আর্জেন্টিনার সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আর্জেন্টিনার সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

লুমিনিয়াস রিপাবলিক

 


আন্দ্রেস বার্বা স্পেনে জন্মেছেন, আপাতত বেশ কয়েক বছর ধরে আর্জেন্টিনায় থাকছেন। সাহিত্য জগতে তাঁর খাতির আছে। ইংরেজি পাঠকরা যদি তাঁর নাম না শুনে থাকেন, তাহলে তাঁর বিশেষ কিছু আসে যাবে না। কারণ, টু কাট দ্য লং স্টোরি শর্ট, এই সময়ে দুনিয়ায় হিস্প্যানিক জগতেই 'আর্গুয়েবলি' সবচেয়ে ভালো আর বৈচিত্র্যময় কাজকর্ম হচ্ছে। সে উপন্যাস হোক, ছোটগল্প বা গ্রাফিক নভেল। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিকরা যেভাবে চালিয়ে ব্যাট করছেন, যাকে বাংলায় বলে 'আনঅ্যাপলোজেটিক'। বুম সাহিত্যের ভালো জিনিসগুলো সযত্নে আলাদা করে রেখেছেন, অথচ সেই নস্টালজিয়ায় ব্যাগেজটা ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। গত কয়েক বহরের মধ্যে নতুন মুখরা এসে যা পারফর্ম্যান্স দিয়েছেন, তাতে লোকজন নড়েচড়ে বসতে বাধ্য। পরপর অনুবাদ করা সত্ত্বেও এই গুপ্তধনের অনেকটাই এখনও ইংরেজি মেনস্ট্রিম দুনিয়ায় আসেনি, সে সম্ভবও নয়। অনুবাদ যতই হোক, সব তো করা সম্ভব নয়।

ধান ভানতে শিবের গীত অনেক হল। এই সব বলার প্রধান কারণ, রিসেন্টলি পড়ে শেষ করা আন্দ্রেস বার্বার একটা ছোট্ট বই... দ্য লুমিনিয়াস রিপাবলিক। মাত্র ১২৯ পাতার এই নভেলা উপন্যাসে তিনি যে খেল দেখালেন, তাতে আমি ফিদা।

গল্প খুব ছোট্ট। সান ক্রিস্টোবাল একটা কাল্পনিক শহর, বর্ণনা শুনে আমাজনের জঙ্গল এর লাগোয়া কয়েকটা ছোট ছোট শহরের কথা মনে পড়ে যায়। সেখানে কয়েক দশক আগে এক সোশ্যাল সেক্টরে কর্মরত ব্যক্তির অভিজ্ঞতাটুকু লেখা হচ্ছে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে। নয়ের দশকে সেই মফস্বলি শহরে বত্রিশজন বাচ্চা ছেলেমেয়েদের দেখা পাওয়া যায়, মূলত যারা স্ট্রিট কিডস। তারা কোত্থেকে আসে, কোথায় যায়, কেউ জানে না। কিন্তু বয়সে অল্প হলেও সেই বাচ্চাগুলো এমন একটা বীভৎস ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে, যে শহরের মানুষের বিশ্বাসের ভিত নড়ে যায়। ধীরে ধীরে এই সোজাসাপ্টা গল্প এমন জটিল হিউমান স্টোরি হয়ে ওঠে যে পাঠক থ মেরে যায়। অল্পবয়সীদের প্রতি প্রাপ্তমনস্ক সমাজের যে মনোভাব, আর একটা ক্রাইসিসের পর সমাজ ব্যাপারটা যেভাবে ডিল করে, তা অসামান্য ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কোথাও লেখার গতিকে শ্লথ করে না, কারণ লেখার শৈলী অসম্ভব স্মার্ট আর ফ্লুইড, আবার একইসঙ্গে অসম্ভব গভীর। সিম্বলিক রিপ্রেজেন্টেশন আর অ্যালাগরিক দৃশ্যকল্প ব্যবহার করার মুনশিয়ানা চোখে পড়ার মতো। বইটা যে কেন খুব বেশি পাঠকের চোখে পড়েনি, সেটা বলা মুশকিল। ছোটদের দুনিয়া বলেই যে সহজ সরল আদুভুঁদু নরম গুলুমুলু টাইপ্স, এই মানসিকতার ঊর্ধ্বে গিয়ে নতুন কিছু পড়তে চাইলে এই বইটা পড়ে ফেলুন। ঠকবেন না।

