ফিচার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ফিচার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২১ মে, ২০২৫

লিন্ডবার্গ! তুমি আমাদের হিরো

 


আকাশ তখন কালো হয়ে আসছে। সন্ধ্যে নেমে গেছে। রুজভেল্ট ফিল্ডের বিমানবন্দরে একটি ছোট্ট সিঙ্গল-ইঞ্জিন বিমান দাঁড়িয়ে আছে, নাম 'স্পিরিট অফ সেন্ট লুইস'। সেই বিমানের পাশে একজন তরুণ পায়লট দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কিছুটা ক্লান্তি লেগে আছে, সবাই দেখে বুঝতেও পারছে সেটা। কিন্তু তার অদম্য সাহস সম্পর্কে লোকজনের বিশেষ ধারণা নেই। আজকের দিনে, ৯৮ বছর আগে একজন ২৫ বছরের তরুণ ইতিহাস রচনা করেছিল।

১৯২৭ সালের ২০ মে, শুক্রবার। চার্লস লিন্ডবার্গ মাসের পর মাস ধরে এই মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাঁর সামনে এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ-- সম্পূর্ণ একা, বিরতিহীন ভাবে অ্যাটলান্টিক মহাসাগর পার করে নিউইয়র্ক থেকে প্যারিসে যাওয়া। তখনও এরকম কোনও নজির ছিল না। কেউ এই অসম্ভব কাজ করতে এগিয়ে আসেনি। দু একজন চেষ্টা করেছিলেন বটে কিন্তু তাদের যাত্রা শেষ হয়েছিল অ্যাটলান্টিকের অতল জলে।

সকালে বৃষ্টি হয়েছে বেশ। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন যে ওয়েদার কন্ডিশনও ভালো নয়। বিমান ওড়ানোর জন্য তখনও আজও সবচেয়ে বড় বিপদ তাই, যা সেই যুগে ছিল। ঝোড়ো বাতাস নয়, বৃষ্টি নয়, বজ্রপাত বা পাখির ঝাঁক নয়, সেই বিপদের নাম কুয়াশা। হ্যাঁ, ঘন কুয়াশায় সেদিন ছেয়ে গিয়েছিল অ্যাটলান্টিক মহাসাগর, সেই কুয়াশা আরো বাড়বে বলে আবহাওয়াবিদরা বলছিলেন। কিন্তু লিন্ডবার্গ আর অপেক্ষা করতে পারছিলেন না। প্রথম ব্যক্তি যিনি নিউইয়র্ক থেকে প্যারিসে অবিরাম ৩,৬০০ মাইল উড়ে যাবেন তার জন্য ২৫,০০০ ডলার পুরস্কার বরাদ্দ আছে। বেশিদিন হলে এত পায়লট চলে আসবে যে একটা অভিযান অবশেষে মানি মেকিং রেসে পরিণত হবে। লিন্ডবার্গ সেটা চান না। তিনি সাফল্য চান ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চান এই যাত্রার রোমাঞ্চতা অনুভব করতে, যে রোমাঞ্চ তাঁর আগে কেউ অনুভব করতে পারেনি।

লিন্ডবার্গ মনে মনে নিজেকে বললেন, "সময় হয়েছে বাছা। এইবার হয় বাঁচবি, নয় মরবি। কিন্তু যাই হোক না কেন, না লড়ে মরিস না বুঝলি।"

শেষবারের মতো তাঁর বিমানের চারপাশে হেঁটে প্রতিটি যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করলেন তিনি । 'স্পিরিট অফ সেন্ট লুইস' দেখতে সাধারণ ---আগে তাঁর নাম ছিল Ryan NYP, কাস্টম বিল্ট, মোনোপ্লেন, একজন বসতে পারে, ইঞ্জিনও একটা। রেকর্ড করার জন্য খুব কাজের বিমান নয়। কিন্তু লিন্ডবার্গ বিশেষ নকশা তৈরি করে তাঁর যাত্রাপথটিকে বিশ্লেষণ করেছেন। বারবার করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, এই প্লেনই সবচেয়ে বেস্ট। হালকা, জ্বালানিও কম লাগে, নেভিগেট করতে পারলে অনায়াসে এই বিমান ৩,৬০০ মাইল যেতে পারে।

পায়লট কেবিনটা ছোট, একমাত্র সামনের দিকে একটি ছোট্ট জানালা। লিন্ডবার্গ ঠিক করেছিলেন অতিরিক্ত জ্বালানির জন্য বাড়তি জায়গা রাখতে হবে, সকলে সাধাসাধি করার পরও ইমারজেন্সি কো-পায়লট নিতে রাজি হয়নি। আয়োজকদেরও ফিরিয়ে দিয়েছেন। আশ্চর্য কথা হল, তাঁর সঙ্গে কোনও রেডিওও ছিল না, সেক্সটেন্ট ছিল না, এমনকি একটি ম্যারিন কম্পাসও ছিল না-- কেবল সাধারণ যন্ত্রপাতি আর তাঁর ইন্সটিংক্ট। এতটুকুই সম্বল।

সন্ধ্যা ৭:৫২ মিনিটে লিন্ডবার্গ তাঁর চামড়ার জ্যাকেট পরলেন, মাথায় একটি ক্যাপ লাগালেন, তারপর ফ্লায়িং কেবিনে উঠে পড়লেন। উপস্থিত ভিড় তাকে উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলে বিদায় জানাল। ট্যাক্সিওয়েতে যাওয়ার আগেই বিমানের চাকা কাদায় আটকে গিয়েছিল, বোঝো! তারপর 'স্পিরিট অফ সেন্ট লুইস'-এ এত জ্বালানি ভরা হয়েছে যে ওজন বেশি হয়ে গেছে। অনেকে বাজি রেখেছিল প্লেন আজ মাটিই ছাড়বে না। এক মাইল লম্বা রানওয়েতে বিমানটি বারবার ঝাঁকুনি খেতে খেতে দুলতে দুলতে এগোচ্ছিল। ভিড় তখন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে।

শেষ মুহূর্তে, যখন সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছে, 'স্পিরিট অব সেন্ট লুইস' একদম সাঁই করে মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে গেল, আর কয়েক ফুট এগোলেই প্লেনটা সোজা গিয়ে দেওয়ালে ধাক্কা খেত। লিন্ডবার্গ কোনোরকমে প্লেনটা সমুদ্রের ওপর নিয়ে গেলেন। এরপর আসল সফর শুরু হল।
লং আইল্যান্ড ছেড়ে, তিনি উত্তর-পূর্ব দিকে উড়ে চললেন, নিউ ইংল্যান্ড উপকূল ধরে, কেপ কড পার করে, ফিশিং জাহাজগুলো পিছনে রেখে নোভা স্কটিয়া পর্যন্ত ঠিকঠাক রুটে উড়ে গেল প্লেনটা। সূর্য ডুবে যাযে একটু পরেই। লিন্ডবার্গও জানতেন যে সামনে শুধু অন্ধকার, এবং অ্যাটলান্টিক মহাসাগর। অনন্ত জলরাশি, যেখানে বহু দুরন্ত পায়লটের সলিল সমাধি হয়েছে।

রাতের দ্বিতীয় প্রহর পেরোলে প্রথম সমস্যা দেখা দিল। লিন্ডবার্গ লক্ষ করলেন যে তাঁর বিমানের উপরে বরফ জমা হচ্ছে, ইঞ্জিনের উপর চাপ বাড়াচ্ছে স্নোফ্লেক্স। ফলে তাকে আরও নিচে দিয়ে উড়তে হবে। কিন্তু সে আরও ঝুঁকির কাজ। প্রায় সমুদ্রের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া, বাতাস আরো বেশি গরম থাকে বলে স্নোফ্লেক্স জমবে না ঠিকই কিন্তু ঝড় উঠলে আর দেখতে হবে না। বিপজ্জনক হলেও আর কোনও পথ খোলা ছিল না, ফলে সেই সিদ্ধান্ত নিতেই হল। আর পড়বি তো পড় সেই বাঘের মুখেই পড়তে হল, কারণ একটু পরেই সমুদ্রের ওপর ভীষণ ঝড় শুরু হল। লিন্ডবার্গ দাঁতে দাঁত চেপে নেভিগেশন সামলাতে লাগলেন। সামনে বিপদ, কিন্তু রোমাঞ্চের এই মুহূর্তগুলো তাকে যে 'কিক' দিচ্ছে, সেটাও তো মিথ্যে নয়। রোমাঞ্চ লিখলে সবাই অ্যাড্রেনালিন রাশের কথাই ভাবে, কিন্তু ঝুঁকি আর রোমাঞ্চে আসলে মানুষের মনোনিবেশ বাড়ায়, তাকে শান্ত করে, পরিণত করে, স্থিতিশীল করে। লিন্ডবার্গও এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছিলেন।

ওদিকে, স্নো ফ্লেক্সের চেয়েও বড় সমস্যা আছে, সেটা হল ঘুম। লিন্ডবার্গ আগের রাতে ঘুমাতে পারেনি উত্তেজনায়, নাগাড়ে তিরিশ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জেগে আছেন তিনি। শুনলে মনে হয়, এ আর এমন কি, একদিনের ব্যাপার, জোর করে জেগে থাকলেই হল। কিন্তু এরকম হাই স্ট্রেস মোমেন্টে মানুষের ইন্দ্রিয় মর্জিমতো কাজ করে না। ক্লান্তির সীমা অতিক্রম করে গেলে আমি মানুষকে পাহাড়ে চড়ার সময়েও ঘুমিয়ে পড়তে দেখেছি। লিন্ডবার্গও লড়াই করছিলেন চোখ খোলা রাখতে। কখনও কখনও তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তারপর আবার জেগে উঠছেন, প্লেনের রুট ঠিক করে নিচ্ছেন। একবার তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে গাছের উপর দিয়ে উড়ছেন। অ্যাটলান্টিকের মাঝখানে গাছ আসবে কী করে? কিন্তু ক্লান্তির চরমে পৌঁছে গেলে মানুষ মরুভূমি কেন, প্লেনেও মরীচিকা দেখে।

ঘুমের সঙ্গে লড়াই করতে করতে, লিন্ডবার্গ নিজেকে কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি নিজের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন, তারপর গান গাইলেন, সব শেষ হলে মেঘের ছায়াগুলোকে কল্পনার প্রাণীতে পরিণত করে ছড়া বাঁধলেন। সময় কাটাতে হবে, আর ঘুমালেও চলবে না। আর একা থাকার ভাবনাটা মাথায় ভর করলে আরো বিপদ। সময়ে সময়ে তিনি বিমানের জানালা খুলছিলেন যাতে ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগুক, যাতে তিনি জেগে থাকতে পারেন।

একসময় ভোরের আলো ফুটল। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। সূর্য উঠছে, আকাশ রক্তিম হয়ে উঠছে লিন্ডবার্গের মনোযোগ পুনরুজ্জীবিত হল। তিনি এইবার একটি জাহাজ দেখতে পেলেন, অ্যাটলান্টিকের ওপর দিয়ে চলেছে! মানবসভ্যতার এই চিহ্ন দেখে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। বিমানটাকে নামিয়ে আনলেন অনেক নিচে, জাহাজের কাছাকাছি উড়তে উড়তে জিজ্ঞাসা করলেন "এটা কোথাকার জাহাজ?" জাহাজের চালক দল অবশ্য তাঁর কথা বুঝতে পারল না।

আয়ারল্যান্ডের উপকূল দেখা দিল যখন লিন্ডবার্গ ২২ ঘণ্টা ধরে উড়ে চলেছিলেন। তিনি ঠিক পথেই ছিলেন! অবশেষে, ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে ফ্রান্স দেখতে পেলেন তিনি। সেকালে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর-- আলোর শহর প্যারিস, দেখেই মনের ভিতরেও একটা আলো জ্বলে ওঠে।

সন্ধ্যা ১০:২১ মিনিটে, ২১ মে, ১৯২৭ তারিখে, ৩৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট উড়ানের পর, চার্লস লিন্ডবার্গ Le Bourget Aerodrome-এর ট্যাক্সিওয়েতে ল্যান্ড করেন। তিনি ভেবেছিলেন এইবার একটা দোকানে গিয়ে কিছু খাওয়াদাওয়া করতে হবে, তারপর ঘুমাবেন। কিন্তু সে সব কিছুই হয়নি। লক্ষাধিক ফরাসি তাঁর বিমানকে ঘিরে রেখেছিল, চিৎকার করে বলছিল, "লিন্ডবার্গ! লিন্ডবার্গ! তুমি আমাদের হিরো। তুমি পেরেছ, আমরাও পারব।"

সেই উন্মাদনার বহর এমন ছিল যে লোকজন তাঁর বিমানে উঠে ছোট ছোট অংশ ভেঙে নিয়ে যাচ্ছিল স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে। সৈন্যরা খুব কষ্টে তাঁকে ঢেকেঢুকে একটা হ্যাঙ্গারে নিয়ে গেল। ফরাসি পায়লটরা তাঁকে কাঁধে নিয়ে ঘোরাতে শুরু করল এরপর। লিন্ডবার্গ ৩৩ ঘণ্টা ধরে একাকী উড়ে আসার পর সহসা দুনিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষে পরিণত হলেন। অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছেন তিনি। একজন সাধারণ মেল পায়লট, ৩৩ ঘণ্টা ধরে একা উড়ে যে বাধা অতিক্রম করেছে, সেটা একটা রেকর্ড ভাঙার জন্য নয়। এই ঘটনাটা গোটা এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিকে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করেছিল। ইতিহাসের সেই মুহূর্তে, মানুষের মনে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল। লিন্ডবার্গের এই যাত্রা আধুনিক বিমান চলাচলের যুগের সূচনা করেছিল, এবং প্রমাণ করেছিল যে অ্যাটলান্টিক পাড়ি দেওয়া কেবল সম্ভবই নয়, বরং বাণিজ্যিকভাবেও বাস্তব। ৩,৬০০ মাইল, ৩৩.৫ ঘণ্টা, এবং একটি তরুণ পায়লটের অদম্য সাহস… দুনিয়া বদলাতে এইটুকুও কম নয়।

কাল, সেই ঘটনার আটানব্বই বছর পর একটা বিশেষ বই প্রকাশিত হল। সেই বইয়ের একটা ছবি। ঘটনাটা বিশদে পড়তে হলে লিন্ডবার্গের আত্মজীবনী তো আছেই।

শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৫

উইন্ডটকার্স

 


