ফরাসি সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ফরাসি সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৫

ছোট নৌকা আর একটা টেলিফোন

 


২০২১ সালে ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার সময় কার্দিশ রিফিউজিদের একটা নৌকা মানে ওই স্মল বোট ডুবতে শুরু করে। উপায় না দেখে তারা ব্রিটিশ হেল্পলাইনে ফোন করে। তারা বলে, মনে হয় তোমরা ফ্রেঞ্চ ওয়াটারে আছো, অমুক নম্বরে ফোন করো। ততক্ষণে জল ঢুকতে শুরু করেছে, উনত্রিশজন যাত্রীর মধ্যে নারীপুরুষ তো আছেই, একটা বাচ্চা মেয়েও আছে। মাঝ সমুদ্রে নেটওয়ার্ক পাওয়া চাপ। তবু একজন ফোন করে। ফ্রেঞ্চ হেল্পলাইন থেকে একজন বউ তুলে বলে, তোমরা মনে হয় ব্রিটিশ ওয়াটারে আছো। ওদের জানিয়ে দিচ্ছি! লোকেশন ভেজো! লোকেশন পাঠানোও মুশকিল। ওদিকে জল কোমর অব্দি এসে গেল প্রায়। ঠান্ডা হাওয়া, জলে ভিজে সবাই কাঁপছে। যাই হোক, হেল্পলাইন থেকে বলে, শান্ত থাকুন। দেখছি কী ব্যাপার। দেখতে দেখতে বোট প্রায় ডুবে যায় আর কি! অনেকে জলে পড়ে গেছে। বেগতিক দেখে বারবার তারা ফোন করতে চেষ্টা করছে, দু দশ মিনিট পর আর কিছু করার থাকবে না। বার বার ফোন আসায় মহিলা বলেন, ধৈর্য ধরুন, দেখছি তো! কিন্তু দেখছে আর কে? ব্রিটিশ রেস্কিউ বোট অনেক দূরে, ফরাসি বোট অন্য মিশনে ব্যস্ত। একদম জলে পড়ে যাওয়ার আগে নিরুপায় হয়ে আবার ফোন করে লোকটা। মহিলা বলেন, জ্বালিয়ে মারলি মাইরি! ইউ উইল নট বি সেভড, বোঝলা?

সাতাশজন মারা যায়। সকলের লাশ ভাসতে পাওয়া যায় সমুদ্রে। প্রতি বছর ওইটুকু সামুদ্রিক পথ, যা নব্বই মিনিটে ক্রস করে দেয় ফাস্ট বোট, সেখানে লোক মরছে। এদেশে হলে অবশ্য পাত্তা দিত না। জায়গাটা ইউরোপ বলেই সাড়া পড়ে, তদন্ত হয়। রেস্কিউ হেল্পলাইনের মহিলাকে ডেকে আনা হয় জেরা করার জন্য। তিনি বলেন, "আমি কী করব? আমি তো প্রোটোকল ফলো করেছি।"

প্রশ্ন ওঠে, আপনি সিচুয়েশন এর গুরুত্ব বুঝতে পারেননি? ওরা রিফিউজি, মরে যাচ্ছিল, একটু সেন্সিটিভ হতে পারছিলেন না? উত্তর আসে, রিফিউজি না হলে মিলেনিয়ার হলে বুঝি বাঁচানোর চেষ্টা করতাম না? আমি কেন দুজন মানুষের মধ্যে তফাত করব? আমার চোখে সবাই ভিক্টিম।

“I didn’t ask you to leave, I said. It was your idea, and if you didn’t want to get your feet wet, love, you shouldn’t have embarked. I didn’t push you into the water, I didn’t fetch you from your village or field or ruin of a suburb and put you in your wretched leaky boat, and now the water’s up to your ankles, I get it that you’re frightened, and you want me to save you and you’re impatient. You’re counting on me. But I didn’t ask you for any of that. So you’ll just have to grin and bear it and let me get on with my job. And apparently these thoughts were so strong that I actually spoke them out loud.”

আপনার ওপিনিয়ন কী রিফিউজি সমস্যা নিয়ে? পুলিশ জিগোয়। উত্তর আসে, আমার কোনোও ওপিনিয়ন নেই। ওপিনিয়ন দিয়ে রেস্কিউ চলে না। সাতাশজন মারা গেছে, সারা কেরিয়ারে আমি কত রিফিউজিকে বাঁচিয়েছি সেটা কে বলবে?

