আর্ট ওয়ার্ল্ড লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আর্ট ওয়ার্ল্ড লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২১ জুলাই, ২০২৪

গনেশ হালুই: দ্য ইনারস্কেপ আর্টিস্ট

 


অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট বা মেটাফিজিকাল আর্ট বা 'ইনারস্কেপ'... যা কিনা শিল্পী গনেশ হালুইয়ের সিগনেচার স্টাইল হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই নিয়ে যে সাধারণ মানুষ বা শিল্পপ্রেমিকরাও খুব একটা সময় খরচ করেন না বা আগ্রহ দেখান না, তার যথাযথ কারণ আছে। এমনিতেই মডার্ন আর্ট একটা অববাস্তব আইডিয়া, ভিস্যুয়াল ইন্টারপ্রিটেশনের ঊর্ধ্বে গিয়ে শিল্পীর মাথার ভিতর কী চলছে আর সেই মনের ছবি জ্যামিতি আর কালার কন্ট্যুরের সাহায্য নিয়ে তিনি কীভাবে আর কেন কাগজে ইন্টারপ্রেট করছেন, সেটা বোঝা কঠিন। অবশ্য কখনও কখনও এমনও হয় যে রঙের আধিক্য বা কন্ট্রাস্ট থুড়ি উজ্জ্বলতা একটা ছবিকে সাধারণ মানুষের চোখে বিশেষ ভাবে আকর্ষণীয় করে তোলে। কিন্তু তাতে ছবির দর্শন ধরা পড়ে না। শিল্পী কী ভাবছিলেন ধরা পড়ে না।


যাকগে, আমি আর্টের ছাত্র নই, কিছু জানিও না। কিন্তু আজ একটা বিশেষ ছবি নিয়ে (সেই ছবি উচিত না অনুচিত, ভালো না মন্দ, প্রচ্ছদ হিসেবে যথাযথ না নিগেটিভ মার্কেটিং জেনারেট করার উদ্দেশ্য নিয়ে করা, সে নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই, থাকা উচিতও নয়) অনেকের আগ্রহ চোখে পড়ল আর এই সূত্রে বেশ কয়েক বছর আগে পড়া 'দ্য ফিলিং আই' বলে একটা বইয়ের কিছু কথা মনে পড়ে গেল। আসল কথা হল, যদি কেউ সত্যিই কোনও ইনারস্কেপ ছবির বিচার করতে চায়, সেটা নিজের মতো করে বুঝতে চায়, তাহলে তাঁর একমাত্র উপায় শিল্পীকে বোঝা, তাঁর জীবন ও দর্শনের ওঠানামা, তাঁর তুলিকলম গড়ে ওঠার যাত্রাকে বোঝা। পাশাপাশি আর্ট সম্পর্কে যদি খানিকটা আইডিয়া থাকে, তাহলে লাভ বই ক্ষতি হবে না। এখন এই আইডিয়া বলতে আমি ক্রাফটের কথা বলতে চাইছি না, সেটা সম্ভবও নয়। যেমন, গনেশবাবুর ওয়াটারকালার স্টাইলেই এতগুলো লেয়ার আছে, তিনি এতভাবে একটা বিচ্ছিন্ন বস্তুকে রঙের মাধ্যমে ধরেন যে সেই পদ্ধতি বুঝতে গেলে আমাদের কান থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে যাবে। ওয়েট ইন ওয়েট, ওয়েট অন ড্রাই, ব্রড ফ্ল্যাট অ্যান্ড গ্রেডেড ওয়াশ, ড্রাই ব্রাশ, লিফটিং অফ পিগমেন্টস... এই প্রতিটা পদ্ধতির মাধ্যমে যে একটা ছোট্ট অবয়ব গড়ে ওঠে, তা মনস্ক দর্শকের মনের একটা বিশেষ তারকে স্পর্শ করে। কিন্তু আমি এখানে শুধুই মডার্ন আর্টের বেসিক কিছু পয়েন্টের কথা বলতে চাইছি, যেমন বিমূর্ত ফর্ম আর জ্যামিতির মাধ্যমে একটা সিম্বলিক ছবি তুলে ধরতে চাওয়া। কীরকম? এই ধরুন, দেশভাগ নিয়ে একটা ছবি, সেখানে কিছুই নেই, শুধু কতগুলো লাইন। এই সরল রেখাগুলো কোথাও কোথাও ওভাল শেপকে কেটে বেরিয়ে গিয়েছে। এমনটা হতেই পারে (নাও হতে পারে, জোর দিয়ে কিছুই বলা যায় না) যে এই রেখাগুলো আসলে দু দেশের মাঝে জোর করে টেনে দেওয়া সীমানাকে রেখাঙ্কিত করছে, এই সরলরেখাগুলো যেভাবে ওভালদের কেটে যাচ্ছে, তার মানে শিল্পী বলতে চাইছেন কীভাবে দেশভাগের এই সীমানা সাধারণ মানুষের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। একটা বৃষ্টির ছবি দেখে আমি একবার হাঁ হতে গেছিলাম। বৃষ্টির ছবিতে বৃষ্টি নেই, জল নেই, ভিজে মাটি নেই, সবুজ পাতা নেই, শুধু একটা ইলুমিনাতি মার্কা বিচ্ছিন্ন চোখ। একটাই চোখ। অনেক কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করে বোঝা গেল, বৃষ্টি আসলে ধরা পড়েছে সেই চোখে। একজন বৃষ্টি দেখছে, আরো ভালো করে বলতে গেলে শিল্পী নিজেই তার বৃষ্টি দেখার কথা ভাবছেন, এখানে তার চোখে দেখা বৃষ্টিই আসল, তিনি কী দেখেছেন, তার চোখে কী ধরা পড়েছে, সেটাই আসল, বৃষ্টিটা গৌণ। এমন হতেই পারে যে দুর্গাপুজোর ছবিতে একটা ত্রিভুজ আসলে ত্রিশুলের কথা বলতে চাইছে, একটা ডিসটর্টেড ঘুড়ি বা খাঁচার মতো আকৃতি আসলে স্বাধীনতার কথা বলতে চাইছে। পুজোর সঙ্গে যে স্বাধীনতার প্রচ্ছন্ন যোগ আছে। এমনও হতে পারে এসব কিছুই নয়, কোনও বিশেষ দিনক্ষণ বা বছরের স্মৃতিই বিমূর্ত রূপ নিয়ে এখানে ধরা দিয়েছে।