নেজ জন্মেছিল নিউ মেক্সিকোর চেকারবোর্ড অঞ্চলে। ইন্ডিয়ান নেটিভদের পরিবার, বাবা মা দুজনেই মেষপালক, দিন চলে কষ্টেসৃষ্টে। কিন্তু দারিদ্র‍্য নিয়েও দিন কাটানো যায়, যদি বাবা মায়ের হাত থাকে মাথার ওপর। দু মুঠো চাল থুড়ি ব্রেড মাংস জুটেই যাবে কোনওক্রমে৷ কিন্তু সে যুগে ওইটুকু সৌভাগ্যও অধিকাংশ নেটিভ ছেলেদের হত না। কড়া নিয়ম মেনে ইন্ডিয়ান দম্পতিদের ছেলেদের প্রায় জোর করেই বাড়ির লোকের চেয়ে দূরে সরিয়ে ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থায় দীক্ষিত করার জন্য বোর্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হত। উদ্দেশ্য সহজ, ইন্ডিয়ানদের তাদের শিকড় থেকে আলাদা করে দেওয়া, তাদের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে আধা মার্কিনি সাহেবে বদলে দেওয়া, যাতে অতীতের মতো ইন্ডিয়ানরা কখনও তাদের অধিকার নিয়ে লড়তে না আসে, মুখ বুজে সাদা চামড়ার কথা মেনে নেয়। তবে এই বদল শুধু খাতায় কলমেই ছিল বলাবাহুল্য। প্রত্যেক নেটিভ ইন্ডিয়ানকেই ভালোরকম বুলিং আর নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হতে হত, তাদের ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে খোঁটা শুনতে হত দিনরাত, মারও খেতে হত আকছার৷ মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই! অনেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত, কিন্তু ধরা পড়লে কঠিন শাস্তি, আর সেক্ষেত্রে পড়াশোনার সুযোগও আর পাওয়া যাবে না। নেজ দাঁতে দাঁত চেপে ঠিক করল, সে সব সহ্য করে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে, কিছুতেই হার মানবে না।
সময় কাটে। নেজ শত বাধাবিপত্তি বৈষম্যকে অতিক্রম করে পড়াশোনা শেষ করে। তার মন সংকীর্ণ ছিল না। তার উপজাতির মানুষের সঙ্গে কত অন্যায় অবিচার হয়েছে সে কথা মনে না রেখে সে দেশের কথা ভেবে ইউ এস ম্যারিনে জয়েন করে।
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। পার্ল হার্বারে জাপানি আক্রমণের পর মার্কিনি সেনায় সাজো সাজো রব। আটলান্টিকের তীরে মিত্রশক্তির সৈন্য আর প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে মার্কিন নৌবহর— সর্বত্র যুদ্ধের আঁচ। একদিকে জার্মানির হিটলারের নাৎসি বাহিনী, অন্যদিকে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। মিত্রশক্তির কাছে তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেদের মধ্যে সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা। কারণ, রেডিও কমিউনিকেশন ইন্টারসেপ্ট করায় জাপানিদের সমকক্ষ কেউ ছিল না। যতই এনক্রিপ্টেড মেসেজ হোক না কেন, যতই গোপন সংকেত ব্যবহার করা হোক না কেন, জাপানিরা ঠিক বুঝে ফেলত, তাই যুদ্ধক্ষেত্রে অ্যালাইড পাওয়াররা মোটেও সুবিধা করতে পারছিল না। সব স্ট্র‍্যাটেজির কাট জার্মান আর জাপানিরা আগে থেকেই ভেবে রেখেছে। ঠিক এমন সময় একদল ছেলের আগমন হল, যারা বদলে দিল যুদ্ধের গতিপথ। তাঁরা হলেন নাভাজো কোড টকার (Navajo Code Talkers)।
তখন ১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরোদমে চলছে। মার্কিন নৌ-বাহিনীর একের পর এক সামরিক পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। এমন সময় ফিলিপ জনস্টন নামের এক ব্যক্তি মার্কিন মেরিন কোরের কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে এলেন। জনস্টন ছিলেন মিশনারির সন্তান। তিনি ইন্ডিয়ান নাভাজোদের মধ্যে বড় হয়েছেন এবং তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, নাভাজো ভাষায় একটি কোড তৈরি করা হোক, যা ব্যবহার করে ইউ এস ম্যারিনরা নিজেদের মধ্যে নিরাপদে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারবে।
নাভাজোদের কথা উঠতে নেভি কর্তাদের মনে পড়ল, তাদের ইউনেটেই তো এমন বেশ কিছু ছেলেমেয়ে আছে। নেজ বলে যে ছেলেটাকে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোর্ডিংয়ে পাঠানো হয়েছিল, সে খুবই দক্ষ ম্যারিন। নাভাজো ভাষা তো জানেই, ইংরেজিতেও বলতে পারে গড়গড় করে। প্রযুক্তিগত জ্ঞানও চমৎকার। ফিলিপ জোরাজুরি করলে তাকে সঙ্গে করে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করাই যায়। কিন্তু সেই নিয়ে খুব একটা ভরসা কারোরই ছিল না। নেটিভ ইন্ডিয়ানদের ওপর এমনিতেও সেকালে কেউ বিশেষ ভরসা করত না।
ফিলিপ অবশ্য জানতেম, এই ছেলেগুলোর জবাব নেই। তারা সাহসী, বুদ্ধিমান, ডেডিকেটেড। নাভাজোদের ভাষাও অত্যন্ত জটিল, তার কোনও লিখিত রূপও নেই। এই ভাষার জটিলতা এবং সীমিত ব্যবহারই সেটাকে কোড হিসেবে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত করে তুলবে। কারণ, জাপানিদের পক্ষে এই ভাষা বোঝা প্রায় অসম্ভব।
মার্কিন ম্যারিন কোর প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান ছিল, কিন্তু ক্ষিদে পেলে বাঘে ঘাস খায়। বিপাকে পড়ে তারা জনস্টনের প্রস্তাবে রাজি হয়। শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। নেজ এবং উনত্রিশজন নাভাজো তরুণকে নির্বাচন করা হল, যাদের কাজ ছিল ম্যারিন কোরের জন্য একটি নতুন কোড তৈরি করা। এই উনত্রিশজন যোদ্ধা ছিল নাভাজো কোড টকারের প্রথম প্রজন্ম।
নেজ ও অন্যান্য নাভাজো ম্যারিন তরুণ মিলে এমন একটি জটিল কোড তৈরি করল, যেখানে দৈনন্দিন ব্যবহৃত শব্দগুলোর বদলে সামরিক পরিভাষা ব্যবহার করা হত। উদাহরণস্বরূপ, 'বোমা' বোঝাতে নাভাজো ভাষায় 'ডাহে-ডী-টিন-ডী' (da-he-di-tih-hi) শব্দটি ব্যবহার করা হতো, যার অর্থ 'ডিমের মতো'। একইভাবে, 'সাবমেরিন'-এর জন্য ব্যবহার করা হতো 'বে-লো-হানা' (besh-lo-cha-ah), অর্থাৎ 'লোহার মাছ'।
এই কোড এতটাই জটিল ছিল যে খোদ নাভাজোরাও, যারা এই কোড তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল না, এর কিছুই বুঝতে পারত না।
কাজ সেখানেই শেষ নয়। ফ্রন্টে পাঠানোর আগে এই কোড টকারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হল নানাভাবে। নেজ যোগ দিল প্যাসিফিক ওয়ারে মোতায়েন গুয়াদালকানাল ইউনিটে। এতদিন শুধুই ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে কাজ হচ্ছিল, এইবার হাতেকলমে তার ব্যবহার শুরু হল, নাভাজো কোড টকাররা সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে শুরু করল। তাদের কাজ ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে সংকেত ট্রান্সমিট এবং রিসিভ করা। নাভাজো কোড টকাররা এতটাই দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে কাজ করত যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ইউনিটটা ম্যারিনদের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠল।
সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাভাজো কোড টকারদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা প্রশান্ত মহাসাগরের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। গুয়াদালক্যানাল, তারাওয়া, ইওজিমা এবং ওকিনাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোতে তাদের পাঠানো সংকেতের ওপর নির্ভর করেই মার্কিন সেনারা কৌশল নির্ধারণ করত।
ইওজিমার যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে নাভাজো কোড টকাররা আটশোর বেশি বার্তা পাঠিয়েছিল, যার একটিও ভুল ছিল না। এই নির্ভুল যোগাযোগ ব্যবস্থা ম্যারিন সেনাদের দ্রুত যুদ্ধ জিততে সাহায্য করেছিল।
মেজর হাওয়ার্ড কনর, যিনি ইওজিমার যুদ্ধে নাভাজো কোড টকারদের সিগন্যাল অফিসার ছিলেন, বলেছিলেন, "যদি নাভাজোরা না থাকত, তাহলে ম্যারিন সেনারা কখনোই ইওজিমা দখল করতে পারত না।" জাপানি সামরিক বিশেষজ্ঞরা সব ধরনের চেষ্টা করেও এই কোড ভাঙতে ব্যর্থ হন।
বলাবাহুল্য, নেজ এই সমস্ত কিছুর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিল। এনক্রিপশন আর ডিক্রিপশনে তার মতো দক্ষ বিশেষ কেউ ছিল না, কিন্তু এর পাশাপাশি নেজের অবজার্ভেশনাল পাওয়ারও ছিল সাংঘাতিক। একবার সে যা দেখত, সে তার মাথায় ছাপা হয়ে যেত। ভাগ্যিস, কারণ যুদ্ধের বহুবছর পর নেজ 'কোড ব্রেকার' বলে একটা বই লিখবে, যা পড়ে নাভাজো সংস্কৃতি আর যুদ্ধে নাভাজো কোড টকারদের ভূমিকা সম্পর্কে বিশদে জানা যাবে৷ জাপানি সৈনিকদের ডু অর ডাই অ্যাটিটিউড নিয়েও তিনি ডিটেলে লিখেছেন।
"The Japanese who held Guadalcanal were trained not to surrender. Their war strategy revolved around the Bushido code, an ancient way of the warrior first developed by the Samurai. This code of conduct extolled loyalty and obedience. Soldiers were required to fight to the death and take as many of their enemy with them as they could. Even facing impossible odds, Japanese soldiers chose to blow themselves up hoping to blow American soldiers up rather than surrender. They would die for their Emperor."
যুদ্ধের পর বহু বছর পর্যন্ত নাভাজো কোড টকারদের প্রোগ্রামের ইনফর্মেশন গোপন রাখা হয়েছিল। কারণ, মার্কিন সরকার মনে করত, ভবিষ্যতে আবারও এই কোডের প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘকাল তাঁরা ছিলেন বিস্মৃতির অন্তরালে। যে সমস্ত নাভাজো ইন্ডিয়ান নীরবে দুনিয়ার ইতিহাস বদলানোর জন্য জীবনের তোয়াক্কা করেনি, তাদের কথা কেউ জানল না। যুদ্ধ শেষ হল, নেটিভ ইন্ডিয়ানদের প্রতি মনোভাবে বদল এল না। নেজের মতো সবাইকেই সারাজীবন কটাক্ষ শুনে যেতে হয়েছে।
অবশেষে, ১৯৮২ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান নাভাজো কোড টকারদের স্বীকৃতি দেন এবং ১৪ই আগস্টকে 'নাভাজো কোড টকার দিবস' হিসেবে ঘোষণা করেন। ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মূল উনত্রিশজন নাভাজো কোড টকারকে 'কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল' দিয়ে সম্মানিত করেন। ক্রিপ্টোগ্রাফির ইতিহাসে এমন সব কাহিনি আছে শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। নাভাজো কোড টকারদের কাহিনি তাদের মধ্যে অন্যতম।

মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ, ২০২৫

ব্ল্যাকহোলের ভিতর পিকনিক

 


মাঝে মাঝে এমন এক একটা কথা জানা যায় ভেবে মাথা একেবারে ভোম্বল হয়ে যায়। তার মধ্যেও লেভেল অফ ভোম্বলনেস সীমা ছাড়িয়ে যায় এমন খবর পেলে।
সাম্প্রতিকতম ঘটনার কথাই বলছি। নাসার বিজ্ঞানীরা আভাস দিয়েছেন আমাদের পৃথিবী, ইনফ্যাক্ট গোটা মহাবিশ্ব একটা ব্ল্যাকহোলের মধ্যে বসে থাকতে পারে। আশংকা করা হচ্ছে মহাবিশ্বের জন্মই হয়েছিল একটা ব্ল্যাকহোলের মধ্যে। সিসিন লিউয়ের গল্প? আজ্ঞে না। একবর্ণও বানিয়ে বলছি না। বরং রিপোর্টটা ছোট করে জানিয়ে দিচ্ছি।
সন্দেহ নেই, JWST মানে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ লঞ্চ হওয়ার পর থেকেই একের পর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে। মহাবিশ্বকে দেখার আর বোঝার পদ্ধতিতে বিপ্লব এসেছে বলা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিকতম ফাইন্ডিং দেখে বৈজ্ঞানিকদের ঘিলু নড়ে গেছে।
দশ বিলিয়ন ডলারের এই টেলিস্কোপ ২০২২ সাল থেকে কসমস অবজার্ভ করা শুরু করেছিল৷ এতদিন ধরে ডিপ স্পেস আর গ্যালাক্সিদের অবজার্ভেশন করে যে রিডিং পাওয়া গিয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, ডিপ স্পেস আর আর্লি গ্যালাক্সির অধিকাংশই একদিকে রোটেট করছে। বারো আনা গ্যালাক্সি ঘুরছে ক্লকওয়াইজ, বাকিরা অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ঘুরছে।
একটা র‍্যান্ডম মহাবিশ্বের ধারণা যদি করা হয়, ফিজিক্সের নিয়ম মেনে বৈজ্ঞানিকরা প্রত্যাশা করেন যে ৫০% ক্লকওয়াইজ ঘুরবে, বাকি ৫০% অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ঘুরবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে গ্যালাক্টিক রোটেশনেরও একটা প্রেফারড ডিরেকশন আছে, পছন্দ অপছন্দ আছে। যে ২৬৩টা গ্যালাক্সি অবজার্ভ করে এই কসমিক ডান্সের নির্ভুল ফাইন্ডিং পাওয়া গিয়েছে, তা JADES মানে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ অ্যাডভান্সড ডিপ এক্সট্রাগ্যালাক্টিক সার্ভের একটা উচ্চাকাঙ্খী প্রজেক্ট। বহু সায়েন্টিস্ট রাতদিন কাজ করে রিডিংগুলো বারবার ভেরিফাই করেছেন, তাই ভুল হওয়ার চান্স প্রায় নেইই।
এখন এই অদ্ভুত অ্যানামলির পিছনের কারণ কী, সেই ভেবে সবাই মাথার চুল ছিঁড়ছে। কিন্তু সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য কারণ যা হতে পারে, তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েই দিয়েছেন প্রজেক্টের টিম লিডার লিওর শামির। তিনি বলেছেন, "আমরা ঠিক নিশ্চিত নই কেন এমন হচ্ছে? কিন্তু একটা কারণ হতে পারে যে ইউনিভার্স ওয়াজ বর্ন রোটেটিং। (ল্যাও ঠেলা) ব্ল্যাক হোল কসমোজলিও এই ধারণাকে সাপোর্ট করে।"
এখন ব্ল্যাকহোল কসমোলজি কী? Schwarzschild cosmology বলেও অনেকে, এই ধারণার জনক রাজ কুমার রাজ কুমার পাথরিয়া আর আই জে গুড। তারা বলেছিলেন, Schwarzchild radius বা ইভেন্ট হরাইজন বলে যা প্রচলিত, যেখান থেকে আলোও ফিরতে পারে না, সেটাও আসলে ভিসিবল ইউনিভার্সের একটা দিগন্ত।
এককালে 'সাইলেন্টিয়াম' বলে একখান বই লিখেছিলাম বলে খানিকটা মাথা ঘামাতে হয়েছিল এসব নিয়ে, তাই মনে আছে, ইনফ্যাক্ট গল্পে এর ভূমিকাও ছিল। সত্যি বলতে ব্যাপারটা জটিল। সহজ করে বলতে গেলে বলা যায় এই ধারণা বলছে (১) একটা ব্ল্যাকহোল যত এনার্জি আর ম্যাটারকে গিলে খাচ্ছে তা ব্ল্যাকহোলের অন্যপ্রান্তে নির্মিত হোয়াইট হোল দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু অন্য দিকে যে ইউনিভার্সটা হবে, সেটা হবে ভিন্ন। সেক্ষেত্রে এই ব্ল্যাকহোল আইস্টাইন রোসেন ব্রিজ বা ওয়ার্মহোল হিসেবে কাজ করবে। (২) যখন একটি মৃত নক্ষত্র কোলাপ্স হওয়ার ফলে একটি ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়, তখন একই সময়ে ওয়ার্মহোলের অপর প্রান্তে অবস্থিত হোয়াইট হোল থেকে একটা অন্য ইউনিভার্স বা মহাবিশ্বের জন্ম হয়। (৩) তার মানে দাঁড়াল, একটা ইউনিভার্সে একটা ব্ল্যাকহোল আছে আর সেই ব্ল্যাকহোলের ভিতরে আরেকটা ইউনিভার্স তৈরি হচ্ছে। আমাদের ইউনিভার্সও আসলে সেইভাবে একটা ব্ল্যাকহোলের ভিতরে অবস্থিত থাকতে পারে। (৪) নেস্টেড ইউনিভার্সের এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল এই বলে যে সূর্যের মতো একটা নক্ষত্র কোলাপ্স করলে যে ব্ল্যাকহোল হবে তাতে তার দৈর্ঘ্য হবে দু মাইলের মতো, তার ভিতর এত বড় ইউনিভার্স তৈরি হবে কী করে? তাতে অঙ্ক কষে বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে থিওরিটিকাল ফিজিসিস্ট নিকোদাম পাপোলাস্কি বলেছিলেন, বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও ব্ল্যাকহোলের ভিতরে দূরত্ব আর সময় অন্য ভাবে কাজ করে, অর্থাৎ একটা পুঁচকে ব্ল্যাকহোলের ভিতর গোটা ব্রহ্মাণ্ড থাকতে পারে, মাখন চুরি করে খাওয়া কৃষ্ণের মুখের মতোই।
এই কন্সেপ্ট পুরোপুরি গৃহীত হয়নি, যদিও ফান্ডামেন্টালি সব ঠিকই আছে। কিন্তু এতদিনের সায়েন্টিফিক কন্ডিশানিং থেকে অত সহজে কেউ বেরোতে পারে না। এখন এই জেডস এর বৈপ্লবিক ফাইন্ডিংসের পর সবাই নড়েচড়ে বসেছে। লিওর শামির বলেছেন, "যদি সত্যিই তাই হয় যে আমাদের ইউনিভার্স জন্মেছিলই রোটেটিং অবস্থায়, আর আমরা সত্যিই এক ব্ল্যাকহোলের ভিতরে বসে আছি, তাহলে কসমসের সমস্ত নিয়ম নতুন করে ভাবতে হবে।"
এখন এর মধ্যে স্পেসটাইম টরশন আর পাস্ট ফিউচার সিমেট্রির অনেক জটিলতা আছে, ব্ল্যাক হোল কসমোলজি হলে গ্যালাক্সির প্রেফারড রোটেশন কীভাবে বদলায়, সেসব জটিল অঙ্ক আছে, সেই সব আর লিখলাম না। নাসা বা স্পেসের সাইটে ডিটেলস পাওয়া যাবে। আপাতত আক্কেল গুড়ুম করার জন্য খবরটাই যথেষ্ট।

সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০২৫

মিশরে আর্কিওলজিকাল বোনাঞ্জা

 


মিশর নিয়ে যারা আগ্রহী, তাদের তো এই বছর পোয়াবারো। তিন মাস কাটেনি, এর মধ্যেই বিভিন্ন সাইটে এমন সব মাথা খারাপ করা আবিষ্কার হয়েছে যে আর্কিওলজিস্ট আর ইজিপ্টোলজিস্টদের মাথা ঘুরে গেছে। প্রাচীন মিশরের লোকজন আমাদের জন্য গাদা গাদা সারপ্রাইজ প্ল্যান করে গিয়েছিল সন্দেহ নেই কিন্তু এমন পরপর মাইন্ডব্লোইং ডিসকভারি এর আগে কোনওদিন হয়েছে কিনা সন্দেহ! যাকে বলে আর্কিওলজিকাল বোনাঞ্জা! তা ঠিক কী কী হয়েছে মিশরে? চটপট দু চারটে দেখে নেওয়া যাক।

প্রথমেই বলতে হয় গিজা গিগা ডিসকভারির কথা। যেই মুহুর্তে আমরা সবাই ভাবতে শুরু করেছি যে গিজার পিরামিডের সমস্ত রহস্য খতম, এখন শুধু ওই জায়গাটা টুরিস্ট সাইট আর সিজ্জিতদার সিনেমার শুটিংয়ের জন্যই কাজে লাগানো হবে, গবেষকরা এমন একটা বম্বশেল ফেলেছে বেচারি ইন্ডিয়ানা জোনসও টুপি খুলে ঘাম মুছবেন। স্কটিশ আর ইতালিয়ান স্কলারদের একটা টিম গিজার পিরামিডের তলায় একটা বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড শহর আবিষ্কার করছে। হ্যাঁ, শহর, চেম্বার ফেম্বার নয়, আস্ত একটা সাবটেরেনিয়ায় সিটি। এই দলের দায়িত্বে ছিলেন পিসা ইউনিভার্সিটির কোরাদো মালাঙ্গা আর স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির ফিলিপো বিওন্দি, তারা অত্যাধুনিক SAR মানে সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাফরে পিরামিডের ভিতরে জরিপের কাজ চালাচ্ছিল। এমন সময় তারা সেখানে একটা ঘরের মতো ফর্মেশন দেখতে পায়। আরো ভালো করে খোঁজাখুঁজি করে দেখা যায় একটা বা দুটো নয়, পাঁচ পাঁচটা ঘর, সেগুলো ভূমিগত পথ দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আজকাল সিমস বলে একটা ভিডিও গেম বেরিয়েছে, সেটার আবার একটা পিরামিড এডিশন আছে, সেখানে হেঁয়ালি সলভ করে আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বার আর শহর বানাতে হয়। দেখা যাচ্ছে সাড়ে চার হাজার বছর আগে ইজিপ্টের লোকজন বাস্তবেই সেই গেম খেলছিল। এখন রেডার প্রযুক্তির রিডিং ঠিক হলে এই আন্ডারগ্রাউড চেম্বারগুলো বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। মানে, একটা শহর যত বড় হতে পারে আর কি! রেডারে তোলা ছবিতে ভার্টিকাল শ্যাফট, সর্পিল সিড়ি, ওয়াটার পাইপলাইনের চিহ্ন অব্দি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বিতর্কও কম হচ্ছে না। ইজিপ্টের বৈজ্ঞানিকরা ভূমিগত শহরের ভাবনাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন এই বলে যে ওই রেডারের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এই নিয়ে তুমুল শোরগোল পড়েছে। অন্যদিকে রিসার্চাররা অবশ্য সেখানেই থেমে নেই, তারা ক্লেম করেছেন খুব সম্ভবত এই চেম্বারগুলো হলস অফ আমেনতি হতে পারে। এখন আমেনতি মিশরীয় লোককথায় একটা ভয়ানক কন্সেপ্ট, এই নিয়ে একগাদা মিথ আছে। সহজ ভাষায়  হলস অফ আমেনতি বাস্তব দুনিয়া আর অতিলৌকিক দুনিয়ার মাঝের সেই জায়গা যেখানে নশ্বর বা কায়িক শরীর ছেড়ে আত্মিক অস্তিত্ব অর্জন করা যায়। সাধারণ মানুষ জীবিত অবস্থায় সেখানে গেলে সেখানে অবস্থিত পোর্টাল ইউজ করে মৃতদের দুনিয়ায় প্রবেশ করতে পারে, অতিলৌকিক ক্ষমতাও অর্জন করতে পারে। দশকের পর দশক ধরে পূরাতত্ববিদরা মিশরের এই মিথিকাল চেম্বার খুঁজে বেড়াচ্ছিল। এই বছর রিসার্চারদের দাবী শুনে তারা এমন জোরে মাথা চুলকোতে শুরু করেছে যেন মাথায় উকুন হয়েছে। সত্যি মিথ্যে যাই হোক, আমাদের এই সব জেনে রোমাঞ্চিত হতে কোনও বাধা নেই। তবে থামুন, আবিষ্কারের ফিরিস্তি এই সবে শুরু হল।

যেই সময় একদল আর্কিওলজিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি নিয়ে ব্যস্ত, সেই সময় এমন একটা ভীষণ আবিষ্কার হল যে ইজিপ্ট প্রেমীরা চেয়ার থেকে পড়ে যায় আর কি! বলা হচ্ছে, তুতানখামের সমাধি পাওয়ার পর এত বড় কোনও আবিষ্কার হয়নি। কথা হচ্ছে ফারানো থুতমোস দ্বিতীয়র ( Thutmose II)  প্রায় এক শতাব্দী ধরে ইনি ইতিহাসবিদ আর আর্কিওলজিস্টদের ঘোল খাইয়ে খাইয়ে ঘুরিয়ে মেরেছেন। কত বছর ধরে ভদ্রলোকের সমাধি খোঁজা হচ্ছে তার হিসেব নেই। 'পেল পেল' করে রব উঠেছে বহুবার, কিন্তু পায়নি কেউই। থুতমোস বাবু আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছেন প্রায় এক শতাব্দী ধরে। ভদ্রলোক এমনিতেই দুর্ভাগা, তার দজ্জাল বউ রানি হাপশেটশুত সব লাইমলাইট নিয়ে নিয়েছিলেন, তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না, কিন্তু জানা যায় না বলেই মারা যাওয়ার এতদিন পর তিনি ইজিপ্টোলজিস্টদের দুনিয়ায় উচ্চস্থান অর্জন করেছেন। প্রসঙ্গত তার মমি পাওয়া গিয়েছিল বহু আগে, শুধু টুম্বটার খোঁজ চলছে দেড়শো বছর ধরে। যাই হোক, ইজিপ্ট আর ব্রিটেনের আর্কিওলজিস্টরা ভ্যালি অফ দ্য কিংসের পাশেই থেবস অঞ্চলে তাঁর সমাধি আবিষ্কার করেছে। অবশ্য জায়গাটা আড়াই বছর আগে জানা ছিল, কিন্তু হায়েরোগ্লিফগুলো প্রায় মুছে গিয়েছিল, টুম্বের অবস্থাও ভালো ছিল না, সব রিঅ্যানিমেট করে কনফার্ম করতে করতেই এতদিন কেটে গেল। এই আবিষ্কারের সবচেয়ে স্পেশাল পয়েন্ট হল, এই প্রথম কোনও ফারাওয়ের সমাধিতে রাখা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জিনিসপত্র পাওয়া গেল। সে এতটাই খারাপ অবস্থায় ছিল যে সেটা যে কোনও ফারাওয়ের সেটা আগে কেউ অনুমান করেনি, সবাই ভেবেছিল, সুয়োরানি দুয়োরানি কারো হবে। ওয়েল, জেন্ডার সোয়্যাপের ধারণা আজকের নয়। দেখা গেল, আসলে সেটাই রাজামশাইয়ের টুম্ব। এখন এই সমাধির হিয়েরোগ্লিফ লিপি আর উদ্ধার করা জিনিসপত্র যে আগামীতে কী খেল দেখাবে সেটা ভবিষ্যত বলবে, আপাতত একশো বছরের লুকোচুরি শেষ হল।

আরো আছে। সাক্কারার কথা তো অনেকেই জানেন। মিশরের প্রাচীনতম পিরামিড এবং নেক্রোপলিস, এই বিশাল এক্সক্যাভেশন সাইটে সবসময় কিছু না কিছু আবিষ্কার হচ্ছেই। রহস্য আর শেষ হয় না। সাক্কারার ভূমি দেবতাও দু হাত খুলে কিছু না কিছু দিয়েই যাচ্ছেন। একবারের জন্যও বলছেন না, যতই দাও ততোই চাই। খিল্লি বাদ দিয়ে বলি, জানুয়ারি মাসে জাপান আর ইজিপ্টের একটা জয়েন্ট আর্কিওলজিকাল মিশনের কর্তারা ঘোষণা করলেন, তারা প্রাচীন মাস্তাবা, মানে কফিনই কিন্তু চারটে হাতি ঢুকে যাবে এমন রেক্টাঙ্গুলার সুপারস্ট্রাকচার, আবিষ্কার করেছেন। সঙ্গে সেকেন্ড আর থার্ড ডাইনেস্টির প্রচুর মূল্যবান বস্তু পাওয়া গিয়েছে। সেসব ২৬৫০ বিসির জিনিস। এছাড়াও ১৫৫০-১২৯২ বিসি, মানে যে সময়টা ইজিপ্টে এইটিন্থ ডাইনেস্টি অফ অফ দ্য নিউ কিংডম বলে পরিচিত, সেই সময়ের দশটারও বেশি সমাধির খোঁজ পেয়েছেন। এখানেই শেষ হলেও হত, কিন্তু সাক্কারাতে সেসব হয় না। একটা চাইলে চারটে পাতুরি ঢেলে দেয়। এই দলের লোক এর পাশাপাশি দুটো মাটির ইট দিয়ে নির্মিত মাস্তাবা, দুটো পাথর দিয়ে কুঁদে বানানো সমাধিও খুঁজে বের করেছে, আর সঙ্গে একটা চুনাপাথর দিয়ে সিল করা শ্যাফটও পাওয়া গেছে যেটা একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সমাধিক্ষেত্রতে যাচ্ছে। প্রায় রোজই সেখানে নতুন জিনিস জানা যাচ্ছে। কয়েক মাস পর দেখা যাক এই নতুন আবিষ্কারগুলো কী বোমা ফাটায়!

কিন্তু দাঁড়ান। এই বছর আর্কিওলজিকাল জ্যাকপট যখন চলছেই, লাক্সর পিছনে থাকবে তা কেমন করে হয়? ফারাওদের রাজধানী বলে কতা! সেখানে কিছু পাওয়া যাবে না তা হয়?জানুয়ারি মাসেই ইজিপ্টের রিসার্চাররা জানালেন এক অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের কথা, যা পাওয়া গিয়েছে দেইর-এল-বেহরিতে রানি হাপশেটসুতের মন্দিরের একদম কাছেই। রানির অন্তেষ্টিক্রিয়ার জন্য নির্মিত কমপ্লেক্স থেকে দেড় হাজারেরও বেশি লাইমস্টোন ব্লক পাওয়া গিয়েছে, প্রতিটাই চমৎকার ভাবে মেন্টেন্ড আছে। রঙটঙ চটে যায়নি, হায়েরোগ্লিফে একদম ঠাসা। এখন প্রথম কয়েকটার অর্থ উদ্ধার করে জানা গিয়েছে এ এক বিশাল জিগশ পাজল, কিন্তু অসম্ভব গোপনীয় আর মাথা খারাপ করা কিছু। হায়েরোগ্লিফ এক্সপার্টরা আপাতত মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে, কিন্তু বাকিরা দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছে। এক্সক্যাভেশনে অবশ্য একগাদা রাজকীয় উপাদানও পাওয়া গিয়েছে, এই ধরনের আর্টেফ্যাক্টও তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর থেকে আর পাওয়া যায়নি, সে একশো তিন বছর হয়ে গেল। যা বুঝলাম, রানি হাপশেটসুত পণ করেছিলেন, মৃত্যুর পরেও তিনি বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন, গার্ল পাওয়ার কাকে বলে। জাস্ট কিডিং!

এইবার আসল মজা। এতসবের মধ্যে এমন একটা ভয়ংকর আবিষ্কার হয়েছে যে সকলের রাতের ঘুম উড়ে গেছে, ঘেমেনেয়ে গেছে সারা দুনিয়ার মিশর এক্সপার্টরা। আবাইদোসে মাউন্ট আনুবিস নেক্রোপলিসে একজন ফারাওয়ের সমাধি পাওয়া গিয়েছে, এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব এক মার্কিন-ইজিপশিয়ান টিমের। মুশকিল হচ্ছে এই ফারাও কে, কেউ জানে না। মানে, কিছুই জানে না। কোত্থেকে ইনি উড়ে এসে জুড়ে বসলেন, তাঁর বংশ পরিচয় কী, তিনি কোন রাজত্বে ছিলেন, কিছুই জানা যায় না। খোদাই করা লিপি পড়ে অনুমান করা হচ্ছে এই রহস্যময়ী ফারাও এমন এক নতুন বংশ বা ইতিহাসের কথা জানাতে পারে যে সম্পর্কে এখনও কেউ কিচ্ছুটি জানে না। তেমন হলে মিশরের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে।

এছাড়াও প্রায় নিত্যনতুন আবিষ্কার হচ্ছে এ বছর। মিশর নিয়ে যারা উৎসাহী, তাদের জন্য রোমাঞ্চিত হওয়ার সুবর্ণ সুয়োগ। এ-ই লেখায় কিছু কিছু আলগা টার্ম আছে, মিশর নিয়ে ক্র‍্যাশ কোর্স চাইলে অনির্বাণ ঘোষের 'হায়েরোগ্লিফের দেশে' পড়ে ফেলুন।

রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৫

মুনির আজও বিচার পায়নি

 


আশাবাদী হওয়া খুব ভালো জিনিস। কিন্তু চারিদিকে যা অবস্থা, চোখকান খুলে রাখলে হতাশাই গ্রাস করে বেশি করে। বেনারসে এক পরিচিত ছেলের ভাইকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে শুনলাম, সে নাকি জানেই না কেন তুলেছে! এদিকে মাস চারেক ধরে সে জেলে বসে আছে। কাণ্ড! এদিকে রিসেন্টলি শুনলাম, সুপ্রিম কোর্ট আবারও বলেছে, ট্রায়াল ছাড়া কাউকে দিনের পর দিন আটকে রাখা চলবে না। শুনে ভালোই লাগে, যতক্ষণ না মনে পড়ে, কথাটা সুপ্রিম কোর্ট কুড়ি বছর ধরে বলেই চলেছে। এদিকে হাজার হাজার সাংবাদিক আর অ্যাক্টিভিস্ট বছরের পর বছর ধরে ট্রায়াল ছাড়া জেলে বসে আছে। ভীমা কোরেগাঁও কেসে কবীর কলা মঞ্চের একগাদা শিল্পীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাদের প্রায় কারো কেসই আদালতে ওঠেনি। উমর খালেদের বেল রিজেক্ট হচ্ছে তো হচ্ছেই। আরে দোষী হলে তদন্ত করে সাজা দিলেই হয়, তদন্তের নামে কুড়ি বছর কাটিয়ে দিলে চলবে? এখন অনেকে এদের নাম শুনে রেগেও যেতে পারে, রাগাই দরকার। কারো নাম আলাদা করে বলবই না কেন? ইউএপিএ ইত্যাদি চুলোয় যাক, নর্মাল কেসেই ট্রায়াল হয় না। আজকাল ঠিকঠাক রিপোর্ট রিলিজ করার চলও উঠে গেছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রিকর্ড বিউরো ২০২১ সালে জানিয়েছিল, ভারতবর্ষের জেলে পাঁচ লাখ চুয়ান্ন হাজার কয়েদি আছে, তাদের মধ্যে চার লাখ সাতাশ হাজার ট্রায়ালের জন্য অপেক্ষা করে আছে। এদের মধ্যে অনেকেই কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়েছেন জেলে, কেস আদালতেও ওঠেনি। সাধেই লোকে বলে, পুলিশে ছুঁলে আঠেরো ঘা! জাস্টিস সিস্টেম এমন এক হাস্যকর জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে বলার নয়। নিজে প্যাঁচে না পড়লে কেউ বোঝে না, তা না বোঝাই ভালো। তবে এরকম পরিস্থিতি যে শুধুই ভারতে তেমনটা ভাবলে ভুল হবে। বহু দেশেই কমবেশি একই অবস্থা। বছর ঘোরে, বিচার মেলে না।

