রবিবার, ২৯ মে, ২০২২
জন্নত
বুধবার, ২৫ মে, ২০২২
গুবলুদা ও কুইজ কম্পিটিশন
গুবলুদা ও কুইজ কম্পিটিশন
প্লুটো দু’ হাতে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, “না, এইবার একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার।”
আমি অরুণবাবুর
বাগান থেকে কয়েকটা ডাঁশা পেয়ারা নিয়ে এসেছি। সেইগুলোতে বিটনুন মাখিয়ে খাওয়া
চলছে।
আমি ইউরেনাসকে
একটা টুকরো দিয়ে কিন্তু কিন্তু করে বললাম, “বলছিস?”
প্লুটোর কথা শুনে
মঙ্গলও সাহস পেয়ে গেছে। একটা পেয়ারার আস্ত টুকরো মুখে পুরে নিয়ে সে বলল, “হ্যাঁ। লবিগাকে খিক্ষা গিতেই অবে।”
শুক্র আর বুধ যমজ
বোন। বুধ তালু থেকে বিটনুন চাটতে চাটতে বলল, “বাবা মা কে বলে দিলে হয় না?”
শুক্র মাটিতে বসে
বিনুনির চুলে আঙুল চালাচ্ছিল। সে এইবার কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, “কিন্তু রবিদা তো বয়সে বড়। নালিশ করলে যদি স্কুলে তার বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এসে
মারধোর করে?”
আমি (ইয়ে মানে
আমার নাম শনি) একটা ইঁটের টুকরোকে লাথি দিয়ে নালিতে পাঠিয়ে দিয়ে বললাম, “আর বলবিই বা কী? রবিদা আমাদের কুইজে চ্যালেঞ্জ
করেছে? কেউ পাত্তাই দেবে না। সবাই উল্টে ওরই পক্ষ নেবে!
রবিদা আমাদের কুইজের জন্য পড়াশুনা করতে বলছে, এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?”
নেপচুন জিন্সের
প্যান্টে হাত ঢুকিয়ে বলল, “সেই। জানিসই তো, ওই কুইজ কম্পিটিশনে প্রাইজ পেয়ে পাড়ায় ওর কেমন রোযাব বেড়েছে!”
বৃহস্পতি আমাদের
মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, ফেলুদা আর দীপকাকু গুলে
খেয়েছে। সে মাথা নেড়ে বলল, "ওরকম করে হবে না।
রবিদার বড্ড অহংকার হয়েছে। ওকে জব্দ করতে হলে ওকে ওর জায়গাতেই হারাতে হবে।"
“কিন্তু কী করে? হোমটাস্ক বাদ দিয়ে শেষে কুইজের বই মুখস্থ করতে হবে?” শুক্র প্রায় কেঁদে ফেলে আর কি! ও বেচারি এমনিতেই একটু
ভুলোমনা, কবিতা আর অঙ্কের ফর্মূলা মুখস্থ করতেই ওর হাল খারাপ
হয়ে যায়। আর এ তো একেবারে অজানা জগত!
অগত্যা আমরা সবাই
মাঠের উপর থেবড়ে বসে চিন্তা করতে শুরু করলাম। কূলের আচার খেয়ে পেট খারাপ হয়েছে বলে
পৃথিবী আজ খেলতে আসেনি, তাই আমরা আটজনই মগজ খাটাতে
শুরু করলাম।
গুলিয়ে যাচ্ছে তো? তাহলে খুলেই বলি। আমরা মানে বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি মানে আমি, ইউরেনাস, নেপচুন আর প্লুটো হলাম মিল্কিওয়েভ ইংলিশ স্কুলের ছাত্র। নাম শুনে অবাক হওয়ার
কিছু নেই। এগুলো থোড়াই না আমাদের আসল নাম। আমার আসল নাম হল দীপ্তমান সেনগুপ্ত। বুধ
আর শুক্র হল অনিন্দিতা আর শ্রাবণী। অন্যদেরও একটা করে ভালো নাম আছে।
আমরা সবাই ক্লাস
ফাইভে পড়ি। বাড়িও একই আবাসনে। আমাদের এই বিচিত্র নামকরণ করেছে রবিদা ওরফে রবিকান্ত
দাস।
আমাদের চেয়ে দু' ক্লাস উঁচুতে পড়লেও হাইটে সে আমাদের চেয়েও কম, কিন্তু তার ত্যান্ডাই মাণ্ডাই দেখলে ভড়কে যেতে হয়। আমাদের উপর রবিদা বরাবরই
হুকুম চালায়, কথায় কথায় খিল্লি করে প্রত্যেককে। এমন ডেঁপো আর
নাকউঁচু ছেলে আমি আর কোথাও দেখিনি। কিন্তু তাও রবিদার সব 'বুলি' আমাদের মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। কারণ একটাই, রবিদা পড়াশুনায় বেশ ভালো। আমাদের স্কুলে বদলি নেওয়ার পর দু’ বছর ধরে ফার্স্ট হচ্ছে ক্লাসে, সাইন্স, অঙ্কে আর ইংরেজির শিক্ষকরা বেশ
সমীহ করে
রবিদাকে। ক্রমে স্কুলের বাইরেও তার সুনাম ছড়িয়েছে। আমার মা তো সুযোগ পেলেই বলেন, “রবির কাছ থেকে কিছু শিখতে পারিস না?” কমবেশি একই মনোভাব অন্যদের বাড়িতেও।
রবিদা পড়াশুনায়
ভালো হয়ে আমাদের উপর শাসন করার অধিকার পেয়ে গেছে, তাও আমাদের বাড়ির লোকের আশকারায়। ভগবানও এমন নিষ্ঠুর, নাহলে রবিদার বাবা একই আবাসনে ফ্ল্যাট কিনে আসবেন কেন? যবে থেকে সে এখানে এসেছে, আমাদের শান্তির দিন বিদায় নিয়েছে।
স্কুলে জ্ঞান আর খেলায় জোচ্চুরি করা তো আছেই, তারপর মাঝেমধ্যেই সে মোটা মোটা আঙুল দিয়ে আমাদের
মাথায় গাঁট্টামারে, বুধ আর শুক্রর বিনুনি টেনে হাসতে থাকে। তার দৃঢ়
ধারণা, তার মতো বুদ্ধিমান আর কেউ নেই। তাই আমাদের মতো
বোকাদের শিক্ষা দেওয়ার গুরুদায়িত্ব সে না বলতেই কাঁধে তুলে নিয়েছে। এই আজ ইতিহাসের
সাল তারিখ জিজ্ঞেস করে বিরক্ত করছে, পরদিন
বিজ্ঞানের প্রশ্ন
করছে। কোথা থেকে ভুলভাল সব হেঁয়ালি শিখে আসে, সেই সব পরীক্ষা করে আমাদের উপর। না বলতে পারলেই বত্রিশপাটি দাঁত বের করে গা
জ্বালানো হাসি হাসে আর আমাদের বক দেখিয়ে বলে, "ইউ অল আর টিউবলাইটস। তবে দপ দপ করেই যাস, জ্বলতে পারিস না। হিহিহি..."
তার অত্যাচার
আমাদের এক প্রকার সয়ে এসেছিল, কিন্তু কপালে যে আরো দুঃখ
ছিল তা কে জানত?
হল এই যে
দুর্গাপুজোর সময় আমাদের আবাসনে বড়রা ছোটদের জন্য একটা মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কিত
কুইজ কম্পিটিশনের আয়োজন করল। যে জিতবে, তাকে বিড়লা তারামণ্ডলে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হবে। এছাড়াও দেওয়া হবে আরো কিছু
আকর্ষণীয় পুরস্কার। আমি নাম দিইনি। কিন্তু রবিদা নাম দিল এবং প্রথম স্থান
অধিকার করল। খুবই
সোজা সোজা প্রশ্ন ছিল, তিন চারটে বাদে আমিও সব বলে
দিতে পারতাম। কিন্তু ফার্স্ট হয়ে রবিদার সে কী গুমোর! ক্লাব সেক্রেটারির হাত থেকে 'গ্র্যাভিটি' সিনেমার সিডি আর কাপ নেওয়ার সময় সে একবারে বিরাট
কোহলির মতো হাত তুলে অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। রবিদার এই পুরস্কার যে আমাদের বিপদ ডেকে
আনবে সে যদি তখন জানতাম?
