দিনযাপনের জার্নাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দিনযাপনের জার্নাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৪

দিনযাপন (হেমন্ত ২০২৪)


“October, baptize me with leaves! Swaddle me in corduroy and nurse me with split pea soup. October, tuck tiny candy bars in my pockets and carve my smile into a thousand pumpkins. O autumn! O teakettle! O grace!” 


প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি গিয়ে ভাবি, এইবার কি সেই 'অটাম' দেখা হবে? মার্কিনি মুলুক আর কানাডা না হোক, ছবিতে যে দেখে আসছি চিরকাল, সেই গোড়ালি ডোবা পাতার কার্পেটে হেঁটে যাওয়া দিন, সোনালি পাতার রোশনাই, সবুজ হলুদ কমলা লালের হাত ধরাধরি করে শেষ দিনগুলো কাটিয়ে দেওয়া! বিষাদের দিন হয়, আনন্দের! ফিজগেরাল্ড যেমন বলেছেন, লাইফ স্টার্টস অল ওভার এগেন হোয়েন ইন গেটস ক্রিস্প ইন ফল! 

অটাম আর ফল কি এক? মনে হয় না! সত্যি বলতে, প্রতিটা ঋতু যেন সেখানকার নিজস্বতা নিয়ে বেঁচে থাকে! ইউরোপিয়ান সামার্স আর ভারতীয় গ্রীষ্মের কোনও তুলনা টানা যায় না! অটাম আর হেমন্ত কস্মিনকালেও এক নয়! ইংরেজি 'ফল' আর হিন্দি 'পতঝড়' এর ব্যাঞ্জনা শুধু কানে নয়, মনেও অন্যরকম করে বাজে। আসলে, প্রতি বছরই অটাম দেখি ঠিকই, কিন্তু মন ভরে না! মনে হয়, আরেকটু দীর্ঘজীবী হতে পারত এই সোনালি সময়টা! 

বছর কয়েক আগে স্মরণজিত 'হেমন্তের প্রেমপত্র' নামে একটা প্রতিবেদন লিখেছিলেন, সেখানে তিনি লিখেছেন, "দুর্গাঠাকুর ভাসানের পর থেকেই হেমন্তের শুরু। গাছের পাতায় মরচে ধরতে শুরু করে তখন থেকেই। শুরু হয় পাতা ঝরার মরসুম। ব্রোঞ্জের প্রজাপতি এসে জড়ো হয় শহর থেকে গ্রামের পথেঘাটে, মানুষের মনে। নানা বাড়ির আনাচ-কানাচে ও ছাদে জ্বলে ওঠে আকাশপ্রদীপ! একাগ্র সেই আলো যেন অন্য এক পৃথিবীর কাউকে নীরবে বলে, ‘ভুলিনি, আমরা ভুলিনি তোমায়!’

জীবনে হেমন্ত আসার বিশেষ কোনও বয়স আছে বলে আমার মনে হয় না। হেমন্ত মানে বার্ধক্যের দিকে পা বাড়ানোর সূত্রপাত নয়, বরং রংমিলান্তির দিনলিপি হাতবদল করে একটু ভালো করে জীবনকে দেখে নেওয়া! নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া, যেতে সবাইকেই হয়, সেই পার্মানেন্ট 'পতঝড়' সকলের জীবনেই আসে, কিন্তু পাতাঝরার মরসুম আসার আগে, মনের ভিতর আলো জ্বালানোর চেষ্টাটুকু আদৌ করেছি কি? আমাদের মনের আকাশপ্রদীপ কি জ্বলেছে সলতের শেষ বিন্দু অব্দি?

শরতের শেষ বা মাঝামাঝি যাই হোক, মাসখানেক ধরে আমার রুটিন, বিকেলের দিকে কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘন্টা আড়াই তিনের জন্য হাঁটা লাগানো। মাঝেমধ্যে বেশিও হয়ে যায়!
পথও মোটের ওপর এক, কিছুদূর গিয়েই পার্কে ঢুকে পড়ি। প্রাতার নামে পার্ক বটে, আসলে চোদ্দ আনা ফরেস্ট ল্যান্ড। ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়সওয়ারদের জন্য সুঁড়িপথ, আর অসংখ্য পায়ে চলে ট্রেল কাটাকুটি করে গেছে। মাঝে একটা ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা রাস্তা,  সেখানে গাড়ি চলাচল নেই, দুদিকে গাছের সারি, প্যারালালি দুটো কাঁচা রাস্তা৷ অজস্র গাছ দুদিকেই, ঘাসবন, মখমলি মাঠ। অনেকে বড় রাস্তা দিয়ে ছোটে, অনেকে হাঁটে, কেউ কেউ স্কেট করে বা সাইকেল নিয়েও যায়। 

এই পথে গিয়ে পড়লে বোঝা যায়, অটাম কাকে বলে! হলুদের সমারোহ শুধু নয়, এখানে কিছুক্ষণ সময় কাটালে কেউ যেন মনের মধু ঢালে, মুখে একটা মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়, নাকে একটা সুগন্ধি পাকা কমলার সুবাস আসে। রিলকে লিখেছিলেন, "At no other time does the earth let itself be inhaled in one smell, the ripe earth; in a smell that is in no way inferior to the smell of the sea, bitter where it borders on taste, and more honeysweet where you feel it touching the first sounds. Containing depth within itself, darkness, something of the grave almost.'"

নিয়মিত খেয়াল করলে দেখেছি গাছগুলোর সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। শুনতে বোকা বোকা লাগে, কিন্তু এক একটা বিশেষ গাছ দেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকি। গ্রীষ্মের মাঝ থেকেই কিছু কিছু গাছের পাতা শুকিয়ে ঝুরঝুরে হয়ে গেছিল, কিন্তু সেপ্টেম্বর আসতে আসতে তাদের আরেক রাউন্ড নতুন পাতা গজিয়ে গিয়েছে, কচিকলাপাতা রঙ গাঢ় সবুজ হয়ে লেমন ইয়েলো, তারপর ক্রোম ইয়েলো হয়ে উঠছে একটা একটা করে। মাঝে দু চারদিন ভীষণ বৃষ্টি হয়েছিল, ভিয়েনায় বন্যা হয়ে যা তা অবস্থা, তারপর দেখি প্রখর তাপে শুকিয়ে যাওয়া মরাঘাসের ওপর লেবুরঙের অসংখ্য পাতা, দূর্বাঘাস, তার মধ্যে কোথাও কোথাও ঘাসফুল আর মাশরুম ফুটেছে, কালো বাদামি ফুটকি দেওয়া ফড়িং আর অন্যান্য উড়ুক্কু পোকা নাচানাচি করে বেড়ায়। প্রজাপতির কথা ভাবছেন তো? রোমান্টিসাইজ করে ঢুকিয়ে দিলে কেউ বুঝতে পার‍ত না ঠিকই, কিন্তু কেন জানি প্রজাপতি আমার চোখে পড়েনি। বরং অচেনা ছুটকু পাখি দেখেছি মাঝেমধ্যে। 

সেপ্টেম্বর শেষ, অক্টোবর চলছে, দুর্গাপূজা চলে গেল! ভিয়েনার চেনামুখের পুজো আর ভয়ংকরী সব কেরিয়ারিস্টিক প্রশ্নের ভয়ে এইবার আমরা প্রাগে পালিয়ে গিয়েছিলাম। চমৎকার ছিমছাম পুজো। আর উত্তুরে শহরে শীত ভালোই পড়েছে, হেমন্তও পুরোদমে হলুদের পিচকিরি চালাচ্ছে! গায়ে একাধিক লেয়ার গলিয়ে পথেঘাটে চক্কর দিই। আমাদের বন্ধু ক্রিস্টেন প্রাগের মেয়ে, ব্রাজিলে গিয়ে দেখা হয়েছিল। দু বছর পর তার সঙ্গে দেখা, আগের মতোই সুন্দরী আছে, আগের মতোই আন্তরিক। ক্রিস্টেনের বয়ফ্রেন্ড উৎকর্ষ হলদ্বানীর ছেলে, তাদের সঙ্গে আড্ডা করে বেশ হালকা লাগল। আজকাল খুব অল্প লোকের সঙ্গেই কথা বলতে ভালো লাগে। তক্কে জড়াতে ইচ্ছে করে না। কিয়ানু রিভসের মতো আমারও বলতে ইচ্ছে করে, "টু প্লাস টু ফাইভ বলছ? বেশ, তাই হবে।" ক্রিস্টেনদের সঙ্গে আড্ডা মেরে মনে একঝলক বাতাস এসে লাগল।

ক্রিস্টেন এমনিতেই ভীষণ বুদ্ধিমতী মেয়ে, এশিয়ান স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছে  সে আমাদের প্রশ্ন করে ভারতবর্ষ আর সেখানকার জীবন সম্পর্কে জেনে নিতে চায়। বিভিন্ন পার্স্পেক্টিভ পেলে তার সুবিধা হয়। আমি ইনিয়েবিনিয়ে উত্তর দিই। আমাকে ভারতীয় বা বেনারসী বা বাঙালি ইত্যাদি বলে দাগিয়ে দিলে আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি, আমার সেরকম কোনও বিলংগিংই নেই। প্রতিটা দেশে গিয়েই মনে হয়, এ তো আমারই দেশ! প্রাগ আমার নিজের শহর, আর্জেন্টিনায় আমার চিরকালের বাসা, প্যারিস বা আমাজোনিয়ার মানুষকে আমি জন্ম জন্মান্তর ধরে চিনি। কোথাওই নিজেকে 'স্ট্রেঞ্জার' বলে মনে হয় না, কিন্তু তারপর আমি সেখান থেকে চলে আসি, সেই বিলংগিংনেসটাও আমার সঙ্গেই চলে আসে। যে সমস্ত শহরেই দিন কাটিয়েছি, সেই সময়ে সেই শহরগুলো আমার কাছে আপন হয়ে উঠেছে, কিন্তু কয়েক বছর পর সেখানে ফিরে গেলে (বিশেষ করে দেশে) আর আগের শহরটাকে খুঁজে পাই না। তখন আবার নতুন করা সম্পর্ক পাতাতে হয়। মেজাজে একটা উইকেন্ড কাটিয়ে ফের ভিয়েনায় ফিরে এলাম। সেই পাউঁরুটি ডিম আপেল, উল্টোপাল্টা কাজ, সেই কামচালাউ দুপুররাত্রির রান্নার ফাঁকে বই আর সিরিজের চিরাচরিত দিনলিপি। ব্যতিক্রম শুধু ওই হাঁটাটুকু। যাকে বলে, মনের তেষ্টা মেটানো। 