এই সূত্রে একটা চমকপ্রদ ঘটনার কথা মনে পড়ে। এই গল্প সম্ভবত খুব বেশি মানুষ জানেন না। অথচ, দুনিয়ার ইতিহাসে এ এক বহুচর্চিত কেস।

গল্পের নায়কের নাম মুনির। মুনির সাইদ তালিব। ১৯৬৫ সালে ইস্ট জাভার বাটুতে তার জন্ম। বাড়ির লোক বেশ উদারবাদী, প্রগেসিভ ধরনের ছিল, শিক্ষা আর সততাকে সমান মূল্য দেওয়া হত পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তাহিরের মনে তাই জাস্টিস সিস্টেমের জন্য একটা অন্য রকম শ্রদ্ধা জন্মে গিয়েছিল। পড়াশোনায় খুবই ব্রাইট ছিল সে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ধারালো ছিল ন্যায় বিচারের প্রতি সচেতনতা। বড় হয়ে যখন সে ব্রাউইজায়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে ভর্তি হয়, খুব তাড়াতাড়ি সে সক্রিয় ভাবে অ্যাক্টিভিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। পড়াশোনা শেষ করে সুরাবায়াতে লিগাল এইড এক্সপার্ট হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। তখন কেউ জানত না স্বপ্নালু চোখের এই ছেলেটা কয়েক বছরের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে চর্চিত হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে উঠবে, হাজার হাজার মানুষের বিচারের জন্য আদালতে আওয়াজ তুলবে। 

আশি আর নব্বইয়ের দশক ইন্দোনেশিয়ার জনতার জন্য মোটেও ভালো সময় নয়। কেউ সরকারের আলোচনা করলেই তার মাথায় খাঁড়ার ঘা নেমে আসত। রাষ্ট্রপতি সুহার্তোকে নিয়ে এমনিতেই ইন্দোনেশিয়ায় দু ধরনের গল্প আছে। এক, তিনি কড়া হাতে মিলিটারি শাসন চালু করে দেশের অর্থনীতি ঠিক করেছেন, ইনফ্লেশন কমিয়েছেন, ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদির পত্তন করেছেন, কমিউনিস্ট রেবেলদের লাথি মেরে তাড়িয়েছেন। দুই, সুহার্তো এক নম্বরের কোরাপ্ট, ফ্যাসিস্ট, ডিক্টেটর আদমি। কয়েক বছর পর দেশের ক্ষমতা পুরোপুরি নিজের হাতে তুলে নিয়ে ডেমোক্রেসির সাড়ে তেইশ করে ছেড়েছেন, দুর্নীতি এবং বিরোধীদের খুন জখম করাতে বা গুম করাতেও তার জুড়ি মেলা ভার, ইস্ট টাইমারে জোর করে হামলা করতে গিয়ে এক ভীষণ যুদ্ধ শুরু করেছেন, যাতে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছেন। দুটোই মোটামুটি সত্যি। বেশিদিন পাওয়ারে থাকলে ক্ষমতা মাথায় উঠে মানুষের যা হয় আর কি! মোদ্দা কথা হল, আশির দশকের শেষ দিকে যখন দেশের অবস্থা পড়তির দিকে যাচ্ছে, একটু একটু করে বিরোধের স্বর শোনা যাচ্ছে, সুহার্তোর কথায়  আয়রন ফিস্ট রুল শুরু হয়ে গেছে। ফ্রি স্পিচ আর প্রেসকে তুলোধনা করা আর মিলিটারিকে কাজে লাগিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো যা নয় তাই করা। এইসব ঝামেলা হলে যারা সবচেয়ে আগে আওয়াজ তোলে (আর সবচেয়ে আগে মারা পড়ে), ইন্দোনেশিয়াতেও তারাই তুলেছিল। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা। দেশ জুড়ে ছাত্ররা আন্দোলন করছে, এদিকে সুহার্তোর সেনা নিষ্ঠুর ভাবে তাদের প্রতিরোধ করছে, লাঠিচার্জ করছে, গুলি চালাচ্ছে, কিডন্যাপ করিয়ে এনকাউন্টার করছে বা বাড়ির লোককে সুদ্ধ তাদের ঘর থেকে তুলে এনে টর্চার করছে, মানে তোহফা অবস্থা।

কিন্তু মুনির ভয় পাওয়ার ছেলে নয়। তার ভ্যালু সিস্টেম ছোটবেলা থেকেই মজবুত, ন্যায়ের জন্য সে সব কিছু কর‍তে পারে। যখন সরকারের ভয়ে অনেকে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকাই সেরা পন্থা বলে মনে করছেন, মুনির ঠিক করল সে দুর্বলদের পক্ষ নিয়ে লড়বে। যাদের জন্য কথা বলার কেউ নেই, তাদের হয়ে লড়বে। সুরাবায়াতে কাজ করার সময় থেকেই সে পুলিশের অত্যাচার, বেআইনি ভূমি অধিগ্রহণ আর লেবার রাইট ভায়োলেশনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে লাগল, গরীব জনতার কেস বিনামূল্যে লড়তে শুরু করল আদালতে। কয়েকদিনের মধ্যেই রটে গেল, এ ছেলের সাহস আছে, এ কম্প্রোমাইজ করার বান্দা নয়!

এদিকে দেশের রাজনীতিক পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে চলেছে। মিলিটারি যথেচ্ছ সব কাণ্ড শুরু করেছে, শয়ে শয়ে মানুষকে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গণগত্যা চলছে। ইস্ট টাইমার আর পাপুয়াতে তো ইন্দোনেশিয়ার মিলিটারি তাণ্ডব নৃত্য করছে। কেউ কিছু বলতে গেলেই মুণ্ডু ঘ্যাচাং। এইসব কাণ্ড যত বাড়তে লাগল, মুনিরের কাছে কেসও আসতে লাগল ততো বেশি। সে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া মানুষদের পক্ষ নিয়ে লড়ল, গণহত্যা আর ম্যাসাকারের তদন্ত করল, সেনাবাহিনীর সেই সমস্ত কীর্তিকলাপের হাঁড়ি হাটে ভেঙে ফেলল যে সব চেপে রাখার জন্য সরকার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করছে। KontraS (কমিশন ফর দ্য ডিসঅ্যাপিয়ার্ড অ্যান্ড ভিকটিমস অফ দ্য ভায়োলেন্স) বলে একটা সংগঠন গড়ে তুলল ১৯৯৭ সালে। পরের দুই বছর ধরে প্রো ডেমোক্রেসি অ্যাক্টিভিস্ট আর জার্নালিস্টদের কিডন্যাপিংয়ের তদন্ত করে চলল সে, সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ততদিনে সুহার্তোর স্বৈরাচারী শাসন নিয়ে নিন্দেমন্দ শুরু হয়ে গেছে সারা দুনিয়ায়। মরিয়া হয়ে সরকার মরণ কামড় দিচ্ছে। শয়ে শয়ে ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক, সাংবাদিক, সমাজকর্মীকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। কয়েকজনকে টর্চার করে ছাড়া হলেও অনেকে চিরকালের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। মুনির এই কেসগুলোর তদন্ত করে সরাসরি প্রমাণসহ সরকারকে দোষী ঠাউরাল। এক একজনের নাম নিয়ে সে প্রেসে প্রমাণ দাখিল করতে লাগল। স্বভাবতই মুনিরের সঙ্গে সরাসরি মিলিটারি, ইন্টেলিজেন্স আর পলিটিকাল এলিটদের ঠোকাঠুকি লেগে গেল, সে তখন সকলের চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে স্পেশাল ফোর্সের পূর্ব প্রধান জেনারেল প্রাবোও সুবিয়ান্ত আর সুহার্তোর জামাই তাকে দু চক্ষে দেখতে পারত না।

মুনিরের কাছে প্রথমে হুমকি এল। তারপর শাসানো হল নানাভাবে। তাকে ফলো করা হতে লাগল। তারপর এল আক্রমণ। বারবার। কখনও শারীরিক ভাবে, কখনও মানসিক ভাবে। একবার এক শ্রমিক বাঁচাতে গিয়ে নিরাপত্তা কর্মীর কাছে মার খেয়ে হাত ভাঙল, একবার কিডন্যাপিংয়ের ঘটনায় কোপাসাস বা সিক্রেট আর্মির ভূমিকা সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে ঘরে কে যেন বোমা রেখে এল। ততদিনে সুহার্তো শুধু নয়, গোটা রাজনৈতিক ঘরানা আর আর্মি তাকে শত্রু বলে মনে করছে।  সুহার্তোর শাসন উঠে যাওয়ার পরেও তার প্রতি আক্রোশ কমল না।কিন্তু মুনির শত ঝুঁকি সত্ত্বেও কাজ থামাচ্ছে না। প্রেস কনফারেন্সে বক্তৃতা দিয়ে সরকারের অবস্থা ঢিলে করে দিচ্ছে, প্রোটেস্ট লেড করছে, ট্রায়াল আর মিলিটারি আধিকারিকদের এক্সপালশনের জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। টিমোর, পাপুয়া, আসেহতেও যে সমস্ত বেআইনি হত্যা আর ডিটেনশন হয়েছে, সেই নিয়েও সে সোচ্চার। এদিকে সে এও প্রমাণ পেয়েছে যে এই জায়গা থেকে মিলিটারির কোরাপ্ট অফিসিয়ালরা নিষিদ্ধ ড্রাগ আর চোরাই কাঠের ব্যবসাও করছে।

মুনির জানত, সে কোন লেভেলের ঝুঁকি নিয়েছে।একবার সে বলেছিল, "Being a human rights activist means you have to be ready to be beaten, terrorized, and even killed. But if I stop, who else with fight for the justice?"

মুনির ততদিনে ইন্ডোনেশিয়ার সবচেয়ে সক্রিয় হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য নিবেদিত 'ইমপার্সিয়াল'-এ তাকে ডিরেক্টর করা হয়েছে, তাতে তার কাজের ব্যাপ্তি আর ঝুঁকি, দুটোই বেড়েছে।

২০০৪ সালের কথা। মুনির অ্যামস্টারডামে আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে যাচ্ছিল। সেপ্টেম্বর মাসের সাত তারিখে সে গরুডা ইন্টারন্যাশনালের আমস্টারডামগামী ফ্লাইটে উঠল, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই তার বুকে পেটে ভয়ানক ব্যাথা শুরু হল, বমি হতে লাগল বার বার। ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টরা প্রথমে ভেবেছিল ফুড পয়জনিং, কিন্তু মুনিরের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে লাগল। প্লেন যখন আমস্টারডামের মাটি ছুঁল, তার দেহে আর প্রাণ নেই। মাত্র ৩৮ বছর বয়স হয়েছিল তার। 

অটোপ্সি করে জানা গেল ফুড পয়জনিং নয়, পরিকল্পনা করে তাকে খুন করা হয়েছে। ডাচ অথোরিটিরা জানালেন, তার পেট থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্সেনিক পাওয়া গেছে, লিথাল ডোজ। ব্যাপারটা কাকতালীয় নয়। ঘটনা ইচ্ছে করে ঘটানো হয়েছে, যখন প্লেন থাকবে ৩৫০০০ ফুটে, আর মেডিকাল অ্যাসিস্ট্যান্স পাওয়ার কোনও উপায় থাকভে না। তার খুনের পরিকল্পনা করেছে যারা তারা নিশ্চিত হতে চেয়েছিল মুনির প্লেন থেকে জীবিত অবস্থায় নামবে না।

মুনিরের মৃত্যুতে গোটা ইন্ডোনেশিয়া জুড়ে প্রতিবাদের বন্যা বয়ে গেল। এটা সাধারণ একটা অ্যাসাসিনেশন নয়, মুনির মানুষের কথা ভেবে বাঁচত, আজীবন সাধারণ মানুষকে বিচার দেওয়ার জন্য লড়ে গেছে সে। তার এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারেনি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সুসিলো বাম্বাং য়ুধোউনো চাপে পড়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম আর তদন্ত কমিটি বসালেন বটে, কিন্তু অর্ধসত্য ছাড়া কিছুই বেরোল না। পলিটিকাল ইন্টারফেরেন্স আর কভার আপ করে সত্যি চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলতেই লাগল। এদিকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেশনে জানা গেল ইন্ডোনেশিয়ার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বিআইএন এর পিছনে আছে। গরুডা ইন্টারন্যাশনানের পাইলটই সম্ভবত মুনিরের পানীয়তে বিষ মিশিয়েছিল, বহুদিন পর তাকে চোদ্দ বছরের সাজা দেওয়া হল, কিন্তু কার নির্দেশে সে এমন করল সেটা জানা গেল না। এদিকে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হল ওপর থেকে নির্দেশ পেয়ে, প্রমাণ লোপ পেল, সাক্ষীরা হুমকি পেতে লাগল, হাই র‍্যাঙ্কিং অফিসিয়ালদের জেরা অব্দি করা হল না। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টরা অবশ্য হাল ছাড়লেন না। একে একে সুতো জুড়তে লাগল, বোঝা গেল মুনিরকে সরানোর পিছনে সরকারের বড় বড় নেতা, আর্মি অফিশিয়াল আর ইন্টেলিজেন্সের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের হাত আছে। সকলেরই মুখোশ খুলে দিচ্ছিল মুনির, তাকে বাঁচিয়ে রাখা বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। তাদের অনেকেই এখনও ক্ষমতাসীন, বড় বড় জায়গায় বসে আছে সবাই। প্রচুর প্রতিবাদ হল, মিছিল হল, তদন্ত কমিটি বসল, কিন্তু বিচার হল না। যারা মুনিরকে মেরেছে, তাদের কোনও সাজা হল না।

আজ একুশ বছর কেটে গেছে, মুনিরের হত্যার জন্য দায়ী মানুষরা আজও ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার স্ত্রী সুশিওয়াতি নিজেও লেবার রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট, দুই সন্তানকে নিয়ে সে আজও স্বামীর জন্য বিচার চেয়ে চলেছে। এখনও প্রতি মাসে ইন্দোনেশিয়ায় কোথাও না কোথাও মুনিরের জন্য বিচার চেয়ে প্রোটেস্ট হয়, হাজার হাজার আবেদন পড়ে স্বাধীন ভাবে তদন্ত করার জন্য, কিন্তু লাভ হয় না কিছুই। মারা যাওয়ার পর মুনিরের নামে প্রচুর সম্মান দেওয়া হয়েছে, তার কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু মানবাধিকার সংগঠন খুলেছে, তার লিগেসি রয়ে গেছে। কিন্তু দোষীদের সাজা হয়নি। যে ছেলেটা অন্যদের বিচার দেওয়ানোর জন্য আটত্রিশ বছর বয়সে মারা গেল, সে নিজে আজও বিচার পায়নি। 

দুনিয়া জুড়ে এই অবস্থা। তাহলে কেনই বা কেউ অবিচারের বিরুদ্ধে লড়বে? কেনই বা ন্যায় চাইবে? কেন আশা রাখবে? কেন বিচার চাইতে কোর্টে যাবে? 

এর উত্তর মুনির জানত। সে বলেছিল, "If we stay silent in the face of injustice, we become part of the crime."

We have tired of Violence 
The new press

মঙ্গলবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

একটা গান কি জীবন বদলাতে পারে?