এক সপ্তাহ পর
তারামণ্ডল থেকে ঘুরে আসার পর দেখি রবিদাকে মহাকাশের ভূতে পেয়েছে। 'গ্র্যাভিটি' দেখে সে নাকি অ্যাস্ট্রনট হবে বলে ঠিক করেছে। পরদিন
মাঠে এসেই সে বলল, “সবাই শোন। আজ থেকে তোদের নাম দিলাম সোলার সিস্টেমের
গ্রহের উপর। বিজু, তুই হলি প্লুটো।“
বিজু মাথা নেড়ে বলল, “আমি প্লুটো হব কেন? নাম যদি দিতেই হয়, আমি মার্স হব।”
রবিদা খেঁকিয়ে
উঠে বলল, “চোপ। প্লুটো যেমন ডোয়ার্ফ প্ল্যানেট, তুইও অমন বেঁটে বামনের মতো দেখতে। মঙ্গল হবে কিশোর।”
কিশোরের মুখে
একটা লালিমা আছে, তার ঠোঁট দু’টোও লাল। তাকে মঙ্গল করার যুক্তি বুঝতে
আমাদের অসুবিধা হল না। আমি বেশ মজা পেয়ে হাসতে যাচ্ছি, এমন সময় রবিদা বলল, “তুই হাসছিল কেন বোকচন্দর? তুই হলি গিয়ে শনি।”
আমি শনি হলাম কেন? হাঁ করে তাকাতেই দেখি রবিদা আমার প্যান্টের দিকে চেয়ে হাসছে। ব্যাপারটা বুঝতে
পেরে আমার গা কিরকির করে উঠল। আমি অত্যধিক রোগা বলে আমার প্যান্টটা মাঝে মাঝে একটু
নেমে যায়, আমার কোমরের কালো ঘুনসিটা তখন চোখে পড়ে। সেই কবে
ঠাকুমা পরিয়ে দিয়েছিল ওই সুতো, সেটাকে রবিদা স্যাটার্নের
রিংয়ের সঙ্গে তুলনা করেছে। কী বদমাশ রে বাবা!
পরদিন থেকেই
আমাদের খেলাধুলা মাথায় উঠল। রবিদা সর্বক্ষণ মহাকাশের জ্ঞান কপচাচ্ছে, ইচ্ছে না হলেও আমাদের শুনে হুঁ হাঁ করে যেতে হবে। সেরেস আর এরিস বলে দু'টো বামন গ্রহ পাওয়া গিয়েছে বা নেপচুনের পর যে কাইপার বেল্ট বলে একটা গ্যাসীয়
আচ্ছাদন আছে, সে সব মুখস্ত করে আমাদের শোনানোর কী আছে বাপু? তার বাতেলা আর গুল মারার বহরও দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু যতই ভুলভাল বকুক, আমরা আপত্তি করলেই গাঁট্টা খেতে হবে। রবিদা নাকি তারামণ্ডলে গিয়ে ব্ল্যাকহোলের
ভিতর ঢুকেছে, তার মামা মুম্বাই থেকে আসল স্পেসস্যুট পাঠিয়েছে, বড় হয়ে চাঁদে যাওয়ার জন্য নাসার খাতায় সে নাম লিখিয়েছে... আমরা শুনি আর মাথা
চুলকাই।
ক্রিকেট ম্যাচ
খেলার সময় হয় সবচেয়ে মুশকিল। রবিদা ক্যাপ্টেন বলে ফিল্ডিং সাজায়, প্লুটোকে পাঠিয়ে দেয় মাঠের কিনারায়। বিজু বেশি লম্বা নয়, বাউন্ডারিতে লম্বা লোকদের দাঁড় করানোই নিয়ম। কিন্তু টিমে সবচেয়ে লম্বা যে
পৃথিবী, সে তখন আম্পায়ার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রবিদার মত হল, পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই সৌর মণ্ডলের গ্রহদের কাজকর্ম, তাকে থাকতে হবে মাঝখানে। স্লিপে তখন বুধ আর শুক্র, মানে অনিন্দিতা আর শ্রাবণী দাঁড়িয়ে। ওরা নতুন খেলছে বলে অতটা চটপটে নয়, ফলে স্লিপের ক্যাচ আকছার মিস হয়। তখন রবিদা চেঁচিয়ে বলে, “অক্সিজেন সিলিন্ডার শেষ হয়ে গেছে নাকি? ক্যাচগুলো কি তোদের ক্যাপ্টেন মার্ভেল এসে ধরবে?”
রবিদা নিজে মোটেও
ভালো খেলতে পারে না, বল করলেই ব্যাটসম্যান চার বা ছয় হাঁকিয়ে দেয়। তখন সে
হনুমানের মতো লাফাতে লাফাতে বলতে থাকে, “ওরে মঙ্গল, ওরে শনি! হ্যালির ধুমকেতুর মতো ছুটে যা!”
এই সব কান্ড দেখে
আমাদের তো মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। রবিদার স্ক্রু ঢিলে হয়ে গেছে সন্দেহ নেই। তা
বাপু তুমি মহাকাশচারী হবে ভালো কথা, আমাদের ওতে জড়ানো কেন? বাড়িতে বলেও কিছু লাভ হয়নি।
এসব না হয় চলে
যাচ্ছিল কিন্তু কালকের ঘটনা আর বরদাস্ত করা গেল না। আমরা অ্যাভেঞ্জার্স দেখে মনের
সুখে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় রবিদা এসে ঘোষণা করল, “ওসব থানোস ফানোস ডাহা মিথ্যা। এলিয়েন বলে কিছুই হয় না। ভিন্নগ্রহীদের নিয়ে
লেখা সব গল্প আর সিনেমা কল্পনা।”
আমি তেড়েমেরে
কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই ইউরেনাস ওরফে ঋষি
লাফিয়ে উঠে বলল, “তুমি বলছ প্রোফেসর শঙ্কু ডায়েরিতে মিথ্যে লিখেছেন? ওর সঙ্গে অন্য গ্রহের প্রাণীদের দেখা হয়নি?”
ঋষি প্রোফেসর
শঙ্কুর একনিষ্ঠ ভক্ত, রবিদার কথায় তার চটে ওঠা
স্বাভাবিক। রবিদা ঠোঁট উল্টে বলল, “হয়নি!হয়নিই তো!”
আর যায় কোথায়, ঋষি সব কিছু ভুলে এক ধাক্কায় বেঁটে রবিদাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে বলল, “তুমি কাঁচকলা জানো। তোমার বাবা পুজো কমিটিতে আছে
বলে তোমাকে জোর
করে প্রাইজ পাইয়ে দিয়েছে।”
এই কথা শুনে
রবিদার মুখ লাল হয়ে গেল। সে উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “তোরা সবাই এক একটা গাধা। অতই যদি জানিস পরের
বার কুইজে জিতে
দেখা! আমার ক্লাসের ছেলেমেয়েরা এক টিমে, তোরা এক টিমে। হিম্মত আছে? দেখি তোদের প্রোফেসর শঙ্কু
আর অ্যাভেঞ্জার্সদের কত মুরোদ?”
আমাদের
উল্টোপাল্টা বললে বিশেষ গায়ে মাখতাম না। কিন্তু তাই বলে অ্যাভেঞ্জার্সদের পিছনে
লাগা! প্রিয় হিরোদের অপমানিত হতে দেখে আমাদের গা জ্বালা করে উঠল। আমরা মুঠো পাকিয়ে
চেঁচিয়ে বললাম, “হোক তবে! হয়ে যাক। হোক কলরব!”
রবিদা ফুঁসতে
ফুঁসতে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, “আর কয়েক মাস। তারপর তোদের
হচ্ছে।”
তারপর থেকেই
আমাদের মিটিং বসেছে। রবিদা গাদাগাদা বই মুখস্ত করেছে স্পেস নিয়ে, ওকে হারানো সহজ নয়। ভেবেচিন্তে কিছুই ঠিক হল না। ঋষি বলল, “আজ সবাই ভাব। কাল শনিবার। বিকেলে মাঠে জড় হয়ে আলোচনা করব।”
পরদিন গিয়ে দেখি
পৃথিবী ওরফে কেল্টু এসে গিয়েছে। ঋষি আমাদের দেখে হাসতে হাসতে বলল, 'মুশকিল আসান। খোদ প্রোফেসর শঙ্কু আমাদের সাহায্য করবেন।"
আমি তো ভ্যাবলার
মতো তাকিয়ে আছি। কেল্টু আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, “আরে আমার মামা কালই ভুবনেশ্বর থেকে ফিরেছে। ওর নাম শঙ্কু বন্দোপাধ্যায়। ইসরো
মনে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনে কাজ করেন। মাস কয়েক ওয়ার্ক ফ্রম হোম
করবেন। কাল জয়(বৃহস্পতি) ফোন করে সব বলেছে। আমি সে কথা মামাকে বলতে উনি বললেন
আমাদের সাহায্য করবেন। আজই যেতে বলেছেন।”
কেল্টুর কথা শুনে
তো আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। তারপর মহানন্দে নাচতে নাচতে প্ল্যানেটস অফ এপস থুড়ি
প্ল্যানেটস অফ মিল্কিওয়েভ চলল প্রোফেসর শঙ্কুর
কাছে। কেল্টুর
বাড়িতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিলেন তিনি। কী আশ্চর্য! তাকে সত্যিই প্রোফেসর
শঙ্কুর মতো দেখতে! সেই রোগা, মাঝারি হাইট। সামনে চুল
উঠে টাক পড়ে গেছে, কাঁচাপাকা দাড়ি। চোখে চশমা, মুখে হাসি। আমাদের দেখে
তিনি হেসে বললেন, “এসে গেছিস তোরা! আমাকে আবার প্রোফেসর শঙ্কু বলে
ডাকিস না যেন! বরং গুবলুদা বলতে পারিস। শরবত খাবি তো?”