অক্টোবর শেষ হতে হতে সবুজ ঘাসের রঙ সূর্যাস্তের আকাশের মতোই পাল্টে যেতে থাকে। সব অবশ্য নয়, প্রকৃতিতে বৈচিত্র্য চিরকাল বিদ্যমান। একদিকে এক থালা গাছ শুকিয়ে  শাকভাজা, অন্যদিকে নতুন ঝোপে সতেজ পান্নার ছাপ দেখি। তবে কিনা সিজন চেঞ্জের ঢাক বাজছে, বুঝতে কষ্ট হয় না। টাল খাওয়া এক একটা গাছ সবুজ তৃণভূমিতে একা দাঁড়িয়ে শোভিত হয়, তারা একটু একটু করে গা মুচড়ে হলদে কালচে পাতা ফেলতে শুরু করে। চেয়ে চেয়ে দেখি, পায়ের তলায় শুকনো পাতার সঙ্খ্যা বেড়ে চলে, চেনা গাছগুলোর পাতায় রঙ ধরে। এমন কিছু ম্যাজিক সৌন্দর্য নয়! তীব্র নয়, খুব ঢিমে চালে হেমন্ত থুড়ি অটাম আর ফল এসে কড়া নাড়ে এই বনপ্রান্তরে। এক একটা গাছে এক একটা শেড, তা বদলে যেতে তিন চারদিন লাগে। আমরা বুঝি না, আমাদের চোখে সামগ্রিক বদল ছাড়া কিছু ধরা দেয় না। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীরা হয়তো ঠিকই বোঝে! হয়তো আমার মনের ভুল, কিন্তু বুকে হাত রেখে বলছি, গরমকালে যে সমস্ত পোষা কুকুরগুলো লাফঝাঁপ করে নিরন্তর খেলা করে যেত, তাদের দুরন্তপনাতেও একটু একটু করে ভাঁটা পড়েছে। আমি মিলন কুন্দেরা বা হান্স ফালাদা কানে দিয়ে হাঁটি। হলুদের শেড ক্রমে গাঢ় হচ্ছে, পায়ের তলায় ঝরাপাতার আস্তরণ গভীর হয়। জঙ্গল পাতলা হচ্ছে, দূরে মাঝেমধ্যে হরিণের দল দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে দেখা যায়। বাতাসে হিমের ছোঁয়া, টি শার্ট থেকে সোয়েট শার্ট, তারপর একটা জ্যাকেট। রোদ এখনও ভালোই ওঠে, কিন্তু সেই আরামদায়ক উষ্ণতা আর নেই। বেখেয়াল হয়ে চলি, মাঝেমধ্যে ইয়ারপিস খুলে বেঞ্চিতে বসে জিরোই! ছোট ছোট সাজানো হ্রদ... লেক বলাই ঠিক হবে.... হাঁসের দল সাঁতার কাটে। সবুজ জলের পাশে একটা শান্ত পরিবেশ, কেউ কেউ বেঞ্চে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা, কেউ কেউ দেখি ছবি আঁকছে। জলে সবুজের ছায়া পড়ে, হলুদ পাতা পড়ে, সেদিকে তাকিয়ে ঘোর লেগে যায়। আমিও বসে পড়ি ইতিউতি। জিরোই। ব্লুটুথ বন্ধ করে অবান্তর কথা ভাবি!   

অনেকদিন গান শোনা হয় না সেভাবে! বিশাল ভারদ্বাজের কথা আর সুর যে আমার কী প্রিয়! পুরোনো সুর গুনগুন করি! প্রিয় গান গাইতে গিয়ে মনে পড়ে যায়, উর্দু বইগুলো পড়া হয়নি! লখনউতে আমার বন্ধু ফৌজান আন্সারি কি এখনও উর্দুর ক্লাস নেয়? ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে একযুগ ধরে দেখা হয়নি! নিয়ম মেনেই সবাইকে মিস করি! অক্টোবর এর সময়টা আমাদের এই পুজো সেই পুজো ভাইফোঁটা করেই চলে যেত, হেমন্ত ফেমন্ত নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামাইনি। হেমন্তও আমাদের সেভাবে দেখা দেয়নি। কিন্তু অক্টোবারের একটা মাহাত্ম্য থাকেই, বিশেষ করে জীবনের একটা বিশেষ সময়, যখন ছেলেরা বন্ধুদের নিয়েই বেঁচে থাকে। তারপরের গপ্পো সবাই জানে। স্মৃতিচারণেরও হয়তো একটা স্পেসিফিক ঋতু আছে। ঋতু না হোক, মাস তো আছে। অক্টোবর! সুজিত সরকারের সিনেমা হোক বা আমজনতার জীবন, উই আর গ্রেটফুল ফর দিস মান্থ। আকাশের তারা হয়ে যাওয়া মানুষ, হারিয়ে যাওয়া বন্ধু, ফেলে আসা সময়... স্মরণজিতের মতোই মনে মনে বলি, ‘ভুলিনি তোদের বুঝলি! তোদের জন্য, তোমাদের জন্য আর কিচ্ছু করব না জানি। করতে পারব না। কিন্তু তোমাদের মনে রেখে দেব জেনো। ভুলব না কিছুতেই।’


দিন কাটে। হঠাৎ একদিন খেয়াল করি, হলুদ গাছগুলোর পাতা প্রায় অনেকটাই ঝরে গিয়েছে। গাছেদের হাত পা আঙুল ছড়ানো কঙ্কাল দেখা দিচ্ছে, সন্ধ্যে নামার আগে কোনো কোনো কাজে শত শত কাক এসে বসে থাকে। দেখে একটা ভূতুড়ে ছবির দৃশ্য বলে মনে হয়। কমবেশি একই রাস্তায় হাঁটি, একই সময়ে হাঁটি বলে অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়, জার্মান কেতা মেনে আলাপচারিতা হয় না বটে, কিন্তু আমি সবাইকে মনে রাখতে চেষ্টা করি। কেউ দু পায়ে দু রঙের মোজা পরে ছোটে, কেউ চারটে কুকুর নিয়ে হাঁটে। মাঝরাস্তায় গিয়ে আমি একটা বেঞ্চে বসি, তার দুটো বেঞ্চ পরে এক হুডি পরা বয়স্ক মানুষ এসে বই খুলে বসে। আমি প্রায় রোজই উঁকি মেরে নামটা দেখতে চেষ্টা করি, কিন্তু পাই না। বইটা জার্মান এটুকু বুঝতে পেরেছি। জার্মান অনুবাদও হতে পারে। হাঁটতে হাঁটতে একসময় গরমই লাগে একটু একটু। তখন সোয়েটশার্ট খুলে কিছুক্ষণ হাওয়া খাই। সিনামন অ্যান্ড ব্রাউন সুগার... ভিয়েনায় অক্টোবারের হাওয়ায় নাকি দারচিনির গন্ধ ভাসে, মোজার্টের সুর শোনা যায়। লোকজন ইয়াবড় কুমড়ো নিয়ে হ্যালোউইন এর জন্য পরিকল্পনা করছে, অনেকে ক্রিসমাস মার্কেটের জন্য রেডি! এরই মধ্যে ভিয়েনা দারুচিনি দ্বীপ হয়ে গেছে। গোল্ড অ্যান্ড ক্রিস্প... চেস্টনাট রোস্ট করার জন্য কেনার দরকার নেই, চিকু নাশপাতি আপেলের মতো চেস্টনাটও গড়াগড়ি খাচ্ছে। বাতাসে সিনামনের পাশাপাশি কফি আর রোস্টেড চেস্টনাটের গন্ধ ভাসে।

আমি সেসব বুঝি না, ভিজে মাটি আর গাছের গন্ধ পেয়েই আমি খুশি। রঙিন পাতা কুড়িয়ে হাত বুলোই। এক একটা ম্যাপলের পাতায় চার চারটে রঙের শেড। মনে হয় ঝরে পড়া পাতাগুলো সোনায় মুড়ে দিচ্ছে কেউ।

বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা মৌজ করে ছুটোছুটি করছে, দেখলে বেশ ভালোই লাগে। আমাদের তো বেশিরভাগ শহরে একটু হাত পা খেলানোর জায়গাও নেই, ঘাসে ছাওয়া একটা মাঠও পাওয়া যায় না। এরা ভালো আছে! সবুজ হলুদ কমলা পুলওভার পরে কেউ কেউ একদম বনের মধ্যে মিশে যায়, তখন মনে হয় তারাও বনের হরিণ বা কাঠবেড়ালির মতোই। ছুটোছুটি হুড়োহুড়ি করতে করতে কেউ কেউ পড়ে যায়, কিন্তু বেশি কাঁদে না কেউই। আমি দাড়িতে আঙুল বুলিয়ে মাথা ওপরে করে বসে থাকি। গাছের অ্যানাটমির ওপারে নীল আকাশ, পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, মাঝেমধ্যে প্লেনও উড়ে যায়। মাঝেমধ্যে শিরশিরে বাতাস বয়, বাদামি পাতাগুলো বৃষ্টির মতো উড়ে আসে মাটির দিকে। কাপাসের ফুলের মতো খড়কুটো ওড়ে। দেখে সাধ মেটে না। মাঝেমধ্যে ফোটোগ্রাফার হতেও ইচ্ছে করে বটে, কিন্তু আদ্যিকালের এমআই ফোনে প্রায় কোনও রঙই ধরা পরে না। আমি আবার হাঁটা লাগাই।

অন্ধকার নামার ঠিক আগে বনবীথিকার মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে দূরে চেয়ে দেখি, গাছের মাথা, পাতা আর আকাশের রঙ মিলে একটা সোনালি কুয়াশার আদল তৈরি হয়েছে দূরে! ধীরে ধীরে আলো কমে আসে, সেই বাষ্পীভূত কুয়াশা এসে ঘিরে ধরে আমাদের। কেটলির ভাপের মতো সোনালি কুয়াশা পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলি। 

দিন কাটে। যেমন কাটার কথা...








সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৪

দিনযাপন (বসন্ত ২০২৪) -৩


নতুন বছরের আসে, চলেও যায়। এতই তাড়াতাড়ি চলে যায়, যে বছরটা যে আদৌ এসেছিল কিনা, সেই নিয়েই মাঝেমধ্যে সন্দেহ হয় আমার। যাই হোক, নতুন বছর আসছে, আজকাল এই কথাটা দু একদিন আগে কেউ না কেউ আমাকে মনে করিয়ে দেয় বলে জানতে পারি। আগে ভাবতাম, যাহ, আরেকটা বছর জলে গেল! 

এখন ভাবনা বা দুর্ভাবনা কিছুই হয় না, শুধু মনে হয়, অ, নতুন বছর এসে গেছে! শারদীয় আনন্দমেলার বিজ্ঞাপন এল বলে!

তা আমি নতুন বছরের উইকেন্ড কী করে কাটালাম! শনিবার দেখলাম, কাউচসার্ফিং এর ছেলেমেয়েরা সিটি হাইক করছে, তিন নম্বর রুট শহরের একপ্রান্ত থেকে শুরু হয়ে বন জঙ্গল পাহাড়পর্বত চড়াই-উৎরাই  দিগন্তজোড়া সবুজ বিস্তারের ভিউপয়েন্ট দেখিয়ে আবার সেই একই জায়গায় ফিরে আসবে, ম্যাপ অনুয়ায়ী আট নয় কিলোমিটার পথ। একটা থেকে ছটা, চড়াইয়ের পর অবশ্য রেস্টপয়েন্টও পাওয়া যাবে! চললুম দুজনে কোমর বেঁধে। অনেকেই এসেছে। এদেশীয় মানুষ, এদেশীয় কেন, ইউরোপ আমেরিকার অধিকাংশ মানুষের জীবনেই আউটডোর অ্যাক্টিভিটিটা একটা বাধ্যতামূলক ব্যাপার, ঘরে বসে থাকা এদের স্বভাবেই নেই। কেউ ছুটছে, কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, কেউ কায়াক নিয়ে নদীতে নেমে পড়ছে, শীত পড়লে স্কি করতে  চলল, গরম পড়লে সাঁতার কাটতে নামল... অনেকটা বাঙালির চৈত্র সেলে গিয়ে বইপত্র জামা জুতো কেনার মতোই ব্যাপার। হাইকিং তো বারোমাসই চলছে, আর হাইকিং ট্রেলও বানিয়েছে বটে! গোটা ইউরোপ জুড়ে হাঁটতে থাকো সারাজীবন, শেষ হবে না। যাই হোক, এই যাত্রায় বেশ কয়েকজন চমৎকার বন্ধু হল। ফিনল্যান্ডের এক ছেলে এসেছে, সে পাখিপাগল, টিটি পাখির ডাক শুনে পাখির বাপ ঠাকুরদার নামও বলে দিতে পারে। আর একটা ছেলে অ্যালেক্স, তাকে দেখতে গ্যারি ওল্ডম্যানের মতো, সে স্কেটিং আর সাইকেল নিয়ে পড়ে থাকে। ইউনিভার্সিটি থেকেও একটা দল এসে যোগ দিয়েছে, অঙ্কুশ বলে একটা ঢাকার ছেলের সঙ্গে পরিচয় হল, টেলিকম নিয়ে পড়ছে, চরকির সিনেমার কথা বলতে বলল সিনেমা নিয়ে ইন্টারেস্ট নেই, বই পড়ে মাঝেমাঝে। আমি ফুলে ফুচকা হয়ে জিগোলাম কী পড়েছে শেষ? তাতে সে বলল মানিক বন্দোপাধ্যায় আর হুমায়ুন আহমেদ, নতুনদের লেখা বিশেষ পোষায় না! হুমম!