 



একটা গান আপনার জীবন বদলাতে পারে? কয়েকজন হ্যাঁ বললেও অনেকেই হয়তো না বলবেন। সত্যি কথা বলতে, একটা বই, একটা পেন্টিং, একটা কবিতা, একটা সিনেমা বা একটা গান যে আদৌ জীবনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে, সে কথা সঙ্খ্যাগরিষ্ঠ মানুষই বিশ্বাস করেন না। তর্ক না করে বরং একটা গানের চার লাইন শোনানো যাক, তারপর একটা গল্প হোক।
নেলি ব্লাই নেলি ব্লাই
নেভার নেভার সাই
নেভার ব্রিং দ্য টিয়ারড্রপ
টু দ্য কর্নার অফ ইওর আই
না, গানটার মূল লাইন এটা নয়। এই অংশটা আসলে কোরাসের পার্ট। গান শুরু হচ্ছে এভাবে...
Nelly Bly! Nelly Bly!
Bring de broom along,
We’ll sweep de kitchen clean, my dear,
And hab a little song.
কিন্তু, একটা মেয়ের কাছে কোরাসে গাওয়া ওই লাইনগুলো কীভাবে জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে উঠল, সে এক অসামান্য কাহিনি। ১৮৫০ স্টিফেন ফস্টার এই গানটা কম্পোজ করেছিলেন এক দরিদ্র মেয়ে নেলি ব্লাইকে কল্পনা করে, যে শত দুঃখ কষ্টেও কোনোদিন ভেঙে পড়ে না, কোনোদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে না। তিনি জানতেন না, চোদ্দ বছর পর পেনিসেলভেনিয়াতে এলিজাবেথ বলে এক মেয়ে জন্মাবে, আর মায়ের পাশে রান্নাঘরে বসে তাঁর এই গান শুনতে শুনতে তাঁর জীবনে এক অদৃশ্য বদলের সূচনা হবে।
এলিজাবেথ জন্মেছিল আর্মস্ট্রং কাউন্টির কোচরান মিলসে। বাবার নাম ছিল মাইকেল কোচরান। তিনি জীবন শুরু করেছিলেন দিন আনি দিন খাই মজুর হিসেবে, কিন্তু কর্মজীবনে নানা ঘাটের জল খেয়ে নানা কাজ করতে হয়েছে তাঁকে৷ কখনও পোস্টমাস্টার, কখনও মিল ওয়ার্কার, অবশেষে তিনি কোচরান মিলস কিনে ব্যবসা শুরু করেন। এই ব্যস্ত কর্মজীবনের মধ্যে তিনি দু'বার বিয়ে করেছেন, পনেরোটি সন্তানের বাবা হয়েছেন, কিন্তু প্রায় কাউকেই সময় দিতে পারেননি। অবশেষে যখন তিনি মারা যান, ব্যবসা পড়তির দিকে, দেনাপাওনা ভালোই বেড়েছে, তখন এলিজাবেথের বয়স মাত্র ছয়।
পনেরোজন সন্তানের মধ্যে বিষয় সম্পত্তি বাঁটোয়ারা হওয়ার পর দেখা গেল, নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাচ্ছে। উপায়ান্তর না দেখে এলিজাবেথের মা আবার বিয়ে করলেন, এই ভেবে যে নতুন স্বামী দায়িত্ব নিলে অন্ততপক্ষে পাঁচ সন্তানের পড়াশোনা খাওয়াদাওয়ার অসুবিধা থাকবে না। কিন্তু সে বিয়ে টিকল না। প্রায় প্রতিদিন স্বামীর হাতে মার খেতে খেতে, শুতে বসতে ছেলেমেয়েদের নিয়ে খোঁটা শুনতে শুনতে দিন কাটানো দুস্কর হয়ে পড়ল তাঁর জন্য। বরের হাত মার খাওয়ার সময় মেয়েকে রান্নাঘরে বসিয়ে যান, ফোনোগ্রাফ আবিষ্কার হয়েছে কয়েক বছর হল। এলিজাবেথ বসে বসে নেলি ব্লাইয়ের গান শোনে, পাশের ঘর থেকে মায়ের আর্তনাদ শোনা যায়। শোনা যায় অমানুষিক সব শব্দ। এলিজাবেথ মনপ্রাণ দিয়ে গান শোনার চেষ্টা করে, এক একটা শব্দ তাঁর মাথার মধ্যে গেঁথে যায়।
এমন করে বেশিদিন চলতে পারে না। এলিজাবেথের মা ম্যারি বিবাহবিচ্ছেদ করে পিটসবার্গে চলে আসেন, তখন সে জায়গার নাম অ্যালেগেনি সিটি। সম্বল বলতে তেমন কিছুই নেই, পেট চালানোর জন্য একটা বোর্ডিং হাউস চালাতে শুরু করেন ম্যারি। ততদিনে এলিজাবেথ কিশোরী হয়েছে। পাঁচ ছেলেমেয়ে বোর্ডিং হাউসের কাজ করে হাঁফিয়ে পড়ে, দিনান্তে বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। ব্যতিক্রম এলিজাবেথ। সে ল্যাম্প জ্বালিয়ে বই পড়ে। ম্যারি এই পরিস্থিতিতে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে খুব আশাবাদী ছিলেন না, কিন্তু ম্যারি জেদ ধরে রইল, সে পড়া চালিয়ে যাবে। জেদ করে সে জোর করে ইন্ডিয়ানা নর্মাল স্কুলে নাম লিখিয়ে ফেলল, প্রায় চারশো মাইল দূরের কলেজ, কিন্তু টাকাপয়সা ছিল বা বলে এক সেমেস্টার পরেই তাকে বের করে দেওয়া হল। বোর্ডিং স্কুলে ফিরে আসা ছাড়া আর উপায় রইল না।কিন্তু মেয়ের জেদ কম নয়। সে পড়বেই। কিছুতেই সে পরিস্থিতির কথা বলে কান্নাকাটি করবে না, হার স্বীকার করবে না। নেলি ব্লাইয়ের মতোই সে লড়াই চালিয়ে যাবে।
এরকম করেই ছয় বছর কেটে গেল। ১৮৮৫ সালে পিটসবার্গ ডিসপ্যাচ কাগজে "What Girls Are Good For" বলে একটা কলাম ছাপা হল। সেখানে জানানো হয়েছে ভালো মেয়েদের জায়গা ঘরের ভিতর, তাদের কাজ শুধু পুরুষদের কাজে সাহায্য করা। সেই কলাম পড়ে এলিজাবেথের গা পিত্তি জ্বলে গেল। রেগেমেগে সে সম্পাদককে একটা চিঠি লিখে পাঠাল। নিজের নামের জায়গায় লিখল... লোনলি অরফ্যান গার্ল।
১৮৮৫ সালের কথা। জর্জ ম্যাডন তখন পিটসবার্গ ডিসপ্যাচের সম্পাদক। তিনি এই চিঠির ভাষা ও শৈলী দেখে মুগ্ধ হয়ে সেটা কাগজে তো ছাপলেনই, সঙ্গে চিঠি লিখে অনুরোধ করলেন পাঠিকা যেন তার আসল পরিচয় জানিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে। এলিজাবেথের কোনও সংশয় ছিল না। সে বিশ্বাসী ভঙ্গিতে কাগজের দপ্তরে গিয়ে জর্জ ম্যাডনের সঙ্গে দেখা করল। তার সঙ্গে কথা বলে ম্যাডন আবারও মুগ্ধ হলেন, এলিজাবেথকে নিয়মিত কলাম লেখার চাকরি দেওয়া হল। কিন্তু কয়েকদিন লেখার পরই সে মেয়ে একটা বেয়াড়া অনুরোধ করে বসল। এলিজাবেথ নয়, সে লিখতে চায় নেলি ব্লাই নামে। এই ছদ্মনামই তার কলমের পরিচয় হবে। ম্যাডন সব শুনলেন, বুঝলেন না ভালো, কিন্তু আপত্তি করলেন না৷
কিন্তু, কয়েকদিনের মধ্যেই ম্যাডন বুঝতে পারলেন এই মেয়ে অন্য ধাতুতে গড়া। টেবল ওয়ার্ক করলে ওর মন ভরবে না। এলিজাবেথ থুড়ি 'ব্রেভ নেলি ব্লাই' কে ছদ্মবেশে স্থানীয় কারখানায় পাঠানো হল সেখানকার মহিলা কর্মচারীদের প্রতি চলতে থাকা অন্যায় অবিচারের ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য। কোনও মেয়ের জন্য এই ধরনের ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের কাজ সে যুগে ভাবাই যেত না। নেলি অবশ্য নিঁখুত পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে সেই ফ্যাক্টরির অন্তরীণ দুর্নীতি আর মেয়েদের জোর জুলুম করে খাটিয়ে নেওয়ার বিরোধে একের পর এক কলাম লিখে চলল। ফলে ফ্যাক্টরির মালিকরা গেলেন মহা চটে। নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে আবার ডেস্কে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হল। কিন্তু ফ্যাশন আর ঘরোয়া বিষয়বস্তু নিয়ে লেখার প্রতি নেলির বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, ব্রেভ নেলি নামটা যখন সে নিয়েছে, তখন পুতু পুতু করে জীবন সে কাটাবে না। পিটসবার্গ ডিসপ্যাচের ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে মেক্সিকোতে একটা জায়গা খালি ছিল। তখন সেখানে স্বৈরাচারী পোরফিরিও ডিয়াজের শাসন চলছে, কেউ ভয়ে যেতে চায় না৷ নেলি প্রায় জোর করে ছয় মাসের জন্য মেক্সিকো চলে গেল। সেখানে সরকারের নিষ্ঠুরতা আর প্রেস ফ্রিডমের সেন্সরশিপ নিয়ে সে এমন সব জ্বলন্ত ভাষায় কলাম লিখতে লাগল, মেক্সিকোর সরকারের বড়কর্তাদের কালঘাম ছুটে গেল৷ একজন লোকাল জার্নালিস্টকে বেআইনি ভাবে গ্রেপ্তার করা হলে নেলি ভীষণ কড়া ভাষায় পোরফিরিও ডিয়াজের আলোচনা করল। এরপর সে ক্রমাগত হুমকি পেতে শুরু করল। লোকাল গুণ্ডা থেকে পুলিশ, কেউ খুন করার ভয় দেখায় তো কেউ বলে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হবে। নেলি অবিচল। সে একা থাকলে নেলি ব্লাইয়ের ছোটবেলায় শোনা গান গুনগুন করে। সে কিছুতেই ভেঙে পড়বে না, কিছুতেই দুর্বল হবে না। শেষমেশ কেউ তাকে গ্রেপ্তার করেনি, পিটসবার্গ ডিসপ্যাচই ভয় পেয়ে তাকে ফিরিয়ে আনে। নেলি এতে ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে সেখান থেকে ইস্তফা দিয়ে নিউইয়র্কে চলে আসে, কয়েকদিন ঘোরাফেরা করে 'নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডে' চাকরি পেয়ে গেল সে।
এইবারের কাজটা আরো চ্যালেঞ্জিং। সত্যিকারের (এবং কোনও মেয়ের জন্য প্রথম) ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের কাজ, মাঝেমধ্যেই নানান ঝুঁকি নিতে নয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক অ্যাসাইনমেন্টটা এল যখন নিউয়র্কের মেন্টাল অ্যাসাইলাম মানে পাগলখানার পরিস্থিতি বিচারের জন্য একজনকে কাজ দেওয়ার কথা উঠল। নেলি প্রায় লাফিয়ে উঠে এই দায়িত্ব নিল। সে বদ্ধ উন্মাদ সেজে দশ দিন সেই অ্যাসাইলামে কাটিয়ে দিল, সব কিছু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর করল। এসে সে অ্যাসাইলামের অব্যবস্থা আর দুর্নীতি নিয়ে এইসা ভয়ানক ডিটেলস সহ রিপোর্ট লিখল যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটা তদন্ত কমিটি বসানো হল অ্যাসাইলামের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করার জন্য, বাজেটও বাড়িয়ে দেওয়া হল কয়েক গুণ। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে নেলি পরে 'টেন ডেজ ইন দ্য ম্যাডহাউস' বলে একটা বই লিখবে, যে বই একশো বছর পরেও পাঠকপ্রিয়তা হারাবে না।
পরবর্তী দশ বছর ধরে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হিসেবে নেলি ব্লাই যে কত সামাজিক অবিচার আর দুর্নীতির কথা লিখেছে, কত শক্তিশালী মানুষের মুখোশ খুলে দিয়েছে, তার কোনও হিসেব নেই। বহুবার হুমকি পেয়েছে, মাফিয়ারা ভয় দেখিয়েছে, নেতারা চোখ রাঙিয়েছে, কিন্তু নেলি পরোয়া করেনি। শুধু মনে মনে গুনগুন করে গেছে ছোটবেলায় শোনা সেই গান।
শুধু পেশার জন্য তদন্ত করেই অবশ্য সে থামেনি। অ্যাডভেঞ্চার তার ধমনীতে বইত। 'অ্যারাইন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ' থেকে অনুপ্রানিত হয়ে সে একবার ৭২ দিনে দুনিয়া ঘুরে ফেলেছিল। সে এক ভ্রমণ বটে। চল্লিশ হাজার মাইলের এই রোমাঞ্চকর সফর করা হয়েছিল ঘোড়াগাড়ি, রেলগাড়ি, স্টিমার, নৌকা, জাহাজ ইত্যাদি করে। এই গোটা সফরের বিবরণ ধরা আছে 'অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ৭২ ডেজ' বইতে। কত প্রকাশক বেআইনি ভাবে ইংরেজি বই অনুবাদ করছেন, এই পাবলিক ডোমেনে থাকা চমৎকার বইগুলো তাঁদের চোখে পড়ে না কেন কে জানে?
এই বই লেখার পর নেলি সেলেব্রিটি হয়ে গেলেন। মেয়েরা সবাই নেলির উদাহরণ টেনে কথা বলতে শুরু করলেন। ষোল বছরের পারিবারিক জীবনের নানান ওঠানামার পর নেলি কিছুদিনের জন্য সাংবাদিকতা থেকে ব্রেক নিয়েছিলেন, ১৯১১ সালে তিনি 'নিউইয়র্ক ইভিনিং জার্নাল'- এর জন্য আবার কাজ করতে শুরু করেন। বারবার লেখালিখির মাধ্যমে তিনি জানিয়ে গিয়েছেন মেয়েরা কোনও অংশেই, কোনও ক্ষেত্রেই ছেলেদের চেয়ে কম নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ইউরোপের ফ্রন্ট লাইনে গিয়ে ট্রেঞ্চের ভিতরে থেকে রিপোর্ট করেছেন, এরম কোনও নজির তখন ছিল না। বাইরে যখন বোমা ফেলা হচ্ছে, নেলির বুক কেঁপে কেঁপে উঠছে, তখনও সে মনে মনে ছোটবেলার গান গুনগুন করছে।
নেলি ব্লাই নেলি ব্লাই
নেভার নেভার সাই
নেভার ব্রিং দ্য টিয়ারড্রপ
টু দ্য কর্নার অফ ইওর আই
আট্টান্ন বছরের স্বল্প আয়ুতে যে সংবেদনশীল জীবন নেলি কাটিয়েছেন, যে সাহস দেখিয়েছেন, পুরুষপ্রধান সমাজে বহু মেয়েকে, এমনকি বহু ছেলেকেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। স্টিফেন ফস্টার শুধু জানতে পারলেন না, নেলির জন্য লেখা একটি গান আসলে সত্যি সত্যিই এক নেলিকে জন্ম দেবে, যার জীবনের সঙ্গে গানের এই লাইনগুলো একেবারে খাপে খাপ।
নেলি ব্লাই হ্যাভ আ হার্ট
ওয়ার্ম অ্যাজ আ কাপ অফ টি
অ্যান্ড বিগার দ্যান দ্য সুইট পট্যাটো
ডাউন ইজ টেনেসি
হ্যাঁ। একটা গানও আপনার জীবন বদলে দিতে পারে।

শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

চাটনি পুরাণ

 


আজকাল ল্যাদ বেড়েছে বলে গল্প উপন্যাস দূর, আগের মতো ব্লগ বা ফেসবুক পোস্টও করা হয় না। বছর দুই তিন আগে যে সমস্ত অদ্ভুত অনালোচিত ঘটনা আর ইতিহাস নিয়ে লেখালিখির ইচ্ছে ছিল, সে সব লিস্টি করলেই একটা পুস্তিকা হয়ে যেত৷ দেদার ডকুমেন্ট আর কাটিং রাখা আছে এখনও ল্যাপটপে। বেশিরভাগ বিষয় নিয়েই এখনও তেমন কথাবার্তা হয় না (বা আমার নজরে পড়ে না) বলে একটু অবাকই লাগে। যেমন- চাটনি! 