সহজ কথায়, জটিল বা কমপ্লেক্স থিমকে সহজ জ্যামিতি তুলে আনা মেটাফিজিকাল আর্টের প্রধান কাজ। কালার প্যালেটের কথাটাও মাথায় রাখলে ভালো। গনেশবাবু সাধারণত মিনিমালিস্ট ছবি আঁকেন, দু একটার বেশি রঙ ব্যবহার করেন না। নীল সবুজ ঘুরেফিরে আসে, লাল বা বেগুনির মতো উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার কমই দেখা যায়। এখন যেখানে রঙের ব্যবহার যতটা উজ্জ্বল, সেই কম্পোজিশনের মুড আর ডেপথ সাধারণত ততোটা বেশি হয়। এই সমস্ত কম্পোজিশন ঠিক কী কী আকারে এসেছে, কোথায় এসেছে, পাতা জুড়ে থাকা এই কম্পোজিশন মুভমেন্ট দেখে বোঝা যায় ছবির থিমটা ঠিক কতটা ডায়নামিক, কতটা তরল! তিনি যা ভাবছেন, তার একটা ছন্দময়তা আছে আর এই জ্যামিতিক আকারগুলো ছন্দবন্ধ জ্যামিতির শেপ নিয়ে স্পেসটাইমে বয়ে যাচ্ছে! এছাড়াও কিছু জিনিস আছে, যা গনেশবাবু বাদে অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যেও থাকে, তা হল স্প্রিচুয়াল আর কালচারার আন্ডারটোন বজায় রাখা। নন লিটেরাল রিপ্রেজেন্টেশন আর কালাচারাল রিপ্রেজেন্টেশন তুলে আনার অসংখ্য উপায় আছে। বিভিন্ন মোটিফের প্লেসমেন্ট, রঙ, লেয়ারিং... রঙের কথাই হোক। নীল রঙটা কতভাবে ব্যবহার হতে পারে একটা শারদীয় ছবিতে?

শরতের আকাশ বোঝানোর জন্য একটা নীল, নীলকন্ঠ শিব, নীল অপরাজিতা, নীলকণ্ঠ পাখি শিবের কাছে দেবীর ফিরে আসার কথা জানায়, নীল পদ্ম দিয়ে রাম দেবীর পুজো করেছিল, নীল উজ্জ্বল জামা পরে বাচ্চারা ঘুরতে বেরোয়... শিল্পীর মন ও স্মৃতিতে কোন রঙের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব কতটা, সেটা বুঝে তিনি রঙের ডেপথ বজায় রাখবেন। একটা জাতি বা গোষ্ঠীর রিটুয়াল সিম্বলকে ছবিতে তুলে আনা কিন্তু একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট রূপ দেওয়া ইনারস্কেপে নতুন কিছু নয়। 

গনেশ হালুই সমসাময়িক কালে ইনারস্কেপের মাস্টার ফিগার শুধু নয়, ভারতবর্ষে বিভিন্ন শিল্প ঐতিহ্যে বজয় রাখার পিছনে (অজন্তা সহ) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। কিন্তু তাঁর জীবনের একটা অন্ধকার দিকও ছিল, মাতৃভূমি ছেড়ে চলে আসাত বেদনাটা তিনি কোনোদিনই ভুলে যেতে পারেননি। এই মেলানকলিক অতীত রূপক হয়ে তাঁর অনেক ছবিতেই ধরা পড়েছে। একবার কথায় কথায় তিনি বলেছিলেন, 'Pain is the beginning of all art, joy is the end. Art is not the question, art is not the answer. It is a continuous process. You cannot separate heat from fire in the end. If there is heat in fire, you feel it. There is continuity. It is transforming, it means it is continuing. There should be continuity in your life, in things. I was born, like a proverb, I have become old. We cannot stick to one point. You can’t step into the same river twice, because it’s never the same river."