মরিয়ম বলে একটা আরবের মেয়েও চলেছে, তাকে দুজন মিলে ক্রমাগত হাবিবি হাবিবি করে ভেঙাচ্ছে, মেয়েটাও ব্যাপারটা বেশ এনজয় করছে মনে হল। আরেক ভারতীয় ছেলে ছিল, নাম নরেশ, থাকে কোপেনহেগেনে। প্রায় কুড়ি পঁচিশজন ছেলেমেয়ে, সবাইকে একাট্টা করে নিয়ে চলেছে আমাদের লিডার মার্টিন, সে ব্যাটা ভিয়েনার সিএস অ্যাম্বাসাডর, প্রতি সপ্তাহে লুক চেঞ্জ করে ফেলে। এই সপ্তাহে একটা গাব্দা গোঁফ রেখেছে।

তবে সবচেয়ে ভালো লাগল, এই হাইকে একটা অন্ধ ছেলেও ছিল, মূলত পলিশ, চড়াই-উতরাই গোটা রাস্তাটাই অ্যালেক্সের হাত ধরে চলল সে, বাড়তি কোনও সাহায্য চাইল না, কেউ আগ বাড়িয়ে বাড়তি সাহায্য করার কথা ভাবলও না। ছেলেটা একবারে লেভেলের ইন্টেলিজেন্ট, কথাবার্তা শুনে যা বুঝলাম, তাতে মনে হল ভাষাবিজ্ঞান থেকে টেকনলজি, সব কিছুতেই সে বাকিদের টেক্কা দিতে পারে। বাদাম চিবুতে চিবুতে মনে হল, ছুটির দিনগুলো এইভাবে হাইল করলে মন্দ হত না! ব্যাঙ্গালোরে থাকতে যত ফালতু লেখালিখি করে সময় নষ্ট করেছি, ওসব মিডিওকার লেখা লেখার চেয়ে শনিবার রবিবার ট্রেক করলে হত! অবশ্য ট্রাফিকের জ্বালায় বাইরে বেরোতে ভয় হত, সে কথাও সত্যি।

ঝকঝকে রোদ উঠেছিল, চমৎকার আবহাওয়া, চার পাঁচ ঘণ্টা গল্পগুজব করে হাঁটতে হাঁটতেই কেটে গেল, মাঝে একটা খোলা মাঠে ঘাসের ওপর বসে খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়া হল। ছ'টা নাগাদ ফিরে দেখি, গা অব্দি ঘামেনি।  নববর্ষ উৎসব হোক না হোক, অন্যান্য উৎসব চলতেই থাকে এ শহরে। ফ্লি মার্কেট, আর্ট এক্সিবিশন, সিনেমা... ফেরার সময়ে দেখি বালকান ফুড ফেস্টিভ্যাল চলছে। হুড়ুমদুড়ুম গান, বিয়ারের ফোয়ারা, মাংস গ্রিল হওয়ার গন্ধে মাথা গরম হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়! এসব জায়গায় গিয়ে আমি পিপল ওয়াচিং করি! জনজোয়ার, ঠিক হুজুগে বাঙালির মতোই মেলাত গিয়ে বেশি দাম দিয়ে রোল চাউমিন খাওয়ার লোক, এখানে দুরুম পরোটা আলুভাজা খায় আর কি! আর আইসক্রিম। আইসক্রিম না খেলে বলে বসন্ত পালন হয়  না, এমন পাপ করলে ঠাকুর গোঁসা হয়। আমি এদিকে ঘাসের জাজিমে বসে বসে লোকজনকে দেখে যাই। কোন ছোঁড়া দুষ্টুমি করছে, কোন জুটি নতুন প্রেমে পড়েছে, কোন ছেলে একমনে আলুভাজা খাচ্ছে বা সাইকেল চালাচ্ছে, মাঝেমধ্যে ব্র‍্যাড পিট বা জেনিফার কনেলিরও দেখা পাওয়া যায়। একা বসে আছে। তখন মনে হয়, ধুস, বছর পনেরো আগে হলে আমি নিজেই একটা বিফোর দ্য সানরাইজ বানিয়ে ফেলতে পারতাম। 

রবিবার আমাদের বাঁধা প্রোগ্রাম। গুরুদ্বারা গিয়ে ভুরিভোজ। সেখানেও অবশ্যি পিপল ওয়াচিং কম হয় না। তবে মাঝেমধ্যে খানিক ডিটোর নিয়ে টুলিপ গার্ডেন বা বার্ড পার্কে ঢুকে পড়ি। গত সপ্তাহে একটা প্রকাণ্ড গ্লাসহাউজে ঢুকে পড়েছিলাম না জেনেই। গিয়ে দেখি, কৃত্তিমভাবে ট্রপিকাল ক্লাইমেট তৈরি করে রেখেছে। ৩৫ ডিগ্রি গরম, ক্রান্তীয় এলাকার গাছপালা, ফুল, নানারকম পাখি, গিরগিটি, ফড়িং নাচানাচি করছে। এত পাখি দেখে এমন লাফালাফি করলাম, ভুলেই গেছি যে অন্য বাচ্চারাও সেখানে ঘুরতে এসেছে। তাদের অনেকেই আমাদের দেখে ভুরু কুঁচকে ভাবছে, আদেখলাপনা দেখো! শালোরা আগে কোনোদিন পাখি দেখেনি! কে বোঝাবে, সত্ত্যিই তো দেখিনি! দেখি না! কোথায় পাখি? কাক চড়ুই পায়রা বাদে বিশেষ কিছু চোখে পড়ত না দেশে থাকতে, কেরলে প্রথম লেজ ঝোলা পাখি দেখতে গিয়ে আমি প্রায় খাদে পড়ে যাচ্ছিলাম। এই সব করে দিন কাটাতে কাটাতে মনে হয়, মন্দ কি! নতুন বছর ভালোই তো কাটল! তারপর এ-ও মনে হল, শুভনন্দন কথাটা তো শুনতে ভালোই!

















 

মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০২৪

দিনযাপন (বসন্ত ২০২৪)- ২

 


#দিনযাপন

প্রতিবছর এপ্রিল এলেই আমার মনে রাজ্যের ভুলভাল কথা এসে ভিড় করে। বসন্তের রংমিলান্তি সোনারোদ আর ঝকঝকে নীল আকাশ, এরই মাঝে হুট করে এক একদিন মনখারাপের মেঘ উড়ে এসে জুড়ে বসে। বিকেলে হাঁটতে গিয়ে পুষ্পবিলাসী বাতাস গায়ে লাগে, পশমিনা ঘাসের গালচেতে পিকনিক করতে করতে বল খেলে অল্পবয়সীরা, ভ্যানিলা-চকোলেট স্কুপ হাতে এশিয়ান তরুণীরা হেঁটে যায়, তখন সেদিকে চেয়ে শুধু মনে হয়, জাপানে এখন চেরি ব্লসমের মরসুম৷ সাকুরা স্প্রিংগস। আরো একটা বছর কেটে গেল, জাপান যাওয়া হল না। কেন জানি বারবার 'ইন দ্য মুড ফর লাভ'-এর আবহসঙ্গীতটা কানে বেজে যায়।  

ভিয়েনায়, এপ্রিলের সময় কেউ মুখভার করে থাকে না। অস্ট্রিয়া কস্মিনকালেও জার্মানি নয়, এখানে শীতকালেও ফুটফুটে রোদ্দুর ওঠে। একের পর এক পাবলিক ইভেন্ট, মেলা, অনুষ্ঠান চলতেই থাকে। কথায় আছে, ইন ইউরোপ, হ্যাপিনেস স্টপস অ্যাট ভিয়েনা। তবুও, প্রতিটা সুখের সঙ্গে আইসিং সুগারে মতো কিছুটা বিষাদ লেগে থাকে ঠিকই। 

In her eyes, the sadness sings—of one who was destined, for better things.

হাঁটা ছাড়া আমার বিশেষ কোনও কাজ নেই বাইরে এলে। তাই হাঁটতে থাকি। দশ মিনিট হোক বা দু ঘন্টা, ওইটুকু সময়ের মধ্যেই চোখ আর মনের কসরত হয়। এক একটা চেরি গাছ (ফুলে বোঝাই হলে কি ভরন্ত গাছ বলা যায়?) সেদিকে তাকালে আর সত্যি সত্যিই চোখ ফেরানো যায় না, বোকার মতো গোলাপি ফুল দেখে যাই... বা বীথি চট্টোপাধ্যায়ের মতো করে বলা যায়...

'গোলাপি ফুল, সবুজ পাতা, সদ্যোজাত কমলা জবা, ম্যাগনেলিয়ায়

অল্প আলো চুঁইয়ে পড়ছে, একটু ঠান্ডা হাওয়া

পাঁচিলের ওপর মাধবীলতা, চোখ বুজে যায়'... 