কিছুক্ষণের
মধ্যেই শরবত চলে এল। কমলালেবুর ফ্লেভার হলেও বেশ অন্যরকম স্বাদ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কীসের শরবত রে কেল্টু?”
উত্তরটা অবশ্য
দিলেন গুবলুদা। হেসে বললেন, “এ হল ট্যাং। আমেরিকাতে
তৈরি। নাসার মহাকাশচারীরা কিন্তু পৃথিবীর বাইরে গেলে এই শরবতই নিয়ে যায়। গতবার
হিউস্টনে গিয়ে
নিয়ে একগাদা প্যাকেট নিয়ে এসেছি।”
আমরা তো সে কথা
শুনেই ‘ফ্ল্যাট’। আমরা মহাকাশযাত্রীদের শরবত খাচ্ছি! ভাবাই যায় না।
গুবলুদা বললেন, “কেল্টু আমাকে সব বলেছে। তোদের ওই রবিদা যে সব কুইজের বই মুখস্ত করে অত দেমাক
দেখাচ্ছে, তাতে আসলে কিছুই জানা যায় না। স্পেস
ইজ সো বিগ। সেখানে
এমন সব ঘটনা হয় যা আমাদের কল্পনারও ঊর্ধ্বে। মহাকাশ সম্পর্কে সত্যিই জানতে চাইলে
তাকে ভালোবাসতে হয়, তার সঙ্গে সময় কাটাতে হয়।
তবেই তার কথা
বোঝা যায়। তোরা যদি চাস, আমি তোদের হেল্প করতে পারি।
কিন্তু এগোনোর রাস্তা তোদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।”
ঋষি উশখুশ করছিল।
সে এইবার কিন্তু কিন্তু করে বলল, “গুবলুদা। আগে একটা কথা বল
তো, এলিয়েন বলে কিছু হয় না? রবিদা কি ঠিক বলছিল? প্রোফেসর শঙ্কু
ডায়েরিতে মিথ্যে
কথা লিখেছেন?”
গুবলুদা হাসতে
হাসতে বললেন, “তোদের রবিদা কিচ্ছু জানে না। শোন, আমাদের পৃথিবীতে যত বালিকণা আছে, মহাকাশে তার চেয়ে হাজার গুণ
বেশি নক্ষত্র আছে।
তার একাংশ
সম্পর্কে জানতেই আমাদের আরো দশ হাজার বছর লেগে যাবে। সেখানে কোথায় কী আছে কে বলতে
পারে? যুক্তি তো বলে, এই অনন্ত মহাকাশে অন্য প্রাণীদের থাকার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তবে কিনা...”
“কী?” দম বন্ধ করে জিজ্ঞেস করল ঋষি।
“মঙ্গল গ্রহে
বৈজ্ঞানিকরা ইতিমধ্যেই প্রাণের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন। ভূমিগত হ্রদের নীচে পাওয়া
সূক্ষ্ম মাইক্রোঅরগ্যাজমিক জীবগুলো ইটি বা জাদুর মতো তাদের দেখতে নয় ঠিকই, তবে এলিয়েন তো বটেই। আমাদের গ্রহের পাশের গ্রহেই যখন প্রাণের সন্ধান পাওয়া
যাচ্ছে, তাহলে অন্য গ্রহ আর গ্যালাক্সিতে কী কী আছে কে বলতে
পারে?”
আর যায় কোথায়, ঋষি তুড়ি মেরে লাফিয়ে উঠে বলল, “আমি বলেছিলাম। প্রোফেসর
শঙ্কু কোনওদিন ভুল বলেন না।”
গুবলুদা হেসে বলল, “চল। তোদের বরং একটা জিনিস দেখাই।”
বাইরে অন্ধকার
হয়ে গিয়েছে। শাঁখ বাজানোর শব্দ কানে আসছে। আমরা গুবলুদার পিছন পিছন ছাদে উঠে এলাম।
সেখানে দেখি একটা মাঝারি আকারের টেলিস্কোপ ফিট করা হয়েছে। সেটার দিকে ইশারা করে
গুবলুদা বলল, “আজ থেকে তিন দিন পর সুপারমুন হওয়ার কথা। পৃথিবীর
খুব কাছ দিয়ে পরিক্রমা করবে চাঁদ। কে কে দেখতে চাস?”
আমরা হইহই করে
উঠলাম। এ সুযোগ ছাড়া যায় না। গুবলুদা হেসে বলল, “হবে হবে। তোদের সবাইকেই টেলিস্কোপ ব্যবহার করতেও শিখিয়ে দেব। প্রথমে গ্রহ আর
উপগ্রহ, তারপর তারামণ্ডল। এক একটা নক্ষত্র দেখতে পেলে দেখবি
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে। কিন্তু তার আগে খানিকটা বেসিক জেনে নেওয়া দরকার।”
পরদিন বিকেল
থেকেই আমাদের মহাকাশচর্চা শুরু হয়ে গেল। গুবলুদার কথা শুনে মোটেও মনে হয় না
পড়াশুনা করছি, মনে হয় গল্প শুনছি। আর সে সব কী দারুণ, রোমাঞ্চকর গল্প! সূর্যের মধ্যে যে তেরো লক্ষ পৃথিবী ঢুকে যাবে অথবা মঙ্গল
গ্রহে যে নীল রঙের সূর্যাস্ত দেখা যায়, সে কথা কি রবিদা জানে?
একদিন অনিন্দিতা
জিজ্ঞেস করল, “গুবলুদা, ব্ল্যাকহোল কী? রবিদা বলছিল সে নাকি তারামণ্ডলে গিয়ে ব্ল্যাকহোলে
ঢুকেছে?”
গুবলুদা চা
খাচ্ছিল। কথাটা শুনে সে এমন হাসতে লাগল যে চা ছলকে পড়ে গেল মাটিতে। হাসতে হাসতে কাশি হয়ে তার বিষম লাগে আর কি! একটু ধাতস্ত হয়ে গুবলুদা বলল, “ওরে ব্ল্যাকহোল হল যেখানে মাধ্যাকর্ষণ অনেক বেশি। ব্ল্যাকহোল সব
জিনিসই টেনে নেয়, আলোকেও টেনে নেয় এই ব্ল্যাকহোল! অনেকের ধারণা এই ব্ল্যাকহোলের শেষ বিন্দুতে
আবার একটা হোয়াইট হোল আছে, অনেকটা ইন্টারস্টেলার সিনেমায় দেখানো ওয়ার্মহোলের মতো! সেখান
দিয়ে অন্য এক পৃথিবীতে যাওয়া যায়, যা আমাদের পৃথিবীর মতো হলেও অনেকটা আলাদা! তবে
তার কোনও প্রমাণ নেই। আসল কথা হল পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে যে ব্ল্যাকহোল--দ্য
ইউনিকর্ণ-- সেটা প্রায় ১৫০০ আলোকবর্ষ দূরে! এক আলোকবর্ষ কতটা জানিস তো?”
আমি বিদ্যা
ফলানোর চেষ্টা করে বললাম, “এক বছরে আলো যতটা দূরে
যায়। এক সেকেন্ডে যদি তিন লক্ষ কিলোমিটার দূরে যায়, ১৫০০ বছরে...ও গুবলুদা! এ তো অনেক দূর!”
গুবলুদা আবার
চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “তবে আর বলছি কী! বরং কাছেই
বলতে হবে। পৃথিবী তো আকাশগঙ্গা গ্যালাক্সিতে অবস্থিত, এরকম আরেকটা গ্যালাক্সি হল অ্যান্ড্রমিডা। প্রায় পঁচিশ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে
অবস্থিত। অবশ্য পঁচিশ হাজার পঞ্চাশ হাজার দূরত্বে কিছু পুঁচকে গ্যালাক্সিও আছে বটে, সেগুলোতে প্রাণের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।”
আমি উত্তেজিত হয়ে
বললাম, “অ্যান্ড্রমিডা গ্যালাক্সির কোনও গ্রহে মানুষ বা
অন্য জীব থাকতে পারে গুবলুদা?”
গুবলুদা ঠেস দিয়ে
বলল, “কে জানে? হতেও পারে। প্রায় একশ কোটি তারা আছে ওই গ্যালাক্সিতে, সেই তারার তারামন্ডলে কতগুলো করে গ্রহ আছে ভাব! কিন্তু অতদূর যাবে কে? একমাত্র যদি গ্যালাক্সি নিজেই চলে আসে...”
