প্রবন্ধ-না লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ-না লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৫

রহস্য বাকি আছে (ভারতবর্ষ)

 


গত সপ্তাহে আফ্রিকায় কতরকম আবিষ্কার হচ্ছে, সেই নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম। তার আগে মিশর নিয়েও একটা আপডেট দিয়েছি। অনেকের হয়তো ধারণা হতে পারে, আবিষ্কার- ফাবিষ্কার বুঝি দেশের বাইরেই সব হচ্ছে। পোস্ট ট্রুথ ইন্ডিয়ান সোসাইটিতে গবেষণা-ফবেষণা সব গোল্লায় গেছে, সবাই ফালতু বকতেই ব্যস্ত, তাঁদের মিষ্টি হাসি হেসে বলতে হয়, একশো চল্লিশ কোটির দেশে ও কথা ভাবাও পাপ। ভারতবর্ষে আজও এমন মানুষ আর প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই, যারা একের পর এক কামাল করছেন। সাধারণ মানুষের কাছে সেই সব কথা পৌঁছতে পারে না, তাঁদের নিয়ে কেউ ব্রেকিং স্টোরি করে না, এইটুকুই যা দুঃখের। যাকগে, অন্তত পাঁচটা বিষয় নিয়ে ভারতীয় বৈজ্ঞানিক আর আবিষ্কারকরা কী কী চমকপ্রদ তথ্য জানতে পারছেন, সেই নিয়ে কয়েক লাইন করে লিখে দিলাম। বড় লেখা কেউ পড়েও না। কেউ আগ্রহী হলে বিস্তারিত পড়তেই পারেন খুঁজে।

১) প্রথমেই পুরাতত্ত্ববিদদের কাণ্ডকারখানা দেখা যাক। আমাদের দেশে আর্কিওলজিস্টদের নানা রকম ঝামেলায় পড়তে হয়, সেই নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ইতিহাস খুঁড়ে বের করা ঢের ঝক্কির কাজ, টাকাফাকাও লাগে, খোদ সরকারেরও ওতে বিশেষ আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। সামান্য বাধানিষেধ পেলেই বড় বড় প্রজেক্ট তালাবন্ধ হয়ে পড়ে থাকে, এক্সক্যাভেশন সাইটে খাটিয়ে রাখা ত্রেপল নিজেই ফসিল হয়ে যায় আর কি! তবু ভারতীয় আর্কিওলজিস্টরা হাল ছাড়তে রাজি নয়। গত কয়েক বছরে তারা এমন সব রোমাঞ্চকর তথ্য জানতে পেরেছেন যে দুনিয়ায় হইচই পড়ে গেছে।

প্রথমেই বলতে হয় কিলাদি এক্সপিডিশনের কথা। তামিলনাডুর কিলাদি আর কাছাকাছি অবস্থিত অন্যান্য এক্সক্যাভেশন সাইট থেকে পাওয়া তথ্য এমন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে যে ইতিহাসবিদরা দাড়ি চুলকে পোকা বার করে ফেলছেন প্রায়। ব্যাপারটা ইতিহাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে৷ কিলাদিতে বহুদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, সেখানে প্রচুর পরিমাণে প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। গ্রাফিতি-চিহ্নিত মৃৎপাত্রের টুকরো, খোদাই করা চাকা, সোনার অলংকার, হাতির দাঁতের পাশা, জীবজন্তুদের মূর্তি তো আছেই, কিন্তু আসল ঝামেলা বেধেছে সেখানে পাওয়া সঙ্গম টেক্সট নিয়ে। কিলাদি থেকে প্রচুর পরিমাণে পটারি আর অন্যান্য জিনিস পাওয়া গেছে, তার ওপর তামিল ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা খোদাই করা আছে। পড়ে সকলের ঘুম উড়ে গেছে। এ যে সঙ্গম সাহিত্যের বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে।

এখন সঙ্গম সাহিত্য আবার কী জিনিস? খুব ভাসাভাসা বলতে হলে বলতে হয় তামিল সাহিত্যে সঙ্গম সাহিত্যের টেক্সট প্রায় একটা লিজেন্ড। সঙ্গম সাহিত্য আসলে ব্যাকরণ গ্রন্থ কাব্যসংকলন (তোল্কাপ্পিয়াম) আর তা বাদেও আটটা গ্রেটার টেক্সট নিয়ে একটা প্রাচীন সাহিত্য জনরা, সেগুলো আবার দু ভাগে শ্রেণীভক্ত করা হয়েছে। অত ঝামেলায় না গেলে বলি, উল্লেখযোগ্য রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে আকানানুরু (৪০০ প্রেমের কবিতা), পুরানানুরু (৪০০টা বীরত্বপূর্ণ কবিতা), কুরুন্থোগাই (ছোট প্রেমের কবিতা) এবং নাত্রিনাই (পাঁচটা সিনসিনারি নিয়ে কবিতা) ইত্যাদি। মোদ্দা কথা হল, সঙ্গম লিটারেচর দাবী করে তামিল সভ্যতা ৬০০ বিসিই-তেও, এমনকি তার আগেও যথেষ্ট উন্নত ছিল। সেখানে স্থাপত্যশিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ভীষণ ভাবে এগিয়ে ছিল। এতদিন ভাবা হত উত্তর ভারতে জ্ঞানের বিকাশ হয়েছে প্রথমে, দক্ষিণ ভারতে নয়। সঙ্গম সাহিত্যে যে বলা হয়েছিল তামিল সভ্যতা আরিয়ান আর বৈদিক সভ্যতার চেয়ে ভিন্ন আর তামিলরা প্রাচীনকাল থেকেই স্বতন্ত্র সভ্যতা বিকশিত করেছে, সেটা সত্যি। কোন্ডাগাই বিউরিয়াল সাইট থেকে পাওয়া আর্টেফ্যাক্টগুলোর লিপি পড়ে তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।পাশাপাশি এনসিয়েন্ট তামিলরা যে এজুকেশন, ক্রাফটসম্যানশিপ আর ট্রেডিংয়ে ভীষণভাবে উন্নত ছিল বলে লেখা হয়েছিল, তা শুধুই কষ্টকল্পনা নয় বলেও প্রমাণ হয়েছে।

এসব জানার পর রাজনীতি গরম। তামিলনাডুর সিএম বলছেন সেন্টার থেকে ফান্ডিং বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। মিডিয়াতেও যেন এই নিয়ে বিশেষ কথা না হয়, সেইজন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে চারিদিক থেকে। তাঁদের ভয়, তামিলনাডুর ইতিহাস নিয়ে এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার রাজনীতিতেও পালাবদল ঘটাতে পারে। সে-সব সত্যিমিথ্যা জানি না, তবে কিলাদি অভিযান আর নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে সারা দুনিয়ার ইতিহাসকাররা উদগ্রীব হয়ে আছে।

২) তামিলনাড়ুর গাঙ্গাইকোন্ডাচোলাপুরমেও খননকার্য চালিয়ে চোল বংশের ইতিহাস, শিল্পকর্ম আর ঐতিহ্য নিয়ে অজানা সব তথ্য পাওয়া গিয়েছে। গবেষকরা বিশ্বাস করছেন যে আয়ুধালাম আর কোল্লানকুঝিতে এক্সপিডিশন চালিয়ে গেলে আরো অনেক তথ্য জানা যেতে পারে, কিন্তু আপাতত বাজেট নেই সেই কাজটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পট্টরাইপেরেম্বুদুরেও টেরাকোটা শিল্প আর মৃত্তিকামূর্তি মিলিয়ে প্রায় দশহাজার আর্টিফ্যাক্ট পাওয়া গিয়েছে।

৩) হরিয়াণার রাখিগরিতে একটা প্রাচীন জলাশয় বা রেজর্ভয়ের সিস্টেম পাওয়া গিয়েছে। হরপ্পান যুগে ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে খুব ইন্টারেস্টিং তথ্য জানা গেছে। হাইড্রোলজিস্ট আর ত্রিমাত্রিক মডেল ডিজাইনারদের কথা বিশ্বাস করতে হলে বলতে হবে, এমন উদ্ভাবনী ওয়াটার সিস্টেম সম্পর্কে এখনও আমরা বিশেষ কিছুই জানতে পারিনি।

৪) ওদিকে ইসরো যে একের পর এক ধামাকা করছে সে তো সবাই জানে। চাঁদের সাউথ পোলে চন্দ্রযান নামানোর কথা বেশ আলোরণ ফেলেছে, সূর্যের করোনা আর সোলার উইন্ড নিয়ে স্টাডি করার জন্য যে আদিত্য-এল১ বলে সোলার অবজারভেটারি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

কিন্তু বিজ্ঞানী মহলে তার চেয়েও বেশি লাফালাফি হচ্ছে একটা ব্ল্যাকহোল আবিষ্কার নিয়ে। এক বিরল বিস্ফোরণের সময় সুইফট জে১৭২৭. ৮-১৬১৩ ব্ল্যাকহোল থেকে যে হাই এনার্জি এক্স রে পাওয়া গেছে, তাতে কিছু আনইউজুয়াল বিহেভিয়ার লক্ষ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই অস্বাভাবিক আচরণের নাম 'অ্যাপিরিওডিক মড্যুলেশন'। এই আচরণের ফলে এক্স-রেতে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক প্যাটার্ন দেখা যায় যা কোয়াসি-পিরিওডিক অসিলেশন (QPO) নামে পরিচিত। ব্যাপারটা নিয়ে আপাতত জোর গবেষণা চলছে।

৫) ওদিকে বনেজঙ্গলেও ধুমধাড়াক্কা চলছে। ২০২৩ সালেই জীববৈচিত্র্যে একের পর এক নতুন নাম যোগ হয়েছে, ভারতে ৬৪১টি নতুন প্রজাতির প্রাণী পাওয়া গিয়েছে, তাদের মধ্যে ১৯৯টি প্রথমবার ভারতে পাওয়া গিয়েছে। প্রচুর প্রাণী এই প্রথম পাওয়া গেছে পৃথিবীর বুকে। নতুন আবিষ্কারের বেশিরভাগই ছিল অমেরুদণ্ডী প্রাণী (৫৬৪টি প্রজাতি), বিশেষ করে পোকামাকড় (৩৬৯টি প্রজাতি), যেখানে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে (৭৭টি প্রজাতি), মাছ (৪৭টি প্রজাতি) প্রাধান্য পেয়েছে, তারপরে সরীসৃপ, উভচর, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখি রয়েছে। হিমালয়ে 'হিমালয়ান আইবেক্স' বলে একটা নতুন প্রজাতির আইবেক্স বা পাহাড়ি ছাগল পাওয়া গেছে, কর্নাটকের কুর্গে Miniopterus srinii বলে বাঁকানো ডানার চামচিকে মিলেছে, কেরালায় পাওয়া গেছে অ্যান্ট মিমিকিং স্পাইডার, ময়ুরভঞ্জে নতুন প্রজাতির গিরগিটির নাম খাতায় উঠেছে। সবচেয়ে বেশি প্রজাতি পাওয়া গিয়েছে ওয়েস্টার্ন ঘাটে, বলাই বাহুল্য। তবে নর্থ ইস্টে হাজার রকম গাছড়া পাওয়া গেছে, সেগুলো নিয়ে গবেষণা চলছে।

এছাড়াও দেশজুড়ে আবিষ্কার চলছে। জাদুবিদ্যা নিয়ে, উপজাতির ইতিহাস আর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে, সামুদ্রিক জীবন ও পরিবেশ নিয়ে, জিওসায়েন্স নিয়ে, এমনকি ভূত প্রেত রাক্ষস নিয়েও নৃতত্ত্ববিদরা ডেঞ্জারাস সব কাজ করছেন। পড়তে গেলে রোমাঞ্চে গায়ের কাঁটা দাঁড়িয়ে যায়। মুশকিল হল, অধিকাংশ জনতা শুধু আলতু ফালতু নিউজ চ্যানেল আর খবরের কাগজ নিয়ে পড়ে আছেন, বাকিরা রিল নিয়ে লাফাচ্ছেন। অনেকে তো ভেবেই নিয়েছেন এ দেশে কিছুই হয় না, কারণ এসবের বিশেষ প্রচার নেই। আসল কথা হল, বাধাবিঘ্ন সত্ত্বেও কাজ হচ্ছে, আস্তে আস্তে করে হলেও নতুন আবিষ্কার চলছে। আমি নিশ্চিত, আমার বন্ধুবৃত্তেই এমন মানুষ আছেন, যাঁরা কর্মক্ষেত্রে এই ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। যদি তাঁরা মাঝেমধ্যে সে নিয়ে কিছু কিছু কথা জানান, আমার মতো আগ্রহী পাঠকরা উপকৃত হই আর কি!

বৃহস্পতিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৫

রহস্য বাকি আছে (আফ্রিকা)

 


পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য আর রহস্য নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ক্রমে কমতে দেখছি। ছোটবেলায় একটা নতুন প্রাণী বা প্রাকৃতিক বিস্ময়ের কথা জেনে গেলে আমি দিনরাত সেই চিন্তাই করতাম। আফ্রিকা, আমাজন বা তিব্বত আমাদের মনোজগতে এক রহস্যময় জায়গা হয়ে বেঁচেছিল। আমি ততোটাও বুড়ো হাবড়া নই, সেই যুগেও প্ৰযুক্তির যথেষ্ট অনুপ্ৰপবেশ ঘটেছে মানবজীবনে, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ আর রাজনৈতিক বিপর্যয় লেগেই থাকত গোটা দুনিয়া জুড়ে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও একটা অবাক হওয়া ছিল, চমকে ওঠা ছিল, নতুন একটা তথ্য জেনে বিস্ময়মিশ্রিত আনন্দে ডগমগ হওয়া ছিল। ইন্টারনেট আর স্মার্টফোনের যুগে তথ্য পাওয়া সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু 'বিস্ময়' জিনিসটা প্রায় হারিয়েই গিয়েছে মানুষের মন থেকে। এখন আর আমরা কেউই অবাক হই না। অনেকের আবার ধারণা, পৃথিবীর সব রহস্যই আসলে আবিষ্কার করা হয়ে গেছে। অবাক হওয়ার মতো কিছুই আর বাকি নেই। অথচ সত্যি কথা হল, এখনও, এই যুগেও একের পর তাক লাগানো আবিষ্কার হচ্ছে। শুধু আফ্রিকার কথাই যদি ধরি, গত কুড়ি বছরে এমন সমস্ত প্রাণীদের খোঁজ পাওয়া গেছে, এমন সব প্রাকৃতিক ফেনোমেনার কথা জানা গেছে যে বিজ্ঞানীরা নড়েচড়ে বসেছেন, বারবার। কয়েকটা বলা যাক।

গত এক দশকে চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার হল রুয়ান্ডার গোল্ডেন মাঙ্কিদের নিয়ে। তাদের সোনালি পশমের মতো লোম রোদ্দুরে ঝকঝক করে, দেখা গেছে তাদের এই লোমে আসলে ফিওমেলানিন পিগমেন্ট আছে বলেই এমনটা হয়। এই ধরনের প্রাইমেট প্রজাতিকে রাখা হয়েছে cercopithecid গ্রূপে, অন্যান্য প্রাইমেট প্রজাতির সঙ্গে এদের যথেষ্ট ফারাক আছে। একদিকে গোল্ডেন মাঙ্কিদের নিয়ে উন্মাদনার ফলে রুয়ান্ডার পর্যটন ইন্ডাস্ট্রি বেশ অর্থলাভ করছে, অন্যদিকে কনজারভেশন বায়োলোজিস্টরা এদের বাঁচানোর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। একের পর এক অভিযান হচ্ছে। গত বছর রুয়ান্ডায় সবচেয়ে বড় গোল্ডেন মাঙ্কিদের দলকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।

