অনেকেরই ছিল। সাত, আট কিংবা তার বেশি দম নীচে যেতে পারত যারা, তাদের মধ্যে থেকেই কুলপতি নির্বাচন হতো। স্বাভাবিকভাবেই কুলপতির ওপরে ভার পড়ল হেলেনকে জলের নীচে শিলাপ্রবালের দেশে রেখে আসার। তার আগে ওর নাক ও কান থেকে খুলে নেওয়া হলো মাকড়ি, গা থেকে খোলা হলো মাছের কাঁটার অলংকার। এরপর সবজে সিলিকনের গা থেকে ঘসে ঘসে সব উল্কি তুলে ফেলল ওরা। দেহের প্রতিটি ছিদ্রপথে ভরে দিল ডুমুরের বীজ। তারপর সারাদেহ ছাই আর পাতায় মুড়ে ভেলায় চাপিয়ে নিয়ে গেল বাইশ দম, ঠিক যেখানে ঢেউয়ের মাঝে একটি সুস্থির ঘোল চিহ্নিত করেছে শিলাপ্রবালের দেশ। এরপর কুলপতি পাতায় মোড়া পুতুলটিকে পিঠে বেঁধে নিয়ে ডুব দিল।

আর উঠে আসেনি।

জলের নীচে প্রবালগুহায় ছিল অসংখ্য গোলকধাঁধার ফাঁদ, স্বতঃপ্রভ মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের দেশ। সেখানেই ভোররাতের স্বপ্ন, শিশুর দেয়ালা আর না-পাওয়া পুরুষ কিংবা নারীর জন্য গলার কাছে চিনচিনে ব্যথাগুলো সব থরে থরে জমা হয়ে থাকে। বর্ষার রাতে নারকোল ছাউনির ভেতর আগুনের ধারে বসে সেই গোলকধাঁধার গল্প বোনে গোষ্ঠীপ্রবীণারা। হয়তো সেই কাহিনির বুননের ভেতর কোনো একটি বাঁকে রয়ে গিয়েছিল কুলপতি। আর ফিরে আসেনি।

নাহুমের গ্রাম ও অন্যান্য মিউজিয়াম
অবভাস