কিন্তু এরই মধ্যে মনে পড়ে যায়, কিছু পাওয়া হয়নি, সঙ্গে কিছু হারিয়েও এসেছি। যে এপ্রিলগুলো ফেলে এসেছি, সে আর ফিরে আসবে না। শুধু আমার জন্য নয়, কারো জন্যই সেই সময়টা আর বসে নেই। 

ছোটবেলায় আমার এপ্রিল মাসটা ছিল ছুটির প্রথম মাস। জীবনের অনেক কিছু আমি এপ্রিল মাসের ছুটিতেই আবিষ্কার করেছি। সন্তু কাকাবাবু থেকে হ্যারি পটার, ক্রিকেট ফিল্ড থেকে সাঁতার, নতুন অভিজ্ঞতার জন্য স্কুল ছুটির পর এই মাসটাই উইশিলিস্ট করা হিসেবের খাতায় ধরা থাকত। রোদের তাপ সে সময় এপ্রিল মাসে এত চড়া হত না, দশ বা পনেরো এপ্রিল অব্দি ছাদে গিয়ে দিন কাটানো আমাদের দিনলিপির মধ্যেই পড়ত। 

সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়তে আবিষ্কার করলাম, বা উপলব্ধি হল বলা যায় যে, বেনারসে থাকাকালীন আমার জীবনের এক তৃতীয়াংশ সময় মনে হয় ছাদেই কেটেছে। ছাদ নিয়ে এত অভিজ্ঞতা জমে আছে যে 'আমার ছাদ জীবন' বলে একটা পাণ্ডুলিপি হয়ে যায়। শুধু আমিই কেন, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত বা তারপরও অনেকের কাছে সোশালাইজিং এর প্রধান জায়গাই ছিল ছাদ, এখন এই প্র্যাক্টিস আগের চেয়ে অনেক কমে এলেও লুপ্ত হয়ে যায়নি। 

সরু গলির মধ্যে বাড়ি, উঠোন ফুঠোন বা লাগোয়া রকের বালাই নেই, শীত গ্রীষ্ম বর্ষা আমরা ছাদেই কাটিয়ে দিতাম। গরম পড়লে তো রাতেও ছাদেই শোয়া হত, কারণ লোডশেডিং হওয়া ছিল অবধারিত। মাদুর কাঁথা চাদর নিয়ে সন্ধ্যার পরেই সবাই ছাদে চলে যেত, তার আগে বালতি বালতি জল ফেলে ঠান্ডা করা হত ছাদটা। রাতে শুয়ে শুয়ে চশমাবিহীন চোখে তারাদের দিকে তাকিয়ে থাকা আর মাঝেমধ্যেই শব্দ হলে ধড়ফড় করে উঠে বসা! মুঁহনোচওয়া এল নাকি? (যাঁরা মুঁহনোচওয়ার কথা জানেন না, গুগল বাবার শরনাপন্ন হোন। এই অদ্ভুত জীব বাঁদর ভূত এলিয়েন একসময় অর্ধেক উত্তর ভারতের মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল) 

মার্চ এপ্রিল অব্দি পেয়ারা লেবু মাখা নিয়ে খাওয়াদাওয়ার পর ছাদেই গুলতুনি চলত, ব্যাটবল নিয়ে মাঝেমধ্যে আমাদের ছাদ থেকেই অন্যদের ছাদেও চলে যেতাম। এপ্রিল মাসে পাড়াপড়শিদের ছেলেদেরও স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, সবাই মিলে জমে যেত ম্যাচ। তবে মুশকিল হল, বল প্রায়ই চলে যেত অন্যদের ছাদে। তখন এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে ঝুঁকি নিয়ে কার্নিশ বেয়ে যেতে হত, কাজটায় আমার প্রবল উৎসাহ ছিল সন্দেহ নেই। ছাদে বড়ি আর পাঁপর দেওয়া হয়েছে, আচার মজছে,  কাপড় শোকাচ্ছে, বাঁদরের উৎপাত আছে বলে আমরা অনেকেই একটা ইয়া বড় ডান্ডা নিয়ে ঘুরতাম। (যদিও বাঁদর মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এলে সেই অস্ত্র কোনও কাজেই লাগত না)। রোদ চড়া হলে সেই ডান্ডা বা লাঠি ছাদের কোণে পাঁচিলের ওপর রেখে একটা চাদর নিয়ে ঢেকে দিব্যি একটা তাঁবু টাইপস ঘর করতাম, সেখানে মাদুর বিছিয়ে বই পড়ার মজাই ছিল আলাদা। মাঝেমধ্যে বিস্কুট গুঁড়ো করে পায়েস বানিয়ে সেখানে বসে খেয়েছি, সেই স্মৃতি এখনও আমার উবে যায়নি। বাবা জেঠু বা অন্যরা খবরের কাগজ নিয়ে বসত ছুটির দিনে, মাঝেমধ্যে দেশোদ্ধারও চলত রাজনীতিক বিশ্লেষণ সহ। 

এরই মধ্যে আবিষ্কার করতাম, ছাদের ওপর লাগানো লোহার জালতির ওপারে, কোণার এক মুঠো মাটিতে গজিয়ে ওঠা নয়নতারার গাছে কুঁড়ি থেকে নতুন ফুল আসছে। বসন্ত পঞ্চমী কেটে গেছে দেড় মাস আগেই, কিন্তু বসন্ত এখনও তল্পিতল্পা গুটিয়ে বিদায় নেয়নি আমাদের জীবন থেকে। সেই বসন্তে কোনও চেরিফুল ছিল না, কিন্তু চড়ুইপাখি ছিল। তারা এসে ছাদে বসত, চাল আর জল খেত। বাসা করত একতলার ঘুলঘুলিতে, বারান্দার টঙে। শত গরম লাগলেও তখন বিকেলের পর পাখা চালাতাম না আমরা, ঘরে ফিরে আসার সময় যদি পাখার ধাক্কা খেয়ে মরে যায় চড়ুইগুলো? সেই বসন্তে ফড়িং ছিল, যাদের আমি ভীষণভাবে উত্যক্ত করেছি। এমনকি, প্রজাপতিও ছিল। ভাবলে অবাক হতে হয়, কিন্তু কংক্রিটের সেই ভিড়েও প্রজাপতিরা আমাদের দেখা দিতে এসেছে সেই সব বসন্তে। খুব বেশি সময় তো কাটেনি, কিন্তু সব কিছুই আমূল বদলে গেছে মনে হয়।

এখনকার ছেলেমেয়েরা কি প্রজাপতি আর ফড়িং নিয়ে ভাবে, চড়ুইপাখির বাসা নিয়ে চিন্তা করে? তারা কি জানে, বসন্ত বলে একটা ঋতু আছে?  সত্যিই আছে, বইয়ের পাতার বাইরেও?

এইসব হাবিজাবি ভাবি আর হাঁটি। স্ট্রাউসের প্রতিমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কালীঠাকুর মনে আসে, এপ্রিলের স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে সেপ্টেম্বরে চলে যাই। তারপর গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে আবার পা চালাই, মনে মনে ভাবি, একদিন শালা জাপান যাবই। ফের কিছুক্ষণ পর গাছ আর ফুল দেখে আনমনা হয়ে যাওয়া... এই করেই চলে। প্রতিদিনের বেত্তান্ত। মাঝেমধ্যে ছবি তোলার চেষ্টাও হয়, কিন্তু স্মার্টফোনে কিছুই ভালো করে ধরা যায় না। তখন মনে হয়, ধুরছাই, পিংকি রঙের স্টিল ক্যামেরাটাই ভালো ছিল। কোথায় যে হারিয়েছে, সে আর কিছুতেই খুঁজে পাওয়া গেল না।

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০২৪

দিনযাপন (বসন্ত ২০২৪)

 


দিন কাটে, যেমন আগেও কাটত। সে নিয়ে আর আলাদা করে লেখার কী মানে আছে? তবুও মাঝেমধ্যে লিখি, কারণ আদতে কোনও কিছুরই তো কোনও মানে নেই।
মার্চ মাস শেষের দিকে, শীত প্রায় পায়ে জুতো গলিয়ে বসে পাইপ টানছে, কিন্তু যাব যাব করেও টিপিকাল অস্ট্রিয়ান বুড়োর মতোই রকিং চেয়ার ছেড়ে নড়ছে না। যদিও মার্চ মাস আসতে আসতে তাঁর সম্মান গেছে কমে, বসন্তের হাওয়া আর তাকে পরোয়া করছে না। জাপানে চেরি স্প্রিং বা সাকুরার মরসুম, জাপানিজ চেরি ফুলের নাকি যত্নআত্তি লাগে গেইশাদের মতোই, সময়ের আগে পরে গেলে তাদের দেখা পাওয়া ভার, কিন্তু ভিয়েনার ম্যাগনোলিয়া জার্মানদের মতোই বুক চিতিয়ে আসে, পারদ দশ ডিগ্রি নামল বা চড়ল, তাতে তাদের কিচ্ছু আসে যায় না। ফেব্রিয়ারি থেকেই শহরভর্তি গোলাপি সফেদ ফুলের মেলা, তাদের সঙ্গ দিতে ওয়াইল্ড গার্লিক আর বেগুনি ঘাসফুলও মাঠে নেমে পড়েছে। দু একদিন মেঘলা করলেও এমনিতে ঝকঝকে রোদ উঠছে আর আমি ডিক্যাথেলনের ফ্লিস আর জ্যাকেট গলিয়ে দুপুরবেলা হাঁটতে বেরিয়ে পড়ছি। মার্চ মাস এলেই আমার মাথায় মাঝেমধ্যে এমিলি ডিকিনসনের 'ডিয়ার মার্চ' কবিতাটা ঘোরে, যদিও কবিতার লাইনগুলো আমার আর ঠিক করে মনে থাকে না। গুগলই ভরসা!
Dear March—Come in—
How glad I am—
I hoped for you before—
Put down your Hat—
You must have walked—
How out of Breath you are—
Dear March, how are you, and the Rest—
Did you leave Nature well—
Oh March, Come right upstairs with me—
I have so much to tell—
I got your Letter, and the Birds—
The Maples never knew that you were coming—
I declare - how Red their Faces grew—
But March, forgive me—
And all those Hills you left for me to Hue—
There was no Purple suitable—
You took it all with you—
কিছুদূর এগিয়ে মেট্রো স্টেশন পেরিয়েই নিঝুম সব পাড়া, সেখানে শান্তিনিকেতনী বসন্ত উৎসব চলছে বললে বাড়াবাড়ি হবে না। সবুজ মখমলের মতো ওয়াকিং ওয়ে, ছিমছাম সব বাড়ি, টেরেস সংলগ্ন রুফ গার্ডেনে টুলিপের টব, পুষ্পলতা আড়াল করে থাকে পুরোনো গির্জা বা কোঅপারেটিং হাউসিংয়ের বাড়িগুলো, রোদ ঝলমলে প্যাটিওতে বসে থাকে আদুরে বেড়াল, কোঁচকানো চামড়ায় রোদ লাগায় সাবেকি বুড়োরা, কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চারা পার্কে ছুটোছুটি করে।
আমি দেখতে দেখতে হাঁটি। শীত শীত লাগলে জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢোকাই বটে, কিন্তু ভুলেও দস্তানা পরি না এদেশিয়দের মতো। সাইকেল বা ইলেক্ট্রিক বাইক নিয়ে ছেলেমেয়েরা পাশ কাটিয়ে যায়, তারা কিন্তু অনেকেই গ্লাভস পরে থাকে। মাঝেমাঝে এক একটা গাছ একেবারে ফুলে ভর্তি, ফুলের ভারে নুয়ে পড়ে প্রায়, আর লাগোয়া কোর্টইয়ার্ডগুলোয় অনবরত শোনা যায় পাখির গান। আমি জন্মকানা, কাক ছাড়া কোনও পাখিই সাধারণত আমার চোখে ধরা দেয় না, কিন্তু সেই দুঃখ পোষাতে আমি গাছ দেখে যাই। গাছের পর গাছ, ন্যাড়া, পত্রহীন। কিন্তু এই শীতেই আমার চোখে তাদের আসল রূপ ধরা পড়ে, প্রতিটা কঙ্কালকায় বৃক্ষ ও তাদের শাখাপ্রশাখার প্রসারিত ভুতুড়ে আঙুল ও শুষ্ক রোমের আড়ালে বোঝা যায় তাদের সত্যিকারের স্বভাব, দেখা মেলে তাদের আত্মার। কখনও বা মনে হয়, হাজার হাজার গাছের মধ্যে একজনের সঙ্গেও অন্যজনের মিল নেই, আর কার সাধ্যি এই অ্যানাটমির বিশ্লেষণ করে? এই সব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে যায় উইম ওয়েন্ডার্স পরিচালিত 'পার্ফেক্ট ডেজ'-এর সেই দৃশ্য, যেখানে ছবির নায়ক প্রতিদিন কাজের ফাঁকে লাঞ্চ করতে গিয়ে একটা পার্কে গিয়ে বসে আর একটা গাছের ছবি তোলে। একটাই গাছ, তার ছবি সে সারাজীবন ধরে তুলছে। প্রতি সপ্তাহে তোলা ছবিগুলো প্রিন্ট করে সে বাড়ি নিয়ে আসে, ভালো ছবিগুলো রেখে দেয় বাক্সে যত্ন করে, আলোয় ঝলসে যাওয়া ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলে। তার একচিলতে ঘরে শয়ে শয়ে ছবি, একই গাছের। এক, কিন্তু এক নয়! আমাদের বোধবুদ্ধির আড়ালে সব কিছুই বয়ে যায়, বদলে যায়, আমাদের চোখে পড়ে না।
মাঝেমধ্যে রোদ ভালো থাকলে আমি কিন্ডারগার্টেন লাগোয়া পার্কে বসে থাকি, ভাবি এইবছর কোথায় ঘুরতে যাব? গতবছর বাল্টিকস আর ইস্টার্ন ব্লকের দেশগুলো প্রায় দেখে নেওয়া হয়েছে, যুদ্ধ চলছে বলে ইউক্রেনে যাওয়া হল না! এইবছর কি বাকিগুলোয় যাওয়ার সুযোগ হবে? স্কুলের দেওয়ালে রঙিন ছবি আঁকা হয়েছে নতুন করে, সেখানে একটা মস্ত বড় জিরাফ না জেব্রা কী যেন আছে। সেই জিরাফের সামনে কচিকাঁচাদের দল হুড়োহুড়ি করে, সেদিকে চোখ চলে যায় বারবার। এরকম ভুলভাল ভাবতে ভাবতেই আবার ওঠা হয়, ফেরার সময় টম্যাটো শশা ইত্যাদি কেনার থাকে মাঝেমধ্যে। প্রায় দেড় মাস বাড়িতে থাকার সময় রান্নাবান্না করতে হয়নি, তাতে আরাম হয়েছে বটে, কিন্তু স্বস্তি মেলেনি। কামচালাউ রান্নাবান্না করার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন সুখানুভূতি আছে হয়তো, যদিও রোজ রোজ রান্না করলে সেটা বোঝা যায় না। কিনোয়া সেদ্ধ করব না রাতে আলু কপি ভেজে নেব ভাবতে ভাবতে হাঁটি, হলদে সাদা ফুল মাড়িয়ে এগোই। কুকুরকে হাঁটাতে নিয়ে বেরোনো বৃদ্ধার সঙ্গে নরম হাসি বিনিময় করে, গাছের সারি পিছনে রেখে, সবুজ বাগান ডাইনে রেখে, কানে হাওয়া লাগিয়ে, বসন্তের লাবণ্যকে বুকে রেখে হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, ভালোই তো আছি। আনন্দেই আছি বলা যায়! বসন্তের রোদ্দুর পিঠে নিয়ে হাঁটতে পারছি, এমন অঢেল সবুজে চোখ রাখতে পারছি, চশমার পাওয়ার বাড়লেও দৃষ্টিশক্তি কমে যায়নি, মেঘেদের আঁকিবুকি দেখছি, পাখিদের ডাক কানে আসছে...দেখার বাসনাটা এখনও বজায় আছে বইকি! হোয়্যাট ইফ দিস লাইফ ফুল অফ কেয়ার, উই হ্যাভ নো টাইম টু স্ট্যান্ড অ্যান্ড স্টেয়ার!
আর কীই বা চাই সুখী হতে! এরকম করে কয়েক বছর কাটিয়ে দিতে পারলেই চুকে যায়!
এরকম করেই কাটে! দিন চলে যায়...

রবিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৩

দিনযাপন -বসন্ত ২০২৩

 


দিন কেটে যায়...

দেশ থেকে ফিরে প্রায় দেড় মাস হতে চলল। মাঝে শীত কমেছিল, সোনালি রোদের উত্তাপ বসন্তের আভাস নিয়ে এসেছিল, রঙবেরঙের টুলিপের কুঁড়ি আর সতেজ সবুজ পাতার ওপর চোখ বুলিয়ে দিন গুজরান করছিলাম বেশ। ভিয়েনা পার্কের শহর, শহরে রাস্তাঘাটের চেয়ে গ্রিন স্পেস ঢের বেশি, প্রতিবার ম্যাপ দেখে এক একটা নতুন পার্ক আবিষ্কার করি, তারপর সেখানে গিয়ে উপস্থিত হই। পার্ক বলতে সারাজীবন আমি স্লিপ আর দোলনা লাগানো ঘাসহীন খালি জমি দেখে এসেছি, বড়জোর ব্যাঙ্গালোরের জগার্স পার্ক, সেখানে ইউরোপের পার্কগুলো আমার স্বভাব খারাপ করে দিচ্ছে। শেষ আর হয় না। মাইলের পর মাইল সবুজের বিস্তার, বসন্তের অধীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা পত্রহীন গাছের অদ্ভুত শরীরগুলো আঙুল বাড়িয়ে মেঘ ছুঁতে চাইছে, অজানা লেজঝোলা পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে, হরেকরকম ঘাসফুল আর টলটলে দীঘিকে সঙ্গে নিয়ে উঁচুনিচু জমি তেপান্তরের মাঠের মতো খেলে বেড়াচ্ছে, আমরা কাঠবিড়ালির মতো সেখানে দাপাদাপি করছি। ইস্টারের ছুটি, বাতাসে একটা মন ভালো করা আমেজ, সূর্য অস্ত যেতে যেতে সাড়ে আটটা, ফলে আঠ থেকে আশি সবাই মনের আনন্দে কমলালেবু রোদ গায়ে মেখে ঘুরতে বেরোয়। আমরাও এই দলে শামিল হয়েছি। দুপুরবেলায় রোদ পিঠে নিয়ে ট্রামে চড়ে বসি, এক একটা পার্কে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করি। ম্যাগনেলিয়ায় বোঝাই হয়ে থাকে গাছগুলো, এক একটার এক এক রকমের বাহার। গোলাপি, লাল, সাদা তো আছেই, বাদামি সাদা সরভাজা রঙের একটা ফুল দেখে আমি নাম দিয়েছিলাম রাবড়ি ফুল। কিন্তু যে ফুলটা দেখে আমি প্রেমে পড়েছি, সেটা একটা পুঁচকে ফুল। পাঁচটা করে পাঁপড়ি, তিনটে সাদা, দুটো বেগুনি। মাঝখানে সূর্য আঁকা হলুদ কালো ড্রয়িং। বাকি তিনটে পাঁপড়িতেও বেগুনির ছাপ আছে। ফুল বড় হলে সবগুলোই বেগুনি হয়ে যায়, সে যে কী সুন্দর লাগে! নেট ঘেঁটে দেখলাম ফুলের নাম প্যান্সি। কী কাণ্ড! নাম জানি, ফুল চিনি না। এই আমাদের অবস্থা। পাখি, ফুল, ফল কিছুই চিনি না, খালি বার বার অবাক হয়ে যাই। বিস্ময় আর যায় না! হাঁ করে তাকিয়ে থাকি, প্যান্সিরাও চোখ টিপে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে। এদিকে আকাশে তখন মেঘের নৌকা পাড়ি দিয়েছে। রোদ আর ছায়ার সঙ্গে আপস করে মেঘের দল এগিয়ে চলে, সে দেখে আবার বেজায় অবাক হয়ে তাকাই। মুখে অবশ্য ভাব করি কিছুই কেয়ার করছি না, নির্লিপ্তির আড়ালে এদিকে আমার মনে নেরুদার 'মার্চ ডেজ কাম উইথ দেয়ার কোভার্ট লাইট' উঁকি মেরে যায়। 

মার্চের দিনগুলি ফিরেছে তাদের গোপন আলো নিয়ে

আর বিশাল এক মাছ সাঁতার কেটে যায় আকাশপথ দিয়ে...

তারপর একদিন বসন্তবিলাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আচমকা হুট করে আল্পসে তুষারপাত হল আর টুলিপরোদ উবে গিয়ে ফিরে এল শীত। দামাল হাওয়ার দুষ্টুমি আর বৃষ্টির বদমায়েশি নিয়ে আমার অভিযোগ নেই, কিন্তু তাপমাত্রা নেমে গিয়েছে বলে বৈকালিক ভ্রমণে ছেদ পড়ল। ফায়ারপ্লেস রাত আর স্টেক ডিনারের বালাই নেই, ফলে মুড়ি চানাচুর খেতে খেতে নেটফ্লিক্স দেখা আর অপেক্ষা করা, কবে শীত যায়! শীত গেল না, কিন্তু গরম পড়ে গেল কলকাতায়। আকাশের মুখ ভার, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একের পর এক খারাপ খবর আসতে লাগল। 

আত্মীয়স্বজনদের শরীর খারাপ, বন্ধুবান্ধবদের ডিপ্রেশন, সম্পর্ক বিচ্ছেদ, মামলা মোকদ্দমা, মৃত্যুসংবাদ। শুনি। কিছু করার নেই, কোভিডের পর মনের অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। মনে পড়ে যায়, দু বছর আগের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কথা। একের পর এক কাছের মানুষকে হারিয়েছিলাম আমরা সবাই,  তখনও করার কিছু ছিল না। দু বছর, এরই মধ্যে সব নিজের জায়গায় ফিরে গিয়েছে, কিন্তু আমাদের বদলে দিয়ে গেছে। বিচ্ছেদ আর বিদায় এখন অনেক স্বাভাবিকভাবে ধরা দেয়, কিন্তু এই নীরব আঘাতের অভিঘাত হয় অনেক বেশি। দিন কয়েক আগে উজ্জ্বলদা, উজ্জ্বল সিংহ মারা গেলেন। বছর আটেক আগে কলকাতা টু ব্যাঙ্গালোর ট্রেন জার্নিতে উজ্জ্বলদা ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ, সেই তিরিশ ঘণ্টার আলাপের পরও আমাদের মনে রেখে দিয়েছিলেন দুজনে।  আমরাও তাদের আন্তরিক ব্যবহার ভুলে যাইনি। এমন হাসিখুশি, সদালাপী, বিদ্বান ব্যক্তি, কবি, অনুবাদক, সম্পাদক...সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন, কত বই লিখেছেন, স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছিলেন শুধুমাত্র নিজের মনে পড়াশোনা করবেন বলে, গত বছর স্ত্রীর চলে যাওয়ার পর একা হয়ে গিয়েছিলেন, এবার নিজেও পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন। শুনলাম। বুকে একটা কাঁটা বিঁধে রইল। উজ্জ্বলদার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একটা ফোনও করিনি, করেও বা কী বলতাম! মনখারাপ আসে, চলেও যায়। কয়েকজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক মারা গেলেন, তরুণ কবিদের চলে যাওয়ার খবর এল। দু একটা পোস্ট, দু একজনের স্মৃতিচারণ, তারপর রিসেট বোতাম টিপে নিজের নিজের কাজে ফিরে যাওয়া। সেই নতুন বই আর সিনেমা, রান্নাবান্নার ঝামেলা, নতুন জায়গায় ঘোরার প্ল্যান। আকাশের মুখ ভার, তিষ্ঠোতে না পেরে আমরাও বেরিয়ে পড়ি। ভিয়েনা থেকে মার্সেই, মার্সেই থেকে রোডস... পথের কাছে ফিরে যাওয়ার শান্তিটুকু অন্তত কেউ কেড়ে নিতে পারে। নীল আকাশ, নীল সমুদ্র, মানুষজনের জীবনেও যেন এই নীলাভ উষ্ণতার ছাপ পড়েছে। ব্লু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালার। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আমি মানুষের মুখ দেখি, তাদের স্লাইস অফ লাইফ' মুহুর্তগুলোর আড়ালে থাকা গল্পগুলো বোঝার চেষ্টা করি। কত রকমের মানুষ! তাদের রোজনামচা দিয়ে গড়ে ওঠা শহর! শহরের ইতিহাস! বর্তমানও!