এই পোস্টটা দিলাম, কারণ আর কাউকে দিতে দেখলাম না। এই সূত্রে যদি একজন দুজন গনেশ হালুইয়ের কাজ নিয়ে একটু চর্চা করে, তাহলেই আমি খুশি।





বুধবার, ৩ জুলাই, ২০২৪

দ্য আর্ট অফ থিংকিং

Triumph Over Mystery 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শুধু একজন মার্কিন শিল্পীকে নিয়ে যদি পড়াশোনা করার ইচ্ছে থাকে, চোখ বন্ধ করে মার্ক টান্সির কাজ নিয়ে বসে পড়ুন। ভদ্রলোকের এক একটা কাজ নিয়েই চারখান করে বই লেখা হয়ে যাবে। 

তাঁর এক একটা প্রকাণ্ড মোনোক্রোম্যাটিক ক্যানভাসের সামনে পড়লে সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে বটে, কারণ না থেকে উপায়ও নেই, কিন্তু তিনি যে ঠিক কী বলতে চাইছেন, সেটা সহজে বোঝার কোনও উপায় থাকে না। 

একে তো টান্সির আর্ট স্টাইল একেবারে নিজস্ব ধারার, এমন করে কেউ কোনোদিন ছবি ফবি এঁকেছে বলে জানা নেই। প্রথমে তিনি একটা রঙ দিয়ে ক্যানভাসটা ভরিয়ে তোলেন, তারপর স্থানবিশেষে সেই রঙ খুরচে খুরচে তুলতে থাকেন। আবার পিচকিরির মতো করে রঙ ঢালেন, আবার সেই রঙ তোলেন। এই কন্সট্রাক্টিভ ডিকন্সট্রাকশনের পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে অবশেষে এমন এক সম্মোহনী ছবি উন্মোচিত হয়ে ওঠে, যা অবাস্তব বলে মনে হয়। অনেকে বলেছেন....টান্সির ছবি হল দ্য মার্জিং অফ ডিফারেন্ট রিয়ালিটিজ। সেখানে জ্যামিতি বিজ্ঞান দর্শন থেকে শুরু করে রাজনীতি, পপ কালচার সবই আছে, কিন্তু সে সবই আছে ছদ্মবেশে।

টান্সি আসলে শিল্পের ইতিহাস, দর্শন আর বিজ্ঞান নিয়ে ব্যাপকভাবে পড়াশোনা করেছেন, তাঁর ছবির মাধ্যমে তিনি শিল্পের বিবর্তন এর ইতিহাস লিখে চলেছেন। এক একটা ছবি একইসঙ্গে শিল্পের পূর্বসুরিদের সঙ্গে কথা বলছে আর উত্তরসূরিদের জন্য একটা বার্তা দিচ্ছে। ('কথা বলছে' লিখেছি বলে "আর সব ভালো তো? কাল ম্যাচ দেখলে?" মার্কা কথা হচ্ছে না, অ্যালাগরিকাল অর্থেই কথাটা ধরতে হবে।)

আরো সহজ করে বোঝাতে গেলে বলতে হয় টান্সি আসলে মানুষ বা ঘটনার ছবি আঁকেন না, তিনি ভাবনার ছবি আঁকেন। দ্য আর্ট অফ থিংকিং। তাঁর ছবির প্রোটাগনিস্টরা যা দেখছে, যা করছে, সবটাই আসলে তাদের চিন্তার প্রতিফলন। প্রতিটা কাজেরই একটা নির্দিষ্ট বিষয় আছে, যা কিনা ছবির শিরোনামে ধরা পড়েছে। আর এই নীরব কথোপকথনের সবটাই হচ্ছে সেই বিষয়বস্তুকে ঘিরে। এক একটা ছবির বিভিন্ন অংশে যে ঠিক কতগুলো স্তর আছে, সেগুলো নিয়ে ভাবতে বসলে বোঝা যায়, শিল্পী শুধুই ছবি আঁকেননি, পাশাপাশি একটা হাজার পাতার কালজয়ী উপন্যাসও লিখে ফেলেছেন।

Source of the loue

Transition team

Waiting in the line to look

Still life

Forward Retreat

Judgement of Paris

An innocent eye test

Robbe-Grillet cleansing every object in sight

Installing the lens

Columbus discovers Spain

Achilles and the tortoise

Matrix

The Raw & the framed

A short history of modernist painting



বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০২৪

টুইন্স সেভেন সেভেন-- এক 'স্পিরিট-এড' শিল্পী


ইয়োরুবা সংস্কৃতিতে বাবালাওদের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে। বাবালাও হল ইফা ওরাকলের সেই সমস্ত প্রিস্ট বা ধার্মিক পূজারী, যাঁরা ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেয়ে স্পিরিচুয়ালি হাইয়ার লেভেলে চলে গেছে, মহাবিশ্বের অজানা রহস্য এখন তাঁদের জানা। ইয়োরুবা ভাষায় এই কথাটার মানেই হল ফাদার অফ সিক্রেটস। কিন্তু ইফাটা কী বস্তু! ইফা আর কিছুই নয়, একটা স্প্রিচুয়াল প্রফেসি বা দৈববাণীর সিস্টেম, এই সিস্টেম ইয়োরুবার সুপ্রিম ডেইটি ওলোরুন বা ওলাদুমার দেবতাকে নিবেদিত, কিন্তু ইকার কোর হল মেধার দেবতা (উরিষ্যা) ওরিশ্যা ওরুনমিলার শিক্ষা। সেই শিক্ষার ফাউন্ডেশন নিয়েই ইফা কালচার আর বাবালাওদের বিবর্তন ঘটেছে। 