দুজন মানুষ ডুবে যাচ্ছে। তাদের পরিচয় জানা কি তাদের রক্ষা করার জন্য জরুরি? হতে পারে একজন কোটিপতি, শখ করে নিজস্ব ইয়াটে করে মাছ ধরতে এসে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়েছেন, অন্যজন সিরিয়া বা ইরাক থেকে পালিয়ে এসেছে, তাদের ঘরবাড়ি বোমায় উড়ে গেছে, তারা যা হোক কিছু করে আইনি বা বেআইনি ভাবে নৌকা করে ইংল্যান্ডে যেতে গিয়ে নৌকাডুবির শিকার হয়েছেন। দুজনে একসঙ্গে ডুবছে? আমি একজনকে বাঁচাতে পারব। কাকে বাঁচাব? তাদের অতীত বা সিদ্ধান্ত বা গুডলাক/ব্যাডলাক জানার প্রয়োজন আমার আছে কি? একজন পেশাদার রেসকিউ অফিসারের কাছে কি দুজনেই সমান ভিকটিম নন? না সেখানেও আপনার সো কল্ড হিউম্যানিটির ভূমিকা থাকতে হবে? থাকা কি আদৌ উচিত? কে জানে? আমি তো বলতে পারছি না।

এই লেখক যে দার্শনিক বলে পরিচিত, সেটা বোঝাই যায়। তাই, স্মল বোটও ঠিক ফিকশন নয়, এটা একটা ফিলোসফিকাল প্রশ্নকে তুলে ধরেছে। সে প্রশ্ন কালেক্টিভ ডিসেন্সিটিজেশনের। উচিত অনুচিতের। মনুষ্যত্ব আর দায়িত্ববোধের মাঝে থাকা সূক্ষ্ম লাইনের। এই বই সাহিত্য হিসেবে পড়তে কেমন লাগবে জানি না, কিন্তু এই সময় আর এখনকার মানুষকে বুঝতে হলে বইটা আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

একটা জায়গা পড়ে সত্যি একটু নড়ে গেছিলাম।

There is no shipwreck without spectators. Even when there’s no one, when it’s far out at sea, at night, without witnesses, when there’s no living soul in sights for thousands of nautical miles, only waves and the viscous night, covering everything, swallowing everything; when there are no more eyes to see than there are arms to reach out, there are still spectators and the shore from which they are watching is never far away, even if, at the same time, it is infinitely distant.

কিন্তু সতর্ক করে দিচ্ছি, ইটস নট অ্যান ইজি রিড। ভালো লাগবে, তা জরুরি নয়।

বুধবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৪

দ্য কুইন অফ শর্ট নভেলস: বেলজিয়ান সাহিত্যের রানি



ভালো সাহিত্যিক হওয়া আর ভালো স্টোরিটেলার হওয়া এক জিনিস নয়। দুটো মুচুয়ালি এক্সক্লুসিভ হবে এমন জরুরি নয়, তবে হবে না তার গ্যারান্টিও কেউ দিতে পারবে না। মহৎ সাহিত্য লিখেও তার মধ্যে একটা নিটোল গল্প বুনে দেওয়ার বিদ্যা যাঁরা আয়ত্ত করেছেন, তাঁরা নমস্য মানুষ। তার চেয়েও বেশি ক্রেডিট সেই সমস্ত কলমের, যাঁরা গল্প হয়তো সেভাবে বলছেন না, কিন্তু যাই বলছেন, পাঠক গল্পের মতো করে পড়ে যাচ্ছে, একবারের জন্যও হোঁচট খাচ্ছে না। আমেলি নাথোম্ব এই ঘরানার সাহিত্যিক। উচ্চারণে হেরফের হতেই পারে, মাফ করবেন।
হঠাৎ করে আমেলির কথা মনে পড়ল কেন? কারণ, কাল সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হবে আর বেটিং টেবিলের ঊর্ধ্বে থাকা যে কয়েকজন কলমের দিকে অনেকে তাকিয়ে থাকেন, তিনি হয়তো আগামীতে এই লিস্টে চলে আসলেও আসতে পারেন। প্রথমত, বেলজিয়ামের সাহিত্যিকদের মধ্যে হয়তো কেউই আমেলির মতো প্রলিফিক নন। তাঁকে বলা হয় দ্য কুইন অফ শর্ট নভেলস। অজস্র গল্প, নভেলা, উপন্যাস লিখেছেন, ফি বছর একটা তো আসেই। আমি আগে বেশ কিছু পড়েছি, আর বারবার মনে হয়েছে, ইনি 'ওস্তাদ' লেখিকা। আমেলির অধিকাংশ কাজই যাকে বলে অটোবায়োগ্রাফিকাল, কিন্তু পড়তে একঘেয়েমি হয় না, কারণ পার্স্পেক্টিভের জায়গা থেকে তিনি প্রতিবার এমন একটা স্ট্যান্ড নেন, যা আগে পাওয়া যায়নি। ন্যারেটিভে সত্তা, অবসাদ, প্রত্যাশা, মৃত্যু সম্পর্কিত যে সমস্ত প্রশ্ন উঠে আসে, যেভাবে উঠে আসে, তাতে পাঠক লেখার গভীরতা অনুভব করে ঠিকই, কিন্তু সেই ক্রাইসিস মাথায় নিয়ে মাঝজলে ডুবে যায় না।
তবে, এই উপন্যাসটার ছবি দিয়েছি একটা বিশেষ কারণে। আমেলির এই ছোট্ট একশো কুড়ি পাতার বইটা অটোফিকশন নয়, বরং তাঁর বাবার জীবন নিয়ে লেখা একটা কাহিনি। অনেকটাই বাস্তব, তবে কতটা কল্পনা কতটা বাস্তব বোঝার উপায় নেই। প্রসঙ্গত, আমেলির বাবা ডিপ্লোম্যাট ছিলেন, তিনি নিজে নানান দেশে থেকে বড় হয়েছেন। কঙ্গোতে ষাটের দশকে বিপ্লবীরা তাঁর বাবা সমেত অনেককে হোস্টেজ নিয়ে রেখেছিল, প্রায় চার মাস ধরে নেগোশিয়েশন চলেছিল তাঁর সঙ্গে। বইয়ের প্রথমেই দেখা যায়, তিনি বন্দুকধারীদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, এক্ষুনি ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলি তাঁকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। এমন সময় তাঁর বাবা প্যাট্রিক নাথোম্ব তাঁর অতীত জীবনের কথা ভাবতে শুরু করেন। যে সাবলীল ভাবে এই স্মৃতিচারণ এগিয়ে গিয়েছে, তাতে মাঝপথে থামতে ইচ্ছে করে না। আমেলির বাবা কোভিডের সময় মারা গিয়েছেন, যতদূর জানা যায় খুবই ইমোশনাল, চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলেন, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতার অভাব ছিল না। আমেলি বহুদিন ধরে তাঁর বাবার অতীত ও জীবনকে আবিষ্কার করার জন্য লেগে আছেন। হয়তো এই বইটা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন! বাবাকে নিয়ে কতজন কত লেখাই তো লেখে, কিন্তু ফার্স্ট পারসনে লেখা এমন অভিনব, সৎ, আউট অফ দ্য বক্স বাস্তবানুগ উপন্যাসিকা ক'টা লেখা হয় কে জানে?


সোমবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৪

দ্য নোটবুক ট্রিলজি

No book, no matter how sad, can be as sad as a life.

আগোতা ক্রিস্টফের নাম শুনলে মনে হয় আগাথা ক্রিস্টির হারিয়ে যাওয়া বোন। আসলে অবশ্য তা নয়। ইনি হাঙ্গেরিয়ান লেখিকা, ছাপান্ন সালে রাশিয়া হাঙ্গেরি অধিকার করার পর সুইটজারল্যান্ডে পালিয়ে যান, লেখালিখি করেন ফরাসিতে। অবশ্য বেশিরভাগ লেখাতেই হাঙ্গেরির সমাজ আর ইতিহাস উঠে আসে, কিন্তু ফরাসি লেখালিখির শৈলী বা সুইস উদাসীনতা দেখা যায় পাশাপাশি। তাহলে কী বলব এই বইকে? হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্য? ফ্রেঞ্চ লিট? না সুইস সাহিত্যই বলতে হবে?

সে যাই হোক, আগোতা ক্রিস্টফের কলম ইন্ডি ঘরানায় বেশ নামকরা। তিনি চিরাচরিত জিনিস লিখে পাতা ভরান না। আমার এক বন্ধু বছর দুয়েক আগে তাঁর লেখা নোটবুক ট্রিলজি রেকামেন্ড করেছিল, আমি এই সেই করে আর পড়তে পারিনি। এই সপ্তাহে কম্বাইন্ড এডিশনটা ধরলাম, আড়াই দিনে শেষও হয়ে গেল। এইবার আমি ভ্যাবলা হয়ে বসে ভাবছি কী পড়লাম? মন আর মাথা দুইই গুবলেট হয়ে গেল? এত রকম ইমোশন একসঙ্গে মিশে খিচুড়ি হয়ে গেছে যে ঠিক কী লিখব বুঝে উঠতে পারছি না।

এইটুকু বলতে পারি, আগোতা ক্রিস্টফ একটা অনন্য জিনিস লিখেছেন। তিনটে বইই (নোটবুক, প্রুফ, আর দ্য থার্ড লাই) প্রায় দেড়শো পেজ না তার চেয়েও কম, আর তিনটের সুরই একেবারে আলাদা। বিশেষ করে প্রথম বইটা পড়তে গিয়ে বোঝা যায়, এ আর চারটে বইয়ের মতো নয়।

আরেকটু খোলসা করি বলা যাক। প্রথম বই শুরু হচ্ছে হাঙ্গেরির সীমানার কাছে অবস্থিত একটা মফস্বলি টাউনে৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। এমন সময় এক রগচটা বদমেজাজি বুড়ির মেয়ে তার কাছে নিজের দুই জমজ ছেলেকে রেখে ফ্রন্টে যাওয়া স্বামীকে খুঁজতে যায়। এই ছেলেদুটো নেহাতই বাচ্চা, ডাইনিমার্কা দিদার কাঠখোট্টা মেজাজ আর অপরিষ্কার বাড়িঘরে তাদের টিকে থাকাই মুশকিল ছিল। কিন্তু ছেলেদুটো হাড় বিচ্ছু, বা বলা যায় শার্লকের মতো দুজন জিনিয়াস সাইকোপ্যাথ। তারা চটপট সব বুঝে নেয়, দিদাকে সিধা করে দেয়, নিজের পড়াশোনা খাওয়াদাওয়া হাইজিনের দায়িত্ব নিজে নিয়ে নেয়, প্রয়োজনে নিষ্ঠুর হতে বা দয়া দেখাতে দু'বার ভাবে না। দুই ভাই একদম হরিহর আত্মা, তারা দুজনে বিদঘুটে আর মারাত্মক সব কাজকম্মো করে, আর সব কথা লিখে রাখে একটা নোটবুকে। পড়তে গিয়ে প্রথমে মনে হবে এমন ড্রাই ফ্যাক্ট মার্কা লেখা কেন? না বর্ণনা, না ন্যারেটিভ, না ইমোশন, স্রেফ ফ্যাক্ট, স্রেফ অ্যাকশন! "আমরা বালির বস্তা দিয়ে ছেলেটাকে পেটালাম। সকালে আমরা ঘাস কাটি। দিদা চান করে না। তার গায়ে পচা গন্ধ। আমাদের মুখ ধোয়ার জায়গা নেই..." তিরিশ চল্লিশ পাতা পড়ে বোঝা যায় আসলে আমরা ওই নোটবুকটাই পড়ছি। প্রথম বইটা এমন চমৎকার ভাবে একটা ডার্ক গল্প বলেছে যে সব ভুলে পড়ে যেতে হয়। প্রায় থ্রিলারের ভঙ্গিতে গল্প এগিয়ে চলে। এরই মধ্যে হাঙ্গেরির গ্রাম্য জীবন, যুদ্ধের পরিবেশ, সংস্কৃতি সবই ধরা পড়ে যায়। বইটা এমন একটা জায়গায় শেষ হয় যে পরের বইটা না পড়ে উপায় নেই।