গ্রিসে এসে খবর পেলাম, জেঠু মারা গিয়েছে। কিছু এলোমেলো স্মৃতি ভেসে এল, আর বিশেষ কিছু মনে হল না। বেনারসের বাড়ির বাসিন্দাদের মধ্যে জেঠুই ছিল সবচেয়ে বড়। বয়স হয়েছিল, মুম্বাইয়েতে দাদার কাছে গিয়ে ছিলেন। আর্মিতে কাজ করতেন, দাপুটে মানুষ, গুণের পাশাপাশি দোষও কম ছিল না। জানতাম, এরকম একটা ফোন একদিন পাবই। ওই বাড়িতে শেষ মৃত্যু ঘটেছিল তেইশ বছর আগে, ঠাকুমার সময়। তারপর বহুদিন কেটে গিয়েছে। সময় বদলেছে, বাড়ির বাসিন্দাদের জীবনও বদলে গিয়েছে। বাড়ির সবচেয়ে ছোট যে, যার কাছে ওই বাড়ি আর শহরটার স্মৃতি সবচেয়ে বেশি করে জড়িয়ে ছিল, জড়িয়ে আছেও, তার সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে বাড়িটার। এ হওয়ারই ছিল। অভিজ্ঞতা বেড়েছে, বন্ধু কমেছে। নতুন বন্ধু অনেক হয়েছে দেশদুনিয়া ঘুরে, কিন্তু কেন জানি না একটা পরিমিত দূরত্ববোধ বজায় রাখতে হয়েছে। কৈশোরের মতো ঘনিষ্ঠতা কারো সঙ্গেই হয়নি, হবেও না। বড় হওয়া, পরিণত হওয়ার এই এক সাইড এফেক্ট, বাস্তবটা মেনে নিতে আর বিশেষ কষ্ট হয় না। অভিমান করার জায়গাগুলো ক্রমে হারিয়ে যায়। এখন আমি জানি, দূরত্ব বাড়লে সম্পর্কের উষ্ণতা কমে আসবে, বয়স বাড়লে মানুষ মারা যাবে, আমার মাথার ওপর যারা ছিল, যারা আছে, যারা স্নেহ করতেন বা করেন, তারা সবাই একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। আমার আগে বা আমার পরে। সাইকেল অফ লাইফ।

তবু, জীবন চলে। আমি দেশ ঘুরে বেড়াই। স্টিল লাইফে ধরে রাখি মানুষের জীবন। এক একটা সাদামাটা মুহুর্ত, যা নিয়ে সেই মানুষটার মাথাব্যাথা নেই, কিন্তু এই মুহুর্তগুলোই তার অলক্ষ্যে তার জীবনের পথ ঠিক করে দিচ্ছে। কেউ জ্যাকেট নামিয়ে কফি খেতে খেতে বই পড়ছে, কেউ উঁচু গলায় ফোনে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ঝগড়া করছে, কলেজ বা ঘুরতে আসা বন্ধুরা হয়তো প্যাস্টিস খেতে খেতে সিনেমা বা বই নিয়ে তুমুল তর্ক করছে,  বেড়ালকে পাঁচিল থেকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে এক যুবক। এই সব ছোটোখাটো দৃশ্য। এই নিয়েই আমার বেড়ানো। আর সব ভুলে যাব হয়তো, কিন্তু এই ছবিগুলো থেকে যাবে। থেকে যায়। চিরকাল।





 












বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২২

লাইফলাইন


 আমার সমবয়সী বন্ধুদের মধ্যে প্রায় সবাই গাড়িবাড়ি কিনে 'সেটলড'। শতকরা নব্বইজন ঘোর সংসারী, উইকেন্ড প্ল্যান করতে হলে ছয় মাস আগে জানাতে হয়, বাকিরা পরিবারের 'দায়িত্ব' বুঝে নিয়েছে। ব্যাটাদের পিএফ থেকে পেনশন প্ল্যান, মুচুয়াল ফান্ড থেকে রিটায়ারমেন্ট স্কিম, সব পাক্কা। মাঝেমধ্যে কথা হয়। তখন আমার মুখে কথা সরে না। ইনভেস্টমেন্টের কথা জিগোলে আমি মুচকি মুচকি হাসি, অ্যাপ্রেসেল আর কেরিয়ারের প্রশ্ন শুনে মাথা চুলকোই। বাড়ির লোকে তো হাল ছেড়ে দিয়েছে। বন্ধুরাও অনেকে আড়ালে, অনেকে সামনেই হাসাহাসি করে। দু' একজন তো ঠাট্টা করে বলেই দিয়েছে, সুদীপ নাকি চিরকালের ফার্স্ট বয়! মাধ্যমিকে স্কুলের পঞ্চাশ বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল! বেনারসে হইচই পড়ে গিয়েছিল সেই ঘটনা নিয়ে! সেই ছেলের কিনা এই দশা! শেষমেশ কিনা সে ভবঘুরে হয়ে গেল? দায়িত্বজ্ঞানহীন আর ইমম্যাচুয়ার তকমা তো আমার অনেক আগেই জুটেছে। সকলের এক ভাবনা, এই উলোঝুলো, বাউন্ডুলে স্বভাব নিয়ে আমি বাঁচব ক্যামনে?

পরেরবার এই প্রশ্নের সামনে পড়লে (পড়ব ঠিকই) যথারীতি উত্তর দেব না সরাসরি, কিন্তু মনে মনে এই সূর্যাস্তের স্মৃতিটা ঝালিয়ে নেব। রিও দে জ্যানেইরো। আট জুলাই, দু হাজার বাইশ সাল। আমার জীবনের বেস্ট সূর্যাস্ত। সুগারলোফ মাউন্টেনের ওপর থেকে দেখা সেই স্মৃতি কোনও ছবিই ঠিকঠাক ধরতে পারবে না জানি, কিন্তু আমার মনের ক্যামেরার অসাধ্য কিছুই নেই। আমি কাজের জিনিস ভুলি না। আই উইল রিমেম্বার! আই উইল রিমেম্বার এভরি মোমেন্ট অফ ইট!
থাক! এই মুহুর্তগুলো থাক! এই আমার ইনভেস্টমেন্ট! আমার সঞ্চয়! আমার লাইফলাইন! এবং আমার লাইফ! যতদিন বাঁচব, এই স্মৃতিগুলোই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। বাকি জানা তো সবকো হ্যায় হি!
(ঠিক কী দেখলাম সেটা ছবিতে বোঝানোর কোনও উপায় নেই। মাফ করবেন।)

অলীক আলেখ

 


জীবনে কোনোকিছুই খুব ভালো করে শিখতে পারিনি, কিন্তু হাত মকশো করা হয়েছে অনেক জায়গাতেই। পাহাড়ে ওঠা হোক বা ষাঁড়ের পিঠে ওঠা, বাদাম বিক্রি হোক বা সফটওয়্যার বিক্রি, সিনেমা হোক বা নাটক... অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী হব বলে একেবারে প্রতিজ্ঞা করেছি আমি। এই করতে গিয়ে সেবার ঢুকেছিলাম অভিনয়ে। স্টেজ অ্যাক্টিং সম্পর্কে আমার মাইনাস লেভেলের জ্ঞান, বিদ্যার ব ও নেই, তাই পেত্থম পেত্থম বেশ মুখ হাঁড়ি করে সব গিলেছি। যদিও অ্যামেচার থিয়েটার ছিল, তাও স্টেজ ব্লকিং, সাবটেক্সট, আলো নেওয়ার প্রাথমিক শিক্ষা দিব্যি গলাঃধকরণ করেছি। সে গল্প অন্য একদিন বলব। আপাতত এই ছবিটা মেমোরিতে উঠে এল বলে যে কথাটা মনে পড়ছে, সেটা হল এই নাটকটা করার অভিজ্ঞতা। সে কী অভিজ্ঞতা! ওরে বাপ রে বাপ!
অস্কার ওয়াইল্ডের 'দ্য ইম্পর্ট্যান্স অফ বিইং আর্নেস্ট' সর্বকালের সেরা ক্লাসিক বলে গণ্য করা হয়। লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে প্রায় প্রত্যেক উইকেন্ডে একটা না একটা শো থাকেই, কোভিডের সময়টুকু ছাড়া সে নিয়মের অন্যথা হয়নি। এই কমেডি নিয়ে অবশ্য নাক কুঁচকানো লোকের অভাব নেই। 'ফার্স' বা লো কমেডি বলে অনেকেই ওয়াইল্ডকে হেয় করেছিলেন এককালে, আবার উইটি ডায়ালগ আর ভিক্টোরিয়ান লাইফস্টাইলকে একেবারে হুবহু মঞ্চে তুলে আনার জন্য তিনি তারিফও পেয়েছেন কম নয়। তা আমাদের পরিচালক অমিতাভদা এই নাটকটার একটা বাংলা ভার্সান লিখে ফেললেন। সেই বাংলাটা হিন্দিতে অনুবাদ করার দায়িত্ব দেওয়া হল আমায়। বাংলা টু হিন্দি অনুবাদ ইজ নট আ বিগ গেম, নামিয়েও ফেললাম। এইবার ঠিক হল, নাটকটা করা হবে হিন্দিতে।
এখন ভেবে দেখি, ভবিষ্যৎ জানার উপায় থাকলে আমি প্রথম দিনই দৌড় মারতাম। কিন্তু আমি ওই যে বলে জাত আর্টিস্ট, ঘটে আর গ্যাঁটে কিছু না থাকলেও শিল্প সাধনা করার অদম্য বাসনা, তাই দুগগা বলে ঢুকে পড়েছিলাম সেই নাটকের রিহার্সালে। হিন্দিটা ঠিকঠাক জানা আছে বলে বড়কা একটা রোল বাগিয়েছি, বেশ উড়ু উড়ু ভাব এসেছে মনে।
কিন্তু দু চার সপ্তাহ যেতে না যেতেই বোঝা গেল, এ ফিল্ড থেকে নামটা বরাবরের জন্য কাটা গেল রে ভাই! ভাবতাম, চান্স পেলে একদম ইন্টেন্স রোল করব, এ তো কমেডি! ট্রিভিয়াল কমেডি ফর সিরিয়াস পিপল! কিছুই হচ্ছে না। একে তো অভিনয় লবডঙ্কা, তারপর নাটকের হিন্দি ভার্সান আমার মোটেও পোষাচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে তো আর পালানো যায় না। তাই রিহার্সাল চলতে লাগল (সে মুগলে আজম এর জন্যও এত রিহার্সাল হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে আমার) আর আমিও বলদার মতো সেই পার্ট মুখস্থ করে চালিয়ে যেতে লাগলাম। এদিকে আমার মন সর্বক্ষণ বিদ্রোহ করছে। কোথায় ওয়াইল্ডের লেখা সংলাপ আর কোথায় তার বাংলা অনুবাদ থেকে পাওয়া হিন্দি অনুবাদ। (ঈয়াপ! অনুবাদ। বাংলা চরিত্র করে দিলেই তো অ্যাডাপ্টেশন হয় না, আর নাটক অনুবাদ করলে খিচুড়ি আর অ্যাপল পাই মিশিয়ে যে জিনিসটা হয়, সেটাকে হয় নাটক বলা যায় না, নয় আক্ষরিক অর্থেই 'নাটক' বলতে হয়।) অ্যাক্টিং কেরিয়ার এর প্রথমেই এরকম ক্রিয়েটিভ কনফ্লিক্ট হলে যে কী অবস্থা হয় বলুন দিকি?
খুব ছোট্ট উদাহরণ। এই ধরুন মূল ইংরেজিতে সংলাপ...
Jack: ... That, my dear Algy, is the whole truth pure and simple.
ALGERNON.
The truth is rarely pure and never simple. Modern life would be very tedious if it were either, and modern literature a complete impossibility!
JACK.
That wouldn’t be at all a bad thing.
ALGERNON.
Literary criticism is not your forte, my dear fellow. Don’t try it. You should leave that to people who haven’t been at a University. They do it so well in the daily papers. What you really are is a Bunburyist. I was quite right in saying you were a Bunburyist. You are one of the most advanced Bunburyists I know
এইবার এই ইমোশনটা যদি বাংলা বা হিন্দিতে অনুবাদ করাও হয়, Bunburyist কথাটার হিউমার জিন্দেগিতে আসবে না। যদি বা লেখায় আসে, মঞ্চে সেটা একেবারেই ফুটবে বলে আমার অন্তত মনে হয় না। ফলে ব্যাপারটা দাঁড় করাতে গেলে পুরো ব্যাপারটার সেটিংই পালটে ফেলা দরকার। সে আর হওয়ার নয়! সে যাই হোক, অ্যামেচার গ্রুপে অত ভাবলে চলে না। আর আমিই বা কোন হনু যে আমার কথা সবাইকে বোঝাতে যাব বা বোঝাতে পারব? ফলে হিন্দিতে (অনেকেই বাংলা উচ্চারণেই হিন্দি বলছিলেন, সেটা শুনতে মন্দও লাগছিল না) ব্যাপারটার টেক্সচারই বদলে গেল।
সে যাই হোক, এই বিপুল কাস্ট নিয়ে সেই অসমসাহসী নাটক অবশেষে মঞ্চে নেমেওছিল। আর খুব আশ্চর্য হয়ে দেখেছিলাম, লোকে বেশ এনজয়ও করছে। আমার এক অসম্ভব প্রিয় বন্ধু(দরকারে ঠোঁটকাটা হয়ে সত্যি বলতে তার বাধে না), তখনকার রুমমেট আর নাটকপাগল (অভিনেতা) ছেলেটিও যখন ভালো ভালো কথা বলতে লাগল, আমি যারাপনাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কেয়া হো গেয়া ভই?
সেই নাটকের একটা স্টিল। সহ অভিনেতাদের (ধুস, সব বন্ধু! কে কার চেয়ে বেশি ছ্যাবলা বলা মুশকিল) কাছে আমি আজও কৃতজ্ঞ। সপ্তর্ষি, যার সঙ্গে সিন করতে আমি প্রথম থেকেই কম্ফোর্টেবল ছিলাম, ফ্লোতে পড়ে মাঝেমধ্যে ক্যারেক্টর ফ্যারেক্টার ভুলে নিজের ম্যানারিজম ঢুকিয়ে দিতাম এবং প্রথম শো তেই ডায়ালগ ভুলে কেলেংকারি হওয়ায় ব্যাটা যেভাবে উদ্ধার করেছিল আমাকে, শ্রীময়ী, কৃষাণু, ঈন্দ্রাণী, 'গবা'দা, তনুশ্রীকেও। অতি অবশ্যই আমাদের পরিচালক অমিতাভদাকে। আর বিশেষ করে ঊর্মি বলে এই মাঝেমধ্যে রেগে যাওয়া মেয়েটাকে, যে অ্যাট লিস্ট আমার ওপর রেগে যায়নি কখনও। নাহলে সিন ঝুলিয়ে একাক্কার করতাম।
নাটক চলাকালীন একটা গোটা গান গাইতে হত একটা সিনে। একেবারে বুকে হাত রেখে বলতে পারি, ওই সাড়ে তিন থেকে চার মিনিটের পিসটাই মঞ্চে আমার সবচেয়ে প্রিয় সময়। ছোটবেলা থেকে গানটা শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল, অসংখ্য প্রিয় গানের একটা বলা যায়। ওটার জন্যই মুখিয়ে থাকতাম। শেষ মেশ যে নাটক ছেড়ে পালাইনি, তাও ওই গানটার জন্যই। এই সেই গান গাওয়ার সিন

বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

হাইলিগেনস্ট্যাট টেস্টামেন্ট

Heiligenstadt Testament

আমার জীবনে রক্ত মাংসের শিক্ষকদের প্রভাব খুব বেশি নেই। যতটা শিখেছি, বই পড়ে, নানান ধরনের লোকের সঙ্গে আলাপ করে আর পথে পথে ঘুরে। যেমন, কাকাবাবুর 'ভয়ংকর সুন্দর' গল্পে পড়া 'আকাশ পুরোনো হয় না' কথাটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার একটা বলেই মনে করি। একজন আমাকে বলেছিল, টিচিং লাইজ ইন ডিসগাইজ। কোথায় সে দেখা দেবে, কেউ জানে না। 

হ্যাঁ, স্কুলজীবনে অনেক শিক্ষকের সাবজেক্ট নলেজ ভালো ছিল, যত্ন নিয়ে পড়াতেন, কিন্তু ওইটুকুই। পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ আমাকে কেউ বানিয়ে দেয়নি, প্রোফেসর লুপিনের মতোও কেউ ছিল না। ব্যতিক্রম ইংরেজি ও আর্টের শিক্ষক ডিটিলবাবু, স্কুলে ড্রয়িং রুমে তাঁর নিজস্ব লাইব্রেরি থেকে বাংলা বই এনে পড়ার অভ্যেস আমাকে অনেক পরিণত করেছে, তবে স্কুলজীবনে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে জীবনের পাঠ দিয়েছেন, এমন শিক্ষকের কথা বিশেষ মনে পড়ে না। এহেন উচ্চমাধ্যমিকের পর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোচিং করতে গিয়ে একজন কেমিস্ট্রির মাস্টার পেলাম, যাকে শিক্ষক বলে ভাবার অবকাশ ছিল না। কালো-কুলো ছোকরা চেহারা, র‍্যাগিংয়ে নাগিন ডান্স করতে হয়েছিল বলে তার নিকনেম পড়ে গিয়েছিল 'নাগু'; এমনকি আমরাও নাগু স্যার বলেই ডাকতাম। নাগু আই টি বিএইচইউ থেকে কেমিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পাস করেছিলেন, কিন্তু কোচিং উদ্যোগেই কেরিয়ার করার ইচ্ছে ছিল তাঁর। ফলে তিনজন আইআইটিয়ান মিলে একটা কোচিং খুলেছিলেন বেনারসে। (প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, কোটা ফ্যাক্টরি ওয়েব সিরিজের জিতু ভাইয়া চরিত্রটা যে ব্যক্তিকে মাথায় রেখে লেখা, সেই এনভি স্যার ওরফে নিতিন বিজয় তাঁর কেরিয়ার শুরু করেছিলেন কোটা পয়েন্ট থেকেই। তখন তিনি সেরেমিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বছরের ছাত্র, ফাটাফাটি পড়াতেন। আমরাই তাঁর প্রথম ব্যাচ) কিন্তু আমার প্রিয় ছিলেন নাগু। তাঁর কেমিস্ট্রি জ্ঞান নিয়ে আমার কিছু বলার নেই কিন্তু মাঝেমধ্যে তিনি এমন এক একটা কথা বলতেন যা মনে থেকে যেত। কোন শিক্ষকের কোন কথা লাইফ লেসন হয়ে মনে গেঁথে যায় চিরকালের জন্য, সে কথা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। তা সেবার কেমিস্ট্রি শীট সাবমিট করার পর সমর নামে এক ব্রিলিয়ান্ট ছেলে বাজে রকম সিলি মিস্টেক করে নম্বর কম পেয়ে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিল প্রায়, খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, নাগু সে কথা জানতে পেরে বললেন, "সালো! এক বাত গাঁঠ বাঁধ লো! অ্যায়সা হ্যায়, আই আই টি বহুত কুছ হ্যায়, পর সব কুছ নেহি হ্যায়!"

এই নীতিকথা শুনে ছেলের মুখের ভাব বদলাল না। সমর মুখ গোঁজ করে বলল, "সরজি, আই আই টি না সেহি, ইঞ্জিনিয়ারিং তো নিকালনা পড়েগা। নেহি তো জিন্দেগি বরবাদ হো জায়েগি।"

নাগু আবার হেসে বলেছিলেন, "জিন্দেগি বহুত বড়ি চিজ হ্যায় বচ্চে। ইঞ্জিনিয়ারিং, জব, পড়াই লিখাই, সাকসেস...ইয়ে সব জিন্দেগি মে বহুত কুছ হ্যায়... পর...সব কুছ নেহি হ্যায়! "

তখন জানতাম না, এই কথাটা সারাজীবনের জন্য আমার মাথায় জায়গা করে নেবে। সে কথা থাক! গল্পটাও আসলে নাগুকে নিয়ে নয়, এই গল্পে তাঁর ভূমিকা শুধুই সূত্রধরের! সেদিন ক্লাসের পর আমরা কয়েকজন তাঁকে গিয়ে বললাম, "কেয়া নাগু স্যার! ডিপ্রেসড বাচ্চে কো জ্ঞান দে দিয়া বেফালতু মে!"

নাগু হেসে বললেন, "অবে জ্ঞান নেহি থা ইয়ার, ইন্সপিরেশন থা! এক শীট কা ইতনা টেনশন লেগা তো আগে কেয়া পড়েগা?"

একজন খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল, "ফির আপকা ইন্সপিরেশন! আপ তো সুইসাইড নোট মে ভি ইন্সপিরেশন ঢুন্ড লোগে স্যার!"

নাগু মুচকি হেসে বললেন, "লড়কে, উয়ো ভি হোতা হ্যায়! হাইলিগেনস্টাট টেস্টামেন্ট কা নাম শুনা হ্যায়!"

"হায়... কেয়া?" আমরা ভড়কে গিয়েছি। 

নাগু কপাত করে আমার খাতাটা কেড়ে নিয়ে লিখতে শুরু করলেন। খাতাটা তুলে নিয়ে সবাই দেখলাম লিখেছেন-- Heiligenstadt Testament... 

এই অদ্ভুত শব্দের কী মানে আর এসবের মাঝে কী ভূমিকা, সে রহস্যের কিনারা সেদিন হয়নি। কিন্তু খাতাটা ভাগ্যক্রমে আমার ছিল বলে লেখাটা মাঝেমধ্যেই আমার চোখে পড়ত, ফলে মাথায় থেকে গিয়েছিল ওই কথাটা।

এই ঘটনার পর বহুবছর কেটে গিয়েছে। সেবার ইউপি এমপি সীমানাতে একটা এনজিওর সঙ্গে ভলান্টিয়ারশিপের কাজে গিয়েছি। নদীর ধারে একটা ছোট্ট গ্রাম, সেখানে চারজন ছেলে থাকি। তার মধ্যে দুজন বিদেশি। তাদের নাম আর মনে নেই। ধরা যাক মার্ক আর স্টিভ। তা বুন্দেলখন্ড অঞ্চলের ওই জায়গা ভীষণভাবে প্রান্তিক, দারিদ্র্যের রূপ সচক্ষে দেখার সুযোগ আমাদের হয়েছিল সেবার। নিয়াগর পাতার খোঁজে জঙ্গলে ঘোরে গ্রামের লোক, মাঝেমধ্যেই ভুখমরিতে এক একজনের মৃত্যু হয়। সে খবর আসে আমাদের কাছেও। প্রথম দিকে বিচলিত হলেও সয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের সয়ে গেলেও মার্কের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল, সে রীতিমত ডিপ্রেশনে দিন কাটাত, রাতে জেগে বসে থাকত। একদিন রাতে উঠে দেখি, মার্ক চারপাইয়ের ওপর উঠে বসে আছে, ঢিবরির আলোয় একটা বই পড়ছে। উঠে গিয়ে দেখলাম, তার মুখে অদ্ভুত একটা উজ্জ্বল আলো। জিজ্ঞেস করলাম, "কী পড়ছ মার্ক?"