“গ্যালাক্সি নিজে
চলে আসবে কি গো?” আমাদের বৃহস্পতি চোখ গুলুগুলু
করে বলল, “তারারা কি হেঁটেচলে বেড়াবে নাকি? ওরা তো স্থির বলেই জানি।”
গুবলুদা একটু
মাথা চুলকে বলল, “ও তোদের বোঝানো মুশকিল। কোয়ান্টাম ফিজিক্স আর
স্ট্রিং থিওরির কচকচি আছে। ওই সব নিয়েই তো মার্ভেলের সিনেমা করে। মোদ্দা কথা হল
তারা বা নক্ষত্র স্থির হলেও মহাকাশ দিন দিন ছড়াচ্ছে। অ্যান্ড্রমিডা গ্যালাক্সি
প্রতি সেকেন্ডে একশ দশ কিলোমিটার বেগে আমাদের দিকে এগোচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে কয়েক
কোটি বছর পর ধাক্কা লাগবেই। দু’জন মিলে প্রকাণ্ড একটা গ্যালাক্সি তৈরি করবে তখন।”
প্রায় প্রতিদিনই
এরকম আলোচনা হয়, বাড়িতে গিয়ে নিজেরাই নেট ইন্টারনেট চালিয়ে দেখি।
গুবলুদা চমৎকার সব সাইটের হদিস দিয়েছে, সেখানে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দেয়। এর মধ্যে আমরা টেলিস্কোপও ব্যবহার করছি।
প্রথমদিন তো সুপারমুন দেখে তো বিস্ময়ে আমাদের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল—কী বড়
দেখাচ্ছিল চাঁদটাকে--এখন আমরা কালপুরুষ মণ্ডলের নক্ষত্র চিনছি। টেলিস্কোপের দিকে
চোখ লাগিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকার সময় আর কিছু মনে থাকে না, একটা মুগ্ধতার আবেশ আমাদের ঘিরে রাখে।
কত কত তারা, কত গ্রহ উপগ্রহ ধূমকেতু অনন্ত কাল ধরে মহাকাশে ঘুরছে, হাজার বছর পরেও তারা একই ভাবে থেকে যাবে। হয়তো ওই আকাশের কোনও জায়গাতেই থরের
গ্রহ অ্যাশগার্ড, অথবা আমাদেরই গ্রহের মতো একটা গ্রহ আছে। গুবলুদা
বলেছে স্পেসটাইমের সময়ের মাত্রা অন্যভাবে ধরা হয়, আমরা একই সময় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে থাকি, কিন্তু বুঝতে পারি না। সেক্ষেত্রে টাইম ট্রাভেল করে
ডায়নাসোরদের যুগে
যাওয়া অসম্ভব নয়। যদিও এ সব খুব জটিল ব্যাপার, কিন্তু বৈজ্ঞানিকরা মাথা ঘামাচ্ছে। হয়তো কোনওদিন সত্যিই টাইমমেশিন তৈরি হবে।
ইতিমধ্যে মাস
দুয়েক কেটে গেছে। রবিদার হামবড়া ভাবকে আমরা আজকাল আর আমল দিই না। ও বেচারা স্পেস
কুইজ জিতেই আনন্দে আছে, মহাকাশের অজানা জগত
সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। এখন আমরা জানি যে একটা স্পেস স্যুট তৈরি করতে প্রায়
নব্বই কোটি টাকা লাগে, কেউই সেটা রবিদাকে পাঠাতে
পারবে না।
আমরা এখন জানি
হ্যালির ধুমকেতু রোজ রোজ আসে না, আসে পঁচাত্তর বছর পর পর।
শুক্র গ্রহের এক দিন মানে পৃথিবীর আট মাস কারণ শুক্র তার অক্ষে ঘোরে খুবই ধীরে।
পৃথিবীর কেন্দ্র বিন্দুর তাপমাত্রা প্রায় সূর্যের সমান। শনি গ্রহকে ঘিরে ধরা
স্যাটার্ন রিং তৈরি হয়েছে বরফের কুচি দিয়ে। মঙ্গল গ্রহে মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে
তিন গুণ উঁচু একটা পাহাড় আছে, সেটা আবার আগ্নেয়গিরি। আবার বৃহস্পতির ইউরোপায় এক একটা প্রস্রবণ বা সল্ট
ওয়াটার গিজার এভারেস্ট-এর কুড়ি গুণ।
মঙ্গল গ্রহে নীল
রঙের সূর্যাস্ত হয় আর মহাকাশে হাওয়া নেই বলে চেঁচিয়ে গান গাইলেও শোনা যাবে না। বুধ, শুক্র আর ইউরেনাস আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে, প্লুটো আর বৃহস্পতি এখন টেলিস্কোপে নক্ষত্র খুঁজে বার করতে ওস্তাদ। আমরা সবাই
মোবাইলে 'স্টেলেরিয়াম' বলে একটা অ্যাপ ডাউনলোড করে নিয়েছি, তাতে নক্ষত্রের
অবস্থানের উপর
নজর রাখা যায়। নাসা ও ইসরোর মহাকাশ অভিযানের খবর পড়ি মন দিয়ে, অন্য গ্রহে রোবটের সাহায্যে মহাকাশ নামানোর ভিডিও দেখি। কী দারুণ লাগে দেখতে!
এখন আর গুবলুদা
আমাদের নিজে থেকে কিছু বলে না। আমরা নিজেরাই এক একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করে
দিই। কোনওদিন রকেটের প্রযুক্তি নিয়ে কথা হয়, কোনওদিন আলোচনা হয় ইন্টারস্টেলার অভিযান নিয়ে। আমাদের আগ্রহ দেখে গুবলুদা
প্রত্যেককে এক কপি করে 'ফার্স্ট বিগ বুক অফ স্পেস' আর 'অ্যান অ্যাস্ট্রনট গাইড টু লাইফ' দিয়েছে, সেইগুলো একটু একটু করে
পড়ছি। এরই মধ্যে দুর্গাপুজো চলে এল। স্পেস কুইজ এর ঘোষণা করা হয়ে গেল। আমরা নাম
লিখিয়ে দিয়েছি টিম ইভেন্টে, রবিদারাও লিখিয়েছে।
নির্দিষ্ট দিনে
গিয়ে দেখি গুবলুদাকে বিশেষ অতিথি করে নিয়ে এসেছে পূজা কমিটির লোকজন। সে নিজে ইসরোর
বৈজ্ঞানিক! তাকে আমন্ত্রণ না জানানোই আশ্চর্য!
প্রতিযোগিতার দিন
আমরা মোটেও উত্তেজিত হইনি। না জিতলেও কী? এই সূত্রে গুবলুদার সঙ্গে আলাপ তো হল! তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমাদের
প্রত্যেকের কাছে একটা নতুন দিগন্ত খুলে গেছে। প্রতিযোগিতার কথা ভেবে শুরু করলেও
পরে আমরা নিজের আগ্রহেই পড়াশুনা চালিয়ে গিয়েছি। রবিদার কথা মাথা থেকে বেরিয়েই
গিয়েছিল।
নির্দিষ্ট সময়ে খেলা
শুরু হয়ে গেল। বেশিরভাগই সহজ প্রশ্ন, অসুবিধা হয়নি কারো। ‘বাজর’
রাউন্ডে অবশ্য রবিদার টিম আগেভাগে বেশ কয়েকবার বেল টিপেছে, কিন্তু গতানুগতিক উত্তরের বাইরে মহাকাশ সম্পর্কে কিছুই বলতে পারেনি। শেষ
রাউন্ডটা ছিল ‘এক্সটেমপোর’, তাতে মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে সবাই নিজের মতো কিছুক্ষণ কথা
বলবে। সেই রাউন্ডে রবিদাদের কেউই আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারল না। আমরা প্রত্যেকে
একটা করে বিষয় ভেবে রেখেছিলাম, সেই নিয়ে কিছুক্ষণ কথা
বললাম। আমাদের কথা শুনে তো বিচারকরা সবাই চমকে উঠল। তাদের হাততালি আর থামে না।
কুইজের শেষে সর্বসম্মতিতে আমাদের জয়ী ঘোষিত করা হল। একটা বড় কাপ আর বেশ কিছু
উপহার। আড়চোখে দেখি রবিদার মুখ কালো হয়ে গেছে।
গুবলুদা দেখি
আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ফিসফিস করে সে বলল, “তোদের এই সিক্রেটগুলো ওর সঙ্গে শেয়ার করবি না? ও বেচারা তো জানতেও পারবে না
তোরা কোন
গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছিস?”
হঠাৎ আমাদের খুব
দুঃখ হল রবিদার জন্য। আমরা সবাই এগিয়ে গেলাম তার দিকে। তার সামনে গিয়ে বৃহস্পতি
বলল, “ইন্টারস্টেলারের ডিভিডি পেয়েছি। সিনেমাটা
আমাদের সঙ্গে বসে
দেখবে রবিদা? তোমার বন্ধুদেরও ডেকে নাও। সবাই মিলে খুব মজা হবে।
চল, আমরা আবার ভাব করে নিই।”
রবিদা কিছুক্ষণ
অবাক হয়ে আমাদের দিকে চেয়ে রইল। তারপর কেঁদে উঠল। বৃহস্পতিকে জড়িয়ে ধরে সে বলতে
লাগল, “সরি। সরি। সরি...”