পরের বই 'দ্য প্রুফ' পড়তে গিয়ে দেখি লেখিকা ভোল পাল্টেছেন। প্রথম বইতে প্রায় নিয়ম করে কোনও জায়গা বা চরিত্রের নাম আসেনি, দ্বিতীয় বইতে তা পুরোমাত্রায় আছে। ন্যারেটিভ আছে, বর্ণনা আছে। সব আছে। কিন্তু গল্প শেষ হতে হতে মাথাটা একেবারে ভোম্বল হতে শুরু করে! এই মন খারাপ হচ্ছিল, এই রোমাঞ্চ হচ্ছিল, এই রহস্য সমাধানের কথা ভাবছি, তারপর সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে! প্রায় একটা ক্লিফহ্যাঙ্গারে দাঁড় করিয়ে দ্বিতীয় বই শেষ হয়।

তৃতীয় বইতে এসে আগোতা ক্রিস্টফ প্রায় "ধুত্তোর! আউট হলে হব, চালিয়ে খেলো!" বলে যে ধুন্ধুমার চারছয় মার‍তে শুরু করলেন, তাতে আমি হাঁ। ধরুন, একটা বই পড়লেন। গোটা বই ধরে মোসাদের স্পাই একটা বিশাল রহস্যের সমাধান করল। শেষে গিয়ে জানা গেল, পুরোটাই সে স্বপ্ন দেখছিল, কিন্তু স্বপ্নটায় কিছু কিছু সত্যিও আছে। কোনটা বাস্তব কোনটা অবাস্তব বোঝার চেষ্টা করতে করতেই আপনি আবিষ্কার করলেন, আপনার চোখ থেকে জল পড়তে শুরু করেছে। ভেবেছিলেন হাঁদাভোঁদা পড়ছেন, এদিকে বইটা হিস্টোরিকাল নভেল হয়ে, সাইকোলজিকাল মিস্ট্রি হয়ে থ্রিলার হয়ে আপনাকে কাঁদিয়ে ফেলছে। বই শেষ হতে হতে এমন একটা বিষাদ, এমন এক মেলানকলিক আমেজ এসে জুড়ে বসে যে পাঠক চুপ করে বসে থাকে।

আগোতা ক্রিস্টফ এই ট্রিলজিতে মানুষের নিয়তি আর যুদ্ধের বিপর্যয় এর মাঝামাঝি এমন এক আশ্চর্য গল্প বুনেছেন, যা আগে থেকে বোঝার বা অনুভব করার কোনও উপায়ই নেই। কিন্তু পড়তে পড়তে একসময় বোঝা যায়, লেখিকা পরিকল্পনা করে বা না করে ঠিক সেটাই করেছেন, ঠিক সেভাবেই বইটাকে লিখেছেন, যা হয়তো এই বইটার নিয়তিতে ছিল। দ্য স্টোরি ওয়াজ সাপোজড টু বি দিস!

I answer that I try to write true stories but that at a given point the story becomes unbearable because of it’s very truth, and then I have to change it. I tell her that I try to tell my story but all of a sudden I can’t-I don’t have the courage, it hurts too much. And so I embellish everything and describe things not as they happened but the way I wished they happened.

She says, “Yes, there are lives sadder than the saddest of books.” I say, “Yes. No book, no matter how sad, can be as sad as a life.