সে উজ্জ্বল মুখে আমাকে বইটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, "আমার বাইবেল। বা গীতা, কুরান যা খুশি বলতে পারো। যখন মনে হয় জীবনে বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই, তখন এই বইটা পড়ি।"

ঢিবরির অনুজ্জ্বল আলোয় দেখলাম, হলুদ রঙের মলাটের ওপর লেখা-- Heiligenstadt Testament... 

এই বইয়ের সঙ্গে যে গল্প জড়িয়ে আছে সেটা খুব কমন, অনেকেই হয়তো জানে, কিন্তু আমি গল্পটা শুনেছিলাম সেই রাতে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক একটানা বলে গিয়েছিল মার্ক, আমিও শুনে গিয়েছিলাম হতভম্ব হয়ে। একটা চিঠি কাম অবসাদের দলিল কাম আত্মহত্যার স্বেচ্ছানামা, যা কিনা পরে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে আশার আলো হয়ে এসেছে। একটা আদ্যোপান্ত সুইসাইড নোটের ন্যায় দস্তাবেজ, যা পড়ে হাজার হাজার লোক ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পেয়েছে, এখনও পাচ্ছে। মার্কের মতো অনেকের কাছেই (হয়তো নাগুর কাছেও! জানার কোনও উপায় নেই) হয়তো এই চিঠি অবসাদ জীবন থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র অবলম্বন হয়ে এসেছিল।

হাইলিগেনস্টাট আসলে ভিয়েনার নাইন্টিন্থ ডিস্ট্রিক্টের একটা পাড়া। সাজানো উদ্যান, গাছপালা দিয়ে সাজানো এই পাড়া এককালে শহরের বাইরে অবস্থিত ছিল। বেটোফেন আর তাঁর ছাত্র ফার্ডিনান্ড রাইজ বৈকালিক ভ্রমণে  সেখানে যেতেন মাঝেমধ্যেই। সেদিনও তারা দুজনে ঘুরছেন। গাছেগাছে পাখিদের কলতান, একটা পাখি এমন সুরেলা গলায় গান গাইছে যে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। রাইজ বেটোফেনকে ইশারা করে বললেন, "শুনতে পাচ্ছেন স্যার?"

বেটোফেন কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রাইজের দিকে, তারপর আস্তে আস্তে ঘাড় নাড়লেন। রাইজ এগিয়ে গেলেন। লক্ষ করলেন না, বেটোফেনের দু চোখ বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা। আসলে তিনি কিছুই শুনতে পাননি। পাওয়ার কথাও নয়। তাঁর শ্রবণশক্তি তখন প্রায় পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গিয়েছে, আংশিক ভাবে কালা হয়ে গিয়েছেন বেটোফেন। সেটা ছিল ১৮০২ সাল। 

সমস্যা অবশ্য বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে। সাতাশ বছর বয়সে যখন একদিন তিনি সিম্ফনি রচনা করছেন, কে যেন তাঁর কাজে বাধা দিয়েছিল। বেটোফেন ভীষণ রেগে গিয়ে গালিগালাজ করতে থাকেন। রাগ যখন কমে আসে, তাঁর মনে হয় কানে যেন ঠিক করে শুনতে পাচ্ছেন না। সেই শুরু। ধীরে ধীরে এই সমস্যা বাড়তেই থাকে। বেটোফেন দু একজন বন্ধুকে ছাড়া কাউকেই কিছু জানাননি, বাড়িতে তো নয়ই। কে যেন তাঁকে বলেছিল যে ভিয়েনার থারমাল বাথে স্নান করলে উপকার পাওয়া যাবে, ফলে ভিয়েনা চলে আসেন বেটোফেন। কিন্তু লাভ কিছুই হয়নি। বেটোফেন অসম্ভব প্রকৃতি প্রেমিক ছিলেম। ঝরনার জলের শব্দ, পাখিদের কলকাকলি শুনেই কম্পোজিশন রচনা করতেন তিনি। সে সব কোথায় ঘুচে গেছে তখন! একজন সঙ্গীতজ্ঞ, শোনাই যার কাজ, সে কিনা শুনতেই পাচ্ছে না! যে ঘরই ভাড়া নিতেন, সে ঘরটাই কিছুদিন পর তাঁর অসহ্য ঠেকত। ভিয়েনা প্রবাসের দরুণ প্রায় ষাট সত্তরটা ঘর বদলেছেন বেটোফেন, কিন্তু কোনোদিন শান্তি পাননি। বার বার ভাবতেন, এইবার আত্মহত্যা করবেন। করবেনই। কোথাও না কোথাও তাঁর ধারণা হয়েছিল, এ আসলে তাঁর পাপের ফল। ছোটবেলা থেকে বাবা তাঁকে সঙ্গীত দুনিয়ায় 'চাইল্ড প্রডিজি' করে প্রচার চালিয়েছেন, প্রয়োজনে মিথ্যা বলিয়েছেন তাঁকে দিয়ে, এমনকি তাঁর বোন, সঙ্গীত প্রতিভায় যে কিনা বেটোফেনকেও ছাপিয়ে যেতে পারত, তাঁকে জোর করে পিছিয়ে ছেলেকে সামনে করে দিয়েছেন। হয়তো দোষ বেটোফেনেরও ছিল! অন্তত তিনি নিজে যে সে কথা ভেবেছেন, তা নিয়ে সংশয় নেই। 

তিরিশ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই বেটোফেনের শ্রবণশক্তি কমে আসছিল দ্রুত, চল্লিশ আসতে আসতে বদ্ধ কালা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। আয়রনি হল, মানব সভ্যতার সঙ্গীতের ইতিহাসের সবচেয়ে অসামান্য কিছু কম্পোজিশন তৈরি হয়েছে একজন বদ্ধ কালার হাতে। বেটোফেন শুধু অন্তরাত্মার ওপর ভরসা করে কম্পোজিশন করতেন, কিন্তু সে সব কালজয়ী সুর তিনি নিজে একবারের জন্যও শুনতে পাননি। শোনার উপায়ও ছিল না। সবাই তাঁর কন্সার্টের পর এসে তারিফ করত, তিনি বোকার মতো চেয়ে থাকতেন, কিছুই বুঝতে পারতেন না। 

আরো আশ্চর্যের কথা হল, তাঁর ডিপ্রেশন যত বেড়েছে, তত বেশি ভালো কম্পোজিশন উপহার দিয়েছেন এই মহান সঙ্গীতজ্ঞ। বেঁচে থাকতেই সারা দুনিয়ার শ্রোতাদের কাছে গ্রেটেস্ট মিউজিক আইকন হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু ছাপ্পান্ন বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর আগে আয়োজিত শেষ কন্সার্টে যখন হাজার হাজার শ্রোতা তালি বাজিয়েই চলেছেন, তিনি মুখ ঘুরিয়ে বসে স্বরলিপির খাতা দেখছেন। বাধ্য হয়েই একজন তাঁর চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল দর্শকের দিকে। 

হাইলিগেনস্টাটে থাকার সময়ে অবশ্য৷ বেটোফেন  যুবক। ভেবেছিলেন, এইবার হয়তো কিছু লাভ হবে। তখন সেকেন্ড সিম্ফনির কাজ শেষ হয়েছে সদ্য। ভিয়েনার ডাক্তার জন অ্যাডামস তাঁকে জানিয়েছিলেন, শহর ছেড়ে কান্ট্রি সাইডে গিয়ে থাকলে হয়তো কিছু উপকার হবে। খুব আশা নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ছয় মাস কেটে গিয়েছে, লাভ হয়নি কিছুই। উল্টে দিনদিন বাইরের দুনিয়া আরো নীরব, আরো নিস্তব্ধ হয়ে আসছে তাঁর কাছে। এমন সময় ফার্ডিনান্ড রাইজ এসে উপস্থিত, যিনি তাঁকে পাখির গান শোনাবেন বলে পীড়াপীড়ি করেন রোজ। কিন্তু ... বেটোফেন যে কিছুই শুনতে পাবেন না সে কথা তাঁর প্রিয় ছাত্রেরও জানা ছিল না। 

যে ঘটনার কথা প্রথমেই লিখেছি, সেইদিনই বাইরে থেকে ঘুরে এসে ভাই কার্ল আর জনকে বিশাল এক চিঠি লিখেছিলেন বেটোফেন। আদপে চিঠি, না স্বগতোক্তি না মৃত্যুকামনা...সে সব পরের কথা! কিন্তু এই চিঠির নামই পরবর্তী সময়ে দেওয়া হয়েছে হাইলিগেনস্টাট টেস্টামেন্ট। চিঠির শুরুতেই লেখা...

"to be read and executed after my death." 

বলাবাহুল্য, এই লেখার অস্তিত্ব কেউই জানত না। বেটোফেনের মৃত্যুর বেশ কিছুদিন পর এই চিঠি উদ্ধার করা হয়, রিপ্রোডাকশন কপি প্রকাশিত করা হয় দু মলাটে। কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা যায়, অবসাদের গভীরতম জায়গা থেকে উঠে আসা একটা চিঠি সারা দুনিয়ার অবসাদগ্রস্ত মানুষের কাছে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুইসাইডাল টেন্ডেন্সি ও সিভিয়ার ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকা অসংখ্য মানুষ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটুকু খুঁজে পেয়েছেন এই লেখায়, যা কিনা লেখা হয়েছিল জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে, এক অবসাদগ্রস্ত মানুষের কলমে। সবাই অবাক! দুনিয়ায় কী না হয়! ওই যে বললাম! টিচিং লাইজ ইন ডিসগাইজ! একটা সুইসাইড নোটও দৈবক্রমে কারো কাছে অনুপ্রেরণার স্রোত হয়ে উঠতে পারে।

হাইলিগেনস্টাট টেস্টামেন্ট লেখাটার কিছুটা অংশ দিলাম। ইচ্ছে হলে সম্পূর্ণ লেখাটাই পড়তে পারেন।

For six years now I have had an incurable condition, made worse by incompetent doctors, from year to year deceived with hopes of getting better, finally forced to face the prospect of a perpetual ailment (whose cure will either take years or be entirely impossible). Though born with a fiery, vigorous character, always tempted by the attractions of society, I have had to withdraw into myself, and spend my life in solitude... Such a situation brought me almost to despair; anymore and I would have ended my life. Only my art prevented me from doing it. I couldn't leave the world until I had produced all that I felt was within me."

লেখাটা বেটোফেনস লেটার্স-এ পেয়ে যাবেন। কেম্ব্রিজ লাইব্রেরি কালেকশন ইলাস্ট্রেটেড ভার্সন প্রকাশ করেছে, কিন্তু দাম বড্ড বেশি। কপিরাইট ফ্রি ম্যাটেরিয়াল বলেই মনে হয়, নেট থেকে পড়লেও অসুবিধা নেই।