শনিবার, ৫ জুন, ২০২১
সুলভিন আর সমুদ্রের গল্প
সুলভিন আর সমুদ্রের গল্প
সুদীপ চ্যাটার্জী
১
সমুদ্রের ভিতরের পৃথিবীটা খুব পরিচিত, খুব আপন মনে হয় সুলভিনের। জলের নীচে ডুব দিলেই একটা অচেনা আবেশের সুর তার কানে বাজতে থাকে। সূর্যের আলোয় জলের তলার রঙ্গীন কোরালগুলো চকচক করে। ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন মাছ তাকে আরচোখে দেখতে দেখতে এগিয়ে যায় জল কেটে। সমুদ্রের তলানিতে দল বেঁধে থাকা গোলাপী লাল কাঁকড়া গুলো তাকে দেখতে পেয়ে সড়সড় করে বালির তলায় লুকিয়ে পড়ে। জেলিফিশ আর স্টিং রে থেকে শুরু করে বড় বড় সামুদ্রিক কচ্ছপ, সকলেই যেন তাকে অনেকদিন ধরে চেনে, তাকে জানাতে চায় লুকোনো কোন কথা।
সুলভিনের বয়স নয় বছর। জন্মানোর পর প্রথম যখন সে চোখ খুলেছিল, সমুদ্রের নীল সবুজ জল প্রথমে ধরা দিয়েছিল তার চোখে, তারপর সে দেখতে পেয়েছিল তার মাকে। এরপর একে একে অনেক বছর কেটে গেছে। সুলভিনরা নৌকোতে থাকে, নৌকোতে রান্না করে, নৌকোতেই ঘুমায়। তার মা রেজা তাকে বলেছে, বাজাউ লাউতরা সমুদ্র ছেড়ে কোনদিন যায় না। তাদের ডাঙায় থাকা বারণ।
সুলভিনের ভাই যখন নিখোঁজ হয় যায় সমুদ্রে, তার বয়স তিন। ভাই তাদের মোটর লাগানো নৌকা করে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিল। ঝড়ের দেবতা ‘উমবোহ্ বালিয়ু’ তাকে ফিরতে দেয়নি। বাবা কয়েকদিন মনমরা হয়ে ছিল তাদের হারিয়ে যাওয়া নৌকোর শোকে। নৌকো না থাকলে সমুদ্রে গিয়ে জালে মাছ ধরা যায় না বাজারে বিক্রি করার জন্যে। বাজাউরা টাকাপয়সা রাখে না, মাছের বদলে চাল, কেরোসিন, নুন নিয়ে আসে ডাঙা থেকে। অগত্যা সমুদ্রে ডুব দিয়ে মাছ শিকার করা ছাড়া গতি নেই। সুলভিনও লেগে গিয়েছিল কাজে। বাজাউরা জলের তলায় ডাঙার চেয়ে বেশী সাবলীল, দু’বছর বয়স থেকেই সমুদ্রের গভীরে সাঁতার কাটতে ওস্তাদ হয়ে যায় তারা। দিনের মধ্যে পঞ্চাশ বার অন্তত বাঁশ দিয়ে তৈরি বর্শা হাতে নিয়ে জলে ঝাঁপায় সুলভিন, কখনো সামুদ্রিক শসা, কখনো মাছ, আবার কখন তুলে আনে অর্চিন। তা রান্না হয় তাদের ‘লেপা লেপা’ নৌকোয়।
প্রতিদিনের মত আজও জলের তলায় ডুব সাঁতার দিয়ে শিকার করছিল সুলভিন। জলপরীর মত দু’হাত দিয়ে জলের আরো গভীরে নেমে যেতে যেতে তীক্ষ্ণ চোখে চারদিকে নজর রাখছিল সে। হঠাৎ সে দেখতে পেল, জলের তলানিতে থাকা কোরালের ফাঁকে একটা জিনিস চক চক করছে। কোরালে মরা ঝিনুকের মধ্যে কখনো কখনো মুক্তো দেখতে পাওয়া যায় এদিকের সমুদ্রে, কৌতুহলী হয়ে সেইদিকে সাঁতার কাটতে লাগল সে। মিনিটখানেক পর ভুস করে জলের তলায় যখন মাথা তুলল সুলভিন, তার হাতে ধরা একটা পুরোনো কাচের বাক্স। নৌকোতে উঠে ছইয়ের ভিতরে গিয়ে বাক্সটা ভালো করে দেখল সে। খুব পুরোনো হলেও, জিনিসটা দেখতে অপূর্ব সুন্দর। বাক্সটা খুলে সুলভিন দেখতে পেল, সেখানে রাখা আছে একটা ছোট্ট হাত আয়না। আয়নার চারিদিকে বাহারি কাজ করা আছে। হয়ত সোনা বা রুপোর জল করা হয়েছিল কোন সময়ে। হাতের কাপড় দিয়ে আয়নাটাকে ভালো করে মুছলো সুলভিন, তারপর সেটাকে হাতে নিয়ে চোখের সামনে ধরল।
২
স্কুল থেকে বেরিয়ে নৌকোর দিকে হাঁটা লাগল ইমরান। আজ ভূগোলের ক্লাসে মানচিত্র পড়ানো হচ্ছিল, সেখানে তাদের দ্বীপটা খুঁজে পেতে হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের। ইন্দোনেশিয়ার সুলাবেশী প্রান্তের ছোট্ট একটা দ্বীপ, সহজে কি খুঁজে পাওয়া যায়? তাদের গ্রামের পুরুত টুডো অবশ্য বলে যে একসময় বাজাউরা সারা মালয়েশিয়া, বোরনিও আর ইন্দোনেশিয়া জুড়ে বসবাস করত। তাদের রাজার মেয়ে হারিয়ে যেতে রাজা বাজাউদের আদেশ করেন সমুদ্রে গিয়ে মেয়ের সন্ধান করতে, মেয়ে হয়ত নৌকা নিয়ে সমুদ্র দেখতে গেছে। যতদিন না রাজকন্যাকে খুঁজে পাওয়া যাবে, তাদের ডাঙায় ফেরা বারণ। কিন্তু রাজকন্যাকে তারা খুঁজে পায়নি কোনদিন, কয়েক শতাব্দি কেটে গেছে তারপর। বাজাউ লাউতরা আজও সমুদ্রের বুকে নৌকোতে বসবাস করছে সাবাহ, সুলাবেশী আর অন্যান্য কয়েকটা দ্বীপে। নৌকোয় উঠে দাঁড় বাইতে বাইতে ইমরান ভাবল, সুলভিনও কি সেই গল্পের রাজকন্যের মত অদৃশ্য হয়ে যাবে?
প্রায় দু’দিন ধরে সুলভিনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার চেয়ে বছরচারেকের ছোট হলেও সুলভিনকে ইমরান বন্ধুই মনে করে। ঘরের কাজ না থাকলে সুলভিন স্কুলেও যায় তার সঙ্গে। বিকেলে তার সঙ্গে গল্প করতে করতে সমুদ্র থেকে তুলে আনা শাকপাতা রান্না করে সে। সুলভিন বয়সে ছোট হলেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জলে ডুব দিতে পারে, নিশ্বাস না নিয়ে সাঁতার দিতে পারে অনেকক্ষণ। হঠাৎ করে সে কোথায় উধাও হয়ে গেল কিছুতেই বুঝতে পারে না ইমরান।
দাঁড় বাইতে বাইতে সুলভিনদের লেপা লেপার কাছে চলে এল সে। সুলভিনের মা রেজাকে দেখে ইমরান জিগ্গেস করল, “সুলভিনের কোনো খবর পেলে মাসি?”
রেজা বিষণ্ণ মুখে বলল, “সে কি আর আছে ইমরান? মেয়েটা জল বলতে পাগল ছিল, জলে নামতে পারলেই যেন বেঁচে যেত! সমুদের দেবতা ‘উমবোহ্ দিলাউত’ তাকে জলের তলাতেই নিয়ে গেছে।”
ইমরান রেজাকে জিগ্গেস করল, “সুলভিনের জিনিসপত্র গুলো একটু ঘেঁটে দেখব মাসি? যদি কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়?”
রেজা আপত্তি করল না। ইমরান রেজার নৌকোয় উঠে এল। রেজা উঠে গিয়ে ছইয়ের মধ্যে থেকে একটা ছোট বাক্স আর একটা থলি নিয়ে এসে তার হাতে দিয়ে বলল, “মেয়েটার জিনিস বলতে এইটুকুই। ছোট থেকেই সুলভিন খুব শান্ত আর নরম স্বভাবের। এখন আমি কী যে করি?”