কুলের, আমের, তেঁতুলের চাটনির কথা ভেবে হুসহাস করার আগে জানাই, এ-ই চাটনি সেই চাটনি নয়। এ এক ইন্টারন্যাশনাল চাটনি, লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ যে চাটনির পাঙ্খা। গুয়ানা থেকে ফিজি, সাউথ আফ্রিকা থেকে ভারত, চাটনির অনুরাগী কম নয়। এই চাটনির ইতিহাসও অসামান্য।  মুচমুচে, সাস্পেন্সফুল এবং সুরেলা। সুরেলা, কারণ এই চাটনি আসলে হল চাটনি মিউজিক।  

ভারতবর্ষ থেকে দরিদ্র গিরমিটিয়াদের হাত ধরে সুদূর ক্যারিবিয়ানে এই পূর্ব ভারতীয় সঙ্গীত কীভাবে পৌঁছল আর ফুলেফেঁপে সাম্রাজ্য বিস্তার করল, সে এক অসামান্য কাহিনি। ১৮৫৭ সালের সৈন্য অভ্যুত্থান এর পর থেকে ভারতবর্ষের গ্রামগঞ্জে ব্যাপক দারিদ্র‍্য দেখা যায়, কাজকর্মের অভাব আর সাহেবদের সন্দেহপ্রবণ অ্যাটিটিউডের জন্য প্রচুর মানুষকে ছাঁটাই করা হয়। এর আগে থেকেই ক্যারেবিয়ান আর ফ্রেঞ্চ গুয়ানাতে বিভিন্ন জায়গায় সস্তা শ্রমিকদের চাহিদা বেড়েছে, আর ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ফড়েদের মারফত কুলি ধরে আনার কিসসাও কিছু নতুন নয়। গিরমিটিয়া কুলিদের ইতিহাস বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু কিছু বাংলা বইতেও উঠে এসেছে, কিন্তু প্রামাণ্য, ওয়েল রিসার্চড ডকুমেন্টেশন পড়তে চাইলে প্রবীণ কুমার ঝা- এর 'কুলি লাইনস' একটা অসামান্য কাজ। যাই হোক, সেই সময় উত্তরপ্রদেশ আর বিহার (বা পূর্বাঞ্চল যাকে বলে) থেকে প্রচুর গিরমিটিয়া কুলি ক্যারেবিয়ানে গেছে, আর ফেলে আসা মাটির দীর্ঘশ্বাস আর স্মৃতির পাশাপাশি ভোজপুরি আর ম্যায়থিলী ভাষার সংস্কার, লোককথা, শিল্প ও সংগীত সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন। যেভাবে জ্যাজ গড়ে উঠেছিল কাপাস প্ল্যানটেশনের ব্ল্যাক লেবারদের হাত ধরে, চাটনি মিউজিকের ক্রেডিট এই সমস্ত গিরমিটিয়া কুলিদের দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অবশ্য সেই সঙ্গীত সম্পূর্ণ ভাবে বিকশিত হতে হতে কয়েক শতাব্দী লেগে গেছে, ততদিনে গিরিমিটিয়াদের পরবর্তী প্রজন্মদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষদের সম্পর্ক বেড়েছে, দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষজন মিলে পরিবার গড়ে তুলেছে, ভোজপুরি সঙ্গীতের সঙ্গে ক্যালিপ্সো মিশেছে, ঢোলকের পাশাপাশি সোকা বিটস আর তাশা ড্রাম ঢুকে গেছে। ভাষাও হয়েছে পাঁচমিশালি। পরবর্তীতে চাটনি মিউজিক জ্যাজ, আমেরিকান রক, লাতিনো সঙ্গীতের পাশাপাশি বলিউডি সঙ্গীতেও প্রভাব ফেলেছে, যদিও সে কথা খুব বেশি মানুষ জানেন না। 

আমার এক পূর্বাঞ্চলের বন্ধু গিরমিটিয়াদের বংশধরকে বিয়ে করে ট্রিনিডাডে সেটল করে গেছে। দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব কম নয়, কিন্তু সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেখতে গেলে মনে হয় একই গ্রামের মানুষ। খাওয়াদাওয়া এক, আচার আচরণ এক, শখ আহ্লাদ উৎসবও এক। শুধু একটাই তফাত, প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়া লেগে ওদেশের গিরমিটিয়া বংশধররা কুসংস্কার ঝেড়ে অনেকটা ওপেন মাইন্ডেড হয়ে গেছে। মানাউসে এক বৃদ্ধা স্টুডিও মালিকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাঁর পূর্বপুরুষরা সবাই ফ্রেঞ্চ গুয়ানায় কুলির কাজ করত। কিন্তু শিক্ষা দীক্ষা ক্যাথোলিক স্কুলেই হয়েছে, বড় হয়ে বিদেশ গেছে। অনেকেরই এক কাহিনি। ক্রমে এ-ই ক্রস কালচার লিঙ্গুয়া সভ্যতা কুড়ি পঁচিশটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

যাই হোক, কথা হচ্ছিল চাটনি নিয়ে। প্রায় দু আড়াইশ বছর ধরে চাটনি সঙ্গীত গিরমিটিয়া এবং স্থানীয় মানুষের জীবনের অংশ হয়েছিল, কিন্তু ১৯৬৮ সালের আগের কোনও রেকর্ডিং পাওয়া যায় না। লোকগানের সঙ্গে এমনটা প্রায়ই ঘটে থাকে। ম্যায়থিলি আর ভোজপুরি ভাষী সংস্কৃতিতে প্রায় প্রতিটা আচার অনুষ্ঠান উৎসবের জন্য একগাদা করে ঘরোয়া গান বাঁধা হয়, ধনতাল ঢোল সহযোগে গাওয়াও হয় হরদম, সেই সব গানের কথাও দারুণ মজার। কিন্তু সেসব খুব ভালো করে ডকুমেন্ট করে রাখা হয়নি। 

১৯৬৮ সালে রামদেব চ্যায়তোয়ে 'কিং অফ সুরিনাম' বলে একটা অ্যালবাম রেকর্ড করে চর্চায় চলে আসেন। এইসময় উঠে আসেন দ্রৌপতি বলে এক গায়িকাও। কিন্তু চলতি হিন্দিতে যাকে বলে 'ফাট জানা', সেই পপ কালচার বিষ্ফোরণটা হল হ্যারি মহাবীরের সৌজন্য, তিনি বিহার আর ইউপিয়ান অর্কেস্ট্রার পাশপাশি হিন্দি সিনেমার গান আর স্থানীয় সঙ্গীত মিশিয়ে এমন এক জগাখিচুড়ি জিনিস বানিয়ে ফেললেন, যা শুনলেই সেখানকার মানুষের মনে অতীতের-- যে অতীতের কথা অনেকে শুধু শুনেই এসেছে-- টক মিষ্টি স্মৃতির নস্টালজিয়া তাজা হয়ে ওঠে। এই টক মিষ্টি স্বাদের গানের স্বাদ আসলে আম বা ধনেপাতা পুদিনার চাটনির মতোই। সুতরাং, চাটনি মিউজিক।

সত্তর আশির দশকে সুন্দর পোপো চাটনি মিউজিককে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছিলেন। তাঁকে চাটনির গডফাদারও বলা হয়। মজার মজার সব গান, কিন্তু এরই মধ্যে খুব সূক্ষ্ম ভাবে ডার্ক হিউমার আর সমাজের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরার স্বভাব ছিল তাঁর। যেমন...

আগে আগে নানা চলে

নানি গোইং বিহাইন্ড

নানা ড্রিংকিং হোয়াইট রাম

অ্যান্ড নানি ড্রিংকিং ওয়াইন

নানা রাইডিং বাইসাইকল

নানি রিংগিং বেল

নানি লকড দ্য হ্যান্ডল

দে ফেল ইনসাইড আ ওয়েল

মাই নানা অ্যান্ড নানি

ওয়েন্ট টু টাই আ গোট

মাই নানা মেড আ মিসটেক

অ্যান্ড কাট দ্য নানিজ থ্রোট

নানি ডেড অ্যান্ড গন

মাই নানা গন টু হ্যাং

সো আই হ্যাড টু টেক ওয়ান

ফর মাই কম্প্যানিয়ন

সুন্দর পোপোর এই 'নানা নানি' আগুনের মতো দ্বীপগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল, রেকর্ড বিক্রি হতে লাগল খাস্তা কচুরির মতো। সুন্দর পোপো হ্যারি মহাবীরের শিষ্য ছিলেন, তিনি গুরুর কথা শুনে একেবারে ভারতের গাঁও দেহাতের গানগুলো চাটনিতে নিয়ে এলেন, বিয়ের বাসর রাত্রে পিসিমাসিদের হাসিঠাট্টা করে গাওয়া দ্বিঅর্থী গানগুলো ওয়েস্টার্ন কম্পোজিশন সহ তুলে এনে মানুষকে সেই নস্টালজিয়া ফিরিয়ে দিলেন, যা তারা প্রায় ভুলতে বসেছিল।

'রতিয়া মে দুলহা কে মৌসী বোলল গয়ে...'

'হমরে ভিলেজ মে কোহরা ব্যায়গন বহুত হ্যায়, হম তুরব তু না বেচবে কে নাহি..'

কিন্তু এ বাদেও সুন্দর পোপো এক্সপেরিমেন্টাল গান, গভীর গান কম গাননি। ইংরেজিতে গাওয়া গান I wish I was a virgin বা  Don't fall in love এর মতো গানগুলো যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সুন্দর পোপোর পাশাপাশি স্যাম বুদ্রাম, আইজ্যাক আর রাকেশ ইয়াঙ্করণ, জগেসসর এর মতো শিল্পীরা নানা স্বাদের গান গাইতে শুরু করে। ইয়াঙ্করণের একটা গান আছে... বড়ে দূর সে আয়ে হ্যায়! 





'আনজানে লোগো মে কোই সাথ তো মিলেগা, কোই তো হোগা জো হমকো সামঝেগা..'

ঠিক এই সময়েই দেশের গরীব মানুষরা আধুনিক ভারত থেকে কাজের খোঁজে দূর দেশে যেতে শুরু করেছে। কেউ আরবে, কেউ আফ্রিকায়, কেউ আরো দূরে। এই মর্মস্পর্শী গানগুলো তাঁদের আপন হয়ে উঠল। যাঁরা বলেন চাটনিতে অশ্লীল গান ছাড়া কিছু নেই, তাঁরা সম্ভবত এই ঘরানার অনেক গানই শোনেনি।

পরবর্তীতে এই ধারায় অনেকেই এসেছেন, কিন্তু সকলের কথা বলা সম্ভব নয়। তবু চাটনির কথা উঠলে যে দুজনের কথা না বলে থামা যায় না তারা হল হরি ওম শরণ আর বাবলা-কাঞ্চন জুটি।

পূর্বাঞ্চলে হরি ওম শরণের ভজন ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় শোনেনি, এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। 'ম্যায়লি চাদর ওড় কে ক্যায়সে হো' আর 'তেরে রামজি করেঙ্গে বেড়া পার' এখনও হরদম বাজে। তা ওম শরণ এর বিয়ে হয় গুয়ানার চাটনি গায়িকা নন্দিনীর সঙ্গে, এরপর থেকে তিনি 'শ্বশুরবাড়ি'তে ভারতীয় ভজনের প্রোগ্রাম করে অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করেন। বলা যায় আধুনিক যুগে তিনি ভারতের সঙ্গীতকে ক্যারেবিয়ানে নিয়ে গেছেন। তাহলে এও বলতে হবে যে বাবলা-কাঞ্চন আবার চাটনি আর চাটনি-সোকা ঘরানাকে ভারতে আর বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় জনপ্রিয় করতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। বাবলা ছিলেন আসলে বিখ্যাত কম্পোজার কল্যাণজি-আনন্দজির ভাই, শোনা যায় 'খাইকে পান বানারস ওয়ালা' থেকে শুরু করে তাঁদের অনেক গানই বাবলা কম্পোজ করেছিলেন, তাদের সুরে অনেক গান গেয়েছিলেন কাঞ্চন। কিন্তু দিনের পর দিন বম্বেতে ঘুরেও, বড় বড় নামের কাছে আশ্বাস পেয়েও তাঁদের কেউ স্বাধীন ভাবে ব্রেক দেয়নি। মনক্ষূণ্ণ হয়ে বাবলা-কাঞ্চন (একসময় তারা বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন) নিজেদের ব্যান্ড খুলে প্রোগ্রাম করতে শুরু করেন এবং ক্রমে ভীষণ ভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ক্যারেবিয়ানে৷ এরপর তারা সারা দুনিয়ায় অনুষ্ঠান করেছেন, 'ক্যায়সে বানি' অ্যালবাম তো এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে বড় বড় কর্পোরেট থেকে তাঁদের বিজ্ঞাপনের জন্য গান করতে বলা হয়েছিল। ২০০৪ সালে কাঞ্চন মারা যান, বাবলা অবশ্য অনুষ্ঠান করছিলেন।

যে সময় সবাই ভাবছে চাটনির কথা ভারতে আর কেউ জানবে না, সেই সময় একটা মেয়ে এসে হাজির হল ক্যারেবিয়ানে। নতুন একটা সিনেমা হচ্ছে, সেই জন্য সে চাটনি মিউজিক ব্যবহার করতে চাইছে। মাসের পর মাস ধরে এই দ্বীপ সেই দ্বীপে ঘুরে, অজস্র পুরোনো রেকর্ড শুনে, চাটনি আর সোকা মিউজিকের সর্বেসর্বা আর অতীত শিল্পীদের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করে সেই মেয়ে ফিরে গেল। কয়েক বছর পর সিনেমা রিলিজ হল আর এই গানগুলো লোকেদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল।

'আই অ্যাম আ হান্টার আই ওয়ান্ট টু সি ইওর গান'

'ইলেক্ট্রিক পিয়া'

'মুরা'

'উমনিয়াঁ'

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। মেয়েটার নাম স্নেহা খানবলকর। সিনেমার নাম 'গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর'।

চাটনি মিউজিকের জয়যাত্রা অব্যাহত। ইচ্ছে হলে ইউটিউবে শুনে দেখতে পারেন।


শুক্রবার, ২১ জুন, ২০২৪

ইয়েমেন: দ্য লং স্টোরি অফ হাউথি মিলিশিয়া

 