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০২৪

আ পারফেক্ট সেমেট্রি: পারফেক্ট আর্জেন্টিয়ান সমকালীন গল্প?

 


ফেদেরিকো ফালকো এখন আর্জেন্টিনার সমসাময়িক গল্পকারদের মধ্যে একদম প্রথম সারিতে থাকবেন, যদিও তাঁর লেখা অধিকাংশ লেখাই এখনও ইংরেজিতে অনূদিত হয়নি। ভাগ্য ভালো, চারকো প্রেস হিস্প্যানিক ওয়ার্ল্ড থেকে রত্ন তুলে আনার কাজটা মন দিয়েই করছে। 'আ পারফেক্ট সেমেট্রি' একেবারে পুঁচকে একটা বই, মাত্র পাঁচটি গল্প, একশো পঁচিশটা পাতা। কিন্তু এই বইটা পড়ে আমাকে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করতে হল। এই গল্পগুলো আদৌ গল্প কিনা আর গল্প হলেও আমার পছন্দ হচ্ছে কিনা, আর অপছন্দ হলে আমি এত মন দিয়ে পড়তে পারছিই বা কী করে...এইসব প্রশ্ন এমন মাথার মধ্যে কামড়াতে লাগল যে বইয়ের তিনটে গল্প আমাকে তিনবার পড়ে ফেলতে হল। অনেক ভেবেচিন্তে আমি ঠিক করলাম, গল্পগুলো জাস্ট ফাটাফাটি। কিন্তু গল্পের পাঠক হিসেবে আমি একেবারেই ক্যালানে, কারণ গল্প বলতে যে জিনিসটা আমার মাথায় সাধারণত (বিশেষ বিশেষ নাম বাদ দিয়ে) ঘর করে আছে, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যে সেই গল্পকেই শুধু গল্প বলা হয় না। আমি যে ফেসবুক পোস্ট দিচ্ছি আর চারটে পোস্টে রিচ না পেয়ে পোস্ট দেওয়া কমিয়ে দিই, এইটাই একটা গল্প হতে পারে। সকালবেলা চা খেতে গিয়ে দেখলাম দুধ ফেটে গেছে আর দুধ আনতে গিয়ে ব্যাপারটা বলতে দোকানের মেয়েটা বলল লিকার চা খাওয়াই বেটার.. সেই নিয়েই একটা সার্থক গল্প হতে পারে। তাতে কোনও বিশেষ ওঠানামা দরকার নেই, প্লটের বাঁকবদল ঘটানোর দরকার নেই, কিছুই দরকার নেই... শুধু গল্পটা যে পড়ছে, সে যেন চোখের সামনে আমাকে দেখতে পায়। আমার দুনিয়ার সবকিছু তার কাছে রূপ রস বর্ণ গন্ধ নিয়ে হাজির থাকুক, আমি শুধুই গল্পের চরিত্র না হয়ে একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে ধরা দিতে পারি, সেটাই দরকার। আর এই জায়গাতে এসেই ফালকো ছক্কা হাঁকড়েছেন।