হাইলি রেকামেন্ডেড! সম্ভব হলে পড়ে ফেলুন।

দ্য নোটবুক ট্রিলজি
গ্রেভ প্রেস


মঙ্গলবার, ৬ আগস্ট, ২০২৪

কোরিয়া, কবিতা, কল্পবিজ্ঞান ও ক্যানোপি (এবং কিছু খুচরো স্বপ্ন)

 


রিসেন্ট পড়া জার্নালিস্টিক নন-ফিকশন বইয়ের মধ্যে সেরা তো বটেই, কলমের জোর থাকলে একটা হার্ডকোর পেজ টার্নার নন-ফিকশন অ্যাকাউন্ট কীভাবে মন খারাপ করা আর মন ভালো করা কতগুলো হিউমান স্টোরিতে বদলে যেতে পারে, সেটা জানতে হলে এই বইটা পড়া দরকার।

পুনশ্চ: যারা কে-ড্রামা 'ক্র‍্যাশ ল্যান্ডিং অন ইউ' দেখে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন আর উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে আরো ভালো করে জানতে চান, অতি অবশ্যই পড়ুন।

(দশে কুড়ি)


বুকার লংলিস্টে থাকা একটা বই... বিষয়বস্তু দেখেই মাথা ঘুরছে। এই এক লেখক, বিষয় নির্বাচনেই বাজিমাত করে দেন। প্রতিটি বই অন্য লেভেল। লংলিস্টের বারোটা বইয়ের বিষয়বস্তু একদিকে, রিচার্ডবাবু একদিকে। ভালো মন্দ তো পরের কথা।

এটা পড়লেই চলে যাবে🌹

হরিণী নাগেন্দ্র পাঠকমহলে বিখ্যাত ব্যাঙ্গালোর ডিটেকটিভ সোসাইটি সিরিজের জন্য। কিন্তু এ বাদেও তিনি এই সময়ের অন্যতম এক ইকোলজিস্ট, আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর নামডাকও আছে। দেখে ভালো লাগে ফিকশনের পাশাপাশি হরিণী সমানে পরিবেশ নিয়ে কাজ করে চলেন। কনজার্ভেশনিস্ট সীমা মুন্দোলির সঙ্গে আগের বছর 'শেডস অফ ব্লু' বলে একটা বই এসেছে, সেটা দেখে মনে পড়ল এই বইটা মিস হয়ে গেছে, ব্লসমসে গিয়ে নেব নেব করে আর নেওয়া হল না, তারপর ব্যাঙ্গালোর যাওয়াই হয়নি। এখন পড়তে গিয়ে যেটা সবচেয়ে ভালো লাগছে, সেটা হল যত্ন। ও জিনিসটার আজকাল বড়ই অভাব দেখি। এই মাঝারি বইটায় হরিণী আর সীমা এমন সুন্দর যত্ন করে আর্বান ট্রি আর পরিবেশের কথা লিখেছেন, বই পড়ছি বলে মনে হয় না। গাছেদের বিজ্ঞান আর বট, জাম, তেঁতুল ইত্যাদি থেকে শুরু করে জীবজন্তু, সামাজিক আচার, রান্নাবান্না, খেলাধুলো সব কিছুই মিশে গেছে সাবলীলভাবে। পাম আর ইউক্যালিপটাস নিয়ে এত লাফালাফি কেন, চিল আর পানকৌড়ি হারিয়ে যাচ্ছে কেন, ব্যাঙ্গালোর সহ ভারতের সমস্ত শহরে হিট আইল্যান্ড এফেক্ট কীভাবে কাজ করে, গোটাটাই ছিমছাম ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। সুন্দর কিছু ইলাস্ট্রেশন আছে, দেখে বেশ লাগে। বাড়িতে গাছপালা লাগানোর শখ থাকলে কিনে ফেলুন৷ বা বন্ধুবান্ধবদের উপহার দিন। 


মাঝে মাঝে এমন একটা বই পড়ে ফেলি, যে বুঝতেই পারি না ঠিক কীভাবে আর সি এ করব?

মার্টিন ম্যাকিন্স-এর 'In Ascension' এমন একটা সাইফাই, যা পড়ে অনেকেই 'ধুস! কী ফালতু!/ঘুম পেয়ে গেল/এর চেয়ে ভালো আমি লিখি!" করে উঠবে! অনেকে ভীষণ তারিফও অবশ্য করবেন, বাকিরা আমার মতো সম্মোহিত হয়ে, বইটা গোগ্রাসে গিলবে ঠিকই, কিন্তু ভালো লাগল না লাগল না খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে না। কারণ, দে আর ইন শক।

বলে রাখা ভালো ম্যাকিন্সনের লেখা খুব একটা ডিস্টিংটিভ কিছু নয়, বরং বেশ সহজ সরল সাবলীল, আর সেইজন্যই বইটা শুরু করে আর থমকাইনি। আধুনিক সায়েন্স ফিকশনে যা যা থাকতে পারে, বায়োটেক থেকে স্পেস রিসার্চ, মলিকিউলার বায়লোজি থেকে আন্ডারওয়াটার অর্গানিজমের খুঁটিনাটি, সব কিছুই আছে, কিন্তু কোথাও যেন বইটা একটা ওল্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাডভেঞ্চারের মোড়কে শুরু হয়েছে আর সেই মোড়কটা প্রায় বারো আনা জুড়ে বজায় রেখে গেছে। হাই স্ট্রেস ড্রামা, একের পর এক অমীমাংসিত প্রশ্ন, ম্যারিন বায়োলজিস্ট প্রোটাগোনিস্ট এর ট্রমাটাইজিং শৈশব.. এসব নিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়া এগিয়ে যায়।