Photographs by Amira Al-Sharif

গোটা দুনিয়া ধরে যে ছিছালেদর শুরু হয়েছে, তাতে ডিসকোর্সের কোনও জায়গা আর বাকি নেই। বাকি নেই কোনও রিস্ট্রেনও। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকার, অ্যাগ্রেশন আর রাগ সকলের নাকের ওপর বসে আছে। পান থেকে চুন খসলেই গালাগাল চড় থাপ্পড় লাথি ঘুষি কাট্টা চাকু ট্যাঙ্ক মিসাইল সার্জিকাল স্ট্রাইক যুদ্ধ... এখন এসব কোনও ব্যাপারই নয়। যেদিকে তাকাও, ভারত থেকে মেক্সিকো, রাশিয়া থেকে ইউক্রেন, কোরিয়া থেকে শ্রীলঙ্কা, নারকো টেরর থেকে রিলিজয়াস পোলেরাইজেশন... সব জায়গায় এক কাণ্ড। নিজের ইমোশন কন্ট্রোল না করতে পেরে রাগের বশত একটা ভুলভাল কাজ ঘটিয়ে ফেলা, তারপর সেটা জাস্টিফাই করা। জাস্টিফিকেশানের জন্য তামাম কারণ, হোয়াটাবাউটারি আর যুক্তিও তৈরিই থাকে। কিন্তু কেউই ভাবে না এক একটা ছোট্ট অ্যাকশনের দীর্ঘকালীন কনসিকোয়েন্স কী হতে পারে!
উদাহরণ এর জন্য, এই সময়ের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে ঘটনা গোটা দুনিয়ার ঘুম কেড়ে রেখেছে, গ্লোবাল সাপ্লাই চেনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোটি কোটি ডলার লোকসান করিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সহ বাকি পৃথিবীর শক্তি সমীকরণ বদলে দিচ্ছে, তা শুরু হয়েছিল এরকমই একটা ছোট্ট ঘটনা থেকে। কিছু অপমানজনক কথা, আর তারপর অন্য পক্ষকে হেয় করে একটা ছোট্ট ভায়োলেন্ট অ্যাকশন! এখন সারা দেশ ও অর্ধেক দুনিয়াকে সেই অ্যাগ্রেসনের মূল্য চোকাতে হচ্ছে।
কথা হচ্ছে হাউথি মিলিশিয়া নিয়ে, ইয়েমেনের এই সন্ত্রাসবাদী দল যা শুরু করেছে, তাতে আইসিস আর আল কায়দাও লজ্জা পেয়ে যাবে। কিন্তু, ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অনেকেই এখনও বিশেষ কিছু বলছেন না, রাজনীতির এই নিয়ম। আসলে দুনিয়ার ঘুম উড়ে গেছে। যাই হোক, জিওপলিটিক্স নিয়ে ছোটখাটো কিছু লিখতে গেলেও অনেকটা বড় গল্প হয় যায়, আর এই ঘটনা প্রায় তিরিশ চল্লিশ বছর ধরে চলছে। ধৈর্য না থাকলে না পড়াই ভালো।
ইয়েমেন দেশটা বহুকাল ধরে দুটো আলাদা আলাদা দেশে বিভক্ত ছিল। সবচেয়ে জনবহুল জায়গায় চিরকাল জায়দি মুসলিমদের শাসন ছিল, এরা শিয়া মুসলিমের একটা গোষ্ঠী। ছয়ের দশকে একটা মিলিটারি ক্যুপ হয়ে জায়দি সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়ে, উত্তর ইয়েমেনে নতুন শাসকদলের আবির্ভাব হয়। এদের মধ্যেও মারামারি চলতেই থাকত, ইনফ্যাক্ট প্রথম দিকের অনেক শাসককেই খুন করা হয়েছিল। কিন্তু সাতের দশকের শেষের দিকে আলী আব্দুল্লাহ সালাহ বলে একজন কর্নেল শত্রুদের দমিয়ে নর্থ ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠেন। সালাহ ছিলেন জায়দি, কিন্তু এই গোষ্ঠীর আদর্শ বিশ্বাস পূর্ব সংস্কারের সঙ্গে তার দূর-দূর অব্দি কোনও সম্পর্ক ছিল না। ১৯৯০ আসতে আসতে সালাহ দক্ষিণ আর উত্তর ইয়েমেনের একীকরণ করে নতুন দেশের পত্তন করেন, কিন্তু এই বিশাল দেশের হাল হকিকত তাঁর কিছুই জানা ছিল না। ইয়েমেনের অধিকাংশ শক্তি ছিল সুন্নিদের কাছে, জায়দিদের সেটা পছন্দ ছিল না। উত্তরের পাহাড়ে মানুষ সুযোগ সুবিধা কিছু পেত না, তাদের সাহায্য করতে একটা নন প্রফিট আর এস এস এনজিও মার্কা ধার্মিক-সামাজিক সংগঠন গড়ে ওঠে, তারা সামাজিক কাজকর্ম করত, খাদ্য পানীয় স্বাস্থ্য সুবিধা নিয়ে সভাসমিতি বসাত, কিন্তু রাজনৈতিক অভিসন্ধি তাদের ছিল না। তবে এটা সত্যিই যে জায়দি গোষ্ঠীর একজন লোক দেশের হর্তাকর্তা বিধাতা হয়ে বসেছে আর নিজের লোকদেরই পাত্তা দিচ্ছে না, এই ঘটনার ফলে সালাহ অনেকের চোখের বালি হয়ে উঠেছিলেন। যাই হোক, সালাহর নিজের ক্যাবিনেটেই এক পলিটিশিয়ান ছিলেন, তার নাম হোসেন আল- হাউথি, তিনি নিজেও জায়দি, এবং এই মানুষটি বারবার সালাহের কাছে আবেদন জানিয়ে যাচ্ছিলেন যে জায়দির প্রতি একটু সদয় হওয়া দরকার, সৌদি সরকারের কথায় না নেচে বরং দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের ওপর অ্যাকশন নেওয়া হোক, সঙ্গে তাদের নিজেদের লোককে একটু বেশি অধিকার দেওয়া হোক, টাকাপয়সা রোজগার এর ব্যবস্থা হোক, উত্তরের জনতা আর ক্যাবিনেটের অনেকেই খুব একটা খুশি নেই, বিদ্রোহ হতে পারে।
কিন্তু সালাহ তাঁকে পাত্তা দেননি। উল্টে কানের কাছে এই বকবক শুনে তাঁকে বারবার অপমান করেছেন, চোখ রাঙিয়েছেন, কড়া কড়া কথা শুনিয়েছেন, (শোনা যায় গায়ে হাতও তুলেছিলেন) এমনকি এ-ও বলেছেন, ওই পাহাড়ি অশিক্ষিত গুণ্ডাদের তিনি মোটেও কেয়ার করেন না। তারা চুলোয় যাক, সঙ্গে ইচ্ছে হলে হাউথিও সেখানে চলে যেতে পারেন। ক্যাবিনেটে তাঁর প্রয়োজন নেই।
সালাহ বেচারি জানতেন না, তার এই অদূরদর্শী মনোভাব গোটা ইয়েমনকে এমন এক চিরকালীন হিউম্যানিটেরিয়ান ক্রাইসিসে ঠেলে দেবে যেখান থেকে বেরোনোর কোনও আশাই থাকবে না। হাউথি অপমানিত হয়ে তাই করলেন, যা অন্য কোনও মাথা গরম জায়দি লিডার হলেও করত। তিনি সরকার থেকে আলাদা হয়ে সাদ্দায় একটা নিজস্ব পলিটিকাল উইং খুলে বসলেন আর নর্থের সেই ধার্মিক-সামাজিক 'বিলিভার্স ইউথ'-কে গরমাগরম ভাষণ দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুললেন। এতদিন ধরে যারা শুধুই মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে কাজ করছিল, তারা আচমকা মনে করতে শুরু করল, এসব করে কিস্যু হবে না, এই একরোখা সরকারকে তাড়াতে না পারলে তাদের মুক্তি নেই, কিছুই ঠিক হবে না। ফলে দু এক বছরের মধ্যেই ছাত্রদের জন্য সামার ক্যাম্প বদলে গেল মিলিশিয়া ক্যাম্পে, খাবারের জায়গায় বিতরণ হতে লাগল রাইফেল, ইরানের ইসলামিক বিল্পবের মতো করে একটা নতুন ইয়েমেনিক বিপ্লবের রূপরেখা তৈরি হতে লাগল। দশ বছরও হল না, দেখা গেল উত্তর ইয়েমেন জুড়ে সালাহর বিরোধীরা তাণ্ডব শুরু করেছে, পাহাড়ি অঞ্চলে নিজেদের চেকপোস্ট লাগিয়েছে, হাজার হাজার লোক অস্ত্র হাতে স্লোগান দিচ্ছে।
এমন সময় ৯/১১ এর ঘটনা ঘটে গেল। ইয়েমেনে লুকিয়ে থাকা আল কায়দার সন্ত্রাসীদের খুঁজে বার করার জন্য আমেরিকা সালাহর ওপর চাপ দিতে লাগল। সালাহ আর কী করেন, সৌদির হাত আছে তার ওপর, আর ইউ এস আর সৌদি অ্যালাই। তিনি অনুমতি দিলেন, আমেরিকান ম্যারিনরা ইয়েমেনে এসে সন্ত্রাসীদের কচুকাটা করতে লাগল, সন্দেহের বশে সাধারণ মানুষের ওপরেও টর্চার শুরু হল, ইয়েমেনের মিলিটারিও তাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। এসব দেখে জায়দিরা রেগে আগুন, তারা শিয়া সেক্ট, সৌদির সুন্নি মুসলমানদের ওপর তাদের আগে থেকেই রাগ। আর আমেরিকার ওপর তো রাগ চিরকালের। দুই শত্রুর সঙ্গে হাত মিলিয়ে সালাহ নিজের দেশের শিয়াদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছেন দেখে তারা উত্তর ইয়েমেন জুড়ে একেবারে সশস্ত্র বিপ্লব করে বসল। অল-হৌথি নিজে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভাষণ দিচ্ছেন, আঠ থেকে আশি সবাই ঝপাঝপ র‍্যাশনালাইজ হচ্ছে। ধর্মের গার্নিশিং করলেই অল্পশিক্ষিত লোকজন একদম যুক্তিবুদ্ধি হারিয়ে 'মার মার কাট কাট' করে, ততদিনে অল-হাউথি জেনে গেছেন।
এইবার টনক নড়ল সালাহর। কিন্তু তিনি হলেন রাজা, ডিপ্লোম্যাসি দেখাবেন কেন? অন্যদের অপমান করতে পারেন, তাই বলে নিজের অপমান সইবেন কেন? সেই মানুষটার সঙ্গে আলোচনায় বসবেন যাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, এই গুণ্ডাদের দাবির সামনে মাথা নত করবেন? কভি নেহি। ফলে সালাহ করলেন কি, সোজা সিআইএ স্টাইলে অল-হাউথির উপর একটা 'বাউন্টি' ঘোষণা করলেন, সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে যথেচ্ছ ভাবে রেবেল-নন রেবেল নির্বিশেষে সবাইকে কচুকাটা করলেন আর ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে বললেন, "অল হাউথি ইজ অ্যান্টিন্যাশনাল!" এর এক সপ্তাহের মধ্যেই মিলিটারি অ্যাকশন করে অল হাউথিকে একটা গুহা থেকে খুঁজে বার করা হল আর যমের বাড়ি পাঠানো হল।
সালাহ ভেবেছিলেন, কাম খতম। এই ভায়োলেন্স দেখে বিদ্রোহীরা ভয়ে সিঁটিয়ে যাবে। কিন্তু, ওই একটা বুড়ো লোক কবে বলে গেছিল না, অ্যান আই ফর অ্যান আই মেকস দ্য হোল ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড!
সালাহ ভাবতেও পারেননি, অল হাউথির হত্যা আগুনে ঘি-এর কাজ করবে! হাউথি সরকার থেকে বেরিয়ে জায়দিদের অধিকার দেওয়ার জন্য কাজ করছেন (এমনটা তাদের বলে বোঝানো হয়েছিল, আসলে তিনি নিজেও ক্ষমতালোভীই ছিলেন), তাঁকে দেশদ্রোহী বলাটা লোকেদের পছন্দ হয়নি। ফলে অল হাউথির সমস্ত ফলোয়াররা একাট্টা হয়ে নিজেদের 'হাউথি-রেবেল' বলে সরকারের বিরুদ্ধে ফুল ফ্লেজড যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল। এতদিন ধরে যারা দোনামনা করছিল, এইবার তারাও হাতিয়ার তুলে নিল! একটা মাঝারি আকারের সেপারেটিস্ট আন্দোলন কখন একটা বিশাল মিলিশিয়া গ্রুপ হয়ে উঠল, কেউ বুঝতেও পারল না।
২০০৪ সাল আসতে আসতে হাউথি সন্ত্রাস সালাহের সেনাকে তাদের স্ট্রংহোল্ড থেকে তাড়িয়ে দিয়ে জায়গা অধিকার করতে শুরু করল। স্থানীয় সমর্থন ছিলই, উত্তর মধ্য ইয়েমেনের ভূদৃশ্যের সঙ্গে তারা পরিচিত, দরকার পড়লে পাহাড়ের গিরিখাত আর গুহায় লুকিয়ে পড়ার জন্য ঘাঁটি তৈরি হয়ে গেছে। ফলে একেবারে গুরিল্লা স্টাইল ক্যাম্পেন চালিয়ে সালাহের আর্মিকে জবাই করা হতে লাগল। ইয়েমেনি আর্মি সার্চ পার্টি নিয়ে বেরোলে। তারা কিছুতেই হাউথিদের খুঁজে পায় না। গ্রামবাসীদের উপর জোরাজুরি করে তাদের ঘাঁটির খবর জানার চেষ্টা করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হল, একের পর এক পাহাড়ি আদিবাসীরা, অত্যাচারিত গ্রামের লোকজন রেগেমেগে হাতে অস্ত্র তুলে হাউথিদের সঙ্গে যোগ দিতে লাগল। সালাহ উপায়ান্তর না দেখে এইবার সৌদির কাছে সাহায্য চাইলেন, যদি শত্রুদের ঘাঁটিয়ে এয়ারস্ট্রাইল করে লাভ হয়, অস্ত্রও দরকার। সৌদি সাহায্য করল বটে, কিন্তু তখন তারা নিজেরাও জানত না এই একটা পদক্ষেপ ইয়েমেনের এই পাহাড়ি যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক করে তুলবে। এয়ারস্ট্রাইকের ফলে হাউথিদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল, তারা উত্তরে সীমানা পেরিয়ে সৌদির শহরে হামলা চালাতে লাগল, তাদের নাগরিকদের হোস্টেজ রেখে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে দিল।
এদিকে, ইরান এতদিন বসে বসে এই সব ঘটনার উপর নজর রাখছিল। হাউথিরা এখন সৌদিকে থাপ্পড় মারছে, আর মধ্যপ্রাচ্যের আরব জগতে সৌদি ইরানের সবচেয়ে বড় শত্রু, তাদের সর্বনাশ করতে মদদ তো দিতেই হয়। ফলে ইরান এইবার রেড সি-এর রাস্তা দিয়ে হাউথি মিলিশিয়ার জন্য অস্ত্র আর অর্থ পাঠাতে শুরু করল, বিনিময়ে তারাও রেগুলার ইন্টারভালে সৌদিতে হামলা চালিয়ে গেল, মাঝেমধ্যে ইজরায়েলেও মিসাইল ছুঁড়ে মারতে লাগল। এদিকে সৌদি পড়েছে মহা বিপদে, একদিকে দক্ষিণে হাউথিরা ঝামেলা পাকাচ্ছে, অন্যদিকে অল কায়দার একটা শাখা এসে দেশে ডেরা বেঁধেছে। হাউথিদের পরে মজা দেখাব ভেবে তারা আগে এই অল কায়দার শাখাকে টার্গেট করল। অল কায়দার সৌদি ব্রাঞ্চও কম যায় না, তারা ওখান থেকে পালিয়ে ইয়েমনে থাকা অল কায়দা ব্রাঞ্চের সঙ্গে জোট পাকিয়ে একটা খতরনাক দল বানিয়ে ফেলল, সেটার নাম অল কায়দা ইন আরাবিয়ান পেনিনসুলা কাম এ কিউ এ পি। গত দশ বছরে বোঝা গেছে, নেটওয়ার্ক আর ফান্ডিং এর দিক থেকে এই দলটির মতো বিপজ্জনক সন্ত্রাসী দল আর মধ্যপ্রাচ্য দূর, সম্ভবত দুনিয়াতেও নেই। যাই হোক, এ কিউ এ পি এর লক্ষও আইসিসের মতো একটা বিশাল ইসলামিক স্টেট বানানো, কিন্তু এই পূণ্য কাজে অন্য দল এসে ভাগ বসাবে, সেটা হতে দিতে তারা নারাজ। তাই ব্যাটাচ্ছেলেরা একদিকে হাউথি, অন্যদিকে সালাহের আর্মির সঙ্গে লড়াই শুরু করে দিল। (যারা ভাবছেন আইসিস নিজে কোথায়, সবুর করুন, এখন সবে ২০১০ সাল)