আ পারফেক্ট সেমেট্রির গল্পের চরিত্ররা এতটাই আসল, এতটাই আসল যে গল্প পড়ছি বলে মনেই হয় না। প্রতিটি গল্পই আর্জেন্টিনার কোর্দোবা অঞ্চলের পটভূমিকায় লেখা আর নিজে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে বলেই বলছি, কোর্দোবার পরিবেশ ও প্রকৃতি একদম হুবহু ফুটে উঠেছে এই গল্পগুলোয়, নিঃসন্দেহে কোর্দোবা (সম্ভবত কয়েক দশক আগের কোর্দোবাই হবে) এই বইয়ের এক জরুরি অংশ। আর গল্প, সেও আজব! ভীষণ বাস্তব, আবার ভীষণ অবাস্তবও বটে! মানে, এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, কিন্তু এমন ঘটনা তো ঘটছেই। যেমন, ১০৪ বছর বয়সী বাবাকে যেন মৃত্যুর পর অন্য শহরে কবর না দেওয়া হয়, সেইজন্য শহরের মেয়র এক সেমেট্রি শিল্পীকে ডেকে এনেছেন, তিনি পার্ফেক্ট এক কবরখানা বানাবেন আর জলদি বানাবেন। কিন্তু যার জন্য এত ঝামেলা, সেই বুড়ো সেই সেমেট্রিতে গিয়ে শোবে না বলে পণ করেছে। যেমন, হঠাৎ করে এক কিশোরী মেয়ে নাস্তিক হয়ে যায় আর টিন এজ হার্মোনের প্রভাবে এক অক্রিশ্চান মারমন পাদরির দিকে আকৃষ্ট হয়... বা ঘরের আশেপাশে সমস্ত গাছ কাটা পড়ছে বলে এক মেয়ে আর তার বৃদ্ধ বাবা জঙ্গল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে আর যে কেউ মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য থাকলেই চুকে যায় কিন্তু কোনও স্থানীয় মানুষ রাজি না হওয়ায় মেয়েটা শেষে এক জাপানিজ ইমিগ্রেন্টকে বিয়ে করতে রাজি হয়... এসব সাদামাঠা ঘটনার মাধ্যমে ফালকো কতগুলো অসাধারণ জীবনের ছবি এঁকে গেছেন।

বইটার অনুবাদ অসামান্য। প্রসঙ্গত, এই জেনিফার ক্রাফট ওল্গা তোকারচুকের বুকারজয়ী 'ফ্লাইটস' বইটাও অনুবাদ করেছিলেন। ছোট্ট একটু স্যাম্পল...

Meanwhile the plantains on the central path, the cypresses, the casuarinas, the damson and ornamental plums, the gingko bilobas that would yellow up the gorge, they planted with their root balls and all, exactly as the nurseries had sent them. For the time being they were no more than sickly little trees tied to their stakes, just branches with hibernating buds, sleeping through their latencies. As soon as the cold released its hold and the roots discovered their new liberty, they would untangle and start to extend into the fertile earth, down, down, until they found the centre of the hill.Their stems would swell on the surface and their branches would be covered with new leaves. By the time spring was over the shapes that Victor Bagiardelli had imagined on his own would enrapture the inhabitants of Colonel Isabeta. And so, for years and years, as the trees grew to their maximum size and attained their ideal shape, as the colours of their foliage changed with the seasons, while always, in any month, just exactly as he had planned for it to happen, there would be some bush flowering, and summer after summer the fragrances of fresh pollen would inundate the whole. Every time a resident of Colonel Isabeta died and the cortege transported the body to the cemetery, the trees Victor Bagiardelli had chosen would bend their branches to comfort the mourners in their distress.