এরপর আচমকা একটা জায়গা আসে, ম্যাকিন্স একেবারে কোর্স চেঞ্জ করে সাইফাইকে ডকে তুলে গল্পকে এমন এক মেলানকলিক কম্পোজিশন দিয়ে ফেলেন যে বেশিরভাগ পাঠক ঘাবড়ে যায়, বাকিরা মুগ্ধ হয়ে পড়ে চলে। খুব লজ্জা করছে বলতে, কারণ আমি সেকেন্ড দলে। বিচারবুদ্ধি দিয়ে ভাবলে বলা উচিত ছিল, "এটা কী হল দাদু? গল্পের সমস্ত রহস্য ভুলে, সব অজানা প্রশ্ন মাথায় তুলে এখন তুমি সাহিত্য করছ? সারিয়েলিজম করতে হলে স্পেসটাইম নিয়ে গল্প ফাঁদার কী দরকার বাপু, কবিতা লিখতে, ছবি আঁকতে!"

কিন্তু. কিছুই বলা হল না, কারণ লেখক এতক্ষণে আমাকে পুরোপুরি বশ করেছেন। স্পেকফিক বা রহস্য কাহিনিতে সোশ্যাল ড্রামা ঢোকালে আমি বহুত বিরক্ত হই, কিন্তু 'In Ascension' এমন এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছে যে আমি স্পিকটি নট থাকতে বাধ্য হচ্ছি। এই লিটারারি সাই-ফাই সোজা কথায় আমাকে ক্লিন বোল্ড করল, প্রায় কুড়ি পার্সেন্ট গল্প, হাজার খানেক অনুত্তরিত প্রশ্ন, আর পুরোপুরি ওপেন এন্ডেড একটা এন্ডিংও আমাকে সেই জায়গা থেকে সরাতে পারল না।

পুনশ্চ: বইতে প্রচুর আন্ডার দ্য লাইন ইস্টার এগ আছে। একটা বই লেখার পিছনে কত চিন্তাভাবনা থাকে, কত না বলা ভাবনা থাকে, বাংলার সীমিত বাজারে সেই নিয়ে আলোচনা হয় না। দেখে ভালো লাগে ইংরেজিতে এমন পাঠক বহু আছেন যারা ঠিক খটকা লাগলে এক একটা জায়গা ধরে রীতিমত রিসার্চ করে রেফারেন্সগুলো টেনে বার করেন। বইয়ের নাম আর নায়িকার নামের পিছনেই একটা ভীষণ ইন্টারেস্টিং গল্প আছে, বইটা পড়লে কেউ চিন্তাভাবনা করে দেখতে পারেন। বই শেষ করার পর দেখলাম রিসেন্টলি বইটা আর্থার সি ক্লার্ক পুরস্কার জিতে ফেলেছে। 


আমি সাধারণত এক সময়ে পাঁচ ছ'টা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করি। অসম্ভব ধীরে ধীরে পড়ি, এক একটা শেষ করতে কয়েকমাসও লেগে যায়। তার অধিকাংশই পোস্ট করার প্রয়োজন মনে করি না, করে লাভ কী? কিন্তু এরই মধ্যে কিছু কিছু কাজ থাকে, পড়ে মনে হয়-- 'ইস! এত যত্ন করে লিখেছেন, বিশেষ কেউ জানতে পারেনি!' একটা পোস্ট দিলে যদি একজন দুজনও কিনে পড়ে ! বছর চারেক আগে অব্দি বাংলায় এরকম কিছু কিছু বই পড়ে পোস্ট দিতাম, এখন বাংলা বই হাতে পাওয়াই কঠিন হয়ে গেছে।

তবু দু এক সময় মনে হয়, অমুক বইটা এত যত্ন করে করা, কেউ খেয়ালই করছে না! এরকম কত কত বই আছে! শুধু লিরিক্যাল বুকসেরই প্রচুর অনালোচিত বই আছে, প্রতিটাই সংগ্রহযোগ্য। ভাষালিপি, ধানসিড়ি, সৃষ্টিসুখের কত ভালো ভালো কাজ নিয়ে আলোচনা হয় না। কাফে টেবল বছর দুই ধরে নানারকম এক্সপেরিমেন্ট করেছে (খচ্চর সিরিজ বা গল্পকুঞ্জের মতো চমৎকার সংকলন পুনর্প্রকাশ), মৌহারি, অবভাস, সুচেতনার কিছু কিছু কাজ ছকভাঙা। এছাড়া অজস্র ছোট প্রকাশক তো আছেনই। প্রতিটা লেখকই চান তার বই নিয়ে প্রচার হোক, এতদিনের পরিশ্রম অন্তত একটু ভিসিবিলিটি পাক। প্রচারের নিরিখে দেখতে গেলে এই প্রত্যাশায় দোষের কিছু নেই, একটা বই লিখতে মুরাকামিকে যত পরিশ্রম করতে হয়, একজন অজানা লেখককে তার চেয়ে কম করতে হয় না। তবু, কিছু কিছু বই একেবারেই আড়ালে থেকে যায়, এই তাদের নিয়তি। সামান্য কয়েকজন পড়েন, বাকিরা জানতে পারেন না, আর 'মিসম্যাচ' হওয়া তো খুবই স্বাভাবিক। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে এমন হয়, বইটা সত্যিই যাদের ভালো লাগত, তাঁরাই বইটার কথা জানেন না।