ইমরান থলিটা উপুড় করে দিল কোলের ওপর। কয়েকটা শামুকের খোল, চিরুনি, জামাকাপড় ছাড়া জিনিস বলতে একটা কাঁচের সুন্দর ছোট বাক্স, হয়ত জলের তলায় পড়ে ছিল অনেকদিন। সেটা হাতে তুলে চোখের সামনে আনতেই ইমরান চমকে উঠলো। এটা তো ‘বোসুঙ’ এর বাক্স, টোডু কতবার এই ভয়ংকর বাক্সের কথা বলেছে গল্পে। ইমরান বাক্সটা হাতে লাফিয়ে তার নৌকোতে চড়ে বসল। তারপর জোরে দাঁড় বাইতে লাগল টোডুর ‘লেপা লেপা’র দিকে।
৩
বাজাউরা যে সকলেই সারাজীবন জলে থাকে তা নয়। বেশিরভাগ মানুষ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডাঙায় এসে সরকারের করে দেওয়া ঘরবাড়িতে থেকে দোকান দেয়, পড়াশুনা করে, অনেকে বড় হয়ে বাইরে গিয়ে চাকরি বাকরিও করে। কিন্তু ‘কালামত’ টোডুর মত কয়েকজন আজও স্রোতের বিপরীতে গিয়ে টিকে আছে সমুদ্রের ওপর। সারা জীবনে টোডু বড়জোর বিশ পঁচিশ বার মাটিতে পা রেখেছে। খোলা আকাশ আর নীল সমুদ্রের মাঝে না থাকলে সে বাঁচবে না।
একসময় লোকে তার খাতিরও করত। এই সমুদায়ে সে একমাত্র ‘কালামত’, মরে যাওয়া লোকেদের আত্মা টোডুর শরীরে এসে তাদের পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে। নানা রকম জাদুমন্ত্রও জানে সে। অনেক বার অনেক জিনকে তাড়িয়েছে সে, কিন্তু সে সব কথা আজ অতীত। টোডু বুঝতে পারে, মানুষ বড় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, সমুদ্রের শক্তির ওপরেও তাদের বিশ্বাস কমে আসছে। প্রকৃতিকে তাচ্ছিল্য করতে শুরু করেছে আজকালকাল ছেলেরা, শহরে গিয়ে তাদের ওপর জিন ভর করেছে। টাকার লোভে দরকারের অনেক বেশি মাছ শিকার করছে তারা, সামুদ্রিক জীব ধরে বিক্রি করে আসছে শহরে, সমুদ্রের জলে আবর্জনা ফেলতে শুরু করেছে শহরের লোকেরা এসে। ‘উমবোহ্ দিলাউত’ যেদিন রুষ্ট হবে, পলকে শেষ হয়ে যাবে সবকিছু।
নিজের পুরোনো নৌকোতে বসে উদাস দৃষ্টিতে টোডু তাকিয়ে ছিল সামনের দিকে। এমন সময় তার নজরে পড়ল ইমরান দ্রুত গতিতে নাও নিয়ে তার কাছেই আসছে। মুখে অদৃশ্য একটা হাসি ফুটল বুড়োর। এই ছেলেটার মত কয়েকজন আজও তার কাছে গল্প শুনতে চায়, তারও খারাপ লাগে না স্মৃতি হাতড়ে সেই সব প্রাচীন ঘটনা বলতে।
কিন্তু আজকে গল্প শুনতে না চেয়ে ইমরান তড়িঘড়ি নৌকায় উঠে এসে বলল, “টোডু, সুলভিনকে জিনেরা ধরে নিয়ে গেছে। এই দেখো ওর কাছে ছিল এই বোসুঙ এর বাক্স।”
বৃদ্ধ টোডুর চোখে একটা বিস্ময়ের ঝিলিক দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেল, তারপর তার চোখে ফুটে উঠল আতঙ্ক। দু’হাত দিয়ে বাক্সটা চেপে ধরে সে মন্ত্র পড়তে লাগল বিড়বিড় করে। তার মাথায় ঘুরছে তার পূর্বপুরুষদের কাছে শোনা সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা।
বহু বছর আগে যখন রাজার আদেশে সমুদ্রে নির্বাসন নিতে বাধ্য হয় তাদের পূর্বপুরুষরা, স্বয়ং সমুদ্রের এক দেবতা এসে তাদের উদ্ধার করেছিলেন। ভয়ংকর চেহারা ছিল সেই দেবতার। তার নামই ছিল ‘বাজাউ’। সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চলে খাদ্যভাব হলে লোকেরা তাকে ডাকত সমুদ্রে পুজো দিয়ে। সেই পুজোর পর সমুদ্রের জলে আবির্ভূত হতেন বাজাউ দেবতা, তারপর সাঁতরে সমুদ্রের বিশেষ এক অংশে এগিয়ে যেতেন। তার পিছনে পিছনে অনুসরণ করে যেত বাকি লোকেরা। তাঁর বিশাল শরীরের ভারে সমুদ্রের জল উদ্বেলিত হয় প্রকান্ড ঢেউ উঠত আর প্রচুর মাছ এসে পড়ত বাজাউদের নৌকোতে। সেই মাছ চলত বেশ কয়েকদিন। খুব দরকার না পড়লে দেবতাকে কেউ স্মরণ করত না।
কিন্তু মানুষের লোভের কোন সীমা নেই। গ্রামের অনেক বাজাউ লুকিয়ে লুকিয়ে ফন্দি আঁটতে লাগল কী করে দেবতাকে বন্দী করা যায়, তাহলে তাঁর জাদুবিদ্যের সাহায্যে আরো অনেক মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করতে পারবে তারা। সমুদ্রের গভীর থেকে তুলে আনতে পারবে দামী মুক্তো, আরো অনেক হারিয়ে যাওয়া সোনা, রুপো, হিরে দখল করতে পারবে।
একদিন তারা সুযোগও পেয়ে গেল। প্রচন্ড খরায় মাছেরা সমুদ্রের অনেক গভীরে চলে গিয়েছিল। বাজাউদের পুরুত ‘কালামত’ পুজো করে স্মরণ করলেন দেবতাকে। দেবতা প্রকট হলেন জলে, তারপর এগিয়ে চললেন সাঁতার কেটে। সহসা গ্রামের কয়েকজন তাঁর দিকে তাক করে ছুঁড়তে শুরু করল বিষাক্ত তির, উদ্দেশ্য তাকে অজ্ঞান করে ধরে নিয়ে যাওয়া। একের পর এক তির বিঁধতে লাগল দেবতার শরীরে, কিন্তু আশ্চর্য্য! তিরবিদ্ধ হলেও দেবতা অজ্ঞান হলেন না। বরং প্রচন্ড এক লাফে জল থেকে উড়ে এসে পড়লেন লোকগুলোর নৌকোয়। সেই ধাক্কায় নৌকো চুরমার হয়ে গেল।
তখন দেবতার চোখ দুটো জ্বলতে শুরু করেছে। তার শরীর থেকে অসংখ্য কালো কালো ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এসে ঘুরপাক দিতে শুরু করল আকাশে। দেবতা বাজাউদের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোদের লোভই তোদের কাল। যেই সমুদ্র তোদের থাকার জায়গা দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস তোরা। তোদের আমি অভিশাপ দিলাম, তোরা কোনদিন শান্তিতে সমুদ্রে থাকতে পারবি না। কয়েক শতাব্দী ধরে তোদের তাড়া করে বেড়াবে জিনেরা। তোদের অভিশাপ বন্ধ রইল এই ‘বুসোঙ’ এর বাক্সে। তোদের পরের প্রজন্মের কেউ না কেউ এই বাক্স খুঁজে পাবে সমুদ্রে। যদি সেই মানুষ সৎ হয় তাহলে হয়ত সেই মুক্তি দেবে তোদের, নাহলে সমুদ্রের ঢেউরূপী জিনেরা এসে ধ্বংস করে দেবে তোদের।”
ততক্ষণে তাঁর হাতে উঠে এসেছে একটা কারুকাজখচিত একটা কালো বাক্স। ধীরে ধীরে তার শরীর সমুদ্রের জলের মত স্বচ্ছ হতে শুরু করল, তারপর আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল বাতাসে।
৪
চোখ খুলে সুলভিন দেখল, সে শুয়ে আছে একটা নৌকোর মধ্যে। উঠে দাঁড়িয়ে সে দেখল চারিদিকে দিগন্ত অব্দি প্রসারিত সমুদ্রের অনন্ত জলরাশি, জল ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। রোদ্দুর একটু ফিকে হয়ে আছে মেঘলা হয়ে। বালির সৈকত থেকে অনেক দুরে চলে এসেছে সে। কোন অন্য নৌকো তার নজরে পড়ল না। এখান থেকে কোনদিনে গেলে তাদের বাড়ি?