শেষে অনুবাদ নিয়ে তাঁর একটা ছোট্ট প্রবন্ধ আছে, সেটা পড়লেই অর্ধেক পয়সা উসুল হয়ে যাবে। যাই হোক, আপাতত লাতিন সাহিত্য ফের দুনিয়া কাঁপাচ্ছে। ফালকোরও আরো লেখা পড়ার ইচ্ছে রইল।

ইন্ডিয়ান এডিশন নেই মনে হয়। দামটা অস্বাভাবিক বেশি দেখাচ্ছে। ইবুক পড়াই ভালো।

বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২২

সামান্তা সোবলিনের দুনিয়ায়

 

বইপাগলদের জন্য সম্ভবত বুয়েনাস আইরেসের চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই। পার ক্যাপিটা বুকস্টোরের মামলায় আর্জেন্টিনার রাজধানী তাবড় তাবড় শহরকে গোল দেবে। লিবেরিয়া আর বিবলিওথেকের (মানে বইয়ের দোকান আর লাইব্রেরি) যে রমরমা এখানে নজর পড়ল, তাতে মনে হিল্লোল ওঠা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর বইয়ের দোকান 'এল আতের্নো গ্রান্দ স্পেলেন্ডিড' (পাঁচতলা প্রাসাদ, পুরোটাই বই) যেমন আছে, মোড়ে মোড়ে পুরোনো বইয়ের দোকানের বাড়বাড়ন্তও কম নয়। সে সব শুধু নাম কে ওয়াস্তে নয়, লোকজন অফিস ফেরতা গিয়ে উপস্থিত হয় এইসব দোকানে, রাত বারোটা একটা অব্দি বসে বসে বই পড়ে। দোকানদাররাও দিব্যি মধ্যরাত্তির পর্যন্ত দোকান খোলা রাখে ইচ্ছে হলেই।

বলা বাহুল্য, এরকম পরিস্থিতিতে আমাদের ফোকাস শিফট হতে বাধ্য! কার ফ্ল্যাটে টাকা বেরোল, কোন ওয়েব সিরিজ হিট করল... ওসব নিয়ে মাথা পরে ঘামালেও হবে। ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে আমরা দিন হলে দিন, রাত হলে রাত, বইয়ের দোকানের চক্কর মারছি। জায়গা নেই জায়গা নেই করেও আট দশ খান স্প্যানিশ বই কিনে ফেলেছি, তার মধ্যে একটা আবার পুলিশ প্রসিডেরাল। ভালো অজানা বইয়ের কথা জানতে চাইছি শুনেই ওল্ড বুকস্টোরের মালিক সে বইটা হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল, বইটা নাকি সাতের দশকে প্রকাশিত হয়েছিল । হেক্টর মোরেল, প্লাসিদো দোনেতো, ফেলিক্স কারকাসো সহ পাঁচ ছয় জনের লেখা একাধিক গল্প আছে, পাঠকদের কাছে এই লেখাগুলো Rajarshi দার কানাইচরণের মতোই প্রিয় বলে জানতে পারলাম। তা না হয় হল, আমার আবার কন্টেম্পোরারি রাইটারদের নিয়ে আগ্রহ আছে। সে প্রশ্নে মাথাফাথা চুলকে শেষমেশ পাঁচজনের লিস্ট ধরালেন ভদ্রলোক। যা বুঝলাম, তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনজনের লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে। সেলভা আলমাদার লেখা পড়েছি, মারিয়ানা এনরিকেজের কলমের স্বাদও কয়েকদিন আগেই নেওয়া হয়েছে (এনরিকেজ অসম্ভব জনপ্রিয় লেখিকা, তবে ডেঞ্জার্স অফ স্মোকিং অফ বেড-এর সব গল্প আমার ঠিক জমেনি। কয়েকটি অবশ্য বাকি আছে। আরো কিছু বই পড়তে হবে)। অবশ্য অনুবাদ হলে দুধের স্বাদ ঘোলেই মেটাতে হয়, তবে ঘোলও আমার মন্দ লাগে না। ফলে নজর পড়ল তৃতীয়জনের দিকে। সামান্তা সোয়েবলিন।