যে বইটা পড়ে এই কথাগুলো বলতে ইচ্ছে হল, সেই বই বা লেখিকার কথা এক সপ্তাহ আগেও আমি জানতাম না। জ্যাকালিন হার্পম্যান বেলজিয়ামের লেখিকা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি হওয়ার মাশুল দিতে তাঁকে পরিবারসহ মরক্কোতে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। ফিরে যখন আসেন, দু তিন বার কেরিয়ার বদল করে অবশেষে সাইকো অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ফরাসিতে তাঁর বেশ কিছু বই আছে, কিন্তু এই বইটা বাদে কোনো বইই মনে হয় ইংরেজিতে অনুবাদ হয়নি। কেন হয়নি, জানি না। হয়তো হওয়ার মতো নয়, বা কেউ জানতে পারেনি। Moi qui n'ai pas connu les hommes ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হলেও অনেক আগেই লেখা শুরু হয়েছিল, যখন হ্যান্ডমেড টেল বা স্পেকফিক ডিস্টোপিয়ার কালজয়ী কাজগুলো সেভাবে সাড়া ফেলেনি। কিন্তু এই বইটা ইংরেজিতে আসতে আরো কয়েক দশক লেগে গেছে, আর তারপরও বইটা মেনস্ট্রিমে সেভাবে সাড়া ফেলেনি। হয়তো পাঠকদের পছন্দ হয়নি, অথবা সেই 'মিসম্যাচ'... কিন্তু এক ঘরানার পাঠক এই পাতলা (১২০-১৩০ পাতা হবে) বইটাকে যত্ন করে আগলে রেখেছেন, যথাসম্ভব প্রচার চালিয়েছেন। থ্যাংকস টু দেম, না পড়লে একটা অন্যরকম ইমোশনাল এক্সপেরিয়েন্স থেকে বঞ্চিত হতে হত।

ঠিক কী নিয়ে এই বই? সামারি দেখে বললে বলতে হয়--- একটা বাংকারে চল্লিশজন মেয়েকে সারাজীবন বন্দি করে রাখা হয়েছে, আচমকা একদিন সব পালটে যায়। ব্যস!

কিন্তু ওটুকু জেনে কিছুই বোঝা যায় না। আগেই বলে দিই, এই বইটা চিরাচরিত ডিস্টোপিক ফিকশন নয়। বরং যদি 'দ্য মেমোরি পুলিশ' পড়ে থাকলে কিছুটা সাযুজ্য পাওয়া যেতে পারে। এক ডেসপন্ডেন্ট ও ডেসোলেট কাহিনি, যেখানে একজন কিশোরী আবিষ্কার করছে, সে তাঁর শারীরিক, মানসিক অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানে না। যারা জানত, তারা আবার আবিষ্কার করছে, তারাও আসলে ঠিক জানত না। মনুষ্যজাতির চেতনা আর শুন্যতা ধরা পড়ে পদে পদে। কিন্তু এই 'ব্লিক' যাপনের বর্ণনা পড়তে পড়তে একসময় বোঝা যায়, লেখিকা কী ভীষণভাবে হতাশার ছদ্মবেশে একটা আশার গল্প বলে চলছেন। আবার উল্টোটাও বলা যায়! স্ট্রিম অফ কন্সিয়াশনেস জাতীয় ন্যারেটিভ নয়, বইটা পড়তে গিয়ে কোথাও হাই ওঠে না, কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই গতিশীল কাহিনির ডেপথ এতটাই বেশি যে চমকে উঠতে হয়। বিশেষ করে বইটা সেকেন্ড হাফে গিয়ে যে উচ্চতায় পৌঁছে গেল, সেটা লিখে বোঝানো কঠিন। অনেকদিন পর একটা বই মাত্র দু তিন সিটিং এ শেষ করে ফেললাম আর শেষ করেও ভুলে যেতে পারলাম না। যারা এই ধরনের বই পড়তে ভালোবাসেন, এই কাজটা মিস না করাই ভালো।


যখন স্ক্রিপ্ট কবিতা হয়ে পর্দায় ফুটে ওঠে...

পঞ্চাশ মিনিটের সিনেমা, প্রায় কেউই দেখেনি। মুবিতে ছিল একসময়, পরে আর পাইনি। আইএমডিবিতে শুধু একজন রিভিউ দিয়েছে। অচল মিশ্রা যে সিনেমা করছে সেইজন্যই অনেকের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। প্রায় সংলাপহীন একটা ছবি যে কত কিছু বলতে পারে, সেটা বোঝার জন্য এই জিনিসটা দেখা দরকার। এরকম ভিস্যুয়াল পোয়েট্রি পর্দায় তুলে আনা শেখাও যায় না, শেখানোও যায় না। তাজদার জুন্যায়েদের আবহসংগীত কাজটাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