তানজানিয়া চিরকাল গেম রিজার্ভ বলে খ্যাতিলাভ করেছে, সেরিংগেটিতে শ্বাপদরা হরিণ আর ওয়াইল্ড বিস্টদের ছুটিয়ে শিকার করছে, তানজানিয়া বললেই এই ছবি মাথায় আসে। কিন্তু এখানে বৈচিত্র্যেরও অভাব নেই। কয়েক বছর আগে বিজ্ঞানীরা সেখানে এমন এক প্রজাতির বায়োলুমিনিসেন্ট উদ্ভিদ খুঁজে বের করেছিলেন, যার পাতা থেকে নীল রঙের আলো বিচ্ছুরিত হয়। রিসেন্টলি Tessmannia princeps বলে এক নতুন প্রজাতির গাছ পাওয়া গেছে, সে প্রায় ৩০০০ বছর প্রাচীন। Udzungwa এলাকার Mngeta Valley নাকি অজানা গাছপালা খুঁজে পাওয়ার জন্য সেরা জায়গা। কিন্তু এখনও সেখানে অত অভিযান করা হয়ে ওঠেনি।

ইথিওপিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে এথনোবোটানিস্টরা এমন একটা উদ্ভিদ আবিষ্কার করেছেন যার পাতায় শক্তিশালী anti-inflammatory গুণ রয়েছে। স্থানীয় উপজাতির মানুষ নাকি যুগ যুগ ধরে এই গাছের পাতা ব্যবহার করে আসছে চোটজখম হলে। প্রিলিমিনারি ক্লিনিক্যাল স্ট্যাডিতে জানা গেছে অন্য anti-inflammatory উদ্ভিদের মতো এই গাছের পাতা সেবন করলে কোনও সাইড এফেক্টও হয় না।

ওদিকে ম্যাডাগাস্কারে ব্যাঙ পেয়ে জুলোজিস্টরা নাচ শুরু করেছেন। একের পর এক ব্যাঙ পাওয়া যাচ্ছে, সবাই নিজগুণে অনন্য। একটার নাম দেওয়া হয়েছে চাঁদের আলোর ব্যাঙ। সূর্যের আলো পড়লে ব্যাঙটার চামড়া স্বচ্ছ ট্রান্সপ্যারেন্ট হয়ে যায়, চাঁদের আলো পড়লে মনে হয় ব্যাঙের দেহের ভিতর একটা বেগুনি আলো জ্বলছে। ব্যাঙ বাবাজি এর ফলে দিনের বেলাও নিরাপদে থাকে, রাতের নিশাচর প্রাণীরাও কিছু করতে পারে না। সার্ভাইভালের জন্য এমন এভোলিউশনারি ইনোভেশন খুব কমই দেখা গেছে। এছাড়াও আছে এলিয়েন ব্যাঙ, মানে এই ব্যাঙগুলো ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করলে মনে হয় স্টার ট্রেকের স্পেশাল সাউন্ড এফেক্ট চলছে। মাঝেমধ্যেই ডক্টর Mark Scherz লাইভ বা রেকর্ডেড অনুষ্ঠান করেন, সেখানে আরো বিশদে জানা যাবে।

এখানেই শেষ নয়, গোটা আফ্রিকা জুড়ে নেত্য চলছে আসলে। কঙ্গো ও পশ্চিম অঞ্চলের দুর্গম অরণ্যে গবেষকরা এমন একটা ফল আবিষ্কার করেছেন যা চিনির চেয়ে বহু গুণ বেশি মিষ্টি, কিন্তু কোনও ক্যালোরি নেই। এই ফলকে স্থানীয়রা 'মিষ্টি সাগরের তারা' বলে ডাকে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করছেন যে যে এই ফল থেকে একটি ন্যাচারাল সুইটনার তৈরি করা যেতে পারে যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হবে। এখন শুনছি এরকম আরো কিছু শিকড়বাকড় আর ফলের সন্ধান নাকি পাওয়া গেছে।

নামিবিয়ার মরুভূমিতে এমন একটা বিটল পোকা পাওয়া গেছে যা বাতাস থেকে জল সংগ্রহ করতে পারে। এই অদ্ভুত কীটের পিঠে বিশেষ একরকমের কাঁটা রয়েছে যা কুয়াশা থেকে জল নিয়ে ধরে রাখে, এবং তারপর সেই জল সরাসরি তার শরীরে অ্যাবসর্ব করে নেয়। আর এদিকে আমরা এতদিন সব ক্রেডিট ব্যাটাছেলে উটদের দিয়ে আসছি শুধু।

জিওকেমিস্টরাও কম যান না। তারা মালি ও অন্যান্য জায়গায় রিভারসাইড ডিপোজিট পরীক্ষা করে বিশেষ ধরনের মাটি বা montmorillonite clay পেয়েছেন, হেভি মেটাল আর বিষাক্ত টক্সিন শুষে নিতে এই মাটির জবাব নেই। স্থানীয় মহিলারা বারবার বলেছিলেন যে এই মাটি দিয়ে তাদের হাত ধোয়ার পর ত্বকের সমস্যা সেরে যায়। এখন দেখা যাচ্ছে, তারা ঠিকই বলেছিলেন। বলাবলি চলছে, কসমেটিক্স আর ফার্মা ইন্ডাস্ট্রিতে এই মাটি বিপ্লব আনতে পারে।

কঙ্গো বেসিনের অরণ্যে গত বারো বছরে প্রায় সাড়ে সাতশোরও বেশি নতুন প্রজাতির জীব পাওয়া গিয়েছে। তাদের মধ্যে কুমির থেকে ইলেকট্রিক মাছ, পেঁচা থেকে অর্কিড সবই আছে। হুড়োহুড়ি পড়েছে De Winton's golden mole এর প্রত্যাবর্তনে, যে ব্যাটা বালিতে সাঁতার দেয়। Leaf-Mimic Frog এর কথাও বলতে হবে, এই ছোট ব্যাঙের ত্বকের টেক্সচার এবং রঙ জঙ্গলের মাটিতে পড়ে থাকা পচা পাতাকে প্রায় পুরোপুরি অনুকরণ করে। ডিএনএ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছে যে এই প্রজাতি সম্পর্কে আগে কিছুই জানা ছিল না। এদের ত্বকে এক বিশেষ কোষ রয়েছে যা তার তাৎক্ষণিক পরিবেশের প্রতিক্রিয়ায় টেক্সচার এবং বর্ণকে সূক্ষ্মভাবে বদলে দিয়ে লুকিয়ে পড়তে পারে। আমার ফেভারিট হল লেসুলা মাংকি, যারা একেবারে মানুষের মতো মুখভঙ্গি করে। দলে বসে থাকলে দেখে মনে হয়, সংসদের অধিবেশন… থাউক সে কথা!

ওদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালানোর সময় ইউরেনিয়াম-থোরিয়াম ডেটিং কৌশল ব্যবহার করে প্রায় ১২,০০০ বছর আগে বিলুপ্ত মেগাফৌনা প্রজাতির গুহাচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এই ছবিগুলোতে অত্যাধুনিক পিগমেন্ট প্রিপারেশন দেখা যায়, রঙ চটে না যায় এইজন্য সেগুলো পশুর চর্বির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, এই গুহাচিত্রে যে সব প্রাণী দেখা যাচ্ছে তাদের সঙ্গে মানুষদের কোনওদিন মোলাকাত হয়েছে বলে জানা ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে, লেট প্লাইস্টোসিন এবং আর্লি হোমো-সেপিয়েন্সের মধ্যে কিছু ইন্টারেকশন হয়েও থাকতে পারে? কারণ প্লাইস্টোসিন যুগের ম্যামথের ছবিতে এই ধরনের কালারিং টেক পাওয়া যায়নি, মানে সেই যুগের শিল্পীদের মগজে তখনও ওঁৎ বুদ্ধি আসেনি। না এসেছিল? নাকি ম্যামথ জাতীয় জীবদের সঙ্গে হোমো সেপিয়েন্সদের সাক্ষাৎও হয়েছে? হেহে, ইটা বাড়াবাড়ি হয়ে গেল! যাই হোক, নানান প্রশ্ন আছে, আপাতত প্যালিও এনভায়োলেন্টমেট কন্ডিশন নিয়ে জোর গবেষণা চলছে সাউথ আফ্রিকায়। এছাড়াও নতুন হিউমিনয়েড প্রজাতি পাওয়া গিয়েছে সাউথ আফ্রিকার আরেক গুহায়।

এখন, এই সব আবিষ্কারগুলোই হয়েছে গত এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে। কোনওটা চার বছর আগে, কোনওটা দশ বছর আগে। কিন্তু এই গবেষণা এখনও কন্টিনিউ হচ্ছে। এখন অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, মাত্র এই? এ আর এমন কি! বেশ, তাহলে আরো কয়েকটা লিস্টি করে দিলাম।

২০২৩ সালের শেষের দিকে তানজানিয়ার জাঞ্জিবারের উপকূলে একটা দুর্দান্ত আবিষ্কার হয়েছে। ম্যারিন বায়োলোজিস্টরা সেখানে একটি কোরাল রিফ সিস্টেম অর্থাৎ প্রবাল প্রাচীর ব্যবস্থা আবিষ্কার করেন যা উষ্ণ সমুদ্রের তাপমাত্রার প্রতি অস্বাভাবিক রেসিলিয়েন্সের পরিচয় দিতে পারে। সবাই জানে, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে কোরাল রিফের তাপ বাড়ছে, তারা কঙ্কালে পরিণত হচ্ছে, কিন্তু এই প্রবাল প্রাচীন সেখানে অবস্থিত হিট রেজিস্টেন্ট অ্যালগির প্রকারের সঙ্গে চমৎকার একটা সিম্বায়োটিক রিলেশনশিপ ডেভেলাপ করেছে। জিনোম সিকোয়েন্সিং করে দেখা গেছে যে জলের তাপ বাড়লেই শৈবালগুলো এসে একটা প্রটেক্টেড লেয়ার তৈরি করে ফেলে। এই আবিষ্কারটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে এই গবেষণার ওপর নির্ভর করে গোটা দুনিয়াযা কোরাল রিফ সংরক্ষণের জন্য কাজ করা যায়, ইতিমধ্যেই বৈজ্ঞানিকরা এই ধরনের শৈবাল ট্র্যাক করে দুনিয়ায় অন্যান্য কিছু জায়গাতেও এইধরনের তাপরোধকারী কোরাল রিফ খুঁজে পেয়েছেন। বিজ্ঞানীরা খুব বেশি মুখ খুলছেন না, কারণ ঘটনাটার একটা আর্থিক রাজনৈতিক দিকও আছে। তাই ঘটনাটা কতটা বাস্তব বোঝা এই মুহূর্তে মুশকিল। তবে হিট রেজিস্টেন্ট কোরাল রিফ সম্পর্কিত বড়সড় কিছু একটা যে পাওয়া গেছে, তাতে সন্দেহ নেই।

২০২৪ সালের শুরুতে ইথিওপিয়ার হাইল্যান্ডে বিজ্ঞানীরা একটা ভূগর্ভস্থ ছত্রাক নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করেন। আগেও পাওয়া গিয়েছিল কাছাকাছি একটা কলোনি, কিন্তু এইবার তারা আগের ডেটা বিশ্লেষণ করে আরো ব্যাপক ভাবে গবেষণা চালিয়েছে। এই ব্যাপক মাইসেলিয়াল ফাঙ্গাই সিস্টেম বিভিন্ন পরিবারের একাধিক বৃক্ষ প্রজাতিকে সংযুক্ত করে, পুষ্টি বিনিময়ের সুবিধা দেয়। আইসোটোপ ট্রেসিং কৌশল ব্যবহার করে দেখা গেছে যে ফাঙ্গাই নেটওয়ার্কটা স্ট্রেস কন্ডিশনে গাছেদের কাছে নিউট্রিশন পৌঁছে দেয়। এই প্ল্যান্ট-ফাঙ্গাই কমিউনিকেশন মেকানিজম ঠিক হলে উপস্থিত ইকলজি মডেলগুলো নিয়ে আবার করে ভাবতে হবে।

২০২৩ সালের মাঝামাঝি নামিবিয়ার মরুভূমি অঞ্চলে কাজ করা উদ্ভিদবিদরা এক succulent প্রজাতির উদ্ভিদ খুঁজে বার করেছেন। এই উদ্ভিদ সোলার রেডিয়েশনের তীব্রতা অনুযায়ী ফোটোসিন্থেসিস পাথওয়েকে বদলে দিতে পারে। জটিল বিজ্ঞানে না ঢুকে বলি, ব্যাপারটা কাজে লাগালে সাহারাতেও সুন্দরবন হতে পারে, মানে খরা অঞ্চলে কৃষি করা বা গাছপালা বসানো অনেক সহজ হয়ে যাবে। একইভাবে কেনিয়ার হাইল্যান্ডসেও একটা উদ্ভিদ পাওয়া গেছে যাদের পাতায় বিশেষ ট্রাইকোম বিকশিত হয়েছে যেগুলো বায়বীয় আর্দ্রতা গ্রহণ করে সোজা হাইস্পিড ট্রেনে করে সেই জল শিকড়ের কাছে পৌঁছে দেয়। এমনকি আর্দ্রতা কম হলে, এই ট্রাইকোম উদ্ভিদকে বাঁচাতে বাতাস থেকে পর্যাপ্ত জলও বের করতে পারে। বায়োমিমিক্রি ইঞ্জিনিয়াররা এই নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন ইতিমধ্যেই। বলুন, এই ধরনের যুগান্তকারী একটা সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের নিউজ চ্যানেলরা দু এক কথা বলতেও তো পারে!

যাই হোক, ওদিকে মাদাগাস্কারেও গত বছর একটা পিঁপড়ে পাওয়া গেছে যে ব্যাটাচ্ছেলে তাদের কোষের মধ্যে ব্যাকটিরিয়া চাষ করছে, এই ব্যাকটিরিয়াগুলো কাজে লাগাতে পারলে ছত্রাকদের থেকে হওয়া সংক্রমণকে একেবারের জন্য নির্মূল করে দেওয়া যেতে পারে। এই খবরটা ইউটিউবে কোথাও দেখেছিলাম বলে সত্যতা প্রমাণিত করতে পারব না, তবে ম্যাডাগাস্কারে যে দুরন্ত সব আবিষ্কার আর গবেষণা চলছে তা সায়েন্স ডট ওআরজি সাইটে গিয়ে পড়লেই জানতে পারবেন।

২০২৩ সালের একদম শেষে দক্ষিণ আফ্রিকায় স্পিলিওলজিস্টরা একটা ফাটাফাটি আবিষ্কার করেছেন। মাটির এক কিলোমিটার নিচে এমন একটা প্রকাণ্ড গুহার নেটওয়ার্ক পাওয়া গেছে যেখানে আগে যাওয়া সম্ভবই ছিল না। কিন্তু আসল কথা হল এই অসম্ভব প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, যেখানে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন প্রাণ বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনাই নেই, সেখানে তারা মাইক্রোঅর্গ্যানিজমের একটা আইসোলেটেড ইকোসিস্টেম খুঁজে পেয়েছে। এই প্রবল অম্লীয় পরিস্থিতিতে কোনও অণুজীব থাকতে পারে তা কেউ চিন্তাও করেনি। কিন্তু এই পুঁচকে অণুজীবগুলো কোন একটা উপায়ে যেন মিনারেল মেটাবলাইজ করে দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। এদের শরীরের কেমিক্যাল পাথওয়ে আর গঠন জানা গেলে মানুষকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বাঁচিয়ে রাখার দিকে একটা নতুন পথ খুলে যাবে, স্পেস ট্রাভেল রেডিয়েশনের ঝুঁকিও অনেক কমে যাবে।

২০২৪ সালে, আরো কিছু জরুরি কাজ হয়েছে, সেগুলো সেই অর্থে আবিষ্কার নয়। প্রথমেই বলতে হয় Operation SAMA এর কথা, অবৈধ চোরাশিকার আর পোচিং আটকে ওয়াইল্ডলাইফ সমৃদ্ধ করার এই প্রজেক্ট উনিশটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে আর উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। সিয়েরা লিওন আর লাইবেরিয়াতে রিফরেস্টেশন প্রোগ্রাম ভালো ফল দিয়েছে, শকুন আর অন্যান্য মাংসাশী পাখিদের সংখ্যা বেড়েছে। পোচিং কমেছে হাতি আর প্যাংগলিনের। জাম্বিয়াতে লেপার্ডের সংখ্যা বিপজ্জনক ভাবে কমে গিয়েছিল, এখন তাদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কোপা ভের্দেতে সাস্টেনেবল ফিশিং শুরু হয়েছে, আশার কথা। হাজার হাজার হতাশাজনক খবরের মধ্যেও দেখে ভালো লাগে এখনও অনেকে প্রকৃতি নিয়ে ভাবে। এখনও আমাদের পৃথিবীতে প্রচুর অজানা রহস্য রয়ে গেছে।


শনিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৫

এক লেখকের জীবন ও মৃত্যু

 


১৯৪২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। ব্রাজিলের পেট্রোপোলিস শহর, যেখানে কার্নিভালের রেশ তখনও কাটেনি। সেইদিন সন্ধ্যায় বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ডিনার সেরে বাড়ি ফিরে এলেন এক দম্পতি, আজ তারা খুব আনন্দ করেছেন, দুজনেই খুশি। তারপর দাঁতফাত মেজে শোয়ার পোশাক পরে শোওয়ার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
পরদিন সকালে পরিচারিকা যখন তাদের ভাড়া করা বাড়ির দরজা খোলে প্রতিদিনের মতো, তখন কোনও সাড়াশব্দ নেই। সাধারণত এই দম্পতি খুব ভোরে উঠতেন, তাই এমন নিস্তব্ধতা দেখে পরিচারিকার সন্দেহ হয়। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে শোওয়ার ঘরের দরজা খুলতেই তার চোখ আটকে যায়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে আছেন, নিথর, প্রাণহীন। কারো দেহে প্রাণ নেই। পরিচারিকা স্তব্ধ, পুলিশ এসে হতবাক। এরা বিদেশি ছিলেন, খুব নামকরা না হলেও সাহিত্য জগতে অনেকে তাঁদের চেনেন। তাদের পরিচিতদের কেউই নাকি আন্দাজ করতে পারেনি যে এমন একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে। আগের রাতেও তারা বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে গল্প করেছেন, ব্রাজিলের প্রতি তাদের মুগ্ধতা, কার্নিভালের আনন্দ এবং ইউরোপের যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। রাতের খাবার টেবিলে তাদের দেখে মনে হয়নি যে এটাই তাদের শেষ সন্ধ্যা। কেউ বোঝেনি, স্বামী স্ত্রী ফিরে যাবেন, পরস্পকে চুমু খাবেন, এবং বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবেন।
পুলিশের ছবিতে দেখা যায়, তারা আগের রাতের পোশাকেই শুয়ে আছেন। পুরুষটি চিত হয়ে শুয়ে আছেন, আর ভদ্রমহিলা তাঁর কাঁধে মাথা রেখেছেন। বেডসাইড টেবিলে একটি নেভানো নাইট ল্যাম্প, তিনটি মুদ্রা, দেশলাই এবং একটি খালি গ্লাস। গ্লাসের পেছনে ছোট একটি চিঠি, হাতে লেখা চিঠি। পর্তুগিজ ভাষায় "Declaraçao" শিরোনামের সেই চিঠিটি আসলে জার্মান ভাষায় লেখা একটি বিদায় বার্তা:
"আমি, নিজের ইচ্ছায় এবং সম্পূর্ণ সজ্ঞানে, এই জীবন থেকে বিদায় নিচ্ছি। আমার শেষ কর্তব্য হিসেবে আমি এই চমৎকার দেশ, ব্রাজিলকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমাকে এবং আমার কাজকে এত সুন্দরভাবে গ্রহণ করেছে। এখানে কাটানো প্রতিটি দিন আমাকে এই দেশের প্রতি আরও বেশি করে ভালোবাসা জুগিয়েছে। আমার মাতৃভাষা এবং আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল ইউরোপ যখন ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন আমি এখানেই নতুন করে জীবন শুরু করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ষাট বছর বয়স পার করে নতুন করে শুরু করার মতো শক্তি আমার আর নেই। তাই আমি মনে করি, সময় থাকতে সম্মানজনকভাবে জীবনের ইতি টানাই ভালো। বন্ধুদের জানাই আমার শুভেচ্ছা! আমি আশা করি, তারা এই দীর্ঘ রাতের পর নতুন দিনের আলো দেখবে। আমি অতিরিক্ত অধৈর্য হওয়ার কারণে তাদের আগেই চলে গেলাম..."
চিঠিতে ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি ছিল ইউরোপে নাজিদের আগ্রাসন এবং যাযাবরের মতো জীবন কাটানোর হতাশা। ঘরে আরও কিছু চিঠি পাওয়া যায়, যা তিনি তাঁর পরিবার এবং বন্ধুদের উদ্দেশ্যে করে লিখেছিলেন। এছাড়াও, কিছু অপ্রকাশিত লেখা উদ্ধার করা হয়, যা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম এই প্রতিভাবান লেখকের বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডারে যুক্ত হয়।
কে এই দম্পতি? অনেকে জানবেন, অনেকে জানবেন না। শিল্পী সাহিত্যিকদের জগতে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। বেশি সংবেদনশীল মানুষদের ডিফেন্স মেকানিজম ভিন্ন, সে নিয়ে প্রায় অনেকেই সহমত হয়েছেন। কিন্তু মৃত্যু নয়, আমার আগ্রহ এই দম্পতির জীবন নিয়ে।
হ্যাঁ, ভদ্রলোকের নাম স্টিফেন জোয়্যাগই বটে। ভিয়েনায় এসে অস্ট্রিয়ান লেখকদের প্রতি একটু টান বেড়েছে। সমসাময়িকদের লেখা খুব অল্পই পড়েছি পিটার হানডকে বাদে, কিন্তু অতীতের যে দুজনকে নিয়ে ফের আকর্ষণ বোধ করেছিলাম তারা হলেন স্টিফেন জোয়্যাগ আর থমাস বার্নহার্ড। কেন জানি জোয়্যাগের জন্য একটা অন্যরকম আবেগ আছে। আমি যদিও ওঁর সব লেখা পড়িনি এখনও, তবু আছে। জীবনকালে তিনি খুব বিশাল নাম করেননি ঠিকই, কিন্তু ইদানীং পাঠক তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করছে, মুগ্ধ হচ্ছে, 'আ নেগলেক্টেড জিনিয়াস' বলে একাধিক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। আমি প্রথমে যে ছোট্ট একটা জিনিস পড়ে ভদ্রলোকের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম, সেটা বই নয়, গল্প নয়, প্রবন্ধ নয়, বরং ভিয়েনা সম্পর্কে একটা ছোট্ট মন্তব্য। ভিয়েনা শহর হিসেবে এত কালচার্ড কেন ? নাজিদের হাতের মুঠোয় থেকেও এই শহর সেন্ট্রাল ইউরোপের কালচারাল ক্যাপিটাল হল কী করে ? জোয়্যাগ যা বলেছেন, আমারও আসলে প্রায় একই ধারণা ছিল, সেইজন্য হয়তো গুগলের কল্যাণে এখানে এসে নেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে তাঁর এই পিসটুকু চোখে পড়েছিল।
There was hardly a city in Europe where the aspiration to culture was more passionate than in Vienna. It was precisely because, after so many centuries, the monarchy, Austria itself, no longer knew either political ambition or military success, that patriotic pride was so strongly attached to the achievement of artistic supremacy. The Habsburg Empire, which had once dominated Europe, had long been despoiled of its most important and prosperous Provinces, German and Italian, Flemish and Wallonian; but the capital remained intact in its ancient splendour, the seat of the court, preserver of a millennial tradition.
আবার তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী শার্লট আল্টম্যান থুড়ি লোত্তে আল্টমানকে নিয়েও আকর্ষণ কম নেই। ভদ্রমহিলা কবি, জাতে বেলজিয়ান, এবং স্বামীর চেয়ে ঢের ছোট। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র চৌত্রিশ। তবু তারা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ ছিলেন শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত। একে অপরের প্রতি স্নেহ ভালোবাসা তো ছিলই, মিউচুয়াল রেসপেক্টও কম ছিল না। লোত্তে আল্টমান কিচ্ছু ছাপাননি মনে হয়, কিন্তু তাঁর কাব্যচর্চার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি স্বামীর সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করতেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন, সম্পাদনাও করতেন তাঁর লেখার। কিন্তু এই মানুষটিকে ভালোবেসেছিলেন কেন? কী দেখে? তাঁর সাহস দেখে, শিড়দাঁড়া দেখে, না লেখা পড়েই মোহিত হয়েছিলেন? কে জানে ?
১৮৮১ সালের ২৮শে নভেম্বর ভিয়েনার এক ধনী ইহুদি পরিবারে স্টিফেন জোয়্যাগ এর জন্ম হয়। (আমি জোয়্যাগ লিখছি বটে, অনেকেই স্বাইগ বা স্বেইগও বলেন শুনেছি, তবে সে থাক, উচ্চারণের রকমফের তো থাকেই) সেই সময় অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য ছিল সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের অধীনে। সম্রাট ছিলেন একজন শিক্ষিত মানুষ, যিনি বহু ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। সংস্কৃতি এবং ভিন্নতার প্রতি সহনশীলতা ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্রে ডক্টরেট করার সময় জোয়্যাগ সাহিত্যিক মহলে পরিচিত হন। ১৯০৪ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস "Los prodigios de la vida" প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি উপন্যাস, সাংবাদিকতা, প্রবন্ধ এবং নাটক লিখতে শুরু করেন। ১৯১০ সালে তিনি ভারত এবং ১৯১২ সালে আমেরিকা ভ্রমণ করেন। ১৯১৩ সালে তিনি সালজবুর্গে গিয়ে বসবাস শুরু করেন, কাকতালীয় ভাবে যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এর আঁচ পড়েছিল বেশি। তিনি সেনার আধিকারিক হিসেবে যোগ দেন, কিন্তু পরে সুইজারল্যান্ডে নির্বাসিত হন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন, এরপর আর কোনওদিন তিনি যুদ্ধের সমর্থন করেননি। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সালজবুর্গে বসবাস করেছেন জোয়্যাগ। ততদিনে তিনি একটু একটু করে বুঝতে পারছেন যে নাৎসি জার্মানি আগেপরে অস্ট্রিয়াকে দখল করবেই। তিনি নিজে ধর্ম পালন করতেন না, কিন্তু বংশগতভাবে ইহুদি ছিলেন বলে তাঁকে যথেষ্ট ভুগতে হয়েছে। তবুও হিটলারের জাতীয়তাবাদী মতবাদের সমালোচনার করে তিনি আজীবন লেখালিখি চালিয়ে গিয়েছেন, যদিও সরাসরি হিটলারের বিরোধিতা করেননি বলে সাহিত্য মহলে কথাও শুনতে হয়েছে কম নয়।
ততদিনে প্রথম স্ত্রী ফ্রিডেরিক মারিয়া বার্গার ফন উইন্টারনিজের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে, নাজিদের ঝামেলা বেড়ে যাওয়ায় একসময় তাঁর নতুন পার্টনার লোত্তে আল্টমানের সঙ্গে অস্ট্রিয়া থেকে পালিয়ে প্রথমে ফ্রান্সে এবং পরে ব্রিটেনে যান।
ইংল্যান্ডের বাথে তারা একটি বাড়ি খুঁজে নেন, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জোয়্যাগের আশা ভেঙে যায়। তিনি আশঙ্কা করতে থাকেন যে জার্মানি হয়তো ব্রিটেনও আক্রমণ করবে, কারণ তাঁর বইগুলো ততদিনে একের পর এক নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং প্রকাশ্যে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দুজনে আগেভাগে নিউ ইয়র্কে পালিয়ে যান। কিন্তু সাধের অস্ট্রিয়াকে দেখতে না পেয়ে তখন তাঁর মনে অবসাদ বাসা বেঁধেছে। কবে দেশে ফিরবেন ঠিক নেই। ম্যানহাটনে স্বস্তি না পেয়ে তিনি লোত্তেকে নিয়ে "The World of Yesterday" লিখতে শুরু করেন, যা অনেকের মতে তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। ১৯৪১ সালে "Schachnovelle" বা রয়্যাল গেম বই হয়ে প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি দক্ষিণ আমেরিকা গিয়ে ব্রাজিলে স্থায়ী ভাবে থাকতে শুরু করেন।
ব্রাজিলের তৎকালীন সরকার ইউরোপীয় ইহুদিদের আশ্রয় দিতে রাজি না হলেও, তাঁর জন্য ব্যতিক্রম কেস হিসেবে পারমিট দেওয়া হয়। ভিয়েনার এই লেখকের খ্যাতি ব্রাজিলের দরজা খুলে দেয় হয়তো। রিও ডি জ্যানেইরো থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে পেট্রোপলিসে তিনি একটি বাংলো ভাড়া নেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি ব্রাজিল এবং এর সংস্কৃতিতে মুগ্ধ হয়ে যান। (কে না হয়) তিনি ব্রাজিলকে একটি সহাবস্থানের মডেল হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে আফ্রিকান, পর্তুগিজ, জার্মান, ইতালীয়, সিরিয়ান এবং জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে। তিনি লিখেছিলেন: "এখানে কোনো বর্ণভেদ নেই, কোনো সেগ্রিগেশননেই, কোনো অহংকার নেই... কে এখানে জাতিগত বিশুদ্ধতার বড়াই করবে?"
কয়েক মাসের মধ্যে তিনি তাঁর শেষ বই "Brazil: Land of the Future" লেখেন, যেখানে তিনি ব্রাজিলের সমাজের প্রশংসা করেন এবং ইউরোপের অন্ধকারের বিপরীতে এই দেশকে তুলে ধরেন। কিন্তু তাঁর এই কাজের জন্যও বিতর্ক সৃষ্টি হয়, কারণ গেটুলিও ভার্গাসের সরকারের প্রতি তাঁর সমর্থন অনেক ব্রাজিলিয়ানকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
ব্রাজিলের প্রতি মুগ্ধতা তাঁর হতাশা দূর করতে পারেনি। নির্বাসনের একাকীত্ব এবং অক্ষশক্তির বিস্তার তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। তাঁর ভয় ছিল, জার্মানি হয়তো ব্রাজিল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। ১৯৪২ সালের কার্নিভালের সময় তিনি এক বন্ধুকে লিখেছিলেন, "সত্যিই কি মনে করো নাৎসিরা এখানে আসবে না? এখন আর কিছুই তাদের আটকাতে পারবে না।" নিজের দেশ এবং মাতৃভাষা থেকে দূরে থাকার কষ্ট তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না।
এর কয়েক দিন পরই আসে ২১শে ফেব্রুয়ারির সেই রাত। স্বামী স্ত্রী দুজনেই একসাথে বারবিচুরেট ওভারডোজ নিয়ে জীবনের শেষ নিদ্রায় শায়িত হন। জোয়্যাগ তাঁর এক বন্ধুর জন্য একটি বিদায় বার্তা লিখে যান: "আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই... আমরা ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি, তাই একে অপরের থেকে আলাদা না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।" লোত্তে তাঁর সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা দেননি। অটোপ্সি করে থেকে জানা যায়, জোয়্যাগের আগে মৃত্যু হয়েছিল এবং লোত্তে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর বিষ খেয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
সেই বিদায় বার্তা বা চিঠি, যা বেডসাইড টেবিলে রাখা ছিল, সেটারও এক গল্প আছে। লেখকের ইচ্ছা ছিল চিঠিটি যেন ব্রাজিলের রাইটার্স ক্লাবের সভাপতি ক্লাউডিও ডি সৌজার হাতে তুলে দেওয়া হয়, কিন্তু তা আর হয়নি। পুলিশ চিঠিটিকে তদন্তের এভিডেন্স হিসেবে নিয়ে যায়। প্রথম সেই চিঠিটি পড়েন ফ্রেডরিখ ওয়েইল নামের জার্মানির এক টেক্সটাইল ব্যবসায়ী। পুলিশ অফিসার জোসে দে মোরাইস তাঁকে চিঠিটি অনুবাদ করতে বলেন। ওয়েইল অনুবাদ করে দেন এবং অনুরোধ করেন তদন্ত শেষ হলে চিঠিটি যেন তাঁকে দেওয়া হয়, কারণ তিনি এই লেখককে ভালোবাসেন এবং শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু পুলিশ জানায়, ব্রাজিলের আইনে তা সম্ভব নয়। এর তিরিশ বছর পর সেই মামলার এক পুলিশ অফিসার ওয়েইলের সাথে যোগাযোগ করেন এবং ১০,০০০ ডলারের বিনিময়ে চিঠিটি বিক্রি করার প্রস্তাব দেন। ওয়েইল রাজি হন এবং রিওর একটি বারে গিয়ে টাকা দিয়ে চিঠিটি কিনে ফেলেন। এরপর তিনি তাঁর বন্ধুদের বারবার সেই গল্প বলতেন, কিন্তু কখনও সে চিঠি দেখাননি। ২০০০ সালে ওয়েইলের মৃত্যুর পর মনে করা হয়েছিল চিঠিটি তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে আছে। কিন্তু সাংবাদিকরা জানতে পারেন, ওয়েইল ১৯৯২ সালেই চিঠিটি জেরুজালেমের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে দান করে দিয়েছেন। আজও সেটি সেখানে সংরক্ষিত আছে।
যাই হোক, জোয়্যাগের লেখার একটা আলাদা বিশেষত্ব আছে। তাঁর লেখায় একটা মেলানকোলি আছে, একটা বিষাদ আছে, কিন্তু একইসঙ্গে একটা আত্মবিশ্লেষণ এর জায়গাও থাকে। তিনি চরিত্রদের মনোজগত নিয়েই থাকেন বেশিরভাগ, গল্প ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে নতুন গল্প শুরু হতে পারে, স্টোরি উইদিন আ স্টোরি হতে পারে, কিন্তু যাই হোক না কেন, গল্পের বাঁধুনি একচুলের জন্যও দুর্বল হয় না। একটা নেশা ধরানো ব্যাপার আছে জোয়্যাগের লেখায়। তাঁর সব লেখাই পাবলিক ডোমেনে, কিন্তু বাংলায় কতগুলো অনুবাদ হয়েছে জানি না।

শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৫

উইন্ডটকার্স

 


নেজ জন্মেছিল নিউ মেক্সিকোর চেকারবোর্ড অঞ্চলে। ইন্ডিয়ান নেটিভদের পরিবার, বাবা মা দুজনেই মেষপালক, দিন চলে কষ্টেসৃষ্টে। কিন্তু দারিদ্র‍্য নিয়েও দিন কাটানো যায়, যদি বাবা মায়ের হাত থাকে মাথার ওপর। দু মুঠো চাল থুড়ি ব্রেড মাংস জুটেই যাবে কোনওক্রমে৷ কিন্তু সে যুগে ওইটুকু সৌভাগ্যও অধিকাংশ নেটিভ ছেলেদের হত না। কড়া নিয়ম মেনে ইন্ডিয়ান দম্পতিদের ছেলেদের প্রায় জোর করেই বাড়ির লোকের চেয়ে দূরে সরিয়ে ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থায় দীক্ষিত করার জন্য বোর্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হত। উদ্দেশ্য সহজ, ইন্ডিয়ানদের তাদের শিকড় থেকে আলাদা করে দেওয়া, তাদের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে আধা মার্কিনি সাহেবে বদলে দেওয়া, যাতে অতীতের মতো ইন্ডিয়ানরা কখনও তাদের অধিকার নিয়ে লড়তে না আসে, মুখ বুজে সাদা চামড়ার কথা মেনে নেয়। তবে এই বদল শুধু খাতায় কলমেই ছিল বলাবাহুল্য। প্রত্যেক নেটিভ ইন্ডিয়ানকেই ভালোরকম বুলিং আর নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হতে হত, তাদের ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে খোঁটা শুনতে হত দিনরাত, মারও খেতে হত আকছার৷ মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই! অনেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত, কিন্তু ধরা পড়লে কঠিন শাস্তি, আর সেক্ষেত্রে পড়াশোনার সুযোগও আর পাওয়া যাবে না। নেজ দাঁতে দাঁত চেপে ঠিক করল, সে সব সহ্য করে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে, কিছুতেই হার মানবে না।
সময় কাটে। নেজ শত বাধাবিপত্তি বৈষম্যকে অতিক্রম করে পড়াশোনা শেষ করে। তার মন সংকীর্ণ ছিল না। তার উপজাতির মানুষের সঙ্গে কত অন্যায় অবিচার হয়েছে সে কথা মনে না রেখে সে দেশের কথা ভেবে ইউ এস ম্যারিনে জয়েন করে।
তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। পার্ল হার্বারে জাপানি আক্রমণের পর মার্কিনি সেনায় সাজো সাজো রব। আটলান্টিকের তীরে মিত্রশক্তির সৈন্য আর প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে মার্কিন নৌবহর— সর্বত্র যুদ্ধের আঁচ। একদিকে জার্মানির হিটলারের নাৎসি বাহিনী, অন্যদিকে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। মিত্রশক্তির কাছে তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেদের মধ্যে সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা। কারণ, রেডিও কমিউনিকেশন ইন্টারসেপ্ট করায় জাপানিদের সমকক্ষ কেউ ছিল না। যতই এনক্রিপ্টেড মেসেজ হোক না কেন, যতই গোপন সংকেত ব্যবহার করা হোক না কেন, জাপানিরা ঠিক বুঝে ফেলত, তাই যুদ্ধক্ষেত্রে অ্যালাইড পাওয়াররা মোটেও সুবিধা করতে পারছিল না। সব স্ট্র‍্যাটেজির কাট জার্মান আর জাপানিরা আগে থেকেই ভেবে রেখেছে। ঠিক এমন সময় একদল ছেলের আগমন হল, যারা বদলে দিল যুদ্ধের গতিপথ। তাঁরা হলেন নাভাজো কোড টকার (Navajo Code Talkers)।
তখন ১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পুরোদমে চলছে। মার্কিন নৌ-বাহিনীর একের পর এক সামরিক পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। এমন সময় ফিলিপ জনস্টন নামের এক ব্যক্তি মার্কিন মেরিন কোরের কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে এলেন। জনস্টন ছিলেন মিশনারির সন্তান। তিনি ইন্ডিয়ান নাভাজোদের মধ্যে বড় হয়েছেন এবং তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, নাভাজো ভাষায় একটি কোড তৈরি করা হোক, যা ব্যবহার করে ইউ এস ম্যারিনরা নিজেদের মধ্যে নিরাপদে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারবে।
নাভাজোদের কথা উঠতে নেভি কর্তাদের মনে পড়ল, তাদের ইউনেটেই তো এমন বেশ কিছু ছেলেমেয়ে আছে। নেজ বলে যে ছেলেটাকে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোর্ডিংয়ে পাঠানো হয়েছিল, সে খুবই দক্ষ ম্যারিন। নাভাজো ভাষা তো জানেই, ইংরেজিতেও বলতে পারে গড়গড় করে। প্রযুক্তিগত জ্ঞানও চমৎকার। ফিলিপ জোরাজুরি করলে তাকে সঙ্গে করে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করাই যায়। কিন্তু সেই নিয়ে খুব একটা ভরসা কারোরই ছিল না। নেটিভ ইন্ডিয়ানদের ওপর এমনিতেও সেকালে কেউ বিশেষ ভরসা করত না।
ফিলিপ অবশ্য জানতেম, এই ছেলেগুলোর জবাব নেই। তারা সাহসী, বুদ্ধিমান, ডেডিকেটেড। নাভাজোদের ভাষাও অত্যন্ত জটিল, তার কোনও লিখিত রূপও নেই। এই ভাষার জটিলতা এবং সীমিত ব্যবহারই সেটাকে কোড হিসেবে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত করে তুলবে। কারণ, জাপানিদের পক্ষে এই ভাষা বোঝা প্রায় অসম্ভব।
মার্কিন ম্যারিন কোর প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান ছিল, কিন্তু ক্ষিদে পেলে বাঘে ঘাস খায়। বিপাকে পড়ে তারা জনস্টনের প্রস্তাবে রাজি হয়। শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। নেজ এবং উনত্রিশজন নাভাজো তরুণকে নির্বাচন করা হল, যাদের কাজ ছিল ম্যারিন কোরের জন্য একটি নতুন কোড তৈরি করা। এই উনত্রিশজন যোদ্ধা ছিল নাভাজো কোড টকারের প্রথম প্রজন্ম।
নেজ ও অন্যান্য নাভাজো ম্যারিন তরুণ মিলে এমন একটি জটিল কোড তৈরি করল, যেখানে দৈনন্দিন ব্যবহৃত শব্দগুলোর বদলে সামরিক পরিভাষা ব্যবহার করা হত। উদাহরণস্বরূপ, 'বোমা' বোঝাতে নাভাজো ভাষায় 'ডাহে-ডী-টিন-ডী' (da-he-di-tih-hi) শব্দটি ব্যবহার করা হতো, যার অর্থ 'ডিমের মতো'। একইভাবে, 'সাবমেরিন'-এর জন্য ব্যবহার করা হতো 'বে-লো-হানা' (besh-lo-cha-ah), অর্থাৎ 'লোহার মাছ'।
এই কোড এতটাই জটিল ছিল যে খোদ নাভাজোরাও, যারা এই কোড তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল না, এর কিছুই বুঝতে পারত না।
কাজ সেখানেই শেষ নয়। ফ্রন্টে পাঠানোর আগে এই কোড টকারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হল নানাভাবে। নেজ যোগ দিল প্যাসিফিক ওয়ারে মোতায়েন গুয়াদালকানাল ইউনিটে। এতদিন শুধুই ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে কাজ হচ্ছিল, এইবার হাতেকলমে তার ব্যবহার শুরু হল, নাভাজো কোড টকাররা সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে শুরু করল। তাদের কাজ ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে সংকেত ট্রান্সমিট এবং রিসিভ করা। নাভাজো কোড টকাররা এতটাই দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে কাজ করত যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ইউনিটটা ম্যারিনদের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠল।
সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাভাজো কোড টকারদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা প্রশান্ত মহাসাগরের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। গুয়াদালক্যানাল, তারাওয়া, ইওজিমা এবং ওকিনাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোতে তাদের পাঠানো সংকেতের ওপর নির্ভর করেই মার্কিন সেনারা কৌশল নির্ধারণ করত।
ইওজিমার যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই যুদ্ধে নাভাজো কোড টকাররা আটশোর বেশি বার্তা পাঠিয়েছিল, যার একটিও ভুল ছিল না। এই নির্ভুল যোগাযোগ ব্যবস্থা ম্যারিন সেনাদের দ্রুত যুদ্ধ জিততে সাহায্য করেছিল।
মেজর হাওয়ার্ড কনর, যিনি ইওজিমার যুদ্ধে নাভাজো কোড টকারদের সিগন্যাল অফিসার ছিলেন, বলেছিলেন, "যদি নাভাজোরা না থাকত, তাহলে ম্যারিন সেনারা কখনোই ইওজিমা দখল করতে পারত না।" জাপানি সামরিক বিশেষজ্ঞরা সব ধরনের চেষ্টা করেও এই কোড ভাঙতে ব্যর্থ হন।
বলাবাহুল্য, নেজ এই সমস্ত কিছুর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ছিল। এনক্রিপশন আর ডিক্রিপশনে তার মতো দক্ষ বিশেষ কেউ ছিল না, কিন্তু এর পাশাপাশি নেজের অবজার্ভেশনাল পাওয়ারও ছিল সাংঘাতিক। একবার সে যা দেখত, সে তার মাথায় ছাপা হয়ে যেত। ভাগ্যিস, কারণ যুদ্ধের বহুবছর পর নেজ 'কোড ব্রেকার' বলে একটা বই লিখবে, যা পড়ে নাভাজো সংস্কৃতি আর যুদ্ধে নাভাজো কোড টকারদের ভূমিকা সম্পর্কে বিশদে জানা যাবে৷ জাপানি সৈনিকদের ডু অর ডাই অ্যাটিটিউড নিয়েও তিনি ডিটেলে লিখেছেন।
"The Japanese who held Guadalcanal were trained not to surrender. Their war strategy revolved around the Bushido code, an ancient way of the warrior first developed by the Samurai. This code of conduct extolled loyalty and obedience. Soldiers were required to fight to the death and take as many of their enemy with them as they could. Even facing impossible odds, Japanese soldiers chose to blow themselves up hoping to blow American soldiers up rather than surrender. They would die for their Emperor."
যুদ্ধের পর বহু বছর পর্যন্ত নাভাজো কোড টকারদের প্রোগ্রামের ইনফর্মেশন গোপন রাখা হয়েছিল। কারণ, মার্কিন সরকার মনে করত, ভবিষ্যতে আবারও এই কোডের প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘকাল তাঁরা ছিলেন বিস্মৃতির অন্তরালে। যে সমস্ত নাভাজো ইন্ডিয়ান নীরবে দুনিয়ার ইতিহাস বদলানোর জন্য জীবনের তোয়াক্কা করেনি, তাদের কথা কেউ জানল না। যুদ্ধ শেষ হল, নেটিভ ইন্ডিয়ানদের প্রতি মনোভাবে বদল এল না। নেজের মতো সবাইকেই সারাজীবন কটাক্ষ শুনে যেতে হয়েছে।
অবশেষে, ১৯৮২ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান নাভাজো কোড টকারদের স্বীকৃতি দেন এবং ১৪ই আগস্টকে 'নাভাজো কোড টকার দিবস' হিসেবে ঘোষণা করেন। ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মূল উনত্রিশজন নাভাজো কোড টকারকে 'কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল' দিয়ে সম্মানিত করেন। ক্রিপ্টোগ্রাফির ইতিহাসে এমন সব কাহিনি আছে শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। নাভাজো কোড টকারদের কাহিনি তাদের মধ্যে অন্যতম।

বৃহস্পতিবার, ২৭ মার্চ, ২০২৫

ঘিবলিকে একা থাকতে দিন

 


কাজুও ওগা বলে কারো কথা লিখতে গেলে কতজন তাঁকে চিনতে পারবেন বলা মুশকিল। কিন্তু যদি বলি তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি স্টডিও ঘিবলির (অথবা জিবলির, উচ্চারণে কিছু আসে যায় না) মনকাড়া সিনেমার মায়াবী ব্যাকগ্রাউন্ডগুলো এঁকেছেন, মিয়াজাকির প্রিয়পাত্র এবং ঘিবলি স্টুডিওজের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর, তাহলে অনেকেই নড়েচড়ে উঠবেন। ভদ্রলোক সম্পর্কে দু চার কথা লিখতে ইচ্ছে হল। কেন হল, সে কথা পরে লিখছি।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বলা যায়, কাজুও ওগা, স্টুডিও ঘিবলির একজন কিংবদন্তী তো বটেই, অ্যানিমেশন জগতে তাঁর অবদানও অনস্বীকার্য। ওগা শুধু ছবি আঁকেন না, তিনি তাঁর তুলির আঁচড়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রাণ সৃষ্টি করেন। তাঁর কাজের গভীরতা, রঙের ব্যবহার এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি ফ্রেমে স্পষ্ট বোঝা যায়।

কাৎসুহিরো ওতোমো একবার বলেছিলেন, চরিত্র মানে ক্যারক্টার অ্যানিমেশনের চেয়েও পটভূমি মানে ব্যাকগ্রাউন্ড বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একটা বড় বিল্ডিং নির্মাণ করতে গেলে তার ভিত শক্ত হওয়া ভীষণ দরকার। ওগা সেই ভিত স্থাপন করেন, গল্পের ফাউন্ডেশন সৃজন করেন। মিয়াজাকির সিনেমায় আমরা যে জগৎ দেখি, দেখে মুগ্ধ হই, তার পেছনের কারিগর হলেন কাজুও ওগা। হ্যাঁ, মাই নেবার তোতোরো অথবা কিকিস ডেলিভারি সার্ভিস কিংবা হালের দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরন, সমস্ত সিনেমার ক্যানভাস তিনি ভেবেছেন, এঁকেছেন। ভারতে না হলেও জাপানে সবাই তাঁকে একবাক্য চেনেন। ওগা ব্যাকগ্রাউন্ডকে কেবল কোনও স্থান হিসেবে দেখেন না, বরং ব্যাকগ্রাউন্ডের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইমোশনটাকে বুঝতে চান। গল্পের সঙ্গে কোন ব্যাকগ্রাউন্ড যাবে, তা মানানসই কিনা, সেখানে রঙ বা এলিমেন্ট কী হবে, সেসব তো আছেই, কিন্তু এই প্রতিটা ব্যাকগ্রাউন্ড প্যানেল যেখানে চরিত্ররা ঘুরেফিরে বেড়াবে, তাদের জীবন ও ভাবনার সঙ্গে সেই ব্যাকগ্রাউন্ডের ইমোশনাল কানেক্ট হচ্ছে কী না, সেটা বোঝা, খোঁজা, আঁকা, পরীক্ষা করা আর ফুটিয়ে তোলাই তাঁর প্রধান কাজ। অবশেষে, প্রতিবার ওগা অসামান্য ব্যাকগ্রাউন্ড উপহার দেন, এমন এক অনুভূতি তৈরি করেন, যা দর্শকদের মনে গেঁথে থাকে বহুদিন বাদেও।