সামান্তার অবশ্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য জগতে বেশ নামডাক আছে। দু ধরনের বুকারের জন্য দুটো বই মনোনীত হয়েছিল, সিনেমাও হয়েছে তাঁর লেখা বই নিয়ে। কোনটা আগে পড়ি ভাবতে ভাবতে ছোটগল্পের বইটাই আগে তুললাম। নাম 'মাউথফুল অফ বার্ডস'। দিন চারেক আগে বাসে বসে প্রথম গল্পটা পড়তে শুরু করলাম।

ছোটগল্পের একটা নিজস্ব জগত আছে। সেটা বাংলার পাঠকরা ভালোই জানেন, কারণ বাংলা ছোটগল্পের সম্পদ নিয়ে কোনও কথা হবে না। ব্যক্তিগতভাবে আমার সে সমস্ত গল্প ভালো লাগে, যেখানে ইন্টারপ্রেটাশনের সুযোগ থাকে। আইরনি হল, এই ধরনের গল্প আবার অনেকের মোটেও পছন্দ হয় না, কী হল কী হল করতে করতেই গল্প শেষ হয়ে গেলে লোকে রীতিমত বিব্রত আর বিরক্ত হয়ে ওঠে। সামান্তার লেখাগুলোয় এই ব্যাপারটা পুরোমাত্রায় আছে, ফলে যত পাঠক তারিফ করেছেন, বিরূপ আলোচনাও জুটেছে সমপরিমাণ পাঠকের কাছ থেকে। সামান্তা ছোট ছোট বাক্যে গল্প বলেন, প্রয়োজন না হলে বর্ণনার বাহুল্য দেখিনি। অবশ্য দরকার হলে পরিমিত শব্দে ইমেজারি বা দৃশ্যকল্প তৈরি করতে যে ভালোই পারেন, সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না। একটা উদাহরণ রইল--

He’s lost his ticket, and from behind the ticket window’s white bars, the station agent refuses to sell him another, saying there’s no change in the drawer. From a station bench, he looks at the immense, dry countryside that opens out in all directions. He crosses his legs and unfolds the pages of the newspaper in search of articles that will make the time pass faster. Night spreads across the sky, and far away, above the black line beyond which the tracks disappear, a yellow light announces the next train. Gruner stands up. The newspaper hangs from his hand like an obsolete weapon. In the ticket window he discerns a smile that, half hidden behind the bars, is directed exclusively at him. A skinny dog that was sleeping now stands up, attentive. Gruner moves toward the window, confident in the hospitality of country people, in masculine camaraderie, in the goodwill that awakens in men when you handle them well.

সে সব পরের কথা। রিওয়াইন্ড করে বাসে ফিরে যাই। প্রথম গল্প পড়তে শুরু করেছি। এদিকে সেদিন বুয়েনাস আইরাসে বৃষ্টি নেমেছে। জম্পেশ ঠান্ডা। তার চেয়েও বেশি কুয়াশা। এমন ঘন কুয়াশা সম্ভবত পনেরো কুড়ি পরে দেখলাম। আমি জানলার শার্সির ওপর নাক ঘষতে ঘষতে বই পড়ছি, বাইরে তাকালেই ভিজে শহরের রাস্তাঘাট চোখে পড়ছে আবছা আবছা। ঘন কুয়াশায় বয়ে চলা পথঘাট, আধখোলা দোকান, কফিশপ আর চা-পাঞ্চোর 'টপরি', থিয়েটার পাড়া, কুকুরবেড়াল, প্রেমিকযুগল, চোঙা টুপি পরে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাঙ্গো আর্টিস্ট... প্রেমের গল্প পড়ার আদর্শ সময়। গল্পের নামও তেমন, 'হেডলাইটস'। আমি প্রথম পাতা শেষ করে দ্বিতীয় পাতায়, ঝিমধরা ভাব এসেছে একটা। এমন সময় বইয়ের পাতায় কে যেন আগুন জ্বালিয়ে দিল। ছয় না সাত পাতার গল্প, শেষ হতে দেখলাম প্রেম ফ্রেম কোথায় উড়ে গেছে, শেষ বাক্য পড়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে।