ধুইন
অচল মিশ্রা

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০২৪

কমিক্সে ফরাসি নুয়া


Jean-Patrick Manchette ফরাসি ক্রাইম থ্রিলার লেখক হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত। তাঁর লেখা দুটো বই 'নো রুম অ্যাট দ্য মর্গ' আর 'নাদা' বহুদিন আগে মডার্ন ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই প্রতিভাবান লেখক মাত্র বাহান্ন বছর বয়সে মারা গিয়েছেন, কিন্তু সেই অল্পসময়ের মধ্যেই মঁসেত এমন একটা নিজস্ব দুনিয়া খাড়া করেছিলেন, শুধু নাম শুনে যার নাগাল পাওয়া মোটেও সম্ভব নয়। কয়েকমাস আগে খানিকটা ভাগ্যক্রমেই তাঁর বই 'থ্রি টু কিল' উপন্যাস নির্ভর একটা গ্রাফিক নভেল আমার হাতে এসে পড়ে, শিল্পী আর কেউ নন, বিডি কমিক্সের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী জ্যাক তার্দি। তার্দির সঙ্গে মঁসেতের সখ্য ছিল, তাঁরা দুজনে মিলে বেশ কিছু কাজ একসঙ্গে করেছিলেন। তার্দি এই বিশেষ বইটা, ফরাসিতে নাম Le Petit bleu de la côte ouest পড়ে সেটা কমিক্সে এনেছিলেন, ইংরেজি অনুবাদে সেটা 'ওয়েস্ট কোস্ট ব্লুজ' হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রাফিক নভেলটা পড়ে আমি যাকে বলে বোকা বনে যাই। তার্দি বলেছেন, মঁসেতের লেখা বা সংলাপ তিনি যতটা সম্ভব না বদলে রেখে দিয়েছেন, সংলাপেও বদল ঘটাননি, যাতে মেজাজটা হারিয়ে না যায়। কিন্তু আমার খুব ভরসা ছিল না, তাই পরে বইটা পড়েও দেখেছি। এরপর আমি পাগলা হয়ে মঁসেত-তার্দি জুটির স্ট্রিটস অফ প্যারিস:স্ট্রিটস অফ মার্ডার দুই ভলিউম পড়ে ফেললাম, কিন্তু ওয়েস্ট কোস্ট ব্লুজ আমার মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তার্দির আঁকা নিয়ে কিছু বলার যোগ্যতা নেই, কিন্তু মঁসেতের লেখা নিয়ে দু এক কথা বলে কিছুটা আন্দাজ দেওয়া যাক।


মঁসেতের দুনিয়া যাকে গ্রিটি, ডার্ক, অনাড়ম্বর, সেখানে ন্যাকামি আর আড়ষ্টতার কোনও জায়গাই নেই। গোয়েন্দা ফোয়েন্দা নিয়ে তিনি সাধারণত মাথা ঘামান না, কন্ট্র‍্যাক্ট কিলারদের জীবন নিয়েই লিখেছেন বেশি। এরই মধ্যে কিছু কিছু গল্পে এমন সব প্যারিসিয়ান বা অন্যান্য ছোটখাটো ফরাসি মফস্বলের চরিত্র ঢুকে পড়ে, যাদের জীবনও সেই তার্দির ছবির মতোই গ্রে, সাদাকালো, ডিপ্রেসিভ। যত বড় খুনেই হোক না কেন, কারো কোনও অপরাধবোধ নেই, আর থাকলেও সেই সবের বিন্দুমাত্র প্রকাশ নেই। এক একটা করে কাজ আসছে, মানুষ মরছে, টাকা পাচ্ছে, বন্দুকের যত্ন নিচ্ছে, সেক্স করছে, আবার কাজ আসছে, আবার মানুষ মারছে, ডাইনারে গিয়ে নির্বিকার মুখে বিয়ার খাচ্ছে, আবার বন্দুক পরিষ্কার করছে... নো কাব্য ফাব্য। তার চেয়ে বরং সোনামুখ করে বন্দুকের পরিচর্চা করা ভালো।

কিন্তু এরই মধ্যে, বিশেষ করে ওয়েস্ট কোস্ট ব্লুজে, মঁসেত প্রায় প্রতিটা সিনে এক একটা জ্যাজ গানের ডিটেল দিয়ে গেছেন। যতবার গাড়িতে ব্লুজ বাজছে, জানানো হচ্ছে কার কোন গানটা বাজছে! আর গান বাজছেও বটে! খুনের আগে, অ্যাক্সিডেন্টের পর, শুটআউটের মধ্যিখানে, প্যারিস থেকে পালানোর সময়, হাইওয়ে থেকে বাঁক নেওয়ার আগে... সর্বক্ষণ গান বাজছে! আর অন্য চারটে গল্পের চেয়েও এই বইটা একটু আলাদা, কারণ এই গল্পটাও কোনও কিলারের নয়, এক সাধারণ মানুষের যে কিনা এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছে! মঁসেতের লেখায় এমন একটা নির্লিপ্ত ভাব আছে, যা খাস ফরাসি তো বটেই, পাশাপাশি তাতে এক রুটিন লাইফের বিমর্ষতা চোখে পড়ে। মজার কথা হল, এই রুটিন লাইফ এক একজন পেশাদার খুনির। ফরাসি ক্রাইমের ভক্তরা অতি অবশ্যই মঁসেত পড়ুন, ঠকবেন না।