বাবালাওরা তন্ত্রমন্ত্র, জাদু, আত্মার আগমন ইত্যাদি নিয়ে চর্চা করেন এবং আগে থেকেই দুনিয়ার সমস্ত জীবজগতের ভবিষ্যৎ জেনে ফেলতে পারেন বলে বিশ্বাস আছে। সব ইফা পুরোহিত অবশ্য বাবালাও হতে পারেন না, সে জন্য 'ইকবাল' চাই। মানে, সেই ব্যক্তি কসমিক আশীর্বাদের অধিকারী না হতে পারলে বাবালাও হতে পারবেন না। 

এইবার এইসব শুনে যদি কারো কুসংস্কার মনে হয়, তাহলে বলতে হয়, ইয়োরুবা সংস্কৃতির এই প্র‍্যাক্টিস শুধু পশ্চিম আফ্রিকার গ্রামেগঞ্জে টিকে নেই, লন্ডন প্যারিস নিউইয়র্কের এলিট মহলেও নিয়মিত উড়িষ্যাদের পুজো করা হয়, মন্ত্রোচ্চারণ সহ সুপারন্যাচারাল প্র‍্যাক্টিসও চলে। গত বছর ভিয়েনাও এমন একটা বাবালাও ইভেন্টের আয়োজন চোখে পড়েছিল। এসব ভূতপ্রেত ঝাড়ফুঁক করে কী সত্যি কোনও লাভ হয়? হয় না বলাই যুক্তিসঙ্গত, কিন্তু তবু এক একটা ঘটনা ঘটে, যেগুলো আমার মতো লোকজনকে বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় মেরে বলে যায়, তুমি কিস্যু জানো না বাছা। 

এই ভূমিকার প্রয়োজন ছিল না হয়তো, কারণ ইয়োরুবার তন্ত্রসাধনা বা জাদুটোনা নিয়ে আমার কিছুই বলার নেই। বলার ছিল এক শিল্পীর অবিশ্বাস্য জীবনের কথা, যিনি একাধারে গায়ক, কম্পোজার, নৃত্যশিল্পী, ভাস্কর্য ও পেইন্টার। নাইজিরিয়ার আর্ট ওয়ার্ল্ডকে সারা দুনিয়ায় জনপ্রিয় করতে এই মানুষটির যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তা অস্বীকার করা চলে না। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আশ্চর্য হল তাঁর জীবন কাহিনি।

আজকাল পপ কালচার জগতে 'ডোপ' বলে একটা স্ল্যাং ব্যবহার করা হয়। আফ্রিকা হল সেই ডোপ। এই মহাদেশের শিল্প সংস্কৃতি রাজনীতি সমাজ নিয়ে বেশি মাথা ঘামালে নেশা হয়ে যায়। তার কারণটাও সহজে অনুমেয়। আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গা থেকে যে সৃজনশীলতা উঠে আসে, তার অধিকাংশের কোনও রেফারেন্স পয়েন্ট আমাদের কাছে নেই। এ এক আলাদাই দুনিয়া। গত বছর আফ্রিকান আর্ট আর আর্টিস্ট সম্পর্কে কিছু কিছু লেখা পোস্ট করার কথা ভেবেছিলাম, দু একটার পর আর হয়ে ওঠেনি। যাই হোক, আরো কয়েকটা লিখে রাখা ছিল। তাই টুইন্স সেভেন সেভেনের একটা ছবি যখন ইন্সটাগ্রামে চোখের সামনে চলে এল, ভাবলাম এই পুরোনো লেখাটা পোস্ট করে দেওয়া যাক।

নামের কী বাহার! টুইন্স সেভেন সেভেন! তবে কিনা তাঁর আসল নাম এটা নয়, সেটা হল ওমোবা তাইও ওলানিয়ি ওয়েওয়ালে তোয়েজে ওয়েলালে ওসুনতোকি। নাইজিরিয়ার সবচেয়ে নামকরা বৈপ্লবিক শিল্পী তো বটেই, কিন্তু গানের জগতেও তাঁর নামডাক কিছু কম নেই। ইউনেস্কোর পিস প্রাইজ পেয়েছেন, নাইজিরিয়া সহ গোটা দুনিয়ায় সম্মানিত হয়েছেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন রাস্তায় রাস্তায়, না খেতে পেয়ে শীতের রাত্রে ঘুরে বেরিয়েছেন, চোর ডাকাতের হাতে লাঞ্চিত হয়েছেন, দুর্ঘটনায় মরতে মরতে শেষ পর্যন্ত মরেননি, কিন্তু ভাঙা কোমর আর হিপ নিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ, এই মানুষটার মধ্যে কিনা দৈব বাস করত বলে অনেকের বিশ্বাস।