নাওয়া তানাকা (Naoya Tanaka) বলেছেন, ওগা প্রকৃতির স্বাভাবিক দৃশ্য ভাবেন না, বরং সেই দৃশ্যের গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্টগুলোর মূল ভাবনা বা সার এক্সট্র‍্যাক্ট করেন এবং সেগুলোকে এমনভাবে অগামেন্ট করেন, যাতে পরিচিত ল্যান্ডস্কেপ দেখেও déjà vu-এর মতো মনে হয়। তাঁর কাজের বিশেষত্ব, তিনি খুব সাধারণ উপকরণ ব্যবহার করেন। এমনিতেও পেশাদার কাজে যে পোস্টার কালার ব্যবহার করতেন, তা সাধারণত স্কুলের বাচ্চারা ব্যবহার করে। বাচ্চাদের রোজকার রঙ ব্যবহার করে জাপানের অন্যতম শিল্পী এমন সব চমকপ্রদ ল্যান্ডস্কেপ এঁকে সারা দুনিয়ায় লোককে মুগ্ধ কর রেখেছেন, সে কথা জেনে অনেকে অবাক হয়, বাচ্চারা সেই কথা জেনে ভীষণ ভাবে অনুপ্রাণিত হয়। জাপানের ব্যাকগ্রাউন্ড শিল্পীদের জন্য এরপর পোস্টার কালারই ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড হয়ে যায়। স্টুডিও ঘিবলি Nicker Poster Color ব্যবহার করত, যা অনেকটা ওপেক ওয়াটার কালারের মতোই।

ভাবলে অবাক হতে হয়, এত এত কাজ, এই সমস্তই ওগা করেছেন মাত্র একুশটা রঙ ব্যবহার করে। রঙ নয়, এলিমেন্টের সঙ্গে মানানসই অনুভূতি ফুটিয়ে তোলাই ছিল প্রধান কাজ, ছোট ছোট জিনিসের ওপর ফোকাস করতেন, তারপর কম্বিনেশন ব্যবহার করে পছন্দসই লুক আনার চেষ্টা করা হত। রঙের গ্রেডেশন আর কম্বিনেশন নিয়ে খেলতেন, অল্প অল্প রঙ ব্যবহার করে সূক্ষ্মভাবে মিশিয়ে নানারকম শেড আঁকতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। পছন্দ না হলে আবার আঁকা হত। এক একটা সময় একটা ল্যান্ডস্কেপ একশো থেকে দুশবার আঁকা হয়েছে, বছর ঘুরে গেছে। কিন্তু যতক্ষণ না সেই আবেগটা ফুটে উঠছে, ওগা থামেননি, হতাশও হননি। রঙ বাদে কী থাকত তাঁর টেবিলে? কাগজ, জাপানি ফ্ল্যাট ব্রাশ TMK poster paper, fine-pointed Sakuyo ব্রাশ...ব্যস!

কিন্তু শুধুই কি দক্ষতা? না, পরেরদিকে লে আউট আর স্টোরিবোর্ড এর জন্য টিম থাকত, ওগার কাজ ছিল ফ্রিমিক্সিং এর ব্যবহার করে ব্যাকগ্রাউন্ডগুলো কংক্রিটে করা। কিন্তু টেবিলে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই রিসার্চ শুরু হত, দিনের পর দিন তিনি শহরতলি আর গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন, প্রকৃতিকে দেখতেন, মেঘ ছায়া রোদ্দুর দেখে রাফ স্কেচ করতেন, এই অবজার্ভেশন থেকেই কল্পনা উঠে আসত। পমপোকোর ঋতুবদলের সিন আঁকার জন্য তিনি তামাতে গিয়ে থাকতেন, সেখানকার ফলিয়েজ আর সিনারি মনে তুলে নিতেন, কাজের প্রতি নিষ্ঠার কোনও অভাব ছিল না। সে যতই পরিশ্রম হোক না কেন, যত দিনই লাগুক না কেন!

ওগা একা নয়, স্টুডিও ঘিবলির প্রতিটা কর্মী তিরিশ চল্লিশ বছর ধরে এই নিষ্ঠা দেখিয়েছে। যতগুলো সিনেমা আপনি দেখেছেন, তার একটাও কম্পিউটারাইজড অ্যানিমেশন নয়, প্রতিটা হাতে আঁকা। এক একটা মুভমেন্ট অনেক সময় বছর কাবার করে দিয়েছে। একটা ভিড়ের সিন দেখানোর জন্য কুড়িজন শিল্পী মিলে ছয়মাস ধরে হাজার হাজার স্টোরিবোর্ড এঁকেছেন। একটা সিনের জন্য। সিনেমাগুলো শুধু শুধুই হয়নি।

ইদানীং দেখছি, এআইতে ঘিবলি মুভিজের অনুকরণে একের পর এক ছবি হচ্ছে। আজ সকাল থেকে দেখলাম, হিন্দি বাংলা ছবির স্টিলের অনুকরণে গাদা গাদা ছবি জেনারেট হয়েছে, মুহুর্তের মধ্যে সেগুলো ক্রিয়েট করা যায়। কেউ ইমোশন নিয়ে ভাবে না, কেউ অবজার্ভ করে না, কেউ দিনের পর দিন পিঠ বেঁকিয়ে আঁকে না, কিন্তু ছবি হচ্ছে। কয়েকদিন আগে মিয়াজাকিতে এই নিয়ে প্রশ্ন করাতে তিনি বলেছিলেন, তিনি যারাপনাই ডিসগাস্টেড। এ শুধু শিল্পীদের নয়, মানুষের জীবনেরই অপমান। ইটস অ্যান ইনসাল্ট টু লাইফ ইটসেল্ফ।

সময় বদলাবে। প্রযুক্তি আসবেই। সব কিছু নর্মালাইজ হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুটা সম্মান কি না থাকলেই নয়? এআইকে দিয়ে ঘিবলি স্টাইলে ছবি করার চেয়ে একটা স্বতন্ত্র ভাবনার ছবিই তো হতে পারে! কিন্তু জানি, এই নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। হয়তো কয়েক বছর পর এআই মিয়াজাকির স্টাইলে একটা গোটা সিনেমাই বানিয়ে দেবে। সেখানে কাজুও ওগা রঙয়ের কম্পোজিশন নিয়ে ভাববেন না, গাছপালা পাখিদের দেখে সময় নষ্ট হবে না, হাজার হাজার শিল্পীকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনের পর দিন আঁকতে হবে না। কিন্তু সিনেমা হিট হবে, ট্রেন্ড করবে, আমরা পোস্ট করব, পুরস্কারও পাবে সেই সিনেমা। মানুষের হাতে না তৈরি হলেও এআই আর্ট ক্রমে হিউম্যান আর্ট হয়ে যাবে, হিউম্যান ক্রমে ইনহিউম্যান হয়ে যাবে মানুষ থেকেও। তাই সইই।

কিন্তু, আমি চিরকাল মানুষের বানানো সিনেমাই প্রেফার করব। এইটুকু সেকেলে হয়ে থাকাই আমার প্রতিরোধ। আমি মানুষ হয়ে জন্মেছি, মানুষ হয়েই মরব।

বুধবার, ২৬ মার্চ, ২০২৫

দ্য চেলিস্ট অফ সারাজেভো

 


শিল্পের দুনিয়ায় কালচারাল রেজিস্ট্যান্স বলে একটা কথা আছে। তেমন কোনও বিপর্যয় হলে, ফ্যাসিবাদী সরকারের জোরজুলুম বাড়লে, যুদ্ধ লাগলে শিল্পীরা নিজের মতো করে বিরোধ করে। কেউ কবিতা লেখে, কেউ গান বাঁধে, কেউ ছবি আঁকে। কিন্তু আসলে একজন মানুষের ক্ষমটা ঠিক কতটা? তাঁর এই প্রতিবাদী স্বর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে মানুষের মনে? বাস্তবে এই রেজিস্ট্যান্সের কোনও মূল্য আছে? 

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমরা বরং পঁয়তাল্লিশ বছর পিছিয়ে যাই। এই সেই সময় যখন পৃথিবীর বুকে একটা রাজনৈতিক বদলের সূত্রপাত ঘটেছিল। ১৯৮০ সালে ইউগোস্লোভিয়ার রাষ্ট্রপতি জোসিপ ব্রজ টিটো মারা গেলেন। এখন টিটো যত বড় ক্রিমিনালই হোক না কেন, তিনি প্রায় জোর করেই ইউগোস্লোভিয়ার সোশালিস্ট সাম্রাজ্যকে সামলে রেখেছিলেন, ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ন্যাশনালিস্ট সেন্টিমেন্টও সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতোই ভিতরে ভিতরে ফুটছিল ঠিকই, কিন্তু সেভাবে বিষ্ফোরণ হয়নি। টিটোর মৃত্যু সেই আগলকে আলগা করে দিল। কোসোভো থেকে সার্বিয়া, নানা জায়গায় লোকজন বিদ্রোহ করতে শুরু করল। এর কয়েক বছর পরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়তে লাগল, আর বালকানের একাধিক দেশ স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুরু করে দিল। এদের মধ্যে, বলাবাহুল্য, বোসনিয়া-হার্জেগোভিনা অন্যতম ছিল। বোসনিয়ার কথা আলাদা করে বলার কারণ, এই গল্পের প্রেক্ষাপট বোসনিয়ার রাজধানী সারাজেভো। 

সারাজেভো আসলে একটা উপত্যকা নগরী। পাশ দিয়ে মিলয়াকা নদী বয়ে গিয়েছে। ১৯১৪ সালে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউককে এখানেই হত্যা করা হয়েছিল, যার ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সারাজেভো ইউগোস্লোভিয়ার অংশীভুক্ত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা শহরটাকে অধিকার করে, তারপর দেখা যায় ক্রোয়েশিয়ার আল্ট্রান্যাশনালিস্ট-ফ্যাসিস্ট বিপ্লবী দল উস্তাসের (Ustaše) হাতে পড়ে সারাজেভো ক্রোয়েশিয়ার অংশ হয়ে গেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে হতে সারাজেভো আবার ইউগোস্লোভিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে আর সোস্যালিস্ট রিপাবলিক অফ বোসনিয়া আর হার্জেগোভিনার রাজধানী হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এই শহরে তখন বোসনিয়ানরা তো থাকতই, সার্ব আর ক্রোটসরাও থাকত মিলেমিশে। একটু আধটু ঝামেলা থাকলেও কোনোদিন  জাতি নিয়ে রেসিয়াল টেনশন বা দাঙ্গা হাঙ্গামা শোনা যায়নি। 

গোল বাধল তখন, যখন ৬ মার্চ ১৯৯২ সালে বোসনিয়া হার্জেগোভিনা স্বাধীনতার ঘোষণা করে ফেলল। সার্বদের একাংশ এই ঘোষণাকে মোটেও আমল দিল না, তারা Republika Srpska বলে একটা নতুন স্টেট বানিয়ে স্বাধীন দেশের মতো কাজ শুরু করে দিল। এইবার এই Srpska-তে বোসনিয়ার কিছু অঞ্চলও ঢুকে গিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি রাদোভান কারাদজিক নিজে সার্ব, তিনি বোসনিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে অন্য অঞ্চলগুলোও এই নবনির্মিত 'দেশ'-এ নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন।

এইবার এই যুদ্ধে কী হয়েছিল না হয়েছিল সে অন্য বিষয় এবং অনেক জটিল বিষয়, কিন্তু এই যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি কোপ পড়ল সারজেভোর সাধারণ মানুষের ওপর। একে তো ইউগোস্লোভিয়ান ওয়ার চলছে, স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই ইউগোস্লোভিয়ার সেনাবাহিনী সারাজেভোকে ঘিরে আক্রমণ করছে, তারপর এসে জুটেছে এই শ্রপ্সকা (Srpska) ট্রুপরা। সাঁড়াশি আক্রমণে সারাজেভোর নাজেহাল অবস্থা। সেখানে বোসনিয়ার মানুষ বেশি, তাই সার্বদের রাগ আরো বেশি করে গিয়ে পড়ল রাজধানীর ওপর। প্রথমে ইউগোস্লোভিয়ার সেনা শহরকে ঘেরাও করে রেখেছিল, তারপর শ্রপ্সকা বাহিনী এসে সারাজেভোকে ঘিরে ফেলল। একদিন নয়, এক সপ্তাহ নয়, এক মাস নয়, প্রায় চার বছর ধরে এই সিজ চলল। তেরো হাজার সৈনিক শহরটাকে ঘিরে রেখেছে, আর্টিলারি ফায়ার করছে, ট্যাঙ্ক নিয়ে শহরে ঢুকছে, মর্টার চার্জ করে শহরের নিদর্শনগুলোকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, আনতাবড়ি গুলি চালাচ্ছে নিরপরাধ সিভিলিয়ানদের ওপর। 

একটা শহরকে 'সিজ' করলে কী হয়? একটু ভেবে দেখুন। একটা শহরের খাবার বা পানীয় জল, সবই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরবরাহ হয় বাইরে থেকে। বিদ্যুৎ, ওষুধপত্র, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র... জীবনধারনের জন্য সব কিছুই আসে গ্রাম বা গঞ্জ থেকে। এখন কেউ শহরকে ঘিরে যদি এই সাপ্লাই লাইন কেটে দেয়, তাহলে কী হবে? মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে৷ তারপর যদি কেউ রাস্তায় নেমে আপনার ওপর গুলি চালায়, বোমা ফেলে... তাহলে? সোনায় সোহাগা! একদিন দুদিন নয়, দীর্ঘ চার বছর ধরে এমন হয়েছে। আধুনিক যুগে এমন নজির আর নেই। স্টালিনগ্রাড আর লেনিনগ্রাডে যে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, সারাজেভোর অবস্থা হয়েছিল তার চেয়েও শোচনীয়। একের পর এক ম্যাসাকার, একের পর এক নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে হাজার হাজার মানুষ মরেছে, বিল্ডিংগুলো ধ্বসে গেছে, স্কুল, হাসপাতাল, কমিউনিটি সেন্টার ধুলোয় মিশে গেছে, শিশুদের লাশ ধুলোয় লুটিয়েছে দিনের পর দিন। বোসনিয়ার ৭০০০০ ট্রুপ এই শহরে মোতায়েন, কিন্তু সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়ার ফলে তাদের কিছু করার ছিল না।

খাবার নেই, জল নেই, যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই, কাজকর্ম নেই, আছে শুধু অন্তহীন অপেক্ষা। অন্ধকারে মোমবাতি জ্বেলে বসে থাকত লোকে। কখন মর্টার চার্জ হয়ে মরতে হবে ঠিক নেই। ১৯৯২ সালে সারাজেভোর জনসংখ্যা ছিল ৫ লাখ, চার বছর বাদে যখন সিজ তোলা হয়, তাদের মধ্যে অনকেই আর নেই। যারা আছে, তারা কঙ্কালসার হয়ে বেঁচে রয়েছে।

শুধু বোসনিয়ান নয়, এই যুদ্ধে মূল্য চুকিয়েছে সার্ব জনতাও। যুদ্ধের পর তাদের কাছে ঘরদোর ছেড়ে শ্রপ্সকা রাজ্যে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প ছিল না।

কিন্তু এই ভীষণ হতাশাজনক সময়েও একজন মানুষ ছিল, লোকজন যাকে দেখে ভরসা পেয়েছে, আশায় বুক বেঁধেছে, সাহস পেয়েছে আগামীর স্বপ্ন দেখার। না, তিনি কোনও রাজনেতা নন, কোনও সেলেব নন, কোনও শক্তিশালী সুপারহিরো নন, তিনি একজন সাধারণ মানুষ। একজন শিল্পী। 