সুলভিনের মনে পড়ল সমুদ্রের তলানি থেকে সে একটা কাচের বাক্স খুঁজে পেয়েছিল। নৌকোতে পৌঁছে সে বাক্স থেকে পেয়েছিল একটা হাত আয়না। তারপর? তারপর কী হয়েছিল? এখানে সে এলই বা কী করে? তবে কি “উমবোহ্ দিলাউত” এর যাদুতেই সে এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে? এবার সে কী করবে?
মাথা ঠাণ্ডা করে ভাববার চেষ্টা করল সুলভিন। এখনো সূর্য অস্ত যায়নি। তার মানে খুব একটা দূরে নিশ্চয়ই আসেনি সে। সকলে নৌকা নিয়ে তাকে খুঁজতে বের হবে। এখন অপেক্ষা করাই একমাত্র উপায়।
জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সুলভিনের মন ভালো হয়ে গেল। স্বচ্ছ জলের তলা দিয়ে কত মাছ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে! কী সুন্দর সূর্যের একটা রুপোলি আলো এসে পড়েছে ঢেউয়ের ওপরে। মনে হচ্ছে যেন কোন আয়নার ভিতর দিয়ে মাছগুলো চলে যাচ্ছে। আয়নার কথাটা মনে পড়তেই সুলভিন চমকে উঠল। সেই আয়নাটা? কোথায় গেল? সেই আয়নার মধ্যেই নিশ্চয়ই জাদু’ছিল!
নৌকোর ভিতরে খুঁজতে গিয়ে সে দেখতে পেল জিনিসটা। আয়নাটা হাতে তুলে নিয়ে ভালো করে দেখল সুলভিন। কারুকাজ করা জিনিস। দু’হাত দিয়ে চাপ দিলে শামুকের খোলের মত দুভাগ হয়ে যায়, দুদিকেই গোল আরশি লাগানো।
চোখের সামনে জিনিসটা আনতেই আয়নাতে প্রতিফলিত হয়ে উঠলো দুটো দৃশ্য। সুলভিন দেখল ডান দিকের আয়নাতে ফুটে উঠেছে সমুদ্রের বুকে এগিয়ে চলা একটা ছোট নৌকো। নৌকোতে বসে আছে তাদের গ্রামের ‘কালামত’ টোডু আর তার বন্ধু ইমরান আর ইবু। তারা জোরে জোরে সুলভিনের নাম ধরে ডাকছে। সুলভিন বুঝতে পারল তাকে খুঁজতেই বেরিয়েছে তারা। কিন্তু তাদের সঙ্গে কী করে যোগাযোগ করবে সে? মরিয়া হয়ে আরশির কাচের ওপর হাত রাখতেই সুলভিন অবাক হয়ে দেখল তার আঙ্গুলগুলো আরশির কাচ ভেদ করে অন্যদিকে চলে গেল। সত্যি তাহলে ‘সুম্মাঙ্গা’ দেবতার জাদু’আছে এতে! কৌতুহলী হয়ে খুব সাবধানে সে তার ডান চোখ ছোঁয়াল আরশির গায়ে, তক্ষুণি সে চোখের সামনে দেখতে পেল ইমরানদের নৌকোটা। এই আয়না তাহলে একটা জাদু’পথ! তাহলে সুলভিন চাইলেই ইমরানদের কাছে চলে যেতে পারে এক্ষুনি। তারপর নিশ্চিন্তে তাদের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। ‘সুমাঙ্গা’ দেবতা বাজাউদের সবসময় রক্ষা করেন জিনদের কাছ থেকে, তাকে রক্ষা করতেই এই আয়না পাঠিয়েছেন তিনি। সুলভিন মনস্থির করে ফেলল, কিন্তু ফিরে যাওয়ার আগে বাঁ দিকের আয়নাটাও দেখা দরকার।
বাঁ দিকে চোখ লাগাতেই বুকটা কেঁপে উঠলো সুলভিনের। বিশাল এক জাহাজ দাঁড়িয়ে রয়েছে জলের ওপর। জাহাজের মাস্তুল থেকে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আকাশ ছেয়ে ফেলেছে। সমুদ্রের জলের ওপর কালো চ্যাটচ্যাটে কোন তরলের ওপর মরে ভাসছে হাজার হাজার মাছ, জলের যন্ত্রণায় ছটপট করছে অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীরা। কয়েকটা ডলফিন করুণ স্বরে আর্তনাদ করছে ঢেউয়ের ওপরে।
সুলভিনের মনটা কেঁদে উঠলো। জলের প্রাণীরা তার কাছে অনেক বেশি আপন, সমুদ্রের জলের নীচেই সুলভিন সবচেয়ে আনন্দে থাকে। সেখানের এই করুণ পরিণতি তার মনকে ব্যাকুল করে তুলল। আর কিছু চিন্তা না করে সে কাচে চোখদুটো ছোঁয়াল, পরমুহূর্তেই সে আয়নার ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
৫
“তারপর কি হলো টোডু?” নৌকো থেকে জল সেচতে সেচতে জিজ্ঞেস করল ইবু। টোডু সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। উদাসীন গলায় সে বলল, “দেবতার কথাই সত্যি হল। যেই দিন আমার ভাই তুলে এনেছিল এই বাক্স, তার পরের দিনেই শুরু হয়ে গেল প্রচন্ড ঝড় আর বৃষ্টি। সমুদ্রের ঢেউ পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে আছড়ে পড়ল আমাদের ওপর। কত লোকে মরল, কত লোকে ভেসে গেল, কেউ হিসেব রাখেনি।”
ইমরান জিগ্গেস করল, “আর বাক্স?”
“বাক্সর কথা কারো মনে নেই। ভাইও আর ফিরল না।”
ইমরানের কাছে বোসুঙ এর বাক্সটা দেখেই টোডু ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। তারপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমুদ্রে বেরিয়ে পড়েছিল নাতি ইবুকে সঙ্গে নিয়ে। ইমরানও তাদের সঙ্গ ছাড়েনি। বয়স কম হলেও ইবু চালাক চতুর ছেলে, বিদেশীদের সঙ্গে কথা বলে বলে অনেক কিছু জানে বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে। মোটর লাগানো নৌকো চালাতেও ওস্তাদ হয়ে উঠেছে। টোডু যে সুনামির কথাই বলছে সেটা বুঝতে পারল ইবু। সে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলল, “সুলভিন তো দুদিন আগে থেকেই নিখোঁজ। সমুদ্রে তাকে কোথায় খুঁজব আমরা?” ইমরান টোডুর দিকে তাকালো।
টোডু গম্ভীর মুখে বলল, “বাজাউ দেবতা সমুদ্রের যেই জায়গায় নিয়ে যেতেন আমাদের পূর্বপুরুষদের, সেইদিকেই যাচ্ছি আমরা। বলা যায় না, সুলভিন যদি তার পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হয়, তাকে হয়ত ফিরে পেতে পারি আমরা। তাহলে…”
কথাটা আর শেষ করল না টোডু। সুলভিনের জীবনের সঙ্গে এখন সমস্ত বাজাউ লাউতদের জীবন জড়িয়ে গেছে। মেয়েটা হয় তাদের মুক্তি দেবে নয় দেবতার অভিশাপ আবার আছড়ে পড়বে তাদের ওপর।
এরপর ইবু আর ইমরানের বহু সাধাসাধিতেও টোডু আর মুখ খুলল না। দুশ্চিন্তাতে তার কপালের রেখা গুলো কুঁচকে গেছে। ইমরানরা একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে সমুদ্রের দিকে চেয়ে বসে রইলো। সূর্য মাথার ওপর থেকে নেমে পশ্চিম দিকে এগোচ্ছে ধীর গতিতে। একটা ঠান্ডা হাওয়া চলতে শুরু করেছে সমুদ্রের বুকে। ধীরে ধীরে বিকেল হয়ে এলো।
এমন সময় হঠাৎ ইমরান বলে উঠলো, “আরে! জলটা এরকম হল কী করে?”
টোডু উঠে দাঁড়িয়ে জলের দিকে তাকিয়ে রইলো। ইবু নৌকোর ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল নৌকোর। ব্যাপারটা তারও চোখে পড়েছে। সে অস্ফূটে ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তেল!”
ইমরান এরকম কোন অভিজ্ঞতা হয়নি আগে। সে অবাক হয়ে ইবুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তেল? সমুদ্রের জলে তেল আসবে কোত্থেকে?”