এরপর? এরপর আর কী? গোগ্রাসে বইটা শেষ করলাম প্রায়। গল্পের বই তো নয়, যেন হেঁয়ালির কোলাজ। গল্প আবিষ্কার করা পাঠকের কাজ, সামান্তা সে সব নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাননি। যা লেখার লিখে দিয়েছেন, বাকিটা তোমার ওপর। বলতে হলে বলতে হয় প্রথমদিকের কয়েকটা গল্প অবশ্য স্রেফ আগুন। ফায়ার। আরো ভালো করে বলতে, ড্রাগন ফায়ার। পড়ে মাথাফাথা ঘুরে যাবে, চেয়ার থেকে পড়ে যেতে পারেন।

এমন সব অদ্ভুতুড়ে প্লট নিয়েও যে এমন গতিশীল গল্প লেখা যায়, সেটা দেখে অবাক হতে হয়। আবার কিছু কিছু গল্প এতটাই সাদামাঠা ভাবে শেষ হয়েছে (বা শেষ হয়নি) যে অনেকের কাছে হয়তো কিছুই ধরা পড়বে না। কিন্ত যে ধরে ফেলবে, তার গা শিরশির করে উঠতে বাধ্য। একটা দুটো গল্প তো সামান্তা জাস্ট পাঠককে চ্যালেঞ্জ করতে ছুঁড়ে দিয়েছেন। দমফাটা উত্তেজনা, কী কী হয় ভাব, অসম্ভব টেনশনে পড়তে পড়তে বাসের স্টপেজ ছেড়ে যায় প্রায়, এমন সময় হুট করে পাতা উল্টে দেখবেন গল্প শেষ। মহা খাপ্পা হয়ে ভাববেন পাতাটাই বাদ গেল নাকি, কিন্তু না, পাতা ঠিকই আছে। তাহলে? কী হল শেষে? হলটা কী রে তোপসে? গল্পটা আবার পড়বেন! আরো মন দিয়ে পড়বেন! কিছুই বুঝবেন না। আবার হয়তো শেষ কয়েকটা পাতা পড়বেন। হয়তো বা চতুর্থ কিংবা পঞ্চমবারে একটা লাইন চোখে পড়বে আপনার, আর খেলাটা আপনি ধরে ফেলবেন আর রোমাঞ্চে আপনার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাবে, অথবা ধরতে পারবেন না। কিন্তু গল্প ততক্ষণে আপনাকে পেড়ে ফেলেছে। এটাই হল এই বইয়ের ম্যাজিক। ভূতপ্রেত, সান্তাক্লস, ডিস্ফাংশানাল ফ্যামিলি থেকে শুরু করে আর্বান হরার, স্যাটায়ার, ফ্যান্টাসি সবই আছে, কিন্তু সামান্তার নিজস্ব স্টাইলে।

মাউথফুল অফ বার্ডস শেষ করে তড়িঘড়ি 'ফিভার ড্রিমস' ধরেছি, সেই একই স্টাইলে সামান্তা আমার মাথা ভোম্বল করে দিচ্ছেন। জয় গুরু! শেষ করে জানাব।

(নোট-- 'কার্সড বানি', 'মাউথফুল অফ বার্ডস', 'ডেঞ্জার্স অফ স্মোকিং ইন বেড' সহ বেশ কিছু বুকার নমিনেটেড অ্যান্থোলজি পড়লাম। এই বুক ঠুকে বলছি, সৈকতদা মানে সৈকত মুখোপাধ্যায়ের 'তেঁতুলপাতার গল্প' বা 'ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রুণ' ঠিকঠাক জায়গা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত হলে আরামসে বুকার লিস্টে জায়গা পেত, সে নিয়ে আমার মনে অন্তত একচুল সন্দেহ নেই। না পড়ে থাকলে পড়ে ফেলুন চটপট।)