টুইন্স সেভেন সেভেনের জীবন নিয়ে নাইজিরিয়ার বাইরে তেমন আলোচনা হয় না, উইকিতে বা ইন্টারনেটে কোথাও এসব ডিটেলে লেখা নেই। কিন্তু তাঁর জীবন যতটা চিত্তাকর্ষক, ততোটাই অভাবনীয়। 

বলছি, মুসলমান বাবা আর ক্রিশ্চান মায়ের সন্তান হলে কী হয়?এমনিতে কিছুই হয় না, কিন্তু ব্যাপারটা যখন চল্লিশের দশকে ঘটে, আর তাও ঘটে নাইজিরিয়ার ওগিডি বলে এক অনামা জায়গায়, তখন অনেক কিছুই হয়। প্রথমেই যা হয়, সমাজের লোক আপনাকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করে। দু দলের ধর্মগুরুরাই আপনাকে নিয়ে হেলাফেলা করে, অনেকে স্রেফ অভিশাপ দেয়। সেই অভিশাপের ফলে হয়তো নয়, কিন্তু ঘটনা এটাই যে মারির গর্ভে সাত সাতবার জমজ বাচ্চার আগমন হয়েছিল, তাদের মধ্যে একজন ছাড়া কেউই বাঁচেনি। (প্রসঙ্গত, নাইজিরিয়ায় জমজ বাচ্চার জন্মের হার সবচেয়ে বেশি) 

মারির স্বামী আইতোয়েজে নিজেও প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিল যে তার ওপর অভিশাপ লেগেছে, কিন্তু সে হাল ছাড়েনি। বরং গিয়ে হত্য দিয়েছিল পাশের গাঁয়ের বাবলাওয়ের কাছে। সৌভাগ্যবশত, বাবলাওরা মুসলমান ক্রিশ্চান পরোয়া করেন না, মৃত্যু পরবর্তী আর জন্মের আগের দুনিয়া নিয়েই তাঁদের কাজকারবার বেশি, জ্যান্ত মানুষের চেয়ে বেশি আড্ডা হয় সম্ভবত আত্মার সঙ্গেই। মারিকে দেখেই তিনি বলে দিয়েছিলেন, কেস গড়বড়। অনেক কাজ করতে হবে। 

তা গুনেটুনে দেখে তাঁর বিধান এল, ওসুন দেবীকে নিবেদিত নদীর জল ছাড়া জল খেলে মারির গর্ভের সন্তান সারভাইভ করবেন না। তখন মারি আবার প্রেগন্যান্ট, আর অজন্মা বাচ্চার জন্য সব কিছু করতে তইয়ার। ফলে আনুষ্ঠানিক পুজোপাঠ ছাড়া যেটা হল, মারিকে সেই পবিত্র নদীর জল খাওয়ানো হতে লাগল। পুর্বপুরুষদের আশীর্বাদের জন্যও ভয়ানক সব যজ্ঞফজ্ঞ হল, কিন্তু বাবলাও এরইমধ্যে একদিন বলে দিলেন, সন্তান যদি বেঁচেও যায়, মনে রেখো, সে মানুষ নয়, মনুষ্য রূপে নিয়ে আসা এক দৈব আত্মা। বেশি ঝামেলা করলেই মানুষের রূপ ছেড়ে আত্মা হয়ে পালাবে। দ্বিতীয়ত, এই ছেলে যে কাজে হাত দেবে, সেই কাজেই এক্সেল করবে। কিন্তু, মানুষের মতো করে বাঁচার বিদ্যা তাঁর জানা নেই, সে আসলে মানুষ নয়। তাই যত বড় ইঞ্জিনিয়ার হোক না কেন, অর্থোপার্জন করতে পারবে না। যত বড় নেতা হোক না কেন, রাজ্য ধরে রাখতে পারবে না। যত বড় সেলেব হোক না কেন, খ্যাতি ধরে রাখতে পারবে না। সময়ের আগে সে মরবে না, কারণ পুর্বপুরুষ আর ওরুনমিলার আশীর্বাদ আছে তাঁর ওপর, কিন্তু এই দুনিয়ায় কাজ ফুরোনো হয়েছে জানতে পারলেই তাঁকে স্পিরিট ওয়ার্ল্ডে ফিরে যেতে হবে।

মারি আর আইতোয়েজে, দুজনেই মেনে নিয়েছিলেন। না মেনে উপায়ও নেই। অবশেষে মারির ছেলে হল, আর আশ্চর্যভাবে সে ছেলে বেঁচে গেল। আগে সাত বার জমজ ছেলে মারা গিয়েছে, তাই ছেলের অল্টারনেট নাম হয়ে গেল টুইন্স সেভেন সেভেন। তাঁর রূপ ধরে নাকি তাঁর ঠাকুরদাই ফিরে এসেছিলেন। 