ইবু উত্তর দিল, “জাহাজের ট্যাঙ্কারে করে নিয়ে যাওয়া তেল, পেট্রল, ইত্যাদি। অনেক সময় ট্যাঙ্কার ফেটে অথবা অন্য কোনো অসাবধানতায় সমুদ্রের জলে পড়ে যায়। এরকম নাকি সারা দুনিয়াতে আকছার হচ্ছে। এই তেলের পরতে অক্সিজেন জলের তলায় পৌঁছতে পারে না, ফলে অনেক মাছ আর অন্যান্য প্রাণীরা মরে জলের ওপর ভেসে ওঠে।”
বাস্তবিকই তাই। সারা সমুদ্রে তেল থক থক করছে, আর তার মধ্যে ভাসছে প্রচুর মাছের মৃতদেহ। কতটা জায়গা ধরে যে তেল ছড়িয়েছে সেটা বোঝার কোন উপায় নেই। এখানে ইঞ্জিন চালানোও অসম্ভব, তেলের সংস্পর্শে আগুন ধরে যেতে পারে। নৌকোর পাটাতনের নীচ থেকে একটা বৈঠা তুলে ইবু নৌকোটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল।
যত এগোচ্ছে দৃশ্যটা তত ভয়াবহ হয়ে উঠছে। একটা ভাসমান নরকের ওপর দিয়ে চলেছে তারা। ইমরান আর ইবুর গলার কাছে একদলা কষ্ট পাকিয়ে উঠছে। কত প্রাণীকে যে মরে থাকতে দেখল ইমরানরা। তাদের চোখের সামনে একটা ডলফিন ছটফট করতে করতে মারা গেল। টোডু বুকের ওপর হাত দিয়ে বার বার বলতে লাগল, “উমবোহ্ দিলাউত মানুষের এই অন্যায় ক্ষমা করবে না, কোনদিন ক্ষমা করবে না।”
ততক্ষণে সূর্যের আলো পড়ে অন্ধকার হতে শুরু করেছে। সহসা ইবু চেঁচিয়ে বলল, “ওই দেখো।”
দূর থেকে তারা দেখতে পেল আগুনটা। সমুদ্রের বুকে যেন একটা আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছে। একটা বিশালাকায় জাহাজ সমুদ্রের চরায় কাত হয়ে পড়ে আছে, আর সমস্ত জায়গাটা জুড়ে আগুনের শিখা দাউদাউ করে জ্বলছে আকাশের দিকে মুখ করে।
৬
সুলভিন যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই জায়গাটা সমুদ্রের ওপরের একটা চর। ভাঁটার সময় গভীর সমুদ্রেও কোথাও কোথাও এরকম চর তৈরি হয়। কয়েক মুহর্ত আগেই এই চরে এসে উপস্থিত হয়েছে সুলভিন, কিন্তু এইবার কী করবে সে? আগুন ক্রমেই ছড়িয়ে যাচ্ছে সমুদ্রে আরো দূর পর্যন্ত।
এমন সময় সুলভিনের নজরে পড়ল চরের কাছেই কাত হয়ে আছে একটা জাহাজ। যতদুর মনে হচ্ছে এটা কোন মাল বোঝাই জাহাজ, মানুষজনের চিহ্ন দেখতে পেল না সে। হয়ত কোন দুর্ঘটনা হওয়ায় জাহাজের মানুষেরা ছোট নৌকা করে পালিয়েছে এখান থেকে। কিছু একটা আন্দাজ করে জলে একবার আঙুল ডুবিয়েই ব্যাপারটা পরিষ্কার বুঝতে পারল সুলভিন। তারপর তিরবেগে ছুটতে শুরু করল জাহাজের দিকে। ওই জাহাজটার খোলের মধ্যে রাখা তেলের টিন ফুটো হয়ে তেল এসে পড়ছে সমুদ্রে। প্রতি মুহুর্তে তেল ছড়িয়ে যাচ্ছে আরো দূরে। এক্ষুণি কিছু না করলে আরো হাজার হাজার সমুদ্রের প্রাণী মারা যাবে আজকে।
অনেক কষ্টে ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে জাহাজের ওপরে চলে এল সে। জাহাজের ওপরের বেশিরভাগ জিনিস আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনেক আধপোড়া জিনিস থেকে এখনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। মাস্তুলের ওপরে আগুন জ্বলছে এখনো। তপ্ত লোহায় পা পুড়ে যেতে লাগল ছোট্ট সুলভিনের, কিন্তু সে ব্যাথাকে পাত্তা না দিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নেমে এলো জাহাজের খোলে। বিশাল বিশাল কয়েকটা ট্যাঙ্কার রাখা আছে সেখানে। কোন কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার ফলে অনেক জায়গায় ফাটল ধরেছে সেগুলোর, গল গল করে তেল বেরিয়ে আসছে সেখান থেকে। এদিকে সেদিকে আগুনের জ্বলন্ত টুকরো এসে পড়েছে। আগুনের সঙ্গে তেলের ট্যাঙ্কারগুলোর সংযোগ হলেই প্রচন্ড বিস্ফোরণ হবে এখানে। সুলভিন বুঝতে পারল না কী করবে? অথচ তেল বেরোতে থাকলে সমুদ্রের জল বিষাক্ত হয়ে যাবে। সেটা সে কিছুতেই হতে দেবে না।
এদিকে সেদিকে তাকিয়ে সুলভিন হঠাৎ দেখতে পেয়ে গেল কয়েকটা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। তার মনে পড়ে গেল স্কুলে তাদের শিখিয়েছিল কি করে আগুন লাগলে এই যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়! সুলভিন একটা অগ্নিনিবারক যন্ত্র খুলে নিয়ে তার ক্লিপটা টেনে পাইপটা জ্বলন্ত আগুনের টুকরোগুলোর দিকে তাক করে বোতাম টিপে দিল। সঙ্গে সঙ্গে শুকনো বরফের একটা ফোয়ারা ফিনকির মত বেরিয়ে এসে আগুন নিভিয়ে দিতে লাগল। ততক্ষণে সুলভিনের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আগুন নিভিয়ে সে অগ্নিনিবারক যন্ত্র থেকে শুকনো বরফ ছড়াতে লাগল তেলের ট্যাঙ্কারের ফাটলগুলোর ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই বরফ জমে গিয়ে তেল বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সুলভিন। কিন্তু এখন তার কাছে সময় নেই। জাহাজের খোলের মধ্যে একটা খোলা জাল দেখতে পেল সে। সেটা হাতে করে বাইরে এসে ঝপাং করে সে জলে লাফিয়ে পড়ল। তারপর ডুব সাঁতার দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল আগুনের দিকে। আগুনের তাপে জলের তলায় স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। অনেক মাছ আর অন্যান্য প্রাণী নিশ্বাস নিতে না পেরে সেখানে খাবি খাচ্ছে, সাঁতার কাটতে না পেরে অসহায়ের মত ভেসে আছে জলে। সুলভিন তাদের হাতের জালে ঢুকিয়ে তেলের সীমানার বাইরে গিয়ে পরিষ্কার জলে ছেড়ে দিয়ে আসতে লাগল। সুলভিন জলকে ভয় করে না, সে বাজাউ লাউতদের মেয়ে। শিকার করার জন্যে এমনিতেই সে এক নিশ্বাসে জলের অনেক গভীরে ডুব দিতে পারে। অনেক দূর গিয়ে সে একবার ভুস করে মাথা তুলে নিশ্বাস নিল। তারপর আবার ডুব দিল জলের তলায়। আবার খানিক পরে মাথা তুলল, আবার ডুব দিল।
কতবার সুলভিন জলের তলায় ডুব দিচ্ছে, তার তখন খেয়ালই নেই। যেন সে তার নিজের আপনজনকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করছে। কিন্তু একটা সময়ের পর প্রকৃতির সামনে হার মানতেই হয়। নয় বছরের সুলভিনও একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। জলের তলায় তার দম আটকে আসছে, কিছুতেই সে নিশ্বাস নিতে পারছে না। অনেক কষ্টে সে চোখ খুলে ওপর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করল একবার, তারপর আর সুলভিনের কিছু মনে নেই।
৭
ইবু আর ইমরান নৌকোতে ঘুমিয়ে পড়লেও জলের দিকে দৃষ্টি রেখে ঠায় জেগে বসে ছিল টোডু। একসময় সে চমকে উঠে বসলো। তারপর ঠেলা মেরে জাগাতে লাগল ইমরান আর ইবুকে।
ইমরানরা চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসতেই টোডু উচ্ছ্বসিত স্বরে বললাম, “দেখ, দেখ। বাজাউ লাউতদের রাজকন্যা ফিরে এসেছে। আজ আমি শান্তিতে ঘুমাব। ধন্য তুমি উমবোহ্ দিলাউত, অসীম তোমার করুণা। আজ আমরা মুক্তি পেলাম। মেয়েটাকে নৌকোতে তোল রে তোরা, হাঁ করে দেখছিস কি? স্বয়ং বাজাউ দেবতা সুলভিনকে ফিরিয়ে দিতে এসেছে।”
ইমরান আর ইবু তখন হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছে জলের দিকে। তাদের নৌকোর কাছে জলের মধ্যে মুখটা ওপর দিকে তুলে শব্দ করছে একটা ডলফিন, আর তার পিঠের ওপর অঘোরে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট সুলভিন।
অলঙ্করণঃ মৌসুমী (জয়ঢাকে প্রকাশিত)