মে ২৭, ১৯৯২। দুপুরের দিকে একদল লোক বাজারে পাউরুটি কিনতে গিয়েছিল। এমন সময় প্রচণ্ড শব্দ করে একটা বোমা এসে পড়ে সেখানে। বাইশজন মারা যায়, সত্তরজন আহত হয় ভয়ানক ভাবে। কারো হাত উড়ে গেছে, কারো পা নেই, জনশুন্য বাজারে শুধু রক্ত আর বারুদের গন্ধ। রক্তমাখা পাউরুটির টুকরো পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষের ভিতর।

অনেকেই দেখতে এসেছিল, ফিরেও গিয়েছিল। কী আর করার আছে তাদের? কিন্তু, একজন ফিরে আসেনি। সে দীর্ঘ সময় ধরে তাকিয়ে ছিল রক্তাক্ত দেহগুলোর দিকে, তার চোখ বেয়ে নামছিল জলের ধারা।

লোকটার নাম ভেদ্রান স্মেলোভিক। পেশায় একজন চেলো প্লেয়ার। আর কিছুই সে পারে না। এখন যুদ্ধের মধ্যে কে আর চেলো শুনবে, কে আর সঙ্গীতানুষ্ঠান করবে? তাই তাঁরও কিছু করার ছিল না। 

কিন্তু, এক একটা মুহুর্ত অনেকের মনে অনেক কিছু  বদলে ফেলতে পারে। পরদিন স্মেলোভিক আবার সেই বাজারে এল, পরনে একটা ময়লা সাদা শার্ট আর একটা কালো টেল কোট, হাতে চেলোর বাক্স। এক হাতে ফুলের গোছা। বাজারে এসে সে ধ্বংসাবশেষের ওপর ফুল ছড়িয়ে দিয়ে মৃতদের উদ্দেশ্য করে প্রার্থনা করল, তারপর একটা ভাঙা পাথরের ওপর বসে চেলো বাজাতে শুরু করল।

কেউ কোথাও নেই। নিঃশব্দ শহর, বাতাসে বারুদের গন্ধ। ভাঙা বিল্ডিংয়ের টুকরো ছড়িয়ে আছে সর্বত্র, ধুলো উড়ছে। অনেক দূর থেকে টেলি লেন্স দিয়ে সার্ব সৈনিকরা তাকে দেখতে পাচ্ছে, এক্ষুনি স্নাইপারের গুলিতে তার বুক ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু মানুষটার সে সব খেয়াল নেই। সে একমনে চেলো বাজিয়ে চলল। আলবিনোনি আডাজিওর জি মাইনারের সুর গুঞ্জরিত হতে লাগল সারাজেভোর অলিগলি। যারা শুনল, ভাবল লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এখনও যে গুলি খেয়ে বা বোমা ফেটে মরেনি এই আশ্চর্য! এমন পাগলামি কেউ করে?

হ্যাঁ, কেউ কেউ করে। একবার নয়, বারবার করে। পরদিন স্মেলোভিক আবার ফিরে এল সেখানে। আবার বাজাতে লাগল সেই সুর। একই জায়গা, একই সুর, একই দরদ দিয়ে। তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। তারপর দিন সে আবার ফিরে এল। তারপর দিন আবার এল।

বাইশ দিন ধরে, ক্রমাগত, একই জায়গায় এসে সে চেলো বাজিয়ে গেল। বাইশজন অকালমৃত মানুষের স্মৃতির উদ্দেশে। শেষের কয়েকদিন কেউ আর তাকে পাগল বলেনি, বরং ক্রমে একে একে আরো মানুষ এসে জড় হয়েছেন সেখানে। চুপ করে দাঁড়িয়ে বাজনা শুনেছেন, প্রার্থনা করেছেন, ফুল চড়িয়েছেন। সকলেই ভীত, সন্ত্রস্ত, আশঙ্কিত। সবাই জানে শত্রুরা তাদের দেখতে পাচ্ছে। একটা মর্টার চার্জ করলে সবাই মরবে। কিন্তু তবু তারা এসেছেন। প্রথমে দুজন, তারপর চারজন, তারপর পনেরোজন... একজন মানুষ যখন নিজের জীবনের চিন্তা না করে চেলো বাজাতে পারছে, তারা একটু সঙ্গও দিতে পারবে না? যারা চলে গিয়েছে, তাদের একটু শ্রদ্ধাও জানাতে পারবে না মৃত্যুর ভয়ে? তাহলে মানুষ হয়ে জন্মে আর লাভ কী?

বাইশদিন পর সবাই ভাবল, চেলিস্ট মহাশয় এইবার ক্ষান্ত দেবেন। কিন্তু কোথায় কী? দেখা গেল ভেদ্রান স্মেলোভিক তার টেল কোট পরে অন্য এক জায়গায় উপস্থিত হয়েছেন, অন্য কোনও ধ্বংসস্তুপের মধ্যে বসে তিনি বাজিয়ে চলেছেন তাঁর বাজনা! এই তাঁর প্রতিবাদ! এই তাঁর শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।

দু একদিন নয়, দীর্ঘ দু বছর ধরে এই মানুষটি চেলো বাজিয়েছেন যুদ্ধের পরোয়া না করে। সেরাজেভোর বুকে রোজ সকালে বেজে উঠত তাঁর সেলোর সুর। কোনোদিন ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল, কোনোদিন হাসপাতাল, কোনোদিন ভেঙে পড়া কবরখানার ভিতর থেকে। একদিনের জন্যও থামেননি। সবাই ভাবত, আজই বুঝি শেষ দিন। সেলিস্টটার ছিন্নভিন্ন দেহ নিয়ে আসতে হবে তাদের। কিন্তু, স্মেলোভিক মরেননি। হয়তো শত্রুরাও তাঁকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে এই মানুষের কথা লোকে জানতে শুরু করে।  হোয়ান বায়েজ সারাজেভোতে এসে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন, চলে আসেন সুসান সোনটাগ। শিল্পীমহলে তখন স্মেলোভিক এক কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন৷ সারা দুনিয়া থেকে শিল্পী, লেখক, গায়করা তাঁকে সমর্থন জানাচ্ছেন, তাঁকে নিয়ে বই, নাটক, গান লেখা হচ্ছে, শয়ে শয়ে শিল্পী এসে যুদ্ধবিরোধী মিছিল করছেন সারাজেভোতে। উইনাইটেড নেশনসের টনক নড়েছে, শিল্পীদের বিবৃতি আর অনুরোধের ফলে সাহায্য আসছে একটু একটু করে। সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে তখন একদিকে গুলির শব্দ, অন্যদিকে সঙ্গীত অনুষ্ঠান হচ্ছে। 'চেলিস্ট অফ সারাজেভো' নিয়ে সারা দুনিয়ায় লেখালিখি হচ্ছে, চাপ পড়ছে যুদ্ধবিরতির জন্য। 

১৯৯৬ সালে সারাজেভোর সিজ তুলে নেওয়া হয়। শান্তিও আসে একসময়। তার অনেক আগেই স্মেলোভিক নর্দার্ন আইল্যান্ডে চলে গেছেন, এখনও ওখানেই থাকেন। প্রচারমাধ্যম থেকে নিজেকে যথাসম্ভব সরিয়ে রেখেছেন। বলেছেন, "আমি শিল্পী, সেলেব নই। সারাজেভোর মানুষ হয়ে যেটুকু করা জরুরি মনে হয়েছিল, ততটুকুই করেছি। আমাকে হিরো বানাবেন না।"

স্মেলোভিক এর কাহিনি অবশ্য থেমে থাকেনি, তা ছড়িয়ে গিয়েছে সারা দুনিয়ায়। এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে। কারিম ওয়াস্ফি বাগদাদের বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া বাজারে দাঁড়িয়ে তাঁর মতো চেলো বাজিয়েছেন, পারফর্ম্যান্স আর্টিস্টরা নিজের নিজের মতো করে যুদ্ধ আর অবিচারের জন্য প্রতিবাদ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন এই কাহিনি থেকে। স্মেলোভিক নায়ক হতে চাননি, কিন্তু 'চেলিস্ট অফ সারাজেভো' নামটা চিরকালের জন্য কালচারাল রেজিস্ট্যান্সের প্রতীক হয়ে রইল।

কালচারাল রেজিস্ট্যান্স কথাটা শুধুই কথা নয়। এবং, একজন মানুষের ক্ষমতাও কিছু কম নয়।

(উচ্চারণ ভুল হতেই পারে। স্মেলোভিক সম্ভবত সার্বিয়ানে স্মাইলোভিচ। সে ইগ্নোর করুন)

মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ, ২০২৫

ব্ল্যাকহোলের ভিতর পিকনিক

 


মাঝে মাঝে এমন এক একটা কথা জানা যায় ভেবে মাথা একেবারে ভোম্বল হয়ে যায়। তার মধ্যেও লেভেল অফ ভোম্বলনেস সীমা ছাড়িয়ে যায় এমন খবর পেলে।
সাম্প্রতিকতম ঘটনার কথাই বলছি। নাসার বিজ্ঞানীরা আভাস দিয়েছেন আমাদের পৃথিবী, ইনফ্যাক্ট গোটা মহাবিশ্ব একটা ব্ল্যাকহোলের মধ্যে বসে থাকতে পারে। আশংকা করা হচ্ছে মহাবিশ্বের জন্মই হয়েছিল একটা ব্ল্যাকহোলের মধ্যে। সিসিন লিউয়ের গল্প? আজ্ঞে না। একবর্ণও বানিয়ে বলছি না। বরং রিপোর্টটা ছোট করে জানিয়ে দিচ্ছি।
সন্দেহ নেই, JWST মানে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ লঞ্চ হওয়ার পর থেকেই একের পর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে। মহাবিশ্বকে দেখার আর বোঝার পদ্ধতিতে বিপ্লব এসেছে বলা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিকতম ফাইন্ডিং দেখে বৈজ্ঞানিকদের ঘিলু নড়ে গেছে।
দশ বিলিয়ন ডলারের এই টেলিস্কোপ ২০২২ সাল থেকে কসমস অবজার্ভ করা শুরু করেছিল৷ এতদিন ধরে ডিপ স্পেস আর গ্যালাক্সিদের অবজার্ভেশন করে যে রিডিং পাওয়া গিয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, ডিপ স্পেস আর আর্লি গ্যালাক্সির অধিকাংশই একদিকে রোটেট করছে। বারো আনা গ্যালাক্সি ঘুরছে ক্লকওয়াইজ, বাকিরা অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ঘুরছে।
একটা র‍্যান্ডম মহাবিশ্বের ধারণা যদি করা হয়, ফিজিক্সের নিয়ম মেনে বৈজ্ঞানিকরা প্রত্যাশা করেন যে ৫০% ক্লকওয়াইজ ঘুরবে, বাকি ৫০% অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ঘুরবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে গ্যালাক্টিক রোটেশনেরও একটা প্রেফারড ডিরেকশন আছে, পছন্দ অপছন্দ আছে। যে ২৬৩টা গ্যালাক্সি অবজার্ভ করে এই কসমিক ডান্সের নির্ভুল ফাইন্ডিং পাওয়া গিয়েছে, তা JADES মানে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ অ্যাডভান্সড ডিপ এক্সট্রাগ্যালাক্টিক সার্ভের একটা উচ্চাকাঙ্খী প্রজেক্ট। বহু সায়েন্টিস্ট রাতদিন কাজ করে রিডিংগুলো বারবার ভেরিফাই করেছেন, তাই ভুল হওয়ার চান্স প্রায় নেইই।
এখন এই অদ্ভুত অ্যানামলির পিছনের কারণ কী, সেই ভেবে সবাই মাথার চুল ছিঁড়ছে। কিন্তু সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য কারণ যা হতে পারে, তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েই দিয়েছেন প্রজেক্টের টিম লিডার লিওর শামির। তিনি বলেছেন, "আমরা ঠিক নিশ্চিত নই কেন এমন হচ্ছে? কিন্তু একটা কারণ হতে পারে যে ইউনিভার্স ওয়াজ বর্ন রোটেটিং। (ল্যাও ঠেলা) ব্ল্যাক হোল কসমোজলিও এই ধারণাকে সাপোর্ট করে।"
এখন ব্ল্যাকহোল কসমোলজি কী? Schwarzschild cosmology বলেও অনেকে, এই ধারণার জনক রাজ কুমার রাজ কুমার পাথরিয়া আর আই জে গুড। তারা বলেছিলেন, Schwarzchild radius বা ইভেন্ট হরাইজন বলে যা প্রচলিত, যেখান থেকে আলোও ফিরতে পারে না, সেটাও আসলে ভিসিবল ইউনিভার্সের একটা দিগন্ত।
এককালে 'সাইলেন্টিয়াম' বলে একখান বই লিখেছিলাম বলে খানিকটা মাথা ঘামাতে হয়েছিল এসব নিয়ে, তাই মনে আছে, ইনফ্যাক্ট গল্পে এর ভূমিকাও ছিল। সত্যি বলতে ব্যাপারটা জটিল। সহজ করে বলতে গেলে বলা যায় এই ধারণা বলছে (১) একটা ব্ল্যাকহোল যত এনার্জি আর ম্যাটারকে গিলে খাচ্ছে তা ব্ল্যাকহোলের অন্যপ্রান্তে নির্মিত হোয়াইট হোল দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু অন্য দিকে যে ইউনিভার্সটা হবে, সেটা হবে ভিন্ন। সেক্ষেত্রে এই ব্ল্যাকহোল আইস্টাইন রোসেন ব্রিজ বা ওয়ার্মহোল হিসেবে কাজ করবে। (২) যখন একটি মৃত নক্ষত্র কোলাপ্স হওয়ার ফলে একটি ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়, তখন একই সময়ে ওয়ার্মহোলের অপর প্রান্তে অবস্থিত হোয়াইট হোল থেকে একটা অন্য ইউনিভার্স বা মহাবিশ্বের জন্ম হয়। (৩) তার মানে দাঁড়াল, একটা ইউনিভার্সে একটা ব্ল্যাকহোল আছে আর সেই ব্ল্যাকহোলের ভিতরে আরেকটা ইউনিভার্স তৈরি হচ্ছে। আমাদের ইউনিভার্সও আসলে সেইভাবে একটা ব্ল্যাকহোলের ভিতরে অবস্থিত থাকতে পারে। (৪) নেস্টেড ইউনিভার্সের এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল এই বলে যে সূর্যের মতো একটা নক্ষত্র কোলাপ্স করলে যে ব্ল্যাকহোল হবে তাতে তার দৈর্ঘ্য হবে দু মাইলের মতো, তার ভিতর এত বড় ইউনিভার্স তৈরি হবে কী করে? তাতে অঙ্ক কষে বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে থিওরিটিকাল ফিজিসিস্ট নিকোদাম পাপোলাস্কি বলেছিলেন, বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও ব্ল্যাকহোলের ভিতরে দূরত্ব আর সময় অন্য ভাবে কাজ করে, অর্থাৎ একটা পুঁচকে ব্ল্যাকহোলের ভিতর গোটা ব্রহ্মাণ্ড থাকতে পারে, মাখন চুরি করে খাওয়া কৃষ্ণের মুখের মতোই।
এই কন্সেপ্ট পুরোপুরি গৃহীত হয়নি, যদিও ফান্ডামেন্টালি সব ঠিকই আছে। কিন্তু এতদিনের সায়েন্টিফিক কন্ডিশানিং থেকে অত সহজে কেউ বেরোতে পারে না। এখন এই জেডস এর বৈপ্লবিক ফাইন্ডিংসের পর সবাই নড়েচড়ে বসেছে। লিওর শামির বলেছেন, "যদি সত্যিই তাই হয় যে আমাদের ইউনিভার্স জন্মেছিলই রোটেটিং অবস্থায়, আর আমরা সত্যিই এক ব্ল্যাকহোলের ভিতরে বসে আছি, তাহলে কসমসের সমস্ত নিয়ম নতুন করে ভাবতে হবে।"
এখন এর মধ্যে স্পেসটাইম টরশন আর পাস্ট ফিউচার সিমেট্রির অনেক জটিলতা আছে, ব্ল্যাক হোল কসমোলজি হলে গ্যালাক্সির প্রেফারড রোটেশন কীভাবে বদলায়, সেসব জটিল অঙ্ক আছে, সেই সব আর লিখলাম না। নাসা বা স্পেসের সাইটে ডিটেলস পাওয়া যাবে। আপাতত আক্কেল গুড়ুম করার জন্য খবরটাই যথেষ্ট।

সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০২৫

মিশরে আর্কিওলজিকাল বোনাঞ্জা

 


মিশর নিয়ে যারা আগ্রহী, তাদের তো এই বছর পোয়াবারো। তিন মাস কাটেনি, এর মধ্যেই বিভিন্ন সাইটে এমন সব মাথা খারাপ করা আবিষ্কার হয়েছে যে আর্কিওলজিস্ট আর ইজিপ্টোলজিস্টদের মাথা ঘুরে গেছে। প্রাচীন মিশরের লোকজন আমাদের জন্য গাদা গাদা সারপ্রাইজ প্ল্যান করে গিয়েছিল সন্দেহ নেই কিন্তু এমন পরপর মাইন্ডব্লোইং ডিসকভারি এর আগে কোনওদিন হয়েছে কিনা সন্দেহ! যাকে বলে আর্কিওলজিকাল বোনাঞ্জা! তা ঠিক কী কী হয়েছে মিশরে? চটপট দু চারটে দেখে নেওয়া যাক।

প্রথমেই বলতে হয় গিজা গিগা ডিসকভারির কথা। যেই মুহুর্তে আমরা সবাই ভাবতে শুরু করেছি যে গিজার পিরামিডের সমস্ত রহস্য খতম, এখন শুধু ওই জায়গাটা টুরিস্ট সাইট আর সিজ্জিতদার সিনেমার শুটিংয়ের জন্যই কাজে লাগানো হবে, গবেষকরা এমন একটা বম্বশেল ফেলেছে বেচারি ইন্ডিয়ানা জোনসও টুপি খুলে ঘাম মুছবেন। স্কটিশ আর ইতালিয়ান স্কলারদের একটা টিম গিজার পিরামিডের তলায় একটা বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড শহর আবিষ্কার করছে। হ্যাঁ, শহর, চেম্বার ফেম্বার নয়, আস্ত একটা সাবটেরেনিয়ায় সিটি। এই দলের দায়িত্বে ছিলেন পিসা ইউনিভার্সিটির কোরাদো মালাঙ্গা আর স্ট্রাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির ফিলিপো বিওন্দি, তারা অত্যাধুনিক SAR মানে সিন্থেটিক অ্যাপারচার রেডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাফরে পিরামিডের ভিতরে জরিপের কাজ চালাচ্ছিল। এমন সময় তারা সেখানে একটা ঘরের মতো ফর্মেশন দেখতে পায়। আরো ভালো করে খোঁজাখুঁজি করে দেখা যায় একটা বা দুটো নয়, পাঁচ পাঁচটা ঘর, সেগুলো ভূমিগত পথ দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আজকাল সিমস বলে একটা ভিডিও গেম বেরিয়েছে, সেটার আবার একটা পিরামিড এডিশন আছে, সেখানে হেঁয়ালি সলভ করে আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বার আর শহর বানাতে হয়। দেখা যাচ্ছে সাড়ে চার হাজার বছর আগে ইজিপ্টের লোকজন বাস্তবেই সেই গেম খেলছিল। এখন রেডার প্রযুক্তির রিডিং ঠিক হলে এই আন্ডারগ্রাউড চেম্বারগুলো বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। মানে, একটা শহর যত বড় হতে পারে আর কি! রেডারে তোলা ছবিতে ভার্টিকাল শ্যাফট, সর্পিল সিড়ি, ওয়াটার পাইপলাইনের চিহ্ন অব্দি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বিতর্কও কম হচ্ছে না। ইজিপ্টের বৈজ্ঞানিকরা ভূমিগত শহরের ভাবনাটা পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন এই বলে যে ওই রেডারের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এই নিয়ে তুমুল শোরগোল পড়েছে। অন্যদিকে রিসার্চাররা অবশ্য সেখানেই থেমে নেই, তারা ক্লেম করেছেন খুব সম্ভবত এই চেম্বারগুলো হলস অফ আমেনতি হতে পারে। এখন আমেনতি মিশরীয় লোককথায় একটা ভয়ানক কন্সেপ্ট, এই নিয়ে একগাদা মিথ আছে। সহজ ভাষায়  হলস অফ আমেনতি বাস্তব দুনিয়া আর অতিলৌকিক দুনিয়ার মাঝের সেই জায়গা যেখানে নশ্বর বা কায়িক শরীর ছেড়ে আত্মিক অস্তিত্ব অর্জন করা যায়। সাধারণ মানুষ জীবিত অবস্থায় সেখানে গেলে সেখানে অবস্থিত পোর্টাল ইউজ করে মৃতদের দুনিয়ায় প্রবেশ করতে পারে, অতিলৌকিক ক্ষমতাও অর্জন করতে পারে। দশকের পর দশক ধরে পূরাতত্ববিদরা মিশরের এই মিথিকাল চেম্বার খুঁজে বেড়াচ্ছিল। এই বছর রিসার্চারদের দাবী শুনে তারা এমন জোরে মাথা চুলকোতে শুরু করেছে যেন মাথায় উকুন হয়েছে। সত্যি মিথ্যে যাই হোক, আমাদের এই সব জেনে রোমাঞ্চিত হতে কোনও বাধা নেই। তবে থামুন, আবিষ্কারের ফিরিস্তি এই সবে শুরু হল।

যেই সময় একদল আর্কিওলজিস্ট আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি নিয়ে ব্যস্ত, সেই সময় এমন একটা ভীষণ আবিষ্কার হল যে ইজিপ্ট প্রেমীরা চেয়ার থেকে পড়ে যায় আর কি! বলা হচ্ছে, তুতানখামের সমাধি পাওয়ার পর এত বড় কোনও আবিষ্কার হয়নি। কথা হচ্ছে ফারানো থুতমোস দ্বিতীয়র ( Thutmose II)  প্রায় এক শতাব্দী ধরে ইনি ইতিহাসবিদ আর আর্কিওলজিস্টদের ঘোল খাইয়ে খাইয়ে ঘুরিয়ে মেরেছেন। কত বছর ধরে ভদ্রলোকের সমাধি খোঁজা হচ্ছে তার হিসেব নেই। 'পেল পেল' করে রব উঠেছে বহুবার, কিন্তু পায়নি কেউই। থুতমোস বাবু আমাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছেন প্রায় এক শতাব্দী ধরে। ভদ্রলোক এমনিতেই দুর্ভাগা, তার দজ্জাল বউ রানি হাপশেটশুত সব লাইমলাইট নিয়ে নিয়েছিলেন, তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না, কিন্তু জানা যায় না বলেই মারা যাওয়ার এতদিন পর তিনি ইজিপ্টোলজিস্টদের দুনিয়ায় উচ্চস্থান অর্জন করেছেন। প্রসঙ্গত তার মমি পাওয়া গিয়েছিল বহু আগে, শুধু টুম্বটার খোঁজ চলছে দেড়শো বছর ধরে। যাই হোক, ইজিপ্ট আর ব্রিটেনের আর্কিওলজিস্টরা ভ্যালি অফ দ্য কিংসের পাশেই থেবস অঞ্চলে তাঁর সমাধি আবিষ্কার করেছে। অবশ্য জায়গাটা আড়াই বছর আগে জানা ছিল, কিন্তু হায়েরোগ্লিফগুলো প্রায় মুছে গিয়েছিল, টুম্বের অবস্থাও ভালো ছিল না, সব রিঅ্যানিমেট করে কনফার্ম করতে করতেই এতদিন কেটে গেল। এই আবিষ্কারের সবচেয়ে স্পেশাল পয়েন্ট হল, এই প্রথম কোনও ফারাওয়ের সমাধিতে রাখা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জিনিসপত্র পাওয়া গেল। সে এতটাই খারাপ অবস্থায় ছিল যে সেটা যে কোনও ফারাওয়ের সেটা আগে কেউ অনুমান করেনি, সবাই ভেবেছিল, সুয়োরানি দুয়োরানি কারো হবে। ওয়েল, জেন্ডার সোয়্যাপের ধারণা আজকের নয়। দেখা গেল, আসলে সেটাই রাজামশাইয়ের টুম্ব। এখন এই সমাধির হিয়েরোগ্লিফ লিপি আর উদ্ধার করা জিনিসপত্র যে আগামীতে কী খেল দেখাবে সেটা ভবিষ্যত বলবে, আপাতত একশো বছরের লুকোচুরি শেষ হল।

আরো আছে। সাক্কারার কথা তো অনেকেই জানেন। মিশরের প্রাচীনতম পিরামিড এবং নেক্রোপলিস, এই বিশাল এক্সক্যাভেশন সাইটে সবসময় কিছু না কিছু আবিষ্কার হচ্ছেই। রহস্য আর শেষ হয় না। সাক্কারার ভূমি দেবতাও দু হাত খুলে কিছু না কিছু দিয়েই যাচ্ছেন। একবারের জন্যও বলছেন না, যতই দাও ততোই চাই। খিল্লি বাদ দিয়ে বলি, জানুয়ারি মাসে জাপান আর ইজিপ্টের একটা জয়েন্ট আর্কিওলজিকাল মিশনের কর্তারা ঘোষণা করলেন, তারা প্রাচীন মাস্তাবা, মানে কফিনই কিন্তু চারটে হাতি ঢুকে যাবে এমন রেক্টাঙ্গুলার সুপারস্ট্রাকচার, আবিষ্কার করেছেন। সঙ্গে সেকেন্ড আর থার্ড ডাইনেস্টির প্রচুর মূল্যবান বস্তু পাওয়া গিয়েছে। সেসব ২৬৫০ বিসির জিনিস। এছাড়াও ১৫৫০-১২৯২ বিসি, মানে যে সময়টা ইজিপ্টে এইটিন্থ ডাইনেস্টি অফ অফ দ্য নিউ কিংডম বলে পরিচিত, সেই সময়ের দশটারও বেশি সমাধির খোঁজ পেয়েছেন। এখানেই শেষ হলেও হত, কিন্তু সাক্কারাতে সেসব হয় না। একটা চাইলে চারটে পাতুরি ঢেলে দেয়। এই দলের লোক এর পাশাপাশি দুটো মাটির ইট দিয়ে নির্মিত মাস্তাবা, দুটো পাথর দিয়ে কুঁদে বানানো সমাধিও খুঁজে বের করেছে, আর সঙ্গে একটা চুনাপাথর দিয়ে সিল করা শ্যাফটও পাওয়া গেছে যেটা একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সমাধিক্ষেত্রতে যাচ্ছে। প্রায় রোজই সেখানে নতুন জিনিস জানা যাচ্ছে। কয়েক মাস পর দেখা যাক এই নতুন আবিষ্কারগুলো কী বোমা ফাটায়!

কিন্তু দাঁড়ান। এই বছর আর্কিওলজিকাল জ্যাকপট যখন চলছেই, লাক্সর পিছনে থাকবে তা কেমন করে হয়? ফারাওদের রাজধানী বলে কতা! সেখানে কিছু পাওয়া যাবে না তা হয়?জানুয়ারি মাসেই ইজিপ্টের রিসার্চাররা জানালেন এক অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের কথা, যা পাওয়া গিয়েছে দেইর-এল-বেহরিতে রানি হাপশেটসুতের মন্দিরের একদম কাছেই। রানির অন্তেষ্টিক্রিয়ার জন্য নির্মিত কমপ্লেক্স থেকে দেড় হাজারেরও বেশি লাইমস্টোন ব্লক পাওয়া গিয়েছে, প্রতিটাই চমৎকার ভাবে মেন্টেন্ড আছে। রঙটঙ চটে যায়নি, হায়েরোগ্লিফে একদম ঠাসা। এখন প্রথম কয়েকটার অর্থ উদ্ধার করে জানা গিয়েছে এ এক বিশাল জিগশ পাজল, কিন্তু অসম্ভব গোপনীয় আর মাথা খারাপ করা কিছু। হায়েরোগ্লিফ এক্সপার্টরা আপাতত মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে, কিন্তু বাকিরা দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছে। এক্সক্যাভেশনে অবশ্য একগাদা রাজকীয় উপাদানও পাওয়া গিয়েছে, এই ধরনের আর্টেফ্যাক্টও তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর থেকে আর পাওয়া যায়নি, সে একশো তিন বছর হয়ে গেল। যা বুঝলাম, রানি হাপশেটসুত পণ করেছিলেন, মৃত্যুর পরেও তিনি বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন, গার্ল পাওয়ার কাকে বলে। জাস্ট কিডিং!

এইবার আসল মজা। এতসবের মধ্যে এমন একটা ভয়ংকর আবিষ্কার হয়েছে যে সকলের রাতের ঘুম উড়ে গেছে, ঘেমেনেয়ে গেছে সারা দুনিয়ার মিশর এক্সপার্টরা। আবাইদোসে মাউন্ট আনুবিস নেক্রোপলিসে একজন ফারাওয়ের সমাধি পাওয়া গিয়েছে, এই আবিষ্কারের কৃতিত্ব এক মার্কিন-ইজিপশিয়ান টিমের। মুশকিল হচ্ছে এই ফারাও কে, কেউ জানে না। মানে, কিছুই জানে না। কোত্থেকে ইনি উড়ে এসে জুড়ে বসলেন, তাঁর বংশ পরিচয় কী, তিনি কোন রাজত্বে ছিলেন, কিছুই জানা যায় না। খোদাই করা লিপি পড়ে অনুমান করা হচ্ছে এই রহস্যময়ী ফারাও এমন এক নতুন বংশ বা ইতিহাসের কথা জানাতে পারে যে সম্পর্কে এখনও কেউ কিচ্ছুটি জানে না। তেমন হলে মিশরের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে।

এছাড়াও প্রায় নিত্যনতুন আবিষ্কার হচ্ছে এ বছর। মিশর নিয়ে যারা উৎসাহী, তাদের জন্য রোমাঞ্চিত হওয়ার সুবর্ণ সুয়োগ। এ-ই লেখায় কিছু কিছু আলগা টার্ম আছে, মিশর নিয়ে ক্র‍্যাশ কোর্স চাইলে অনির্বাণ ঘোষের 'হায়েরোগ্লিফের দেশে' পড়ে ফেলুন।

রবিবার, ২৩ মার্চ, ২০২৫

মুনির আজও বিচার পায়নি

 


আশাবাদী হওয়া খুব ভালো জিনিস। কিন্তু চারিদিকে যা অবস্থা, চোখকান খুলে রাখলে হতাশাই গ্রাস করে বেশি করে। বেনারসে এক পরিচিত ছেলের ভাইকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে শুনলাম, সে নাকি জানেই না কেন তুলেছে! এদিকে মাস চারেক ধরে সে জেলে বসে আছে। কাণ্ড! এদিকে রিসেন্টলি শুনলাম, সুপ্রিম কোর্ট আবারও বলেছে, ট্রায়াল ছাড়া কাউকে দিনের পর দিন আটকে রাখা চলবে না। শুনে ভালোই লাগে, যতক্ষণ না মনে পড়ে, কথাটা সুপ্রিম কোর্ট কুড়ি বছর ধরে বলেই চলেছে। এদিকে হাজার হাজার সাংবাদিক আর অ্যাক্টিভিস্ট বছরের পর বছর ধরে ট্রায়াল ছাড়া জেলে বসে আছে। ভীমা কোরেগাঁও কেসে কবীর কলা মঞ্চের একগাদা শিল্পীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাদের প্রায় কারো কেসই আদালতে ওঠেনি। উমর খালেদের বেল রিজেক্ট হচ্ছে তো হচ্ছেই। আরে দোষী হলে তদন্ত করে সাজা দিলেই হয়, তদন্তের নামে কুড়ি বছর কাটিয়ে দিলে চলবে? এখন অনেকে এদের নাম শুনে রেগেও যেতে পারে, রাগাই দরকার। কারো নাম আলাদা করে বলবই না কেন? ইউএপিএ ইত্যাদি চুলোয় যাক, নর্মাল কেসেই ট্রায়াল হয় না। আজকাল ঠিকঠাক রিপোর্ট রিলিজ করার চলও উঠে গেছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রিকর্ড বিউরো ২০২১ সালে জানিয়েছিল, ভারতবর্ষের জেলে পাঁচ লাখ চুয়ান্ন হাজার কয়েদি আছে, তাদের মধ্যে চার লাখ সাতাশ হাজার ট্রায়ালের জন্য অপেক্ষা করে আছে। এদের মধ্যে অনেকেই কয়েক বছর কাটিয়ে দিয়েছেন জেলে, কেস আদালতেও ওঠেনি। সাধেই লোকে বলে, পুলিশে ছুঁলে আঠেরো ঘা! জাস্টিস সিস্টেম এমন এক হাস্যকর জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে বলার নয়। নিজে প্যাঁচে না পড়লে কেউ বোঝে না, তা না বোঝাই ভালো। তবে এরকম পরিস্থিতি যে শুধুই ভারতে তেমনটা ভাবলে ভুল হবে। বহু দেশেই কমবেশি একই অবস্থা। বছর ঘোরে, বিচার মেলে না।