যাই হোক, টুইন্স সেভেন সেভেনের জীবন যেভাবে গড়িয়েছে, তাতে ওই বাবালাওয়ের ভবিষ্যৎবাণীর কথাই মনে পড়ে। সবাই বলে, ছোটবেলায় সে মাকে বহুত জ্বালিয়েছে। বকা খেলেই বলত, ওসব দোষ আমি বুঝি না, বেশি বকলে নিজের জগতে ফিরে যাব। তবে ধীরে ধীরে তাঁর অন্যান্য জিনিসে আগ্রহ জাগে, তখন আর ফিরে যাওয়ার কথা মাথায় আসত না। 

এই ছেলে ছেলেবেলা থেকে যে জিনিস করতে গেছে, সেখানে গিয়েই কেরামতি দেখিয়েছে। ইয়োরুবা সংস্কৃতির উৎসবে নাচ করতে করতে তার নাচের শখ হয়, তারপর সে এমন নৃত্যচর্চা শুরু করে যে সবাই অবাক। উৎসবের সময় তাকে নাচতে দেখার জন্য কয়েক গ্রাম লোক এসে হাজির হত। একসময় এমনও গেছে, অর্থাভাবে রাস্তায় নেচে নেচে পয়সা চাইতেন, লোকে আধুলি ছুঁড়ে দিত। 

এরপর এল গান। শুধু গান গাওয়া নয়, গান বাঁধাও। সেই চর্চা সারাজীবন ধরে করেছেন। পড়াশোনাতেও ব্রাইট ছিলেন, কিত স্কুল কলেজের ধরাবাঁধা নিয়ম তাঁর পছন্দ হয়নি। গান নিয়েই দিন কাটত। নানা জায়গায় নাটকে গান করতে যেতেন, শহরের বাইরে বাইরেও নানান সঙ্গীতানুষ্ঠানেও যেতেন। সেরকম একটা জায়গাতে নাচগান করতে গিয়েই উল্লি বেইয়ার এর সঙ্গে দেখা। প্রসঙ্গত, এই উল্লি বেইয়ার এক নমস্য ব্যক্তি, নাইজিরিয়া আর পাপুয়া নিউগিনির আধুনিক সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতিকে গড়ে তুলতে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনিই নাইজিরিয়ায় ওসোগবো স্কুল অফ আর্ট এর পত্তন করেন, নাইজিরিয়ার আর্ট ওয়ার্ল্ডের তীর্থস্থান এই স্কুল। সবচেয়ে মজার কথা হল, ওসোগবা সেখানে কাউকে আঁকার ট্রেনিং দেওয়া হত না, বরং তাঁদের জীবন আর কল্পনাকে নিজের মতো করে ম্যানিফেস্ট করে কাগজে ফুটিয়ে তোলার জন্য এনকারেজ করা হত। টুইন্স সেভেন সেভেন উল্লি বেইয়ার এর সঙ্গে সেই স্কুলের একটা ওয়ার্কশপে গিয়ে পড়লেন। বাকিটা ইতিহাস।

দীর্ঘ কেরিয়ারে টুইন্স সেভেন সেভেন এমন সব অসামান্য ছবি এঁকে গেছেন, যা আর কেউ চেষ্টা করলেও আঁকতে পারবে না। আর্ট ক্রিটিকরাও হার মেনে গেছেন, কিন্তু একসুরে বিশ্লেষণ করতে পারেননি।

তাঁর ছবি জুড়ে ইয়োরুবা সংস্কৃতি, মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি, আর দেবতা। কিন্তু একটা কিছু যেন অন্যরকম। আসলে, তিনি স্পিরিটস ওয়ার্ল্ডের ছবি এঁকেছেন, ওয়ার্ল্ড বিয়ন্ড হিউমান গ্রাস্প। এই দুনিয়াটাকে যেন তিনি চোখের সামনে দেখতে পেতেন। উল্লি বেইয়ার নিজে বলেছিলেন, "এই ছেলেটার চোখ মানুষের মতো নয়। ও সব কিছু অন্যভাবে দেখতে পায়।"

একসময় তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ে, ইউরোপের নানান দেশে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়। কিন্তু টুইন্স সেভেন সেভেন অন্যান্য শিল্পীদের মতো সেই খ্যাতিকে ধরে রাখতে চাননি, বরং অবসর সময়ে একের পর এক কম্পোজিশন তৈরি করেছেন, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন, বাস্কারদের সঙ্গে পথে পথে নেমেছেন। অন্য শিল্পীদের ছবি দেখা নিয়েও তাঁর উৎসাহ ছিল না। পিকাসোর এক্সিবিশনে যাওয়ার দিন লুকিয়ে পড়েছিলেন। পরে জিজ্ঞেস করাতে জানিয়েছিলেন, "ওইসব ভালো ভালো ছবি দেখে ইন্সপায়ার্ড হয়ে গেলে আমার নিজের ছবি আঁকতে ভুলেই যাব।" বরং প্রিয় বই 'মাই লাইফ ইন দু বুশ অফ গোস্টস' পড়তেন বারবার, তাঁর অনেক ছবির মূল ইন্সপিরেশন হয়তো এই বইটাই।