২০১১ সালে আরব বসন্তে কী হয়েছিল সবাই জানে। একের পর এক দেশে বিপ্লব শুরু হল, জনতা দুর্নীতিবাজ সরকারকে সরে যাওয়ার জন্য পথে নেমে পড়ল। একদিকে কেওস, অন্যদিকে আশা। ইরান আর সৌদি দুজনেই দেখল, সুযোগটা কাজে লাগানো যাক। এই মওকায় এমন সব দেশে অ্যালাই বানানো যাক যারা পরে দরকার পড়লে সাহায্য করতে পারবে। প্রথমেই নজর পড়ল ইয়েমেনের উপর। ইয়েমেনেও মিছিল আর জনবিদ্রোহ চলছে, হাউথিরা আগেই সরকারকে ঘোল খাওয়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে আছে, এই সময়টা কাজে লাগিয়ে রেজিম চেঞ্জ করে নিজেদের একটা লোককে সরকারে বসানো হোক। কিন্তু সালাহ যেমন গোঁয়ার ছিলেন তেমন গোঁয়ার আছেন। কিছুতেই তিনি গদি ছাড়বেন না। তাতে জনারোষ আরো বেড়ে গেল। সৌদি বুঝল, এইটাই লাস্ট চান্স। তাদের দক্ষিণ সীমান্তে এসে হৌথিরা যা শুরু করেছে, সেটাকে সামাল দিতে হলে ইয়েমেনে নিজের কন্ট্রোল চাইই চাই। তারা গিয়ে মধ্যস্থতা করার জন্য ইউনাইটেড নেশনসকে ধরল। ইউ এন আর সৌদির সম্মিলিত চাপে পড়ে সালাহ গররাজি হলেন, তাছাড়া প্রাণের ভয়ও ছিল, বিপ্লবীদের হাতে পড়লে মেরে হালুয়া বানিয়ে দেবেন। তিনি গদি ছেড়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদার মনসুর হাদিকে রাষ্ট্রপতি বানালেন, কিন্তু যেতে যেতে এতদিনে সঞ্চয় করা কয়েক বিলিয়ন ডলার নিয়ে যেতে ভুললেন ন, আর্মি আর ক্যাবিনেটের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও টাকাপয়সা দিয়ে নিজের দিকে টেনে আনলেন। ওদিকে হাদি প্রথমদিকে হাউথিদের সঙ্গে সন্ধি করতে চাইলেন, কিন্তু বছরখানেক টানাটানি করেও কিছুই হল না, হাউথিরাও বুঝে গেল এ ব্যাটা শুধুই নাটক করতে এসেছে, ডিরেক্টর আসলে রিয়াদে বসে কাবাব খাচ্ছে। "ন্যাশনাল ডায়ালগ-এর নিকুচি" বলে তারা বেরিয়ে গেল, এতদিন সময় নষ্ট হয়েছে, সংগঠন দুর্বল করাই এর উদ্দেশ্য ছিল। তারা আবার দ্বিগুন উৎসাহে ইরানের সাহায্য নিয়ে অসমাপ্ত কাজ শেষ করায় মন দিল।
২০১৪ সাল আসতে আসতে হাউথিরা যে কোনও আধুনিক সৈন্যদলের সমকক্ষ হয়ে উঠল, একের পর এক জায়গা সরকারের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে তারা। ড্রোন, মিসাইল, রকেট, বোমা, অধ্যানুনিক রাইফেল, মাইন… ট্রেনিং ক্যাম্প দেখে বোঝার উপায় নেই এরা একটা সন্ত্রাসী দল। এদিকে হাদ্দির অবিবেচনায় দেশের অবস্থা আরো খারাপ, লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এমন সময় তেলের দাম বাড়তে শুরু করল, জনারোষ দেখে হাউথিরা বুঝল এটাই সুযোগ। তারা এইবার দক্ষিণ ইয়েমনের দিকে এগোতে শুরু করল। মজার কথা হল, এই সময়ে হাউথিদের চিরশত্রু সালাহ, বিলকুল নীতিশ কুমার স্টাইলে পালটি মারলেন, তিনি ভাবলেন, হাদ্দিকে ভাগিয়ে হাউথিদের সঙ্গে হাত মেলালে আবার গদি পাওয়া যেতে পারে! ফলে তাঁর প্রভাবে থাকা সামরিক আধিকারিকরা হাউথিদের সাহায্য করতে লাগল, কয়েকদিনের মধ্যেই রাজধানী সানা হাউথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে এল। হাদ্দি তাঁর মন্ত্রী ফন্ত্রী নিয়ে আরো দক্ষিণে পালালেন, কিন্তু হাউথি দস্যুরা তাড়া করছে। উপায় না দেখে তিনি সৌদি আরবে পালালেন৷ ২০১৫ আসতে আসতে হাউথিরা রাজধানী সহ দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে কব্জা করে স্বৈরশাসন চালাতে লাগল। যে বিলিভার্স ইউথ একসময় স্কুলে গিয়ে সামার ক্যাম্প করত, খাবার আর পোশাক দিত, স্বাস্থ্যসেবার জন্য চেষ্টা করত, তারাই এখন অপ্রেসিভ রেজিম চালাচ্ছে। কারো কথা পছন্দ না হলেই শুলে চড়ানো হবে! বাচ্চাদের স্কুল থেকে সরিয়ে এনে হাতে রাইফেল ধরিয়ে দেওয়া হল, মেয়েদের লাথি মেরে ঘরে বন্ধ করা দেওয়া হল, সিভিল সোসাইটির যে ক'জন হতভাগ্য এই দেশে রয়ে গিয়েছিল, তারা স্বাভাবিক নিয়মেই জেলে পচতে থাকল বা মারা পড়ল। বাচ্চারা তখন রাইফেল হাতে সাউথ দখল করবে বলে মার্চ করছে।
এদিকে সৌদি আরব তখন নার্ভাস হয়ে গেছে। সাদার্ন নেবারের দেশে এরকম কাণ্ড হলে কে আর শান্তিতে ঘুমাতে পারে? তারপর হাউথিদের উপর ইরানের হাত আছে, কাল হয়তো এরা রিয়াদেই চড়াও হবে। সৌদিরা নিজেদের বেশ অভিজাত ধনী মনে করে, এইসব ফালতু ঝামেলায় অয়েল বিজনেস ক্ষতিগ্রস্ত হলেই হয়েছে! তা ভয় পেলে কী কর‍তে হয়? কী আবার, ভয় পেলেও মারতে হয়, রাগ হলেও মারতে হয়, দুঃখ বা অপমান হলেও মারতে হয়, আর আনন্দ হলে তো মারতেই হয়! ভায়োলেন্স ইজ অলওয়েজ দ্য বেস্ট অপশন। ফলে সৌদি মিলিশিয়া-সিভিলিয়ান- হাউথি-আল কায়দা- বাচ্চা- বুড়ো নির্বিশেষে শয়ে শয়ে বোমা ফেলে ইয়েমনকে একেবারে ঝাঁঝরা করে দিল। ক্রাউন প্রিন্স আর রক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সলমান নতুন নতুন এসেছেন, একটা উল্লেখযোগ্য কাজ না করলে সিভি খারাপ হয়ে যাবে!
এয়ারস্ট্রাইকের পর অস্ত্র কম পড়তে এইবার তিনি বন্ধুর দিকে, মানে আমেরিকার দিকে চাইলেন। আমেরিকা ইরাকে গিয়ে বহুত ভুগেছে, নিজে আর ওই পাগলা আরবদের দুনিয়ায় ঢুকে অপমানিত হতে চায় না, তবে বন্ধু চেয়েছে বলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওবামা কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র পাঠানোর অনুমতি দিলেন, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নিষিদ্ধ ক্লাস্টার মিউনিশনও পাঠিয়ে দিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯, সৌদি আমেরিকার সব চেয়ে বড় আর্মস ইম্পোর্টার হয়ে রইল। সেই ২০১৫ থেকেই সৌদি আরব আর আরব কোয়ালিশনের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ইয়েমেনের যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। মাঝ থেকে অল কায়দার সেই গ্রুপ এসে জায়গা হড়প করছে, বাজারের নতুন মিলিশিয়া হিরো আইসিসও এসে পড়েছে। মার মার কাট কাট! এদিকে আমেরিকা বলল, হাউথিরা চুলোয় যাক আমার কি, কিন্তু আইসিস আর আল কায়দাকে তো দমন করতেই হবে। এই বলে তারা এই ইয়েমেনে এই দুটো সন্ত্রাসী দলের ডেরায় বোমা ফেলতে শুরু করল। কতজন সন্ত্রাসী মরল জানি না, কয়েক হাজার সিভিলিয়ান যে এয়ারস্ট্রাইকে মরল, তার প্রমাণ অবশ্যই পাওয়া গেছে। হাউথিরাও চুপ করে বসার পাত্র না, তারা সৌদিতে ঢুকে একের পর এক ঘটনা ঘটাতে লাগল। সেই দেখে রক্ষামন্ত্রী সলমান রেগে গেলেন, এত বড় সাহস! পরদিনই ইয়েমেনে একশো তিরিশটা এয়ারস্ট্রাইক হল, স্কুল হাসপাতাল বাড়িঘর ওয়াটার প্লান্ট সব খতম! কল থেকে যদি বা বেরোয়, কালো জল বেরোয়। সবুজের চিহ্ন নেই। বাতাস ভারী হয়ে থাকে। রেড সি-তে সৌদি নৌবহরের পাহারা, যাতে অস্ত্র না আসতে পারে৷ কিন্তু ইরানও কম যায় না। এদিকে হাজার্নালিস্টরা ওয়ার ক্রাইমের দোহাই দিচ্ছে, সলমান ভাই নিজের পিঠ চাপড়াচ্ছেন। এই প্রক্সি ওয়ারের মাধ্যমে যে তিনি চিরশত্রু ইরানকেই মজা দেখাচ্ছেন, তাতে তার সন্দেহ নেই। ওদিকে ইরানের সরকারও আনন্দে আছে, তার পাঠানো অস্ত্র যে হাউথিরা সউদিতে ব্যবহার করছে, এটা ভেবেই মুখ থেকে লালা ঝরে পড়ছে।
২০১৭ সালে সৌদি আর ইউএই ভাবল, সালাহকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনলে পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হতে পারে! সালাহ তো সেই জন্য জিভ বাড়িয়েই ছিলেন! হাউথিদের বিরুদ্ধে গেলেই তাঁকে ক্ষমতায় বসানো হবে শুনেই তিনি অবিকল ইয়েমেনিজ নীতিশ কুমার স্টাইলে রাজি হয়ে গেলেন, তাঁর নিজেদের সেনাপ্রধানরা এইবার হাউথিদের বিপক্ষে লড়তে শুরু করল। কিন্তু দুদিন পরই দেখা গেল সালাহ হাউথিদের হাতে খুন হয়েছেন। এদিকে তখন বাজারে এক সোনালি চুল ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে। তিনি আমেরিকার গদিতে বসেই বললেন, "ওয়ার ক্রাইমের নিকুচি! নিকেশ কর সব শালাকে।" এতদিন যা আসছিল, তার চেয়েও দ্বিগুণ অস্ত্র আসতে লাগল, এয়ারস্ট্রাইক বেড়ে গেল আরো বেশি! কে যে কাকে মারছে, কেন মারছে, তখন সে সব খতিয়ে দেখার সময় নেই।
২০১৮ সালে এই কনফ্লিক্ট নতুন মোড় নিল। ইউনাইটেড আরব এমিরেটস এতদিন সৌদির কোয়ালিশনে ছিল, এইবার সে বেঁকে বসল। ইউ এ ই জানাল, সে এই দলের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস হারিয়েছে। কিন্তু ইয়েমনে রাজনীতির প্রভাব বিস্তার করার শখ তাদের এখনও ষোল আনা। ফলে দেখা গেল, ইউ এ ই কোয়ালিশন ছেড়ে দক্ষিণ ইয়েমনে সক্রিয় এক অন্য দল সাদার্ন ট্রাঞ্জিশনাল কাউন্সিল আব এস টি সি কে সহায়তা করতে লাগল। এই দলটার সঙ্গে সৌদি ব্যাকড সরকার বা হাউথিদের সম্পর্ক ছিল না, তারা আসলে এক স্বতন্ত্র দেশ চাইছিল। ইউ এ ই খুব চালাক ভাবে দক্ষিণ থেকে তাদের সৈন্যসামন্ত সরিয়ে নিল, যাতে এসটিসির রাস্তা পরিষ্কার করে দেওয়া যায়। এক বছরের মধ্যেই তারা দক্ষিণ ইয়েমনে নিজেদের সরকার গঠন করে ফেলল, ইউ এ ই সেই সরকারকে সমর্থনও দিল। দিনে দিনে ইউ এ ই সাপোর্টেড এসটিসি আর সৌদি সাপোর্টেড সরকার হাত মিলিয়ে হাউথিদের রুখতে চেষ্টা করল, কিন্তু হাউথিরা ততদিনে অসম্ভব শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তারা ইরানিয়ান মিসাইল তাক করে একবার সৌদির অয়েল ফ্যাক্টরি, একবার ইজরায়েলকে নিশানা করছে। ২০২১ সাল আসতে আসতে হাউথিরা দেশের ৭০% জনসংখ্যাকে ভুলিয়ে বুঝিয়ে জোর করে বা মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে নিজেদের সঙ্গে করে নিয়েছিল, এই গোটা সময় ধরে এল কিউ এ পি আর আইসিস ইয়েমনের বিভিন্ন জায়গায় তাদের প্রভাব বাঁচানোর জন্য লড়াই চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষের অবস্থা কহতব্য নয়। দু কোটি মানুষকে প্রতিদিন জল আর খাবার পৌঁছে দিতে হচ্ছে। বাড়ি নেই ঘর নেই, পানীয় জল নেই, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়নের কথা বলা হাস্যকরই বটে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে, রোজ মরছেও, এর মধ্যেও কেউ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বললে শুট আউটের নির্দেশ আছে, সে সরকার হাউথির হোক, সৌদি সমর্থিত সরকারের হোক, এসটিসির হোক… প্রায় নয় বছর যুদ্ধ চলার পর যখন বন্দুকবাজরাও একটু হাঁফিয়ে উঠেছে, তখন ইউএন এর মধ্যস্থতায় একটা সিজফায়ার করা হয়, ইরান ও সৌদির মধ্যেও ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশন বহাল হয়, তাতেও চিনেরও ভূমিকা ছিল। এই ধ্বসে যাওয়া, দুমড়ে যাওয়া দেশে গিয়ে আমানা আল সারিফ, আসামা ওয়াগুইহ, মাত্তা ভেলাতি প্রভৃতিরা যে ছবি তুলে এনেছে, রিপোর্ট করেছে, সে সব দেখলে নিজেদের ভাগ্যশালী বলেই মনে হয়। সব কিছু হারিয়েও মানুষরা বলছেন, "এখনও বাঁচতে পারি! শুধু যদি এই লোকগুলো রাগ সামলে রাখে! কথায় কথায় মারামারি না করে!" এই লোকগুলো বলতে কোন লোকগুলো, সে কথার উত্তর কেউ দিতে চায়নি, সে লিস্ট অনেক বড়।
সিজফায়ার এক বছরও টেকেনি। ইজরায়েল গাজার ওপর হামলা শুরু করতেই হাউথিরা শাসানি দিয়েছিল, এই বছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তারা রেড সি থেকে যাওয়া জাহাজগুলোকে নিশানা বানাতে শুরু করেছে। আঠেরো ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ জাহাজ এম ভি রুবি মার ডুবিয়ে যে উন্মাদনা শুরু হয়েছিল, তা দিন দিন আরো বেড়েছে। মার্কিন জাহাজ, ইউরোপিয়ান জাহাজ, এশিয়ান জাহাজ… কিছুই ছাড়া পাচ্ছে না। ভারতে আসতে থাকা অয়েল ট্যাঙ্কারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইন্ডিয়ান নেভি রিলিফ ওয়ার্কের জন্য কাজ করছে, এদিকে ব্রিটেন, আমেরিকারা ফের হাউথিদের ওপর বোমাবর্ষণ শুরু করেছে। এমনিতেও এই জায়গাটা অসম্ভব সেনসিটিভ, চারিদিকে যত দেশ, সবগুলো ফেইল্ড স্টেট। সিভিল ওয়ার, মিলিটারি ক্যুপ, সোমালি পাইরেট, জিবুতি আর ইথিওপিয়া নিয়ে তো একটা অন্য পোস্ট লেখা যায়। দুনিয়া জুড়ে ত্রাস, কারণ রেড সি সাপ্লাই চেনের জন্য অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, তারপর ইন্টারনেটের সমস্ত কেবল এখান দিয়েই গেছে, হাউথিরা বেশিদিন এরকম চালালে গ্লোবাল ইকোনমিতে মেল্টডাউন আসতে পারে! গাজায় যুদ্ধ গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরান, সৌদি সবাই আবার মাঠে নেমে এসেছে, আবার সেই যুদ্ধ, সেই এয়ারস্ট্রাইক, সেই সিভিল ওয়ার, সেই হাজার হাজার মানুষের প্রাণ হারানো…
কী জানি, সালাহ যদি তিরিশ বছর আগে অল-হাউথির কথা শুনতেন! পছন্দ না করলেও তাকে যদি যথেচ্ছ অপমান না করতেন, লাথি মেরে না তাড়াতেন, তাহলে হয়তো ভবিষ্যৎটা অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু জানি, ৯৯.৯৯℅ মানুষ এই সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেওয়ার কাউন্টার লজিক ইতিমধ্যেই ভেবে ফেলেছেন। সুতরাং, চলুক যুদ্ধ! দেশে দেশে! লড়াই হাতে, কাস্তে হাতে (না'হলে চড় থাপ্পড় তো আজকাল খুবই জনপ্রিয়) মানুষে মানুষে! টিভি আর খবরের কাগজে! ফেসবুকের কমেন্টে! দ্য ওয়ার মাস্ট গো অন!