এই সূত্রে একটা চমকপ্রদ ঘটনার কথা মনে পড়ে। এই গল্প সম্ভবত খুব বেশি মানুষ জানেন না। অথচ, দুনিয়ার ইতিহাসে এ এক বহুচর্চিত কেস।

গল্পের নায়কের নাম মুনির। মুনির সাইদ তালিব। ১৯৬৫ সালে ইস্ট জাভার বাটুতে তার জন্ম। বাড়ির লোক বেশ উদারবাদী, প্রগেসিভ ধরনের ছিল, শিক্ষা আর সততাকে সমান মূল্য দেওয়া হত পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তাহিরের মনে তাই জাস্টিস সিস্টেমের জন্য একটা অন্য রকম শ্রদ্ধা জন্মে গিয়েছিল। পড়াশোনায় খুবই ব্রাইট ছিল সে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ধারালো ছিল ন্যায় বিচারের প্রতি সচেতনতা। বড় হয়ে যখন সে ব্রাউইজায়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে ভর্তি হয়, খুব তাড়াতাড়ি সে সক্রিয় ভাবে অ্যাক্টিভিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। পড়াশোনা শেষ করে সুরাবায়াতে লিগাল এইড এক্সপার্ট হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। তখন কেউ জানত না স্বপ্নালু চোখের এই ছেলেটা কয়েক বছরের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে চর্চিত হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে উঠবে, হাজার হাজার মানুষের বিচারের জন্য আদালতে আওয়াজ তুলবে। 

আশি আর নব্বইয়ের দশক ইন্দোনেশিয়ার জনতার জন্য মোটেও ভালো সময় নয়। কেউ সরকারের আলোচনা করলেই তার মাথায় খাঁড়ার ঘা নেমে আসত। রাষ্ট্রপতি সুহার্তোকে নিয়ে এমনিতেই ইন্দোনেশিয়ায় দু ধরনের গল্প আছে। এক, তিনি কড়া হাতে মিলিটারি শাসন চালু করে দেশের অর্থনীতি ঠিক করেছেন, ইনফ্লেশন কমিয়েছেন, ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদির পত্তন করেছেন, কমিউনিস্ট রেবেলদের লাথি মেরে তাড়িয়েছেন। দুই, সুহার্তো এক নম্বরের কোরাপ্ট, ফ্যাসিস্ট, ডিক্টেটর আদমি। কয়েক বছর পর দেশের ক্ষমতা পুরোপুরি নিজের হাতে তুলে নিয়ে ডেমোক্রেসির সাড়ে তেইশ করে ছেড়েছেন, দুর্নীতি এবং বিরোধীদের খুন জখম করাতে বা গুম করাতেও তার জুড়ি মেলা ভার, ইস্ট টাইমারে জোর করে হামলা করতে গিয়ে এক ভীষণ যুদ্ধ শুরু করেছেন, যাতে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছেন। দুটোই মোটামুটি সত্যি। বেশিদিন পাওয়ারে থাকলে ক্ষমতা মাথায় উঠে মানুষের যা হয় আর কি! মোদ্দা কথা হল, আশির দশকের শেষ দিকে যখন দেশের অবস্থা পড়তির দিকে যাচ্ছে, একটু একটু করে বিরোধের স্বর শোনা যাচ্ছে, সুহার্তোর কথায়  আয়রন ফিস্ট রুল শুরু হয়ে গেছে। ফ্রি স্পিচ আর প্রেসকে তুলোধনা করা আর মিলিটারিকে কাজে লাগিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো যা নয় তাই করা। এইসব ঝামেলা হলে যারা সবচেয়ে আগে আওয়াজ তোলে (আর সবচেয়ে আগে মারা পড়ে), ইন্দোনেশিয়াতেও তারাই তুলেছিল। ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টরা। দেশ জুড়ে ছাত্ররা আন্দোলন করছে, এদিকে সুহার্তোর সেনা নিষ্ঠুর ভাবে তাদের প্রতিরোধ করছে, লাঠিচার্জ করছে, গুলি চালাচ্ছে, কিডন্যাপ করিয়ে এনকাউন্টার করছে বা বাড়ির লোককে সুদ্ধ তাদের ঘর থেকে তুলে এনে টর্চার করছে, মানে তোহফা অবস্থা।

কিন্তু মুনির ভয় পাওয়ার ছেলে নয়। তার ভ্যালু সিস্টেম ছোটবেলা থেকেই মজবুত, ন্যায়ের জন্য সে সব কিছু কর‍তে পারে। যখন সরকারের ভয়ে অনেকে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকাই সেরা পন্থা বলে মনে করছেন, মুনির ঠিক করল সে দুর্বলদের পক্ষ নিয়ে লড়বে। যাদের জন্য কথা বলার কেউ নেই, তাদের হয়ে লড়বে। সুরাবায়াতে কাজ করার সময় থেকেই সে পুলিশের অত্যাচার, বেআইনি ভূমি অধিগ্রহণ আর লেবার রাইট ভায়োলেশনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে লাগল, গরীব জনতার কেস বিনামূল্যে লড়তে শুরু করল আদালতে। কয়েকদিনের মধ্যেই রটে গেল, এ ছেলের সাহস আছে, এ কম্প্রোমাইজ করার বান্দা নয়!

এদিকে দেশের রাজনীতিক পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে চলেছে। মিলিটারি যথেচ্ছ সব কাণ্ড শুরু করেছে, শয়ে শয়ে মানুষকে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গণগত্যা চলছে। ইস্ট টাইমার আর পাপুয়াতে তো ইন্দোনেশিয়ার মিলিটারি তাণ্ডব নৃত্য করছে। কেউ কিছু বলতে গেলেই মুণ্ডু ঘ্যাচাং। এইসব কাণ্ড যত বাড়তে লাগল, মুনিরের কাছে কেসও আসতে লাগল ততো বেশি। সে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া মানুষদের পক্ষ নিয়ে লড়ল, গণহত্যা আর ম্যাসাকারের তদন্ত করল, সেনাবাহিনীর সেই সমস্ত কীর্তিকলাপের হাঁড়ি হাটে ভেঙে ফেলল যে সব চেপে রাখার জন্য সরকার কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করছে। KontraS (কমিশন ফর দ্য ডিসঅ্যাপিয়ার্ড অ্যান্ড ভিকটিমস অফ দ্য ভায়োলেন্স) বলে একটা সংগঠন গড়ে তুলল ১৯৯৭ সালে। পরের দুই বছর ধরে প্রো ডেমোক্রেসি অ্যাক্টিভিস্ট আর জার্নালিস্টদের কিডন্যাপিংয়ের তদন্ত করে চলল সে, সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ততদিনে সুহার্তোর স্বৈরাচারী শাসন নিয়ে নিন্দেমন্দ শুরু হয়ে গেছে সারা দুনিয়ায়। মরিয়া হয়ে সরকার মরণ কামড় দিচ্ছে। শয়ে শয়ে ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক, সাংবাদিক, সমাজকর্মীকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। কয়েকজনকে টর্চার করে ছাড়া হলেও অনেকে চিরকালের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। মুনির এই কেসগুলোর তদন্ত করে সরাসরি প্রমাণসহ সরকারকে দোষী ঠাউরাল। এক একজনের নাম নিয়ে সে প্রেসে প্রমাণ দাখিল করতে লাগল। স্বভাবতই মুনিরের সঙ্গে সরাসরি মিলিটারি, ইন্টেলিজেন্স আর পলিটিকাল এলিটদের ঠোকাঠুকি লেগে গেল, সে তখন সকলের চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে স্পেশাল ফোর্সের পূর্ব প্রধান জেনারেল প্রাবোও সুবিয়ান্ত আর সুহার্তোর জামাই তাকে দু চক্ষে দেখতে পারত না।

মুনিরের কাছে প্রথমে হুমকি এল। তারপর শাসানো হল নানাভাবে। তাকে ফলো করা হতে লাগল। তারপর এল আক্রমণ। বারবার। কখনও শারীরিক ভাবে, কখনও মানসিক ভাবে। একবার এক শ্রমিক বাঁচাতে গিয়ে নিরাপত্তা কর্মীর কাছে মার খেয়ে হাত ভাঙল, একবার কিডন্যাপিংয়ের ঘটনায় কোপাসাস বা সিক্রেট আর্মির ভূমিকা সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে ঘরে কে যেন বোমা রেখে এল। ততদিনে সুহার্তো শুধু নয়, গোটা রাজনৈতিক ঘরানা আর আর্মি তাকে শত্রু বলে মনে করছে।  সুহার্তোর শাসন উঠে যাওয়ার পরেও তার প্রতি আক্রোশ কমল না।কিন্তু মুনির শত ঝুঁকি সত্ত্বেও কাজ থামাচ্ছে না। প্রেস কনফারেন্সে বক্তৃতা দিয়ে সরকারের অবস্থা ঢিলে করে দিচ্ছে, প্রোটেস্ট লেড করছে, ট্রায়াল আর মিলিটারি আধিকারিকদের এক্সপালশনের জন্য ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। টিমোর, পাপুয়া, আসেহতেও যে সমস্ত বেআইনি হত্যা আর ডিটেনশন হয়েছে, সেই নিয়েও সে সোচ্চার। এদিকে সে এও প্রমাণ পেয়েছে যে এই জায়গা থেকে মিলিটারির কোরাপ্ট অফিসিয়ালরা নিষিদ্ধ ড্রাগ আর চোরাই কাঠের ব্যবসাও করছে।

মুনির জানত, সে কোন লেভেলের ঝুঁকি নিয়েছে।একবার সে বলেছিল, "Being a human rights activist means you have to be ready to be beaten, terrorized, and even killed. But if I stop, who else with fight for the justice?"

মুনির ততদিনে ইন্ডোনেশিয়ার সবচেয়ে সক্রিয় হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য নিবেদিত 'ইমপার্সিয়াল'-এ তাকে ডিরেক্টর করা হয়েছে, তাতে তার কাজের ব্যাপ্তি আর ঝুঁকি, দুটোই বেড়েছে।

২০০৪ সালের কথা। মুনির অ্যামস্টারডামে আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে যাচ্ছিল। সেপ্টেম্বর মাসের সাত তারিখে সে গরুডা ইন্টারন্যাশনালের আমস্টারডামগামী ফ্লাইটে উঠল, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই তার বুকে পেটে ভয়ানক ব্যাথা শুরু হল, বমি হতে লাগল বার বার। ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টরা প্রথমে ভেবেছিল ফুড পয়জনিং, কিন্তু মুনিরের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে লাগল। প্লেন যখন আমস্টারডামের মাটি ছুঁল, তার দেহে আর প্রাণ নেই। মাত্র ৩৮ বছর বয়স হয়েছিল তার। 

অটোপ্সি করে জানা গেল ফুড পয়জনিং নয়, পরিকল্পনা করে তাকে খুন করা হয়েছে। ডাচ অথোরিটিরা জানালেন, তার পেট থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্সেনিক পাওয়া গেছে, লিথাল ডোজ। ব্যাপারটা কাকতালীয় নয়। ঘটনা ইচ্ছে করে ঘটানো হয়েছে, যখন প্লেন থাকবে ৩৫০০০ ফুটে, আর মেডিকাল অ্যাসিস্ট্যান্স পাওয়ার কোনও উপায় থাকভে না। তার খুনের পরিকল্পনা করেছে যারা তারা নিশ্চিত হতে চেয়েছিল মুনির প্লেন থেকে জীবিত অবস্থায় নামবে না।

মুনিরের মৃত্যুতে গোটা ইন্ডোনেশিয়া জুড়ে প্রতিবাদের বন্যা বয়ে গেল। এটা সাধারণ একটা অ্যাসাসিনেশন নয়, মুনির মানুষের কথা ভেবে বাঁচত, আজীবন সাধারণ মানুষকে বিচার দেওয়ার জন্য লড়ে গেছে সে। তার এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারেনি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সুসিলো বাম্বাং য়ুধোউনো চাপে পড়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম আর তদন্ত কমিটি বসালেন বটে, কিন্তু অর্ধসত্য ছাড়া কিছুই বেরোল না। পলিটিকাল ইন্টারফেরেন্স আর কভার আপ করে সত্যি চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলতেই লাগল। এদিকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেশনে জানা গেল ইন্ডোনেশিয়ার ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বিআইএন এর পিছনে আছে। গরুডা ইন্টারন্যাশনানের পাইলটই সম্ভবত মুনিরের পানীয়তে বিষ মিশিয়েছিল, বহুদিন পর তাকে চোদ্দ বছরের সাজা দেওয়া হল, কিন্তু কার নির্দেশে সে এমন করল সেটা জানা গেল না। এদিকে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া হল ওপর থেকে নির্দেশ পেয়ে, প্রমাণ লোপ পেল, সাক্ষীরা হুমকি পেতে লাগল, হাই র‍্যাঙ্কিং অফিসিয়ালদের জেরা অব্দি করা হল না। ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টরা অবশ্য হাল ছাড়লেন না। একে একে সুতো জুড়তে লাগল, বোঝা গেল মুনিরকে সরানোর পিছনে সরকারের বড় বড় নেতা, আর্মি অফিশিয়াল আর ইন্টেলিজেন্সের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের হাত আছে। সকলেরই মুখোশ খুলে দিচ্ছিল মুনির, তাকে বাঁচিয়ে রাখা বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। তাদের অনেকেই এখনও ক্ষমতাসীন, বড় বড় জায়গায় বসে আছে সবাই। প্রচুর প্রতিবাদ হল, মিছিল হল, তদন্ত কমিটি বসল, কিন্তু বিচার হল না। যারা মুনিরকে মেরেছে, তাদের কোনও সাজা হল না।

আজ একুশ বছর কেটে গেছে, মুনিরের হত্যার জন্য দায়ী মানুষরা আজও ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার স্ত্রী সুশিওয়াতি নিজেও লেবার রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট, দুই সন্তানকে নিয়ে সে আজও স্বামীর জন্য বিচার চেয়ে চলেছে। এখনও প্রতি মাসে ইন্দোনেশিয়ায় কোথাও না কোথাও মুনিরের জন্য বিচার চেয়ে প্রোটেস্ট হয়, হাজার হাজার আবেদন পড়ে স্বাধীন ভাবে তদন্ত করার জন্য, কিন্তু লাভ হয় না কিছুই। মারা যাওয়ার পর মুনিরের নামে প্রচুর সম্মান দেওয়া হয়েছে, তার কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু মানবাধিকার সংগঠন খুলেছে, তার লিগেসি রয়ে গেছে। কিন্তু দোষীদের সাজা হয়নি। যে ছেলেটা অন্যদের বিচার দেওয়ানোর জন্য আটত্রিশ বছর বয়সে মারা গেল, সে নিজে আজও বিচার পায়নি। 

দুনিয়া জুড়ে এই অবস্থা। তাহলে কেনই বা কেউ অবিচারের বিরুদ্ধে লড়বে? কেনই বা ন্যায় চাইবে? কেন আশা রাখবে? কেন বিচার চাইতে কোর্টে যাবে? 

এর উত্তর মুনির জানত। সে বলেছিল, "If we stay silent in the face of injustice, we become part of the crime."

We have tired of Violence 
The new press