সত্যিই হয়তো তাই। তবে কিনা পিকাসোর আঁকার শৈলি নিয়ে যত চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে, হচ্ছে, তার একাংশও টুইন্স সেভেন সেভেনের ছবি নিয়ে হয়নি। অথচ, তাঁর মতো একটা ছবি আঁকতে গেলে সবাই নাকানিচোবানি খেয়ে যায়। এত সময় লাগে যে বলার নয়! এদিকে টিএসএস স্বল্প সময়ে এতগুলো কাজ করে গেছেন যে তাজ্জব হতে হয়। 

হয়তো বাবলাওর কথাই ঠিক, ইনি সাধারণ মানুষ ছিলেন না। যখুনি আর চারটে সফল শিল্পীদের মতো কিছু করতে গেছেন, ডাহা ফেল মেরেছেন। ইয়োরুবা আর্ট নিয়ে একটা থিম পার্ক নির্মাণ এর ইচ্ছে ছিল তাঁর, হয়নি। সব টাকা জলে গেছে। আমেরিকায় শিক্ষকতা করতে গেছেন, বেশিদিন পড়াতে পারেননি। একটা দুর্ঘটনায় মরতে মরতে বেঁচে যান, চিকিৎসকরা অবাক হয়ে গেছিলেন! 'মিরাকল, মিরাকল' বলা ছাড়া আর কিছুই বোঝেননি! 

মরেননি বটে, কিন্তু কোমর ভেঙ্গে কয়েক বছর বিছানায় পড়ে থাকেন। তাঁর জীবনে হাজাররকম সমস্যা ছিল, সে সব কোনোদিনই যায়নি। নাইজিরিয়ায় রাজনৈতিক গুণ্ডারা উত্যক্ত করছিল বলে আমেরিকায় গিয়েই শেষ জীবন কাটাবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে চোর জোচ্চোরদের হাতে সব খুইয়েছেন, ঘর থেকে বেদখল হয়েছেন, পুলিশের হাতে হেনস্থা হয়েছে, পেট চালাতে কখনও বাসন মেজেছেন, কখনও বাথরুম পরিষ্কার করেছেন। 
আর এসব তখন ঘটেছে, যখন তিনি খ্যাতির চূড়ায়। ২০০০ সালের কথা, তখন টুইন্স সেভেন সেভেন গ্লোবালি সেলিব্রেটেড আর্টিস্ট, কয়েকদিন আগেই নাইজিরিয়ায় চিফ উপাধি পেয়েছেন, আফ্রিকান ডায়াস্পোরা নিয়ে কাজ করার জন্য ইউনেস্কো আর ইউএন এর মতো সংগঠনরা তাঁকে সম্মান দেওয়ার কথা ভাবছেন, এদিকে তখন তিনি আমেরিকার রাস্তায় ঝাঁট দিচ্ছেন। ব্যাটা বাবলাও ঠিকই বলেছিল, এই ছেলেটা তাজ্জব সব ঘটনা ঘটাবে, কিন্তু মানুষের মতো করে বাঁচতে পারবে না। হয়তো পৃথিবীতে তাঁর কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল, ২০১১ সালে নাইজিরিয়ার এই শিল্পী ফের স্প্রিরিট ওয়ার্ল্ডে ফিরে যান। 

(যাঁরা ভদ্রলোকের কাজ মিস করে গেছেন, তাঁদের জন্য ক'টা স্যাম্পল রেখে গেলাম।)

শুক্রবার, ৭ জুন, ২০২৪

সৌম্যদীপ সিনহার পলিটিকাল কার্টুন


দ্য হিন্দুর অ্যাসিস্টান্ট এডিটর আর চিফ ইলাস্ট্রেটর সৌম্যদীপ সিনহার কিছু কাজ। কলকাতার এই শিল্পী কোনোরকম ফর্মাল ট্রেনিং না নিয়ে আঁকতে শুরু করেছিলেন বলে পড়েছিলাম। অনেকদিন ধরেই তাঁর কাজ দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি।

একের পর এক দুর্দান্ত ছবি, স্যাটায়ারে পলিটিকাল ল্যান্ডস্কেপের ছোটখাটো কন্ট্রাডিকশন খুঁজে পাওয়া! বিশেষ করে গত কয়েক মাসে স্যার একদম কাঁপিয়ে দিয়েছেন। এই বছর তিনি যা করে দিয়ে গেলেন, পলিটিকাল কার্টুনিং এর জগতে তাঁকে বাদ দিয়ে কোনও আলোচনা আর করা সম্ভব রইল না।
 








শনিবার, ৪ মে, ২০২৪

সাঞ্চেজের দুনিয়ায়

 


সব দিন একরকম যায় না। কোনো কোনোদিন কত ছোটবেলার কথা, কত অবান্তর চিন্তা মাথার মধ্যে ভিড় করে আসে, সেসব লেখা যায় না, শেয়ার করাও যায় না। পেঁজা তুলোর মতো চিন্তাগুলো মাথার মধ্যে ঘুরে ঘুরে ভাসে, ভেসেই যায়। 

চিন্তামেঘ...

নামটা মনে আসতে এক শিল্পীর কথা মনে পড়ে গেল। প্রথম যে ছবিটা, তার নামও এক। চিন্তামেঘ। থট ক্লাউড। একটা নয় আসলে, একগুচ্ছ ছবি আছে এই সিরিজে।

থট ক্লাউডের স্রষ্টা আধুনিক কিউবার কিংবদন্তি শিল্পী তোমাস সাঞ্চেজ। নীল নদী, সাদা মেঘ, ঘন সবুজ বন যাঁর সিগনেচার। প্রায় তিন দশক ধরে নিউইয়র্কের মার্লবোরো গ্যালারি তাঁর 'ইনার ল্যান্ডস্কেপ' সিরিজের এক্সিবিশন করছিল, গত মাসেই সেই মেয়াদ শেষ হয়েছে। সাঞ্চেজের অনুরাগীদের মন খারাপ, অনেকে গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য করা বিক্ষোভে তাঁর আঁকা থট ক্লাউডের ছবি নিয়ে গিয়েছেন। কিউবার সবচেয়ে নাম করা এই শিল্পীর ছবির যাদু এমনই যে গ্যালারি বা আর্ট ক্লাসের কয়েক ঘণ্টা নয়, এই শিল্পীর কাজ বহু মানুষের জীবনের অভিন্ন অংশ হয়ে উঠেছে আস্তে আস্তে। 

এমন সূক্ষাতিসূক্ষ্ম ডিটেলিং ল্যান্ডস্কেপ ছবিতে করা সহজ কাজ নয়। অনেকে বিশ্বাসই করতে চায় না যে এই ছবিগুলো হাতে আঁকা। এখন তো আবার গত কয়েক মাস ধরে সাঞ্চেজ স্টুডিওকে এআই প্রুফ সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হচ্ছে। অ্যানিমে আর্টিস্টদের যে ছবি মুহুর্তে ইন্সটার পর্দায় চলে আসে, সাঞ্চেজ কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে সেরকম এক একটা ছবি এঁকেছেন, আঁকছেন। কিন্তু, যন্ত্রের সঙ্গে রক্তমাংসের শিল্পীর পার্থক্য হল, সাঞ্চেজের ছবি শুধু দেখতে সুন্দর নয়, তার একটা ভাষা আছে, একটা দর্শন আছে। এক একটা ছবিতে দেখা যায়, দিগন্তের দিকে তাকিয়ে এক পুরুষ বসে আছেন। ঘাসবনের ওপর দিয়ে একলা মেঘ বয়ে যাচ্ছে। প্রাচীন বৃক্ষের সমষ্টির মাঝ দিয়ে একটা আলোর রশ্মি দেখা যাচ্ছে। মন অস্থির থাকলে যদি কেউ মন দিয়ে কিছুক্ষণ সাঞ্চেজের ছবি দেখে, মনে হয় জীবনটা এখনও সুন্দর। যতদিন বেঁচে আছি, এই প্রকৃতিকে দেখছি, গাছপালা মেঘ নদী রোদ্দুরকে সঙ্গে নিয়ে এক একটা মুহুর্ত কাটাচ্ছি, এসবের মূল্য চোকানো যাবে না কোনোদিন। এমন হতেই পারত, যে এই পৃথিবীতে আসার মতো ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটত না, তাহলে এসব দেখার সুযোগও হত না। এই মেডিটেটিভ অনুভূতির জন্য আসলে শিল্পীকেই দায়ী করতে হয়, কারণ
সাঞ্চেজ তুলি হাতে ছবি আঁকতে বসে নিজেই সব ভুলে যান, তারপর তিনি ধ্যান করতে থাকেন। তাঁর সামনে একটা কল্পনার বাগানের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটা ছবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি নিজেই বলেছিলেন, “When I enter a state of meditation it’s as if I’m in a jungle or a forest; the mind enters into a great exhilarated state, like an exuberant jungle where you can experience fear, desire, anguish—all types of emotions and feelings. When I begin to feel that there’s a point of inner consciousness everything goes toward that inner space, that inner river. Everything goes toward that place of quiet, that realm of tranquility within the forest where there is a lake."

আসলে সাঞ্চেজের অধিকাংশ ছবিই প্রেমের ছবি। ছবি না বলে চিঠিও বলা যায়। তাঁর এক একটা ছবি যেন প্রকৃতিকে লেখা প্রেমপত্র। সেখানে নিসর্গের প্রতি ভালোবাসা আছে, সমর্পণ আছে, কিন্তু কোনও স্বার্থ নেই। এই নিঃস্বার্থ প্রেমের সিগনেচর দেখে খোদ গার্সিয়া মার্কেজ সাঞ্চেজের প্রেমে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, "মানুষ যেভাবে এই দুনিয়াকে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করছে, ফের যদি কোনোদিন আমাদের এই পৃথিবীটাকে প্রথম থেকে সাজানো হয়, তাকে সাঞ্চেজের ছবির মতো হতে হবে।"

মন খারাপ থাকলে ইন্টারনেটে খুঁজে খুঁজে তোমাস সাঞ্চেজের ছবি দেখুন। হয়তো মন ভালো হবে। হয়তো মনে হবে, সব দুঃখ কষ্ট বিচ্ছেদ সহ্য করেও বেঁচে থাকাটা আসলে মন্দ নয়।